শিরোনাম
প্রকাশ : শুক্রবার, ২ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ জুলাই, ২০২১ ২২:৪২

খলিফা হারুন অর রশিদ : স্বর্ণযুগের সম্রাট

আবদুল কাদের

খলিফা হারুন অর রশিদ : স্বর্ণযুগের সম্রাট
Google News

হাজার বছর আগের একজন আব্বাসীয় খলিফা হারুন অর রশিদ। যিনি ছিলেন প্রাণচঞ্চল বাগদাদ নগরীর শাসনকর্তা। তাঁর শাসনকালেই বাগদাদ নগরী ঐশ্বর্যের চরমে পৌঁছায়। বাগদাদ নগরী জ্ঞান-বিজ্ঞান, ধর্মীয় ও সংস্কৃতিচর্চার শিখরে পৌঁছেছিল বলে সে সময়টিকে ইসলামের স্বর্ণযুগ বলা হয়। একদিকে নিরীহ প্রজাদের কাছে তিনি ছিলেন স্নেহপরায়ণ শাসক, অপরদিকে অন্যায়কারীদের কাছে ছিলেন এক মূর্তিমান আতঙ্ক। যিনি আল-কোরআনের আলোকে গড়ে তুলেছিলেন ইসলামী খেলাফত। ইসলামের ইতিহাসের বিখ্যাত চরিত্র খলিফা হারুন অর রশিদের জীবনী নিয়েই আজকের আয়োজন...

 

অল্প বয়সে খেলাফতের মহানায়ক

নানা গল্পের মধ্য দিয়ে আমাদের হৃদয়পটে খলিফা হারুন অর রশিদের শাসনামলের যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে তা মূলত কল্পনা; বাস্তবতা থেকে আলাদা। তবে কল্পনায় আমরা আজও হেঁটে বেড়াই বাগদাদের অলিগলিতে। মোহিত হই খলিফার ন্যায়পরায়ণতা এবং ঐশ্বর্যের কথা ভেবে।

ছেলেবেলায় গল্পের বই পড়তে গিয়ে আমরা পরিচিত হয়েছিলাম খলিফা হারুন অর রশিদের সঙ্গে। হাজার বছর আগের একজন আব্বাসীয় খলিফা- গল্পের মধ্য দিয়ে তিনি জায়গা করে নিয়েছিলেন আমাদের কল্পরাজ্যে। চোখ বুজলে ভেসে উঠত ইসলামী স্বর্ণযুগের ইতিহাস, খলিফার মনোরম প্রাসাদ, প্রাচীন বাগদাদ নগরী এবং ন্যায়পরায়ণ শাসনকর্তার শাসন ব্যবস্থা। আর নব্বই দশকের টিভি সিরিয়াল আরব্য রজনীর (অ্যারাবিয়ান নাইটস) কথাও নিশ্চয়ই অনেকের মনে আছে! সেই সিরিয়ালের কাল্পনিক চরিত্র তৈরি হয়েছিল আব্বাসীয় খলিফা হারুন অর রশিদকে নিয়েই।

৭৬৩ কিংবা ৭৬৬ সালের ১৭ মার্চ আব্বাসীয় খেলাফতের অধীন রাই নামক অঞ্চলে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আল মাহদি এবং মাতার নাম আল খাইজুরান। বাল্যকালে তাঁর শিক্ষাগুরু ছিলেন বিখ্যাত শিক্ষক ইয়াহিয়া বর্মাক। বড় হয়ে গুরুর মতোই একজন প্রতিভাবান ব্যক্তি হিসেবে পরিণত হন খলিফা হারুন অর রশিদ। ৭৮৬ সালে আল মাহদির মৃত্যুর পর আব্বাসীয় বংশের পঞ্চম শাসক হিসেবে খেলাফত গ্রহণ করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ২০ বছর। যুবক বয়সে খেলাফতের অধিপতি হয়ে প্রাচীন বাগদাদকে ঐশ্বর্যের নগরীতে পরিণত করেন। লোকেরা খলিফা হারুন অর রশিদকে ‘সঠিক’ এবং ‘ন্যায়পরায়ণ’ পদবি দেয়। খলিফা হারুন অর রশিদ ৭৮৬ সাল থেকে ৮০৯ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। বাগদাদে বিজ্ঞান, ধর্ম ও সংস্কৃতি সমৃদ্ধি লাভ করায় তাঁর শাসনামলকে আব্বাসীয় খেলাফতের স্বর্ণযুগ বলা হয়ে থাকে। দক্ষতার সঙ্গে দীর্ঘ ২৩ বছর খেলাফতের শাসনকার্য পরিচালনার পর তিনি ৮০৯ সালে তুস নগরীতে মৃত্যুবরণ করেন। সেখানেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। দাম্পত্য জীবনে তাঁর সঙ্গী ছিলেন জুবাইদা। মৃত্যুকালে খলিফা হারুন অর রশিদ তিন ছেলেকে রেখে যান। যাদের নাম যথাক্রমে আল আমিন, আল মামুন, আল মুতাসিম। খলিফার জীবনের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী ইসলামী খেলাফতের পরবর্তী শাসক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাঁর ছেলে আল আমিন।

খলিফা হারুন অর রশিদকে ইসলামী খেলাফতের মহানায়ক বলা হয়ে থাকে। ইসলামী ইতিহাসবিদগণ তাঁকে স্বর্ণযুগের সম্রাট বলে অভিহিত করে থাকেন। তাঁর শাসনকালে আব্বাসীয় খেলাফতে ব্যাপক সমৃদ্ধি লাভ করে। সে সময় আব্বাসীয় খলিফাদের রাজধানী ছিল দামেস্ক। সেখান থেকে রাজধানী সরিয়ে আনা হয় ইরাকের বাগদাদে। এটি ছিল পারস্যের সম্রাটদের গ্রীষ্মাবকাশের স্থান। এখান থেকে মূলত আব্বাসীয়রা সহজেই এশিয়ার দিকে নজর রাখতে পারতেন। কারণ ইউরোপ থেকে বাগদাদ অনেক দূরে। এক সময় আব্বাসীয় খলিফাগণ সাম্রাজ্যকে সংহত করতে শুরু করলেন। খলিফা হারুন অর রশিদের সময়কাল ছিল আব্বাসীয় সাম্রাজ্যের শ্রেষ্ঠ সময়। এ সময় ইসলামী শিল্প ও সংস্কৃতির যথেষ্ট প্রসার ঘটে। খলিফা হারুন অর রশিদ বাগদাদের বিখ্যাত গ্রন্থাগার বাইতুল হিকমাহ প্রতিষ্ঠা করেন। বাইতুল হিকমাহ ছিল আব্বাসীয় আমলে ইরাকের বাগদাদে প্রতিষ্ঠিত একটি গ্রন্থাগার, অনুবাদকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এটিকে ইসলামী স্বর্ণযুগের একটি প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বাইতুল হিকমাহ এ সময় তার সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছায়। জ্ঞানের আদান-প্রদানের জন্য হারুন অর রশিদ এবং তাঁর ছেলে খলিফা আল মামুন অনেক জ্ঞানীগুণী ব্যক্তিকে বাইতুল হিকমাহতে নিয়ে আসেন। নবম থেকে ১৩ শতক পর্যন্ত পার্সিয়ান ও খ্রিস্টানসহ অসংখ্য পন্ডিত ব্যক্তি এই গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আরবিতে গ্রন্থ অনুবাদ ও সংরক্ষণের পাশাপাশি পন্ডিতরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে মৌলিক অবদান রাখেন। এ ছাড়াও খলিফা হারুন অর রশিদ তাঁর প্রজা ও সাধারণ মানুষের সুবিধায় একে একে তৈরি করেন অসংখ্য পান্থশালা, মসজিদ, মাদরাসা ও হাসপাতাল। দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য জ্ঞানী, গুণীর আনাগোনা শুরু হলো বাগদাদ নগরীতে। বিশেষত ছাত্র আর শিল্পীদের ভিড় বাড়তে থাকল। কারণ খলিফাগণ জ্ঞানীর কদর করতেন। বাগদাদ পরিণত হলো জ্ঞানানুশীলনের এক তীর্থস্থানে। এক সময় আব্বাসীয় খেলাফত প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা বারমাকি পরিবারের ভূমিকা হ্রাস পেতে শুরু করে। ৭৯৬ সালে তিনি বর্তমান সিরিয়ার রাকা নগরীতে (তুস) তাঁর দরবার এবং খেলাফতি সরকারকে স্থানান্তর করেন।

হারুন অর রশিদ বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক ও সামরিক দিক দিয়ে সমৃদ্ধিশালী হওয়ায় তাঁর জীবন ও দরবার বিভিন্ন গল্পের উপাদানে পরিণত হয়েছে। এসবের মধ্যে কিছু বাস্তব হলেও অধিকাংশকেই কাল্পনিক হিসেবে গণ্য করা হয়। বাস্তব ঘটনাবলির মধ্যে অন্যতম হলো শার্লেমাইনের কাছে ঘড়ি পাঠানোর ঘটনা। ৭৯৯ সালে হারুন অর রশিদের কাছে বন্ধুত্বের আহ্বান জানিয়ে পাঠানো ফ্রাঙ্কিশ দলকে বিদায়ী উপহার হিসেবে এটি দেওয়া হয়েছিল। শার্লেমাইন ও তাঁর লোকজন এই ঘড়ির শব্দ ও কার্যকলাপকে জাদুবস্তু ভেবেছিলেন। এ থেকে বোঝা যায়, হারুন অর রশিদের শাসনামলে বিজ্ঞান ও শিল্পচর্চা কতটা সমৃদ্ধিশালী ছিল।

বহুল প্রচলিত আরেকটি ঘটনার মধ্যে রয়েছে ক্ষুধার্ত নারীকে খাবার বিতরণের ঘটনা। এক রাতে খলিফা হারুন অর রশিদ এক সঙ্গীকে সঙ্গে নিয়ে নৈশভ্রমণে বের হয়েছেন। আদতে এটি ছিল রাজ্যের নাগরিকের সুখ-দুঃখের খোঁজ নেওয়ার মাধ্যম। সে রাতে ছিল ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিছুদূর যেতেই হঠাৎ খলিফা শিশুর কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন। অন্ধকার পরিবেশের কারণে কান্নার স্থান নির্ণয় করা সম্ভব হচ্ছিল না। এক সময় খলিফা বালুময় বিস্তীর্ণ পথ পাড়ি দেওয়ার পর শব্দের উৎস খুঁজে পেলেন। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনা অবলোকন করার চেষ্টা করেছেন খলিফা ও তাঁর সঙ্গী। প্রথমে বোঝা গেল এক মহিলা চুলায় কিছু রান্না করছেন। তাঁর পাশে দুই শিশু খাবারের জন্য কান্না করছে। অথচ মহিলাটি বাচ্চাদের অতিশিগগিরই খাবার দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছেন। এভাবে বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হলো। বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরে খলিফা ও তাঁর সঙ্গী আগন্তুক হিসেবে মহিলার দিকে এগিয়ে গেলেন। মহিলার কাছে ঘটনা জানতে চাইলে মহিলা তাঁর অসহায়ত্বের কথা বলতে লাগলেন। এই দুই বাচ্চা আমার সন্তান, আমার স্বামী যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। আমি সারা দিন চেষ্টা করেও তাদের জন্য কোনো খাদ্য সংগ্রহ করতে পারিনি। কথাগুলো শুনে তখন আগন্তুকদের মধ্যে প্রথমজন খুবই মর্মাহত হলেন এবং পাশের যুবককে তাঁদের খাবারের জন্য নিজ কাঁধে করে আটা এবং খেজুর নিয়ে আসার নির্দেশ দিলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে খাদ্য নিয়ে ফিরে এলেন যুবক। এর অল্প সময় পরই মহিলা জানতে পারলেন- তাঁদের জন্য খাদ্য বহন করে নিয়ে আসা ব্যক্তিই খলিফা হারুন অর রশিদের পুত্র আল মুতাসিম।

 

জ্ঞানচর্চায় ব্যাপক অগ্রগতি

খলিফার শাসনামলে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যের তুলনায় বাগদাদ ও আব্বাসীয় সাম্রাজ্য অনেক বেশি উন্নতি লাভ করে শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শাসন পদ্ধতির দিক দিয়ে। জ্ঞানের এই তীর্থভূমিতে শুরু হয় বিজ্ঞানের চর্চা। প্রাচীন যুগে মিসর, চীন কিংবা ভারতবর্ষে বিজ্ঞানচর্চা তেমনটা হতো না। গ্রিসে বিজ্ঞানের চর্চা ছিল। কিন্তু রোমে বিজ্ঞানচর্চা ছিল না। আরবদের ছিল অনুসন্ধিৎসু মন। আধুনিক বিজ্ঞানচর্চা শুরু হয় আরবদের হাত ধরেই। ভারতবর্ষ থেকেও গণিতজ্ঞ ও বিজ্ঞ ব্যক্তিরা বাগদাদে যেতেন। তাঁদের কাছ থেকে গণিতশাস্ত্র, চিকিৎসা ইত্যাদি বিষয়ে আরবরা জ্ঞান লাভ করলেন। আরবদের একটা বড় গুণ ছিল তাঁরা নতুন কোনো আবিষ্কার খুব সহজেই শিখে নিতেন। আরবগণ অনেক কিছু আবার চীনের কাছ থেকেও শিখেন যেমন কাগজ তৈরি করা। অন্যের কাছ থেকে যে জ্ঞান লাভ করেছিলেন তার ওপর ভিত্তি করে আরবরা নিজ পদ্ধতিতে গবেষণা শুরু করেন। দুরবিনের আবিষ্কার আরবরাই প্রথম করেন। আরবের চিকিৎসা পদ্ধতি ছিল খুবই উন্নত। ইউরোপেও তাঁদের চিকিৎসা পদ্ধতির অনেক সুনাম ছিল। আরবদের উন্নতি আর জ্ঞানের অনুশীলন কেন্দ্র ছিল বাগদাদ। পশ্চিমের আরও একটি অঞ্চলে আরবদের উন্নত সভ্যতা ছিল। সেটি ছিল স্পেনে। সেখানকার রাজধানী ছিল কর্ডোভা। এ ছাড়াও আরব সাম্রাজ্যের আরও অনেক সাংস্কৃতিক, বিদ্যাচর্চা কেন্দ্র ছিল কায়রো, বসরায়। কিন্তু হারুন অর রশিদের সময়ে বাগদাদ ছিল সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ। আব্বাসীয় খলিফাদের রাজধানী বাগদাদ ছিল শিল্প, সংস্কৃতি ও সৌন্দর্যের সর্বোত্তম কেন্দ্র। আরবদের যেমন জ্ঞানের তৃষ্ণা ছিল অপরিমেয় তেমনি ভ্রমণের তীব্র নেশাও ছিল। সমুদ্র পাড়ি দিয়ে দূরদূরান্তে তাঁরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে উপনিবেশ স্থাপন করতেন।

 

ইসলামী শরিয়ায় রাষ্ট্র পরিচালনা

সিরিয়ার একটি শহরের নাম রাকা। সেখান থেকে খলিফা হারুন অর রশীদের কাছে চিঠি এলো। সেই চিঠিতে লেখা ছিল- রাকা নগরীর বিচারক অসুস্থ থাকায় দীর্ঘদিন বিচারকার্য বন্ধ। খলিফা হারুন অর রশীদ চিঠির উত্তরে নতুন বিচারকের ব্যবস্থা করলেন। দিন কয়েক যেতেই প্রহরীরা এক বৃদ্ধা মহিলাকে আসামি হিসেবে দরবারে হাজির করলেন। বৃদ্ধা শহরের এক রেস্তোরাঁ থেকে রুটি আর মধু চুরি করার সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন। বিচারে বৃদ্ধা স্বীকার করলেন তিনি গত এক সপ্তাহ অভুক্ত ছিলেন। তার সঙ্গে থাকা এতিম দুই নাতিও অনাহারে দিনযাপন করছিল। ওদের ক্ষুধার্ত চেহারা ও কান্না সহ্য করতে না পেরেই বৃদ্ধ মহিলা চুরি করেন। বৃদ্ধার কথা শুনে বিচারক পুরো দরবারে চোখ বুলালেন। ঘোষণা দিলেন, কাল যেন নগর, খাদ্য, শরিয়া, নিরাপত্তা প্রধান এবং সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকেন। সবার সামনে বৃদ্ধ মহিলার চুরির রায় ঘোষণা করা হবে। পর দিন সকালে সবার উপস্থিতিতে বিচারক রায় ঘোষণা করলেন- ‘বৃদ্ধ মহিলার চুরির অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ৫০টি চাবুক, ৫০০ রৌপ্যমুদ্রা আর অনাদায়ে এক বছর কারাদন্ড দেওয়া হলো। তবে সত্য স্বীকার করায় হাত কাটা মাফ করা হলো।’

যে নগরে একজন ক্ষুধার্ত বৃদ্ধ মহিলা না খেয়ে ক্ষুধার যন্ত্রণায় চুরি করতে বাধ্য হন সেখানে তো সবচেয়ে বড় অপরাধী সে দেশের খলিফা। আর আমি এসেছি খলিফার প্রতিনিধি হয়ে। আমি যেহেতু তাঁর অধীনে চাকরি করি তাই ৫০টি চাবুকের ২০টি আমার হাতে মারা হোক। আর এটা বিচারকের আদেশ।

বিচারক প্রহরীকে চাবুক আনার নির্দেশ দিয়ে নিচে নেমে ওই বৃদ্ধ মহিলার পাশে দাঁড়ালেন। বিচারক বললেন, যে নগরে একজন ক্ষুধার্ত বৃদ্ধ মহিলা না খেয়ে ক্ষুধার যন্ত্রণায় চুরি করতে বাধ্য হন সেখানে সবচেয়ে বড় অপরাধী সে দেশের খলিফা। আর আমি এসেছি খলিফার প্রতিনিধি হয়ে। তাই ৫০টি চাবুকের ২০টি আমার হাতে মারা হোক। আদেশ অনুযায়ী বিচারকের হাতে ২০টি চাবুক মারা হলো। চাবুকের আঘাতে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। কেউ একজন বিচারকের হাত বাঁধার জন্য এগিয়ে গেলে বিচারক নিষেধ করেন। এরপর বিচারক বললেন ‘যে শহরে নগরপ্রধান, খাদ্যগুদাম প্রধান ও অন্যান্য সমাজ হিতৈষীরা একজন অভাবগ্রস্ত মহিলার ভরণ-পোষণ করতে পারেন না, সেই নগরে তারাও অপরাধী। তাই বাকি ৩০টি চাবুক সমানভাবে তাদের মারা হোক।’ এরপর বিচারক নিজ পকেট থেকে বের করা রুমালের ওপর ৫০টি রৌপ্যমুদ্রা রাখলেন। তারপর বিচারপতি উপস্থিত সবাইকে বললেন, ‘যে সমাজ একজন বৃদ্ধ মহিলাকে চোর বানায়, যে সমাজে এতিম শিশুরা উপবাস থাকে সে সমাজের সবাই অপরাধী। তাই উপস্থিত সবাইকে ১০০ দিনার রৌপ্যমুদ্রা জরিমানা করা হলো।’

এবার মোট ৫০০ দিনার রৌপ্যমুদ্রা থেকে ১০০ দিনার রৌপ্যমুদ্রা জরিমানা বাবদ রেখে বাকি ৪০০টি রৌপ্যমুদ্রা থেকে ২০টি চুরি যাওয়া দোকানের মালিককে দেওয়া হলো। বাকি ৩৮০টি রৌপ্যমুদ্রা বৃদ্ধাকে দিয়ে বললেন ‘এগুলো আপনার ভরণ-পোষণের জন্য। আর আগামী মাসে আপনি খলিফা হারুন অর রশীদের দরবারে আসবেন। খলিফার পক্ষ থেকে আমরা ক্ষমাপ্রার্থী’। এক মাস পরে বৃদ্ধা খলিফার দরবারে গিয়ে দেখেন- খলিফার আসনে বসা সেই লোকটি যিনি তার বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন। খলিফা চেয়ার থেকে নেমে এসে বললেন, আপনাকে ও আপনার এতিম দুই নাতিকে উপাস রাখার জন্য সেদিন বিচারক হিসেবে ক্ষমা চেয়েছি। আজ দরবারে ডেকে এনেছি। প্রজা অধিকার সমুন্নত না করায় অধম এই খলিফাকে ক্ষমা করে দিন।

 

রাজনৈতিকভাবে সফল খলিফা

খলিফা হারুন অর রশীদ খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার অল্প কদিনের মধ্যেই খারিজিরা বিদ্রোহ শুরু করেন। প্রথম দিকে মসুলে এই বিদ্রোহ দেখা দিলেও পরে তা আর্মেনিয়া ও আজারবাইজানে ছড়িয়ে পড়ে। এসব অঞ্চলে খারিজিদেরকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আল ওয়ালিদ। হারুন অর রশিদ প্রথমে তাকে হত্যা করলেও আল ওয়ালিদের আরেক নারী উত্তরাধিকারী হিসেবে লায়লা বিদ্রোহী খারিজিদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। লায়লা নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর এই আন্দোলন নতুন মাত্রা লাভ করে। আরব ইতিহাসে জোয়ান অব আর্ক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সেই আন্দোলনের রেশ ইরাক পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। খারিজিদের এই আন্দোলন দমনের জন্য খলিফা কঠোর নীতি গ্রহণ করেন। বিদ্রোহী খারিজিদের পরাজিত করে দলের নেতৃত্বদানকারী নারী লায়লাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার অধিকার  প্রদান করেন। এতে খারিজি আন্দোলন দমনের পাশাপাশি হারুন অর রশিদ রাজনৈতিক সাফল্য লাভ করেন। বাইজান্টাইনদের সঙ্গে খলিফা আল মাহদির সময় থেকেই বিরোধ ছিল। তখনকার সময় খলিফা হারুন বাইজান্টাইনদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সফলতা লাভ করেন। এর ফলে খিলাফতে তাঁকে রশিদ উপাধি দেওয়া হয়। হারুন অর রশিদ যুদ্ধে বিজয় লাভ করার পরও বিরোধ চলতেই থাকে। ফলে তাঁর শাসনের শুরুর দিকে ৭৯১ সালে বাইজান্টাইন শাসকের সঙ্গে বিরোধ দেখা দেয়। আর সেই বিরোধে হারুন সফলতা লাভ করায় বাইজান্টাইনরা কর প্রদান শর্তে চুক্তি করেন। কিন্তু বাইজান্টাইনদের ক্ষমতা পরিবর্তনের পর দাইসেফোরাস ক্ষমতায় এলে কর প্রদানে বিরোধিতা ও আব্বাসীয়দের অস্বীকার করতে শুরু করে। এর উচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য খলিফা দাইসেফোরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সৈন্যদলের নেতৃত্ব প্রদান করেন। এতে দাইসেফোরাস ব্যাপকভাবে পরাজিত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে ৮০৮ সালে আবার বিদ্রোহ করলে আবার দাইসেফোরাসকে পরাজিত করেন খলিফা হারুন অর রশিদ। ইতিহাসবিদদের মতে, খলিফার শাসনামলে এ রকম চুক্তিভঙ্গ দুইবার হয়নি। হারুন অর রশিদের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার এ রকম ঘটনা ঘটেছে। তবে বারবারই খলিফা হারুন অর রশিদ জয়লাভ করে তাঁর বীরত্ব প্রমাণ করেছেন। তাঁর শাসনামলের অন্যতম ঘটান হলো- আফ্রিকায় বিদ্রোহ দমন। হারুন অর রশীদ ক্ষমতায় আরোহণ করার পর পরই সেখানে বিদ্রোহ দেখা দেয়। বিদ্রোহ দমন করার জন্য খলিফা সেখানে হারসামাকে পাঠান। হারসামার অসাধারণ রণনৈপুণ্যে সেখানে বিদ্রোহ দমন করেন এবং ইব্রাহিম ইবনে আগলাবকে সেখানকার শাসক হিসেবে নিয়োগ করা হয়। এর পরবর্তীতে সেখানে বংশানুক্রমিকভাবে আগলাবি শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এভাবেই খলিফা হারুন অর রশিদ আব্বাসীয় খিলাফতকে সুসংহত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং রাজনৈতিক সাফল্যের স্বর্ণশিখরে আরোহণ করেন।

 

পঞ্চম খলিফার শাসনামল

পঞ্চম আব্বাসীয় খলিফা যেমন ছিলেন সমরকৌশলী তেমনি প্রজারঞ্জক শাসকও। তাঁর শাসনামলে প্রশস্ত রাজপথের আশপাশে পরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য প্রাসাদোপম অট্টালিকা, স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত, দোকানপাট, কত প্রমোদ উদ্যান আর খেলার মাঠ। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য খুব ফেঁপে উঠল। সাম্রাজ্য বৃদ্ধি পেতে লাগল। রাজকর্মচারীদের সাম্রাজ্যের নানা অংশের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে হতো। এর জন্য তৈরি করা হলো ডাকবিভাগ। সাধারণ মানুষের সুবিধায় একে একে তৈরি হলো অসংখ্য পান্থশালা, হাসপাতাল। বাগদাদ পরিণত হলো জ্ঞানানুশীলনের এক তীর্থস্থানে। তাঁর শাসনামলে নৌযোগাযোগ উন্নত হওয়ার কারণে সুদূর ইউরোপের সঙ্গে আব্বাসীয় খিলাফতের বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। তাঁর শাসনাধীন এলাকায় ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয় এবং ব্যবসায়ীদের বিশেষ সুবিধা প্রদান করা হয়। ফলে ব্যবসা ক্ষেত্রে নানা উন্নয়ন সাধিত হয়। হারুন অর রশীদের শাসনামলে অন্যতম একটি আমূল পরিবর্তনকারী ঘটনা হলো ‘আল বিমারিস্তান’ নামক চিকিৎসালয় স্থাপন। এটি ছিল বৃহৎ আকারের একটি চিকিৎসালয় যেখানে মুসলিম বিশ্বের নামকরা সব চিকিৎসাবিজ্ঞানী সেখানে সেবা প্রদান ও গবেষণা কাজে নিযুক্ত ছিলেন। তাঁর সময়ে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কার্যাবলি হলো আরবদের পানির কষ্ট লাঘব করার জন্য ১০ লাখ দিনার ব্যয়ে নির্মিত ‘নহরে যুবাইদা’। আবদুল্লাহ বিন ইদ্রিস, শফি, আসমায়ী, আবদুল্লাহ বিন নোয়াস প্রভৃতি জ্ঞানী-গুণী ও কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা দান এবং ইব্রাহিম মসুলির মতো বিখ্যাত গায়কদের নিজ দরবারে আশ্রয় প্রদান করেছিলেন।