আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের প্রত্যয়ে “মায়ের কথা, আমার ভাষা” শিরোনামে এক ব্যতিক্রমী আয়োজন করেছে বসুন্ধরা শুভসংঘ, বান্দরবান জেলা শাখা। পার্বত্য জনপদের ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতে এ আয়োজনে অংশ নেন জেলার ১২টি জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা।
অমর একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জাতিসত্তা ও ভাষাভিত্তিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষাসহ সকল সংগ্রাম ও আন্দোলনের উৎস ও প্রেরণা। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে, যা বিশ্বব্যাপী মাতৃভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় এক ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।
পার্বত্য চট্টগ্রামে ১২টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পাশাপাশি বাঙালিদের মিলেমিশে বসবাস। নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, খেয়াং, লুসাই, বম, ম্রো, খুমি, চাক ও পাংখোয়া সম্প্রদায়। প্রত্যেকের রয়েছে নিজস্ব ভাষা ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
জেলা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভাষার প্রতি আবেগ, অনুভূতি, সম্মান ও ভালোবাসা প্রকাশ করা হয়। বক্তারা বলেন, মাতৃভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়- এটি আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও অস্তিত্বের প্রতীক।
বান্দরবান জেলা বহুজাতিক ও বহুভাষিক এক অনন্য ভূখণ্ড। এখানে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে। তবে বিশ্বায়ন, প্রযুক্তিনির্ভরতা ও প্রজন্মান্তরের দূরত্বের কারণে অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা আজ ঝুঁকির মুখে। তাই ভাষা সংরক্ষণে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি বলে মত দেন বক্তারা।
বসুন্ধরা শুভসংঘ বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি উয়ই সিং মার্মা বলেন, “মায়ের ভাষা আমাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে। যে জাতি তার ভাষাকে সম্মান করতে জানে না, সে জাতি তার ইতিহাস ও সংস্কৃতিকেও হারিয়ে ফেলে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর ভাষা আমাদের জাতীয় ঐক্যের শক্তি। ভাষা সংরক্ষণ মানে কেবল শব্দ রক্ষা নয়; এটি আমাদের আত্মমর্যাদা, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রকাশ। আমরা চাই, নতুন প্রজন্ম নিজেদের মাতৃভাষায় কথা বলুক, লিখুক এবং গর্ব অনুভব করুক।”
তিনি আরও বলেন, ভাষা শহীদদের আত্মত্যাগের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ মাতৃভাষার চর্চা ও সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে হবে। সামাজিক উদ্যোগ, সাংস্কৃতিক চর্চা ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার মাধ্যমে বান্দরবানের ভাষাগত বৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
সাংগঠনিক সম্পাদক উঅংসিং মারমা ভাষা শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ভাষার জন্য জীবনদানকারী শহীদদের আত্মত্যাগের ফলেই আমরা নিজ ভাষায় কথা বলার অধিকার, জাতীয় পরিচয়, আত্মমর্যাদা, মাতৃভাষায় শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিকাশ ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করেছি। একুশের চেতনা আমাদের ঐক্য, সচেতনতা ও অধিকার রক্ষার শক্তি জুগিয়েছে।
অনুষ্ঠানে ভাষা বিষয়ক আলোচনা এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় বক্তব্য প্রদান করা হয়। আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের উদ্যোগ ভবিষ্যতে ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে সচেতনতা বৃদ্ধি করবে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির বন্ধন আরও সুদৃঢ় করবে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন উ অং সিং মার্মা, স্বর্ণা চাকমা, মৌএী চাকমা, উ এ সিং মার্মা, উ হ্লা শৈ মার্মা, উ মং হ্লা মার্মা, সুলোচন চাকমা, শৈনাইমং মারমা, থোওয়াই থোওয়াই ওয়াং মারমা, উশৈওয়াং মারমা, মেসাইওয়ং মারমা, স্মৃতি তঞ্চঙ্গ্যা, অমিতা তঞ্চঙ্গ্যা, সন্ধ্যা তঞ্চঙ্গ্যা ও শান্তিলাল তঞ্চঙ্গ্যা।
বিডি-প্রতিদিন/তানিয়া