‘বর্তমান বাজারে চাকরিটা সোনার হরিণের মতো। এই সংকটের সময়ে আমরা একটা সেলাই মেশিন পেয়েছি, এটা দিয়ে অনেক কাজ করতে পারব। এই মেশিন দিয়ে বাইরের মানুষের কাজ না করলেও নিজের ঘরের কাজগুলো করতে পারব। এই কাজের মাধ্যমে ঘরের টাকা সাশ্রয় হবে।
এই মেশিন আমার পড়াশোনার পাশাপাশি আমার পরিবারের সচ্ছলতার গতি ফিরিয়ে আনতে পথ সৃষ্টি করে দেবে। বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে সেলাই মেশিন পেয়ে এখন আমরা নতুন স্বপ্ন বুনছি।’ বিনামূল্যে তিন মাসের প্রশিক্ষণ শেষে বসুন্ধরা গ্রুপের উপদেষ্টা কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের হাত থেকে উপহার হিসেবে সেলাই মেশিন পেয়ে কথাগুলো বলছিলেন কুলাউড়া উপজেলার আলী আমজদ উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করা শিক্ষার্থী সানজিদা নাহার শোভা। কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের সদপাশা এলাকার বাসিন্দা মৃত নাসির আহমদ খান ও গৃহিণী আয়শা আক্তার লাকির মেয়ে তিনি।
তাঁদের পরিবারে বর্তমানে মা ও এক বড় বোন আছেন। শোভা যখন তৃতীয় শ্রেণিতে পড়তেন, তখন তাঁর বাবা মারা যান। বাবা মারা যাওয়ার পর দরিদ্রতার কারণে শোভা তাঁর নানাবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছেন। বর্তমানে কুলাউড়া সরকারি কলেজে ইংরেজি বিষয়ে অনার্স কোর্সে ভর্তির জন্য আবেদন করেছে তিনি।

সম্প্রতি কুলাউড়া উপজেলা পরিষদের হলরুমে সুবিধাবঞ্চিত ১৫ অসচ্ছল নারীকে স্বাবলম্বী করতে সেলাই মেশিন বিতরণ করেছে বসুন্ধরা শুভসংঘ কুলাউড়া উপজেলা শাখা। সেলাই মেশিন বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনের সংসদ সদস্য শওকতুল ইসলাম শকু। বিশেষ অতিথি ছিলেন বসুন্ধরা শুভসংঘের প্রতিষ্ঠাতা ও কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বসুন্ধরা শুভসংঘের পরিচালক জাকারিয়া জামান। আরো উপস্থিত ছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন, কুলাউড়া থানার ওসি মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মোল্যা, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সজল, বসুন্ধরা শুভসংঘের উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত সহযোগী অধ্যাপক ড. রজত কান্তি ভট্টাচার্য, সাবেক ছাত্রনেতা নজরুল ইসলাম খান প্রমুখ।
এ ছাড়া আগের দিন শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের ৩০ নারীকে সেলাই মেশিন দেওয়া হয়। পরের দিন সকালে মৌলভীবাজার সার্কিট হাউসের মুন হলে অসচ্ছল ১৫ নারীর হাতে সেলাই মেশিন তুলে দেন মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. তানভীর হোসেন। তিন দিনে মৌলভীবাজারের চারটি উপজেলার মোট ৬০ জন নারীর হাতে বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে সেলাই মেশিন তুলে দেন গ্রুপের উপদেষ্টা ইমদাদুল হক মিলন। মেশিন উপহার পাওয়া অসচ্ছল নারী ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আমরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় তিন হাজারের বেশি সেলাই মেশিন দিয়েছি। অসচ্ছল নারীদের আত্মকর্মসংস্থান তৈরিতে কাজ করি আমরা। এই মেশিনটি যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করেন, তাহলে আপনারা সংসারজীবনে অনেক উপকৃত হবেন। আমরা আপনাদের হাতে একটি বিশেষ হাতিয়ার তুলে দিলাম। এই হাতিয়ার যদি সত্যিকার অর্থে ব্যবহার করতে পারেন, তাহলে আপনার সংসারের চেহারা পাল্টে যাবে। পথচলায় অনেক সহায়ক হবে। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় সেলাই প্রশিক্ষণ কেন্দ্র করে সেখানে অসচ্ছল নারীদের বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। অসহায় নারী যাঁরা সমাজে সুবিধাবঞ্চিত, যাঁরা চেষ্টা করছেন ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য, তাঁদের খুঁজে বের করে আমরা সেলাই মেশিন তুলে দিচ্ছি। সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁদের পাশে দাঁড়াচ্ছি। শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা এই মেশিন পেয়েছ, তোমরা পরিবারের জন্য কিছু আয় করবে। তোমরা নিজেদের বদলে ফেলবে। তোমাদের কল্যাণ হলেই বাংলাদেশের কল্যাণ হবে।’
কুলাউড়া সদর ইউনিয়নের মিনারমহল গ্রামের বাসিন্দা রিমা বেগম বলেন, ‘আমি নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। আমার বাবা একজন কৃষক। মা নেই। স্বপ্ন ছিল, আমি পরিবারের পাশে দাঁড়াব। বসুন্ধরা গ্রুপ আমাকে সেলাই প্রশিক্ষণ দিয়েছে এবং একটি সেলাই মেশিন উপহার দিয়েছে। আমি এটি দিয়ে এখন পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারব এবং আমার স্বপ্নগুলো পূরণ করতে পারব। বসুন্ধরা গ্রুপ ও শুভসংঘকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।’ রাজনগর উপজেলার সৈয়দনগর গ্রামের তপন দেবের মেয়ে তিশা দেব। দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয় সে। বাবা দিনমজুর। অভাবের সংসার। বাবার পক্ষে সংসার চালাতে গিয়ে বেশ কাঠখড় পোহাতে হচ্ছে। ভাই ষষ্ঠ শ্রেণিতে, বড় বোন এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। অভাবের সংসারে নিজেই লেখাপড়া করতে পারেনি তিশা। সে মা-বাবার সংসারে নানাভাবে সহায়তা করে। বসুন্ধরা গ্রুপের পক্ষ থেকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ ও সেলাই মেশিন পেয়ে তিশা বলে, ‘এই সেলাই প্রশিক্ষণ আমার আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। এখন নিজের ও পরিবারের জন্য অবদান রাখতে পারব। ঘরে বসে সেলাইয়ের মাধ্যমে উপার্জন করে জীবন বদলাতে পারব।’ সেলাই মেশিন পাওয়া সবার একই স্বপ্ন, সেলাই মেশিন চালিয়ে জীবন বদলানোর স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন দেখার এবং স্বপ্ন পূরণের প্রত্যয়ে সবার চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে হাসির ঝিলিক।
ইমদাদুল হক মিলন বলেন, ‘বসুন্ধরা গ্রুপ দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করে। দেশের কল্যাণ হলে মানুষের কল্যাণ হয়। মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত ভালো না থাকবে, এই দেশ কখনো ভালো থাকবে না। মানুষ ভালো থাকলে, দেশ ভালো থাকবে। আপনি যে পরিবারে আছেন, সেই পরিবারে আপনি যদি সচ্ছল হন, ধীরে ধীরে পরিবারের অন্য মানুষগুলো সচ্ছল হবে। সুতরাং মানুষের উন্নতির জন্য আমরা কাজগুলো করি। আমরা বিশ্বাস করি, মানুষের উন্নতি হলে দেশের উন্নতি হবে।’