দেশের বৃহত্তম চলনবিলের গ্রামীণ জনপদে ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে হয়ে চৌগ্রাম হাইস্কুল। নাটোরের সিংড়া উপজেলার চৌগ্রাম রাজবাড়ী সংলগ্ন হাইস্কুলের মাটির ভবন যেন বাতিঘর হয়ে পথ দেখিয়ে চলেছে শিক্ষার্থীদের। এই পথ ধরেই তারা আলোকিত মানুষ। এই মাটির স্কুলেই লেখাপড়া করে আলোকিত মানুষ হয়েছেন হাজার হাজার শিক্ষার্থী।
নাটোরের সিংড়া উপজেলায় অবস্থিত চৌগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের বর্তমান বয়স ১০৪। নাটোর শহর থেকে ২৭ কিলোমিটার দূরে চৌগ্রাম মহাসড়কের পাশেই অবস্থিত এই বিদ্যালয়টি।
জানা যায়, নাটোরের চৌগ্রাম পরগনার প্রথম রাজা ছিলেন রাজা রসিক রায়। রাজবাড়ীর ৫ম রাজা তার দত্তক পুত্র রাজা রমণী কান্ত রায় প্রজাদের সন্তানদের শিক্ষিত করার উদ্দেশ্যে রাজবাড়ীর পাশেই নির্মাণ করেন চৌগ্রাম হাইস্কুল। ১৯০৩ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে এই স্কুলটি নির্মাণ করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯১৩ সালে তৎকালীন কলিকাতা শিক্ষা বোর্ডের কাছে থেকে স্বীকৃতি পায় স্কুলটি। ২০০৪ সালে কলেজ সংযুক্ত হওয়ার পর স্কুলটি বর্তমানে চৌগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজ নামে পরিচিত।
রাজা রমণী কান্ত রায় মাটি দিয়ে ১৬ কক্ষের স্কুল ভবন তৈরি করে দিয়েছিলেন। টিনের চালার এই স্কুল ভবনের শ্রেণিকক্ষগুলোতে কোন জানালা নেই। দু'পাশেই রয়েছে দরজা ও বারান্দা। মোট ৪৮টি দরজা রয়েছে মাটির তৈরি শতবর্ষী এই স্কুল ভবনে। এখন সেই রাজা নেই, রাজ্যও নেই। তবে ওই স্কুল ঘরটি এখনও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থেকে প্রাচীন ঐতিহ্যের জানান দিয়ে যাচ্ছে।
কর্মদিবসগুলোতে স্কুল ও কলেজের প্রায় এক হাজার ছাত্র-ছাত্রীর পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে মাটির ভবনের এই আঙিনা। নিভৃত পল্লী এলাকার শতবর্ষে সমৃদ্ধ এই চৌগ্রাম হাইস্কুল শিক্ষিত জনগোষ্ঠী তৈরিতে অনন্য ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশের অনেক প্রথিতযশা গুণী ব্যক্তিত্ব এই স্কুল থেকে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। তাদের মধ্যে উল্লেথযোগ্য হচ্ছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সর্বজন শ্রদ্ধেয় মাদার বখশ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ, পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান হানিফ তালুকদার, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী এম এম রহমতুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান রমজান আলী সরদার, রাজশাহী জেলা বোর্ডের সাবেক সচিব আব্দুল জব্বার প্রমুখ।
প্রতিষ্ঠানের পাশেই আধুনিক পাকা ভবন তৈরি হলেও মাটির ভবনে ১৪টি কক্ষ শ্রেণিকক্ষ হিসেবে এবং অন্য দুইটি করে একটিতে সহকারী প্রধান শিক্ষকের কার্যালয় ও অপরটি ক্রীড়া কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানান, স্কুলের পাকা ভবন থাকলেও তারা মাটির ঘরেই ক্লাস করে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
স্কুল শাখার সহকারী শিকক্ষা নরেন্দ্র নাথ সরকার জানান, মাটির ভবনে জানালা না থাকলেও উভয় পাশে বারান্দা ও দরজা আলো-বাতাসের অভাব পূরণ করে। মাটির ভবন প্রাকৃতিকভাবেই শীতকালে উষ্ণ এবং গ্রীষ্মকালে ঠাণ্ডা থাকে।
অপর সহকারি শিক্ষক আতিয়া সুলতানা বলেন, প্রাচীন এই ঐতিহ্য আমাদের গর্বের। তবে কলেজ ইউনিটটি এমপিওভূক্ত এবং স্কুলটি জাতীয়করণ করা হলে ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়া যেত।
চৌগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয় এন্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এরশাদুল ইসলাম বলেন, স্কুল ভবনটি নির্মাণের ১০০ বছর পেরিয়ে গেলেও কোন সংস্কার কাজ করার প্রয়োজন হয়নি। মাটির তৈরি স্কুল ঘর এখনও মজবুত রয়েছে। প্রাচীন ঐতিহ্য ধরে রাখতে বেশ কয়েকটি ক্লাস মাটির ঘরেই নেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা এই মাটির ঘরেই ক্লাস করতে বেশি আগ্রহ দেখায়। শিক্ষকদেরও আগ্রহের কমতি নেই। তবে শতবর্ষী মাটির ভবনের টিনের চালায় মরিচা ধরে নষ্ট হযে গেছে । মরিচা পড়া টিনগুলো সরিয়ে নতুন টিন লাগানো হলে ভবনটি আরও স্থায়ী হবে।
অদূর ভবিষ্যতে কলেজ ইউনিটের এমপিওভূক্ত এবং সর্বোপরি জাতীয়করণের মধ্য দিয়ে ঐতিহ্যের এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষার আলো ছড়াতে আরো অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি আলতাফ হোসেন।
বিডি প্রতিদিন/ফারজানা