Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ২৩ জুন, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ২২ জুন, ২০১৮ ২৩:৩৪

শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান (অব.)

শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্করের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

ঢাকার বারিধারার কূটনৈতিক এলাকায় অনেক জায়গাজুড়ে চীনা দূতাবাস। একটি চীনা ঐতিহ্য ও কারুকার্যখচিত অনিন্দ্যসুন্দর সৌধ। চীনা রাষ্ট্রদূতের বাসভবনও দূতাবাসের ক্যাম্পাসে অবস্থিত। রাষ্ট্রদূতের আমন্ত্রণে অনেকবার বাসভবনটিতে গিয়েছি। বাসভবনের প্রবেশদ্বার পেরোতেই প্রথমে যা দৃষ্টি কেড়ে নেয় তা হলো সুন্দর ফ্রেমে বাঁধানো একটি ছবি। শান্ত, সমাহিত, সাধনায় মগ্ন এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর আবক্ষ ছবি। পরনে গেরুয়া বাস মাথায় শোভিত আকর্ণ আচ্ছাদিত চীবরের শুভ্র শিরস্ত্রাণ। ছবিটি সহস্রাধিক বছরের বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তান— মহাজ্ঞানী, মহাজন, প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা ও অনাবিল শান্তির মূর্ত প্রতীক অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের। বাংলাদেশ ও চীন তথা সমগ্র প্রাচ্যে হিমালয়ের উচ্চতায় শান্তি, সম্প্রীতি ও মৈত্রীর যুগোত্তীর্ণ সেতু তিনিই নির্মাণ করেন।

অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান একটি নাম, একটি দিগন্তজোড়া ইতিহাস। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী সব মানুষ বিশেষ করে তিব্বতের গণমানুষের কাছে তিনি সহস্রাধিক বছর ধরে উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের ন্যায় দেদীপ্যমান। তার অমৃততম অহিংসার মর্মবাণী ফল্গুধারার মতো প্রবাহিত হয়ে তিব্বত তথা চীনের জনগণের জাতীয় জীবনে বিশাল দিগন্ত মেলে দেয়। প্রশান্তির ও প্রগতির প্রলেপ বিলিয়ে দেয়।

অতীশ দীপঙ্কর দশম শতাব্দীর শেষভাগে ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার বিক্রমপুর পরগনার বজ্রযোগিনী গ্রামে এক রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কল্যাণশ্রী এবং মাতা প্রভাবতী দেবী। তার বাল্যনাম চন্দ্রগর্ব। মায়ের কাছে এবং স্থানীয় বজ্রাসন বিহারে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি বিখ্যাত বৌদ্ধগুরু জেতারির কাছে বৌদ্ধ ধর্ম ও শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। এ সময়ে তিনি সংসারের প্রতি বিরাগবশত গার্হস্থ্য জীবন ত্যাগ করে ধর্মীয় জ্ঞানার্জনের সংকল্প করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি পশ্চিম ভারতের কৃষ্ণগিরি বিহারে গিয়ে রাহুল গুপ্তের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। মগধের ওদন্তপুরী বিহারে মহাসাংঘিক আচার্য শীলরক্ষিতের কাছে দীক্ষা গ্রহণের পর তার নতুন নামকরণ হয় দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। এরপর দীপঙ্কর মগধের তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আচার্যদের কাছে কিছুকাল শিক্ষা লাভ করে শূন্য থেকে জগতের উৎপত্তি এ তত্ত্ব (শূন্যবাদ) প্রচার করেন।

১০১১ খ্রিস্টাব্দে শতাধিক শিষ্যসহ দীপঙ্কর মালয় দেশের সুবর্ণ দ্বীপে গিয়ে আচার্য চন্দ্রকীর্তির কাছে ১২ বছর বৌদ্ধ শাস্ত্রের যাবতীয় বিষয় অধ্যয়ন করেন এবং ৪৩ বছর বয়সে মগধে ফিরে আসেন। মগধের তখনকার প্রধান প্রধান পণ্ডিতদের সঙ্গে তার বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময় হয়। তার বাগ্মিতা, যুক্তি ও পাণ্ডিত্যের কাছে তারা পরাজিত হন। এভাবে ক্রমে তিনি একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী পণ্ডিতের স্বীকৃতি লাভ করেন। এ সময় পালরাজ প্রথম মহিপাল সসম্মানে তাকে বিক্রমশীলা (ভাগলপুর, বিহার) মহাবিহারের আচার্য পদে নিযুক্ত করেন। বিক্রমশীলাসহ ওদন্তপুরী ও সোমপুর বিহারে দীপঙ্কর ১৫ বছর অধ্যাপক ও আচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় মহিপালের পুত্র ন্যায়পালের সঙ্গে কলচুরীরাজ লক্ষ্মীকর্ণের যে যুদ্ধ হয়, দীপঙ্করের মধ্যস্থতায় তার অবসান ঘটে এবং দুই রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি স্থাপিত হয়। অতীশ দীপঙ্কর বাংলার সন্তান। তিনি ঢাকার সন্তান। হাজার বছরেরও আগে বাংলার জ্যোতির্ময়, মহাজ্ঞানী মহাজন এ সূর্যসন্তান শুধু বাংলা নয় সমগ্র ভারতবর্ষ, শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, জাভা, সুমাত্রা, বর্নিও, চীন, জাপান, কোরিয়া, তথা সমগ্র এশিয়াকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করেন, শান্তির অমিয় বাণী শোনান। অহিংসার মহিমা প্রচার করেন। প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা, সর্বজীবে দয়া, বিনম্রতা ও মানবতাই একমাত্র মুক্তির পথ, অতীশ এ শিক্ষাই দেন। অতীশের কর্ম, শিক্ষায়, আদর্শ ও চেতনার সোনার কাঠির ছোঁয়ায় গোটা বিশ্ব হয়ে ওঠে হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, সংঘাত, রক্তপাতমুক্ত শান্তি-সম্প্রীতি ও অহিংসার নিবিড় এক জগৎ।

৪০ বছর আগে ২৩ জুন, অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের পবিত্র দেহভস্ম চীন সরকার কর্তৃক বন্ধুত্বের নিদর্শনস্বরূপ বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তিত হয়। বাংলা মায়ের অঞ্চলনিধি বাংলার সত্যসূর্য আবার ভস্মরূপে স্বদেশের মাটিতে ফিরে আসেন। জেনারেল জিয়াউর রহমান ব্যক্তিগতভাবে উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক আসাফউদ্দৌলার নেতৃত্বে ছয় সদস্যের এক প্রতিনিধি দল চীনে পাঠান। চীনা বৌদ্ধ সমিতির কার্যালয় কোয়াংশি বৌদ্ধ মন্দিরে সব আনুষ্ঠানিকতায় সম্পাদিত অনুষ্ঠানে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের পবিত্র দেহভস্মের আধারটি বাংলাদেশের বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সভাপতি ঢাকা ধর্মরাজিক বৌদ্ধ বিহারের মহামান্য অধ্যক্ষ শ্রীমৎ বিশুদ্ধানন্দ শ্রদ্ধাভরে গ্রহণ করেন। পবিত্র দেহভস্ম আধার উন্মোচন করতে গিয়ে বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সৈয়দ আলী আহসান বলেছিলেন, ‘পাণ্ডিত্য ও প্রজ্ঞার জন্য, অহিংসা-প্রেম-প্রীতি-ভালোবাসা ও শান্তির জন্য শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর সর্বকালে সমগ্র বিশ্বে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’

অতীশের জীবন, কর্ম ও শিক্ষা বর্ণনা করতে গিয়ে মূলত বলতে হয় তার তিব্বত অবস্থানের কথা। তিব্বতরাজ চ্যাং চুব বার বার রাজকীয় দূত প্রেরণ করে আমন্ত্রণ জানালে অবশেষে তিব্বতে গেলে তাকে সর্বোচ্চ সম্মান ও অভ্যর্থনা জানানো হয়। রাজা চ্যাং চুব প্রজাদের উদ্দেশে ঘোষণা করেন, দীপঙ্করকে তিব্বতের মহাচার্য ও ধর্মগুরু হিসেবে মান্য করা হবে। বাস্তবে দীপঙ্কর তার চেয়েও অনেক বেশি সম্মান পান। শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হন। হন চিরপূজনীয়। তিব্বতে থো-লিং বিহার ছিল দীপঙ্করের মূল কর্মকেন্দ্র। এ বিহারে তিনি দেবতার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। এখান থেকেই তিনি তিব্বতের সর্বত্র ঘুরে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার করেন। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায় তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের অনেক কুসংস্কার দূর হয় এবং বিশুদ্ধ বৌদ্ধ ধর্মাচার প্রতিষ্ঠিত হয়। তিব্বতে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। তিব্বতবাসী তাকে বুদ্ধের পরই শ্রেষ্ঠ গুরু সম্মান ও পূজা করে এবং মহাপ্রভু (জোবো ছেনপো) হিসেবে মান্য করে। তিব্বতের ধর্ম ও সংস্কৃতিতে দীপঙ্করের প্রভাব আজও বিদ্যমান। সেখানে জনকল্যাণে নদীতে বাঁধ দিয়ে বন্যা প্রতিরোধেরও তিনি ব্যবস্থা করেন।

দীপঙ্কর তিব্বতের ধর্ম, রাজনীতি, জীবনীগ্রন্থ, স্তোত্রনামাসহ তাঞ্জুর নামে এক বিশাল শাস্ত্রগ্রন্থ সংকলন করে প্রভূত খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি দুই শতাধিক গ্রন্থ রচনা, অনুবাদ ও সম্পাদনা করেন। তিব্বতি ভাষায় তিনি বৌদ্ধ শাস্ত্র, চিকিৎসাবিদ্যা ও কারিগরি বিদ্যা সম্পর্কে অনেক গ্রন্থ রচনা করেন। তিব্বতিরা তাকে সর্বজ্ঞানে শ্রেষ্ঠ, সর্ববিদ্যায় বিশারদ, সর্বশ্রেষ্ঠ ‘অতীশ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সুদীর্ঘ ১৭ বছর তিব্বত অবস্থানের পর দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ৭৩ বছর বয়সে তিব্বতের লাসা নগরীর কাছে লেথান পল্লীতে ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দে দেহ ত্যাগ করেন।

উনবিংশ শতাব্দীর বরেণ্য ইতিহাসবিদ, গবেষক ও সাহিত্যিক ড. দীনেশচন্দ্র সেন অতীশ দীপঙ্কর সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এই একজন পূর্ববংগের বাঙ্গালী। যিনি তৎকালিক জগতে অদ্বিতীয় যশ অর্জন করিয়াছেন। নেপালের রাজা অনুগত পরিকরের মত তাঁহার আজ্ঞার প্রতীক্ষা করিতেন। নেপালের যুবরাজ তৎ-কর্তৃক ভিক্ষুধর্মে দীক্ষিত হইয়া তাঁহার সংগে ফিরিতেন। তিব্বতরাজ তাঁহাকে স্বদেশে আনিবার চেষ্টায় তাঁহার বহু অর্থ ও লোকক্ষয় করিয়া শত্রু কর্তৃক কারাগারে নিক্ষিপ্ত হইয়া কারাগারেই প্রাণ ত্যাগ করিলেন। যবদ্বীপের (সুবর্ণ দ্বীপ) রাজা ধর্মপাল দীপঙ্করের কাছে জিজ্ঞাসু হইয়া ধর্মবিষয়ক নানা জটিল প্রশ্ন উত্থাপন করিয়া সুদীর্ঘ পত্র লিখিতেন। গৌড়েশ্বর ন্যায়পালের সংগে তাঁহার সর্বদা পত্র ব্যবহার চলিত। এক কথায় জীবিতকালের দীপঙ্কর সমস্ত এশিয়ার সম্রাটগণের পূজনীয়, অসীম ভক্তি ও শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন এবং এখনও বিশাল বৌদ্ধরাজ্যে তাঁহার প্রতিষ্ঠা অপরিমেয়। চীন দেশের অমিত বিক্রম সম্রাটগণ দীপঙ্করের নাম শুনিলেই সিংহাসন হইতে নামিয়া দাঁড়াইয়া শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিতেন।’ অতীশ তার সময়ে সমগ্র এশিয়া মহাদেশকে শান্তি-সম্প্রীতির এক মহামিলন ক্ষেত্রে পরিণত করেন, যা তার মহাপ্রয়াণের পরেও দীর্ঘকাল বিরাজ করেছে।

সমকালীন বাংলাদেশ এক অস্থির অশান্ত বাংলাদেশ। সে দুর্বৃত্তায়িতা। সে দুর্নীতি ধর্ষা। এই কি তুমি আমার স্বদেশ, অতীশের দেশ, তার মাতৃভূমি? লক্ষ নিযুত শহীদের রক্তে অর্জিত এই কি তুমি আমার পবিত্র জন্মভূমি, আমার বঙ্গভূমি, আমার পুণ্যভূমি? মাৎসন্যায়ের এমন বাংলাদেশ সে তো সুদূর দেড় হাজার বছর অতীতের দুঃস্বপ্নের ইতিহাস। মানবাত্মার উৎকর্ষে মানবতার মঙ্গল ও কল্যাণে এ বাংলায় বার বার রেনেসাঁ এসেছে, স্বর্ণযুগের সৃষ্টি হয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বও আজ অশান্ত। শান্তি বিঘ্নিত। চারদিকে অস্থিরতা, উত্তেজনা, জঙ্গি-সন্ত্রাসবাদ, উগ্র ধর্মান্ধতা, সহিংসতা, মৌলবাদ ও যুদ্ধের উন্মাদনা। দেশে দেশে সামাজিক সংঘাত, জাতি-গোষ্ঠীগত ঘৃণা, সহিংসতা, হানাহানি। সন্ত্রাসবাদের ব্যাপক বিস্তার বিশ্বজুড়ে। শান্তি, সম্প্রীতি আজ সুদূরপরাহত। স্থিতিশীলতা বিপজ্জনকভাবে বাধাগ্রস্ত। নীতি ও মূল্যবোধের প্রচণ্ড শূন্যতা। হিংসায় উন্মত্ত আজ পৃথ্বী। অতীশের মাতৃভূমি বাংলাদেশও আজ এ বিভীষিকাময় দৃশ্যপটের বাইরে নয়। হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসীর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অপূর্ব আবাস ভূমি এ বাংলাদেশ। আমরা উদ্বিগ্নতার সঙ্গে আজ প্রত্যক্ষ করছি এক কদর্য সাম্প্রদায়িকতার উলঙ্গ উত্থান বাংলাদেশে ঘটে চলেছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, আবহমানকাল থেকে, কয়েক হাজার বছর ধরে বাংলাদেশ ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক লীলাভূমি। বাংলার ঐতিহ্যে আজ দেখি এক কৃষ্ণগহ্বর দেখি বিশাল এক ফাটল। প্রতিদিন মিডিয়ায় দেখছি ভিন্নমতের, ভিন্ন আদর্শের, ভিন্নপথের অনুসারীরা নিগৃহীত হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় জঙ্গিবাদীদের হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে হিন্দু পুরোহিত, বৌদ্ধ ভিক্ষু, খ্রিস্টান ধর্মযাজক, শিয়া ইমাম, সুফি সাধক, বাউল গায়ক, সাধারণ নিরস্ত্র মানুষ। অগ্নিতে ভস্মীভূত হচ্ছে তাদের মন্দির, গির্জা, উপাসনালয়। বোমা বিস্ফোরণ হচ্ছে। রক্তপাত হচ্ছে। জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। দেবদেবীর প্রতিমা, যিশুর মূর্তি, বুদ্ধের প্রতিকৃতি ক্ষতবিক্ষত, চূর্ণবিচূর্ণ করা হচ্ছে। আরও দেখি অবুঝ নিষ্পাপ স্বর্গশিশুরা হত্যা হচ্ছে প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত। পৈশাচিক উন্মাদনায় ধর্ষিত হচ্ছে নারী, ধর্ষিত শিশুরাও। আর ধর্ষণ শেষে নিশ্চিত ও অবধারিতভাবে হচ্ছে হত্যা। এ হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়ে চলেছে। স্ফীত হচ্ছে। সংক্রামক রোগের মতো এর ভয়াবহতা আর ব্যাপকতা গোটা জাতিকে শঙ্কিত করে তুলেছে। মানুষের হিংসা, বিদ্বেষ, সীমাহীন লালসা, পারস্পরিক ঘৃণা পশুত্বের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। পশুরাই আজ মনে হয় অনেক মানবিক আর মানুষ চরম দানবিক। হিংসার বিষবাষ্পে সমাজ বিষাক্ত। উদগ্র লোভে অর্থগৃধ্নুতায় মানুষ উন্মত্ত। চারদিকে শুধু হানাহানি, রক্ত আর রক্তপাত। ঘৃণা ঘৃণার জন্ম দেয়, হিংসা হিংসার, ভায়োলেন্স ভায়োলেন্সের, সন্ত্রাস সন্ত্রাসের। এর বিকল্প কখনো কিছু হওয়ার নয়।

ধ্বংসোন্মুখ আমাদের সভ্যতা ও ঐতিহ্যকে আজ রক্ষা করার একমাত্র উপায় অতীশের চেতনায় উজ্জীবিত হওয়া। আজ অতীশের অহিংসার বাণী— প্রেম, প্রীতি, ভালোবাসা ও দয়ার শিক্ষা, ক্ষমা ও মানবতার আহ্বান বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্বকে শান্তিময় ও সম্প্রীতিময় স্বর্গভূমিতে পরিণত করতে পারে। বাংলার পাল সভ্যতা তার ঐতিহ্য ও ইতিহাস ও অহিংসার ললিত বাণী ভারত ছাপিয়ে চীন, জাপান, কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, জাভা, সুমাত্রা, সর্বত্র ছড়িয়ে দিয়েছিল। শান্তি ও সম্প্রীতিতে গোটা এশিয়া হয়ে উঠেছিল সব অমঙ্গল, অকল্যাণ ও সহিংসতার বিপরীতে প্রেম-প্রীতি, শান্তি ও ভালোবাসার এক স্বর্গভূমি।

আজও অতীশের অহিংসার বাণী, প্রেম-প্রীতি ভালোবাসার শিক্ষা, ক্ষমা, দয়া ও মানবতার আহ্বান শুধু বাংলাদেশ কেন গোটা বিশ্বকে শান্তিময়, সম্প্রীতিময় ও প্রশান্তময় করে তুলতে পারে। হাজার বছর আগে জ্যোতির্ময়ী এ মহাজ্ঞানী, মহাজন এমনটাই করে গেছেন। অতীশ নেই। কিন্তু তার অমর অমিয় বাণী, তার শিক্ষা আর চেতনা হারিয়ে যায়নি। তার লেখা বিশাল গ্রন্থমালা আজও সুরক্ষিত ও সংরক্ষিত। অতীশ তার কৃতিত্বে, কর্মে বিদ্যমান। এশিয়াজুড়ে সারা জীবন বিরামহীন চলার পথে পথে, পাহাড়ে পর্বতে, উপত্যকায়, সমতল প্রান্তরে, সাগরের বেলাভূমিতে, অরণ্যের বৃক্ষরাজিতে অতীশ ক্ষমা আর মানবতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। আজ প্রয়োজন তাদেরই নতুন করে আবিষ্কার। আজ প্রয়োজন অতীশ চেতনার, প্রয়োজন অতীশ শিক্ষা অবলম্বনের, অতীশ আদর্শ ধারণের।

জয় হোক অতীশের, অতীশ চেতনার। হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী থেকে দূরীভূত হোক সব সংঘাত আর হানাহানি। বিতাড়িত হোক অকল্যাণ, অমঙ্গল, অশুভ ও অশুচি যা কিছু। বাংলার গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতা সংস্কৃতি কৃষ্টি অজেয় হোক। অজেয় হোক শান্তিবাদী, শান্তিকামী, অহিংস, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ। আজকে তার পরম পবিত্র দেহভস্ম নিজভূমে প্রত্যাবর্তনের পবিত্র দিনে তাকে স্মরণ করছি। অর্পণ করছি এ প্রজন্মের বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

লেখক : সাবেক সেনাপ্রধান।


আপনার মন্তব্য