Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৬ মে, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৫ মে, ২০১৯ ২৩:৩৬

নজরুলের রানু সোম ট্র্যাজেডি

নঈম নিজাম

নজরুলের রানু সোম ট্র্যাজেডি

আমাদের ছোটবেলায় স্কুল-কলেজে বিভিন্ন দিবস পালন করা হতো। উদ্যাপিত হতো নজরুল, রবীন্দ্র, সুকান্তজয়ন্তী। এমনকি মৃত্যু দিবসেও অনুষ্ঠান থাকত। এখন কি তা আছে? প্রজন্ম কি জানতে পারছে রবীন্দ্র-নজরুল সম্পর্কে? একজন শিক্ষককে ফোন করলাম। অনুষ্ঠান আগের মতো হয় না। সেভাবে আগ্রহ এখন আর কারও নেই। আমাদের সবকিছুই বদলে যাচ্ছে। গতকাল ছিল কবি নজরুলের জন্মদিন। নজরুল সম্পর্কে আরও অনেক বেশি তথ্য মানুষের সামনে উঠে আসা দরকার। প্রকৃতির সৃষ্টি নজরুলকে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে নিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু। সময়টা কঠিন ছিল। ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতার প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে দ্রুত কবি নজরুলের ঢাকায় আসার আয়োজনে সহায়তা করেন। কবি নজরুল আমাদের জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মিশে আছেন। আমি বিস্ময় নিয়ে তাঁর লেখা পড়ি। নজরুলের জীবনের একটি বড় সময় কেটেছে কুমিল্লায়। তাঁর প্রেম ও বিরহের শহর কুমিল্লা। তিনি আটকও হন কুমিল্লা থেকে। কুমিল্লা আমার জেলা শহর। এখনো কুমিল্লা শহরে প্রবেশ করলে প্রাণের ছোঁয়া পাই। নজরুল প্রথম কুমিল্লার মুরাদনগরের দৌলতপুরে আসেন আলী আকবর খানের ভাগ্নের বিয়েতে। এ সময় কুমিল্লা শহরে পরিচয় হয় সেন পরিবারের সঙ্গে। বীরেন্দ্র কুমার সেনের মা বিরজা সুন্দরী দেবী নজরুলকে পুত্রস্নেহ দিয়েছিলেন। নজরুল এই নারীকে মা ডাকতেন। নজরুলের জীবনে বিরজা সুন্দরী দেবীর একটা প্রভাব ছিল। মুরাদনগরের দৌলতপুরে বিয়ে খেতে গিয়ে প্রেমে পড়েন নজরুল। নজরুলের বাঁশির সুর মুগ্ধ করে সৈয়দা খাতুন- ইরানি ফুলের নামের মেয়ে নার্গিসকে। সেই প্রেমের বিয়ের দিনই কাবিননামার ঝামেলায় কবি ক্ষুব্ধ হন। ঘরজামাই থাকার প্রস্তাব ব্যথিত করে কবিকে। হেঁটে তিনি চলে আসেন কুমিল্লা শহরে। ওঠেন সেনবাড়িতে। অসুস্থ ছিলেন অনেক দিন। পরে কবিকে কলকাতায় ফিরিয়ে নেন বন্ধু কমরেড মুজফ্ফর আহমদ। কবি কলকাতা গেলেও আবার ফিরে আসেন কুমিল্লায়। বিয়ে করেন প্রমীলা দেবীকে। কবিকে এই বিয়ে দেন বিরজা দেবী।

কবি নজরুলের জীবনটা ছিল অদ্ভুত কষ্টের আঁধারে ঢাকা। তিনি ছিলেন চিরদুঃখী। ছোটবেলা থেকে কষ্টের সমুদ্রে সাঁতার কেটে তার বেড়ে ওঠা। কবি নজরুল ১৯৩০ সালের ৭ মে পুত্র বুলবুলকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে যান। বসন্ত রোগের তখন চিকিৎসা ছিল না। কবিও ছিলেন অর্থকষ্টে। রোগে ভারাক্রান্ত পুত্রের পাশে বসে কবি ফারসি ভাষা থেকে ‘রুবাইয়াৎ ই হাফিজ’ বাংলায় অনুবাদ করেন। এই সময় কবির যাপিত জীবনের মাঝে এক ধরনের আধ্যাত্মিকতা ভর করে। পুত্রের পাশে বসে থেকে লিখেছিলেন, ‘আমি দ্বার খুলে আর রাখব না পালিয়ে যাবে গো।’ কবি নজরুলের জীবনের আরেক বিপর্যয় প্রিয়তমা পত্নী প্রমীলা দেবীর চিরতরে চলে যাওয়া। মৃত্যুর আগে প্রমীলা দেবী পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিলেন। স্ত্রীর মৃত্যুর বেদনায় বিদ্রোহ ও প্রেমের এই কবি লিখেছিলেন, ‘যদি আর বাঁশি না বাজে, আমি কবি বলে বলছি না, আমি আপনাদের ভালোবাসা পেয়েছিলাম সেই অধিকারে বলছি, আপনারা আমায় ক্ষমা করবেন, আমায় ভুলে যাবেন, আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম, আমি প্রেম পেতে এসেছিলাম, কিন্তু সে প্রেম পেলাম না বলে, এই নীরস পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।’ আহারে! কত আকুতি এই লাইনগুলোতে। হৃদয়কে নাড়া দেয় এখনো। কবি নজরুলের আরেকটি লাইন বুকের ভিতরে আমার সব সময় বাজে। কবি লিখেছেন,

‘যেদিন আমি হারিয়ে যাব, বুঝবে সেদিন বুঝবে

অস্তপারের সন্ধ্যাতারায় খুঁজবে আমায় খুঁজবে’

কবি নজরুল একদিকে জানতেন ফারসি, অন্যদিকে উর্দু, আরবিতেও তার দক্ষতা ছিল। অনুবাদ করেছেন অনেক। দুই হাতে গান লিখতেন শুধু অর্থাভাবে। ঈদ, রমজানে লিখতেন ইসলামী সংগীত। আবার পূজায় থাকত শ্যামাসংগীত। এমন অসাম্প্রদায়িক চিন্তার মানুষ কজন আছে? সেনাজীবন শেষে মাত্র ২২ বছর লেখালেখি করেছেন। জড়িয়েছিলেন রাজনীতিতেও। একবার তো ভোটেই দাঁড়ালেন। আমাদের আরেকজন কবি ভোটে অংশ নিয়েছিলেন তিনি কবি নির্মলেন্দু গুণ। তাঁর মার্কা ছিল কুমির। নির্মলেন্দু গুণের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। ঢাকায় বসে পত্রিকায় দাদার পক্ষে আমিও লিখলাম। নজরুল ছিলেন সবকিছুতে। প্রতিভা বসুর ‘জীবনের জলছবি’তে নজরুলকে নিয়ে মজার একটা লেখা পড়েছিলাম। পুরান ঢাকার ওয়ারীতে বাস করতেন প্রতিভা বসুরা। তখন তাঁর নাম ছিল রানু সোম। বাসায় তিনি গান শিখতেন ওস্তাদ দিলীপ রায়ের কাছে। দিলীপ রায় নজরুলগীতিও শেখাতেন। নজরুলগীতি মুগ্ধ করে রানু সোমকে। এ সময় ঢাকায় আসেন কবি নজরুল। একদিন দিলীপ রায় নজরুলকে নিয়ে আসেন রানু সোমদের ওয়ারীর বাড়িতে। খাওয়া-দাওয়ার-আড্ডা হলো। এরপর কবি মাঝে মাঝে আসতেন এই বাড়িতে। ওয়ারীতে তখন বনেদি হিন্দু পরিবারের বাস ছিল বেশি। মহল্লার ছেলেরা দেখল ঝাঁকড়া চুলের লোকটি নিয়মিত এই বাড়িতে আসে। তারা সন্দেহ করল, এই বাড়ির মেয়ে রানুর সঙ্গে লোকটার সম্পর্ক আছে। একটা মুসলমান ছেলের সঙ্গে হিন্দু মেয়ের সম্পর্ক? আর যায় কোথায়। রানু সোমের বাড়িতে আসতে গিয়ে নজরুল আক্রমণের শিকার হলেন। ওয়ারীর হিন্দু যুবকরা নজরুলের ওপর হামলা করে রক্তাক্ত করে ফেলে। এর অনেক দিন পর রেলস্টেশনে কবিকে দেখেন রানু সোম। তখন তিনি বুদ্ধদেব বসুর স্ত্রী প্রতিভা বসু। কবির দিকে এগিয়ে যান। নির্বাক কবি তাকিয়ে থাকেন, চিনতে পারেন না। কারণ কবি তখন নির্বাক জীবনে। ঢাকার মতো ঝামেলায় কবি তেমন পড়েননি কুমিল্লায়। বরং কুমিল্লায় শুধু সেনবাড়ি নয়, আরও অনেক পরিবারের সঙ্গে কবির সম্পর্ক বেড়ে ওঠে। বাবুদের তালপুকুর কিন্তু কুমিল্লাতেই। আবার শচীন দেববর্মণের সঙ্গে সুরের ঝঙ্কারও কবি তুলতেন কুমিল্লায়।

মানুষের জন্য লড়েছেন কবি নজরুল। আটকের পর আদালতে দেওয়া তাঁর জবানবন্দি ইতিহাস হয়ে আছে। বন্দী হিসেবে কবির জবানবন্দি ছিল- ‘আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দী এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।... আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। কবির কণ্ঠে ভগবান সাড়া দেন, আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা ভগবানের বাণী। সে বাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে বাণী ন্যায়দ্রোহী নয়। সত্যের প্রকাশ নিরুদ্ধ হবে না। আমার হাতের ধূমকেতু এবার ভগবানের হাতের অগ্নিমশাল হয়ে অন্যায় অত্যাচার দগ্ধ করবে।’ এর পরও নজরুলকে এক বছর সশ্রম কারাদ- দেওয়া হয়েছিল। কারাগারে তাঁর কলম থেমে থাকেনি। তিনি লিখলেন ‘শিকল পরা গান’ এবং ‘সৃষ্টি সুখের উল্লাস’-এর মতো প্রাণমাতানো কবিতা। কারাগারে থাকার সময় কবি অনশন করেন। এ সময় কবিকে বই উৎসর্গ করে অনশন ভাঙার অনুরোধ করেন রবীন্দ্রনাথ। শেষ পর্যন্ত অনশন ভঙ্গ করেন বিরজা দেবীর অনুরোধে। মানবতাকে গুরুত্ব দিতেন কবি। তাই লিখেছিলেন, ‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান/মুসলিম তার নয়নমণি হিন্দুু তাহার প্রাণ।’ আবার নারী-পুরুষের অধিকার নিয়ে নজরুল লিখলেন, ‘এই বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি, চিরকল্যাণকর/অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ এত দিন পরও আমরা এসব বিষয় নিয়ে বিতর্ক করি। আলোচনা করি। সমাধান নিয়ে বিভিন্ন জন ফতোয়া দিই। অথচ নজরুলের সেসব আধুনিক চিন্তা এখন ধরলে আজকের দিনে অনেক সমস্যার সমাধান এমনিতেই হয়ে যায়। বিতর্ক বাড়ে না।

কবি নজরুল দ্রোহের কবি ছিলেন। তিনি লিখলেন, ‘কারার ঐ লৌহ-কপাট’ কিংবা ‘বল বীর বল উন্নত মম শির...’। সেই কবিই লিখলেন, ‘আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন...’ কিংবা ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী দেব খোঁপায় তারার ফুল’, কিংবা ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে’। আবার সময়কে নিয়ে বললেন, ‘চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায়।’ মানুষের মনের ভাষাকে কবি বুঝতে পারতেন। আমরা এত দিন পরও মানুষের মনের ভাষা বুঝি না। মানুষের চিন্তাকে ধুলোয় মিশিয়ে চলি। ক্ষমতা আমাদের অন্ধ করে দেয়। সমাজের গতিপথেও সমস্যার অন্ত নেই। মানুষ আর মানুষ নেই। অপরাধের ধরন বদল হয়েছে। অপরাধী সমাজে দম্ভ-অহংকার করে চলে। সমাজ পূজা করে অপরাধীকে। সামাজিক ন্যায়বিচার থেকে মানুষ বঞ্চিত। রাজনীতির নামে ভ-ামি চলে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি হারিয়ে গেছে। ভারতের মতো অসাম্প্রদায়িক চিন্তার দেশ এখন উগ্রবাদের রাজনীতিকে সাধুবাদ জানাচ্ছে। উগ্রবাদের পক্ষে বক্তব্য-বিবৃতি গর্ব নিয়ে দিচ্ছে সবাই। ভারতের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক বেশি অসাম্প্রদায়িক দেশ। আমাদের অহংকার অসাম্প্রদায়িকতা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ এর ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। রবীন্দ্র-নজরুল আর বঙ্গবন্ধুর চিন্তার অসাম্প্রদায়িকতা আমাদের অহংকার। এ অহংকার টিকিয়ে রাখতে হবে। উগ্রবাদ আমাদের এখানে চলতে পারে না। এবার ভারতের নির্বাচনে আরেকটি দিক দেখলাম। তা হলো, বামদের ভরাডুবি। পশ্চিমবঙ্গে একটি বাদে সব বাম প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে। মমতা সমর্থকরা বলছেন, বামরা ভোট দিয়েছে বিজেপিকে। বাম দল পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল। দিদির বিরোধিতার নামে বিজেপিকে সমর্থন কোনোভাবে মেনে নেওয়া যায় না। ভারতীয় নির্বাচনের আরেকটা দিক হলো, ’৭৭ সালের পর এবার আবারও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তার পরও গণতান্ত্রিক রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সবাই ভোট মেনে নিয়েছেন। অভিনন্দন জানিয়েছেন নরেন্দ্র মোদির সরকারকে। মোদির সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। তিনি ভারতকে উগ্রতার দিকে ধারাবাহিক ধাবিত করবেন, না আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে থাকবেন- সেই সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হবে। এর বাইরে গেলে ভারত আগামীর পথচলায় হোঁচট খাবে। বিশ্ব দেখবে মহাত্মা গান্ধী, নেহরু, সুভাষ বসুর আদর্শবর্জিত অন্য এক ভারতকে; যা প্রতিবেশী দেশগুলোর স্বাভাবিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

                লেখক : সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।

 


আপনার মন্তব্য