শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ অক্টোবর, ২০১৯ ২২:২১

বোধিবৃক্ষের কাছে হবুনেতার প্রার্থনা

মাকিদ হায়দার

বোধিবৃক্ষের কাছে হবুনেতার প্রার্থনা

অমর হওয়ার বাসনা সম্রাট অশোকের যেমন ছিল, তেমনি আমারও আছে। পৃথিবীর ধূলিকণা যদি আমাকে মনে না রাখে, না রাখুক তবে আমার স্বদেশের জনগণ যদি মনে রাখে তাতেই আমি কৃতার্থ। তৃপ্ত সেই তৃপ্তিতেও যদি আমার তৃপ্তি না আসে, তাহলে আমাকে নেতা হতে হবে। নেতা হওয়ার জন্য আমাকে যা কিছু করতে হয় তাই করব। তবে জেল-জুলুম সহ্য করে নয়, কেননা আমার জন্ম হয়েছিল শীতমাখা ঘরে। লালিত-পালিত হয়েছি অন্যের ক্রোড়ে ক্রোড়ে। পিতা ছিলেন মিলিটারিতে বড় সাহেব। গৃহকর্মীরা যাবতীয় কাজকর্ম করতেন বিধায় মাতাকে কিছুই করতে হয়নি। হয়েছে শুধু নিজ হাতে নয়- কাঁটা চামচে আহার সম্পন্ন করতে এবং বৈকালিক ভ্রমণ ছিল মাতার প্রিয় সঙ্গী। শীতমাখা গাড়িতে সেপাইসহ যেতাম সমুদ্রসৈকতে। আমার মাতা সমুদ্র দেখতে ভীষণ পছন্দ করতেন। তাই তার সঙ্গে নিত্যনৈমিত্তিক সমুদ্র দর্শন।

আমার জ্ঞান-গরিমা হওয়ার কিছুটা পরে, এ দেশে মুক্তিযুদ্ধ এলো, পিতা যেহেতু মিলিটারিতে ছিলেন তিনি গেলেন দেশ উদ্ধার করতে। কার নির্দেশে গিয়েছিলেন সে কথা আমি না জানলেও জেনেছিলাম বেশ কয়েক বছর পরে। মাতা বললেন তোমার পিতার একটি মাত্র ঘোষণায় বাংলাদেশ হয়ে গেল স্বাধীন। পিতার সৌভাগ্য তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পরে সময় সুযোগ বুঝে একদিন খাল কেটে কুমির আনলেন এবং ৯-১০ কোটি মানুষের চোখের মণি হয়ে গেলেন রাতারাতি এবং একই সঙ্গে তিনি হলেন একজন জনপ্রিয় নেতা। আমি ওই দিন থেকে লেখাপড়া বাদ দিয়ে দিন-রাত স্বপ্ন দেখতে লাগলাম আমাকে নেতা একদিন হতেই হবে। সেই ’৭৫ সালের পর থেকে আমার পিতা শুধু যে নেতাই হলেন তাই নয়, হলেন বিশাল মহীরুহ। যার শীতল ছায়ায় এসে সমবেত হলেন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বাংলাদেশবিরোধী। এমনকি পূর্ব পাকিস্তান উদ্ধারকারী। আরেক অপরাধী তিনিও আমার পিতার মহীরুহের নিচে। সেই যে ছাউনি পাতলেন- সেই ছাউনি থেকে তাকে কেউ সহজে বাইরে আসতে না দেখলেও এলেন অনেক পরে। ইতিমধ্যে পিতা কতিপয় দুষ্টলোকের চক্রান্তে একদিন ইহলোক ছেড়ে চলে গেলেন পরলোকে।

পরলোকে যাওয়ার পরে পিতার কাছ থেকে যারা একদিন সুবিধা নিয়েছিলেন, তারাই একদিন আমার গৃহবধূ মাতাকে রাস্তায় নামালেন, রাজনীতি করার জন্য। অথচ মাতা কোনো দিন কল্পনাও করেননি তাকে রাজনীতি নামক রথে ঢাকা শহরের রাজপথে নামতে হবে। নামলেন তিনি- নামালেন তাকে মহীরুহের ছায়ায় যারা ছিলেন তাদের দু-চারজন ব্যারিস্টার, দু-চারজন মুক্তিযুদ্ধবিরোধী- পাকিস্তানিদের গরু, ছাগল, মুরগি সরবরাহকারী এক বামপন্থি নেতাসহ আরও অনেকেই। তবে সুবিধাবাদী এক ব্যারিস্টার সাহেবকে মনে মনে নেতা গুরু মানতে আমার ভীষণ ইচ্ছে হলো। আমাকে যেনতেন প্রকারে একদিন নেতা হতেই হবে এবং সময় সুযোগ বুঝে নেতা হওয়ার পর পরই- গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ার মাঝিমাল্লার সরদারের নামে যা ইচ্ছে তাই বলব, বলেছিলেন অনেক পরে। ইতিপূর্বে নেতা হওয়ার অভিপ্রায়ে গিয়েছিলেম এক বোধিবৃক্ষের কাছে। তার ছায়ায় কিছুটা বিশ্রাম নেওয়ার পরে উপযাচক হয়ে বোধিবৃক্ষকে বললাম, আমি জ্ঞান চাইনে, আমাকে নেতা হওয়ার জন্য কী কী করতে হবে তাই যদি একটু দয়াপরবশ হয়ে আমাকে বলেন, আমি কৃতজ্ঞ থাকব সারা জীবন। বোধিবৃক্ষ মনে মনে হাসলেন এবং ভাবলেন অদ্যাবধি আমার কাছে যারা এসেছিলেন, তারা সবাই চেয়েছিলেন জ্ঞান, যেমন মহামতি বুদ্ধ। কিন্তু এই নির্বোধ মূর্খ এই প্রথম এলো। যাকে নেতা হওয়ার উপদেশ দিতে হবে। বৃক্ষ প্রথমেই জানতে চাইল পিতা-মাতা আছেন নাকি? পিতা নিহত, দুষ্ট লোকের আক্রমণে। আর মাতা- তিনি ছিলেন একদা গৃহবধূ। এখন তিনি ৫৬ হাজার বর্গমাইলের একমাত্র অধিষ্ঠাত্রী। তিনি যাই বলুন- আর না বলুন আমাকে নেতা হওয়ার কৌশল অবশ্যই শিখিয়ে দিতে হবে। নয় তো... কথা শেষ না করলেও বৃক্ষের বুঝতে অসুবিধা হলো না- তখনই বোধিবৃক্ষ বলতে শুরু করল এবং বলল, মনোযোগসহকারে যদি শোনো তবেই তোমাকে বলব। নেতা হওয়ার গোপন রহস্য যেহেতু তোমার মা- ৫৬ হাজার বর্গমাইলের অধিষ্ঠাত্রী। অতএব, নির্ভয়ে নেতা হওয়া যাবে অচিরেই। এই দেশের মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা তোমাকে নেতারূপে গণ্য তো করবেই এবং সর্বক্ষণ তোমার গুণগানে মুখরিত করবে আকাশ-বাতাস। তুমি যখন বগুড়া শহরের সাতমাথা নামক রাস্তার সংযোগস্থলের শহীদ মিনার তোমার হাজারো শিষ্য ভেঙে চুরমার করবে- তখন তোমাকে বগুড়ার মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের লোক এবং ভাষা আন্দোলনের নিহতদের প্রতি বিনীত শ্রদ্ধা, যারা একদিন শহীদ মিনার বানিয়েছিল, তারা মনেপ্রাণে ভীষণ কষ্ট পাবে এমনকি কেউ কোনো কথা বলতে পারবে না। কেননা- তুমি তোমার মাতার বড় পুত্র, যেহেতু মাতা ৫৬ হাজার বর্গমাইলের রক্ষাকর্তা- তাই পারিবারিকভাবে তিনিই আজ হোক কাল হোক তোমাকেই নেতা বানাবেন। এ ছাড়া তোমাকে তিনি কিছু বলবেন না, যেহেতু তোমার পিতামহের বাড়ি বগুড়া জেলার পূর্বদিকে। বগুড়া শহরের অনেক ধনী ব্যক্তি তোমার হাতের স্পর্শ পেলে নিজেদের ধন্য করবেন আজীবন।

বোধিবৃক্ষ, কীসব সাতপাঁচ ভেবে বললেন, আমি যা বলি মনোযোগ দিয়ে শুনলে নেতা হওয়ার পথ তোমার জন্য সুগম হবে। রাজপুত্র/হবুনেতা মাথা দুলিয়ে সম্মতি দিলেন এবং বললেন, বলুন মনোযোগসহকারে শুনছি আমি। বৃক্ষ তখন বললেন, আমি জনাকয়েক সুবিধাবাদী এবং বিপরীত কর্মা, অধিক মিষ্টিভাষী বাক্যাশ্রু কুশলী নেতার কথা বলব, সেসব নেতার পরিধেয় বস্ত্র হবে বিদেশি স্যুট-দামি টাই মরক্কোর চামড়ার তৈরি জুতো এবং গুলশান, বনানীতে অন্যের বাতিঘর নিজ দখলে থাকবে এবং নিজ সহায়সম্পদ গোপনকারী, পরের টাকা-পয়সা আত্মসাৎসহ অসচ্ছল চরিত্র, কাজে কর্মে বিমুখ এবং বক্তৃতাপ্রিয় হবেন তারা। যারা বঙ্গবাসীকে সব রকমের ভোগ-বিলাস থেকে দূরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে নিজে দামি মোটরযানে বঙ্গদেশের সর্বত্র নিজ দলের সমর্থক গুন্ডাপান্ডা নিয়ে পরিভ্রমণ করবেন। অন্যের কোনো কথা এবং নিজমতবিরুদ্ধ কথার উল্লেখ মাত্র যারা অসহিষ্ণু হতে পারবেন এবং ওইসব নেতার বিশেষ গুণ থাকতে হবে, নরমের যম হতে হবে। তারা যদি সত্যে অন্ধ হন এবং মিথ্যায় সর্বক্ষণ নিজেকে জাগিয়ে রাখতে পারেন, তারাই নেতা হতে পারবেন।

যারা কোনোরকম লেখাপড়া না করে পন্ডিত, ডক্টরেট ডিগ্রিধারী হবেন, এমনকি কবিতা না লিখেও যারা কবি হবেন এবং মানুষের সঙ্গে ভালো আচরণ না করে এবং সব সময়ে নিরন্তর চৌর্যবৃত্তি ও জালিয়াতি করে এবং স্বদেশের অর্থ বিদেশে পাচার করতে কোনোরূপ দ্বিধাবোধ করবেন না এবং অগণিত পরস্পরের সঙ্গে সুসম্পর্ক গোপনে গোপনে অর্থের বিনিময়ে গড়ে তুলবেন তারাই হবেন প্রকৃত নেতা। এ ছাড়া নেতা হওয়ার পরে মুখে যা ইচ্ছা তাই বললেও কোনো কিছু কেউ না বললেও দেশের দুষ্ট সাংবাদিকরা সময় সুযোগ বুঝে তাদের পত্রিকায় ছাপিয়ে দেবে। তাতে অবশ্য নেতার কিছু যাবে আসবে না। যেহেতু মাথার ওপর থাকবে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের রক্ষক, রক্ষাকারী।

বোধিবৃক্ষ থামতেই হবুনেতা চানতে চাইলেন যদি কোনো দিন কোনো বিপদাপদ হয়, যদি দেশ থেকে পালাতে হয় তাহলে কোন দেশে গেলে সুখে-শান্তিতে থাকাসহ বক্তৃতা দেওয়া যাবে এবং মাঝিমাল্লা-প্রধানের কন্যার বিরুদ্ধে বিপক্ষে যা ইচ্ছে তাই বলা যাবে। বৃক্ষ মাথা চুলকিয়ে জানাল ব্রিটেনের লন্ডন শহরই হচ্ছে উত্তম শহর। সেই শহরেও আছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ’৭১-এর খুনি ঘাতক এবং আরও আছে পলাতক, তবে সুবিধাভোগী একদল লোক যারা- তোমার নেতা হওয়ার সুবাদে এবং তোমার বাবার জয়জয়কারের সময় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বাংলাদেশের দূতাবাসে, হাইকমিশনার অ্যামবাসাডর/ফার্স্ট সেক্রেটারি হয়েছিল- শুধু তাদের লন্ডন শহরের যে কোনো খোলা মাঠে বা হাইড পার্কে অথবা যে কোনো হোটেলের সেমিনার কক্ষে, ওইসব খুনি পলাতককে শুধু জানাতে হবে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত এক নেতা বক্তৃতা দেবেন।

বোধিবৃক্ষের কথানুসারে সেই অদম্য উৎসাহী তরুণ একদিন নেতারূপে আবির্ভূত হলেন- কিন্তু দুঃখের বিষয় লেখাপড়া না জানলেও তিনি নেতা হলেন, যেমন তার গৃহবধূ মা তিনি দুবার ৫৬ হাজার বর্গমাইলের ১৪ কোটি থেকে ১৬ কোটি মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিতা হয়েছিলেন নেত্রীরূপে- তাই যদি হয়...। কিন্তু নব্য নেতার কপালের আকাশে হঠাৎ দেখা গেল কালো মেঘের ঘনঘটা। অথচ সেই উঠতি নেতাকে তারই পছন্দের অনেক ব্যারিস্টার সিএসপি এমনকি তারই দুজন একান্ত বিশ্বস্ত বাদে সবাই নব্য নেতা, নব্য রাজপুত্রকে অপছন্দের তালিকাভুক্ত করলেন, সর্বপ্রথম জামালপুরের জনৈক উকিল সাহেব অমুক তালুকাদার। নোয়াখালী এবং সর্বক্ষণ স্যুটেড বুটেড, টাইধারী দুজন ব্যারিস্টার ও নরসিংদীর জনৈক ভূঁইয়া সাহেব। সব শেষে বরিশালের একজন প্রাক্তন বিখ্যাত ফুটবল খেলোয়াড়। এরা ছিলেন নব্য নেতার ছায়ারূপে।

রাজনীতির সেই খেলায় নব্য নেতা, যিনি একদা বোধিবৃক্ষের কাছ থেকে জ্ঞান না নিয়েÑ নিয়েছিলেন নেতা হওয়ার পাঠ, সেই যুবরাজ/রাজপুত্রের কপালে হঠাৎ করেই যেন নেমে এলো ২০০৭-২০০৮ সালের বোশেখের কালো মেঘ, সেই কালো মেঘের তর্জন গর্জনে একদিন দেখলাম নব্য নেতাÑ পলাতক। তিনি থিতু হয়েছেন, সেই লন্ডন শহরে বোধিবৃক্ষের কথানুসারে।

নব্য নেতা যখন বঙ্গভূমিতে ছিলেন তখন থেকে নিয়মিত বাণী/বক্তৃতা/সেমিনার/সভা করতে অভ্যস্ত হয়েছিলেন এবং একই সঙ্গে যিনি সাংবাদিকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছিলেন, সেই নেতা লন্ডন শহরের কতিপয় বাংলাদেশবিরোধীর সমাবেশে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের শীর্ষ নেত্রীর পুত্র সমাবেশে বললেন বঙ্গবন্ধুকে রাজাকার। বললেন নির্দ্বিধায়। তারই পরিচিত সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ঢাকার এক আলোচনায় জানালেন যে বঙ্গবন্ধুকে রাজাকার বলতে পারে সে কি কোনো সুস্থ মানুষ? এ অসুস্থ রাজনীতি। [এইচ এম এরশাদ চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টি সূত্র দৈনিক ইত্তেফাক ২ জানুয়ারি, ২০১৫]।

যে নেতা, জাতির পিতাকেই রাজাকার বলতে পারে সে তো জনকের কন্যা শেখ হাসিনা সম্পর্কে যা তা বলতেই পারে। তাই নির্দ্বিধায় লন্ডনের এক সমাবেশে ‘বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুর্বার আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন নিশ্চিত করতে নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এর আগে তিনি নেতা-কর্মীদের ঘরে না-ফেরার পরামর্শ দেন।’

সম্প্রতি পূর্ব লন্ডনের এন্ট্রিয়াম হলে ‘গণহত্যা ও কালো দিবস শীর্ষক’ আলোচনায় তারেক রহমান বলেন, যখন খবর পাবেন শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন, ঠিক তখনই রাজপথ ছাড়বেন।’ অর্থাৎ তিনি লন্ডন শহরেই সুখে শান্তিতে বসবাস করবেন এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগ ছাড়া ঘরে ফেরা সম্ভব নয়। সম্ভবত শেখ সাদি বলেছিলেন, নির্বোধেরা ভাবে- তারাই বেশি বুদ্ধিমান। আর রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন,  ‘যে নিজের সম্মান উদ্ধার করতে পারে না, এ পৃথিবীতে সে সম্মান পায় না।’ (ইংরেজ ও ভারতবাসী প্রবন্ধ, রাজা প্রজার কথা)। তিনি তার চারিত্র্য পূজা মহাত্মা গান্ধী প্রবন্ধে আরও জানিয়েছেন।

পলিটিশিয়ান বলে একটা জাত আছে। তাদের আদর্শ বড় আদর্শের সঙ্গে মেলে না। তারা মিথ্যা বলতে পারে, তারা এত হিংস্র যে নিজেদের দেশকে...।

                লেখক : কবি।


আপনার মন্তব্য