Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper

শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৮ নভেম্বর, ২০১৯ ২৩:২৪

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর গুরুত্ব ও তাৎপর্য

মুফতি মুহাম্মদ মুহিব্বুল্লাহিল বাকী - পেশ ইমাম ও ভারপ্রাপ্ত খতিব : বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ

পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবীর গুরুত্ব ও তাৎপর্য

রবিউল আউয়াল মাসের আগমনে ইমানের জগতে বসন্ত শুরু হয়। রবিউন শব্দের অর্থ বসন্ত। মাঝেমধ্যে মনে হয়, রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমন এ মাসে হবে সেজন্য বোধহয় আল্লাহ যারা মাসের নামগুলো নির্ধারণ করেছেন তাদের অন্তরে এ মাসের নাম রবিউন রাখার জন্য আগে থেকেই প্রত্যাদেশ প্রেরণ করেছিলেন। রবিউল আউয়াল ঘুরে আসার সময় হলেই বিভিন্ন কবিতার চরণ মাথায় ঘুরপাক খায়। তেমনি চরণের মধ্যে একটি চরণ হলো- ‘মক্কায় নবী এলো মা আমেনার ঘরে/হাসিলে হাজার মানিক কাঁদিলে মুক্তা ঝরে’। ইসলামের ইতিহাসে রবিউল আউয়াল হলো একটি গুরুত্বপূর্ণ মাস। যেহেতু অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে, এ মাসেই আখেরি নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুনিয়ার বুকে আগমন ঘটেছে, ফলে এ মাস যখন আসে মুসলমানদের অন্তরে স্বাভাবিকভাবে রসুল-প্রেমের জোয়ারের ঢেউ নতুনভাবে সৃষ্টি হয়। রসুল-প্রেম অন্তর নতুনভাবে আন্দোলিত হয়। বছরের চাকা ঘুরেই রবিউল আউয়াল প্রতি বছর আমাদের কাছে আসে। কিন্তু কী শিক্ষা আমাদের জন্য নিয়ে আসে। আমাদের কী করণীয়? রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুনিয়ায় আসার মুহূর্তে যেসব অলৌকিক ঘটনা ঘটেছিল তা আমাদের বলে দেয় তাঁর আগমনের উদ্দেশ্য কী। সে উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে আমাদের করণীয় কী। ঐতিহাসিক মতামত অনুযায়ী দেখা যায়, যেদিন মা আমেনার ঘরে সুবহে সাদিকের সময় আল্লাহর রসুলের আগমন ঘটেছিল সে সময় কয়েকজন মহিলা তাঁর ঘরে উপবিষ্ট ছিলেন। তারা হঠাৎ দেখলেন আকাশ থেকে সরাসরি যেন এক আলো পুরো ঘরকে আচ্ছাদিত করে ফেলেছে। আলোয় ঝলমল করে উঠল পুরো ঘর। মহিলারা অবাক হলেন, দুনিয়ায় প্রতিদিন কত শিশুর, কত সন্তানের আগমন ঘটছে, এমন তো আর কোনো দিন দেখা যায়নি। তারা হঠাৎ আকাশের দিকে তাকালেন, তাদের কাছে মনে হলো আকাশের তারাগুলো যেন ঝুঁকে পড়ছে আর ঘরটা যেন আলোর বন্যায় ভাসছে।

অন্যদিকে আল্লাহর নবী যেদিন দুনিয়ার বুকে আসেন পারস্যের সাম্রাজ্য যা বিশাল এক সাম্রাজ্য, একটি পরাশক্তি, তাদের সম্রাটের যে বিশাল প্রাসাদ হঠাৎ নড়েচড়ে উঠল এবং ১২টি পাথর সে প্রাসাদ থেকে খসে পড়ল। তারা অবাক হলো। অলৌকিকভাবে ঘটনাটি ঘটেছে এ রকম ব্যাখ্যার সুযোগও বন্ধ হয়ে গেল যখন পারস্যের সম্রাট সেই রাতেই স্বপ্ন দেখেন আরব মরুভূমি থেকে কিছু উট ও সামনে একটি ঘোড়া ধেয়ে আসছে, শক্তিশালী একটি ঘোড়া আরবের কিছু উটকে টেনে মরুভূমি থেকে নিয়ে আসছে, ফোরাত নদ পার হয়ে পারস্যের বিভিন্ন সাম্রাজ্যে তারা ছড়িয়ে পড়ছে। তাদের সাম্রাজ্য বেদখল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে হাজার বছর ধরে প্রজ্বলিত অগ্নিকু- নিভে গেছে। এসব অলৌকিক বা কাল্পনিক স্বপ্ন বলে মনকে মানানো যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে স্বপ্নের ব্যাখ্যাকার ও খ্রিস্টধর্মের বড় পাদরিদের ডাকা হলো। তখন তারা বললেন, শেষ নবী হিসেবে একজন নবী আসার সময়ই এ ধরনের নিদর্শন প্রকাশ হবে বলে আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। তাহলে কি সেই নবীর আগমন ঘটেছে? সে নবীর নেতৃত্বে পুরো মানব জাতি ঐক্যবদ্ধ হবে? তাঁর পয়গাম সারা বিশ্বে পৌঁছে যাবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘সত্য সমাগত, মিথ্যা অপসৃত। আর মিথ্যা অপসৃত হতে বাধ্য।’ সূরা বনি ইসরাইল। মক্কার পাশেই বড় এক ইহুদি আলেম বাস করতেন। তিনি বললেন, ‘আমার মনে হচ্ছে আজ আরবজগতে কোনো একজন বিশেষ শিশুর জন্ম হয়েছে।’ লোকজন জিজ্ঞাসা করল, আপনি কী করে বুঝলেন আজকে আরবের মধ্যে এক বিশেষ শিশুর জন্ম হয়েছে? ইহুদি আলেম বললেন, ‘আমি রাতের বেলায় তারাগুলোকে ঝুঁকে পড়তে এবং আকাশ থেকে আরবের ওপর আলোর বিচ্ছুরণ হতে দেখেছি।’ খবর নিয়ে দেখা গেল সেই রাতে আবদুল মুত্তালিবের ঘরে এক শিশুর জন্ম হয়েছে। সবাই মনে করছে শিশুটি অন্য দশটি শিশুর মতো। ইহুদি আলেম আস্তে করে শিশুটির দুই ঘাড়ের মাঝখানে পিঠে নজর দিলেন। পিঠে দেখতে পেলেন মোহরে নবুয়ত (এক ধরনের বিশেষ চিহ্ন)। শেষ নবীর আলামত হিসেবে পূর্ববর্তী কিতাবে চিহ্নটির উল্লেখ রয়েছে। ইহুদি আলেম দেখেই বেহুঁশ হয়ে গেলেন। হুঁশ ফিরে এলে লোকেরা তার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বললেন, ‘বেহুঁশ হয়েছি খুশি এবং দুঃখে। খুশি এজন্য যে, অন্ধকারাচ্ছন্ন জাহেলিয়া-প্লাবিত বর্বরতাপূর্ণ এই পৃথিবীর বুকে আলোর মশাল নিয়ে শেষ নবীর আগমন ঘটেছে। (আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে আলো তথা মুহাম্মদ ও স্পষ্ট কিতাব এসেছে।’ সূরা মায়েদা।) দুঃখ এজন্য যে, ইহুদি, খ্রিস্টানদের সব নবী ইয়াকুব (আলাইহিস সালাম)-এর বংশধর, তথা বনী ইসরাইল গোত্রের। আমরা প্রত্যাশায় ছিলাম, সর্বশেষ নবীর আগমন ঘটবে ইসরাইল গোত্রে। এখন তার আগমন হয়েছে ইসমাইল (আলাইহিস সালাম)-এর বংশধর থেকে। সেই দুঃখে বেহুঁশ হয়েছি।’ যদিও সেই ইহুদি আলেম সংকীর্ণতার কারণে একচ্ছত্র আনন্দ প্রকাশ করতে অক্ষম ছিলেন। আল্লাহতায়ালা সেই নবীর আগমনে নিরঙ্কুশ আনন্দ প্রকাশ করার লক্ষ্যে বলেন, ‘হে নবী! বলে দিন তারা যেন আল্লাহর দান তথা কোরআন ও আল্লাহর রহমত তথা আপনার জন্য আনন্দ প্রকাশ করে। এটা তাদের জন্য সঞ্চয়ের মধ্যে উত্তম সঞ্চয়।’ সূরা ইউনুস, আয়াত ৫৮। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনে একজন মুসলমান সব সময় কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আনন্দিত থাকবে, আনন্দ প্রকাশ করবে এটা তার ওপর ফরজ। তবে যুগে যুগে প্রতি বছর যখনই আল্লাহর নবীর আগমনের এ মাস আসে তখন আল্লাহর নবীর প্রেমিকদের মাঝে আনন্দ প্রকাশ নতুন উদ্দীপনায় শুরু হয় এবং আনন্দ প্রকাশের ধরন ও কাল-পাত্র ভেদে বিভিন্ন রূপে রূপান্তরিত হয়।


আপনার মন্তব্য