শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০৮

ওমানের সুলতান কাবুসের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

মেজর নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ (অব.) পিএইচডি

ওমানের সুলতান কাবুসের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

সালতানাত অব ওমান, মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্ববাসীকে কাঁদিয়ে চিরবিদায় নিলেন ওমানের মহামান্য সুলতান কাবুস বিন সাইদ। ১০ জানুয়ারি, ২০২০ শুক্রবার থেকেই ওমানের আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। ১১ জানুয়ারি সরকারিভাবে তাঁর মৃত্যুর খবর প্রচারিত হয়। এর অব্যাবহতি পরই অঝরধারায় বৃষ্টি হয়েছে মরুর দেশ ওমানের রাজধানী মাস্কাট ও তার আশপাশ এলাকায়। ওমানের সকর শ্রেণি-পেশার নাগরিক এবং লাখ লাখ প্রবাসীর বিশ্বাস, ওমানের আকাশও যেন কেঁদেছিল এদিন। মরুভূমিতে এত বৃষ্টি ব্যতিক্রমী ঘটনা। তেমনি ব্যতিক্রম বৃষ্টির দিনে ওমানবাসীর ঘরে বসে বিলাপ করা, বিরল বৃষ্টির দেখা পাওয়া মাত্র ওমানের রাস্তাঘাট, বাড়ির আঙিনা, ছাদ, খেলার মাঠ ও বাগানে বেরিয়ে পড়েন ওমানিরা। যদিও সেখানে সাধারণত ক্ষণস্থায়ী হালকা বৃষ্টি হয়, তবু বৃষ্টিতে ভিজে আর কাদাপানি ছিটিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ্যে কার্পণ্য করেন না ওমানবাসী। তবে তাদের প্রিয় নেতা সুলতান কাবুসের মৃত্যু যেন স্তব্ধ করে রেখেছিল সবকিছু। এদিন ভুল করেও কোনো শিশু-কিশোরকে বাইরে বের হতে দেখা যায়নি। যে সুপার শপ বা বিনোদন কেন্দ্রগুলো ঈদের দিনও খোলা থাকে, সেগুলোও ছিল বন্ধ। স্তব্ধতার মাঝে সবাই যার যার মতো ইবাদত করে সুলতান কাবুসের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন। সত্তরের দশকে ওমানের সুলতান সাইদ বিন তৈমুরের একমাত্র পুত্র কাবুস বিন সাইদ ব্রিটিশ বিশেষ বাহিনীর সহায়তায় রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ওমানের ক্ষমতা গ্রহণ করেন। এর আগে ইংল্যান্ডেই তিনি লেখাপড়া করেছেন এবং ব্রিটিশ মিলিটারি একাডেমি স্যান্ডহারস্ট থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে চাকরিও করেছেন এক বছর। তাঁর নিয়োগ হয়েছিল জার্মানিতে অবস্থিত ব্রিটিশ ঘাঁটিতে। ১৯৬৬ সালে দেশে ফিরে তিনি এক বিরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হন। দেশে তখন বিভিন্ন গোত্র, উপদল এবং আঞ্চলিক দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে। উগ্র ও রক্ষণশীলদের প্রচারণায় পিতা তৈমুর দেশের আধুনিকায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষা-দীক্ষা, বিশেষত নারী শিক্ষার বিপক্ষে অবস্থান নেন। বাবার এ অবস্থানকে মেনে নিতে পারেননি কাবুস। ফলে দ্বন্দ্বেই জড়িয়ে পড়েন বাবার সঙ্গে। পরিণতিতে গৃহবন্দী থাকেন কিছুদিন। পরে তাঁর শিক্ষা ও সামরিক প্রশিক্ষণকালীন দেশ ইংল্যান্ডের সহায়তায় ১৯৭০ সালের ২৩ জুলাই তিনি শান্তিপূর্ণভাবে বাবাকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসেন। সুলতান কাবুস বিন সাইদের ক্ষমতা গ্রহণকে ওমানবাসী ‘রেনেসাঁ’ বা নবজাগরণ হিসেবে গণ্য করে। কারণ তিনি নানামুখী তৎপরতা চালিয়ে বিবদমান সব দল-উপদলের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষত দোফার এলাকায় যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও ইনসারজেন্সি যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তাও তিনি নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে দেশে দ্রুতই শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরে আসে। এরপর সুলতান কাবুস নজর দেন দেশের অর্থনীতির দিকে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ তখন খনিজ তেল বিক্রি করে রাতারাতি ধনী হওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে। দূরদর্শী সুলতান অনুধাবন করেন এ অশুভ প্রতিযোগিতা একসময় মধ্যপ্রাচ্যকে পরনির্ভর, ক্ষতিকর উচ্চাভিলাষী, অতিমাত্রায় বিলাসী ও ইসলামের মূল চেতনাচ্যুত করতে পারে। তাই তেল আহরণে তিনি ‘ধীরে চল’ নীতি গ্রহণ করেন। আজ ৫০ বছরের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যে প্রাচুর্যজনিত অস্থিরতা, বৈষম্য ও নীতিহীনতা বিরাজ করছে তার নেপথ্যে সুলতানের ধারণাকৃত অতিমাত্রার তেল সংগ্রহকে দায়ী করা হয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে যে সংকট চলছে বিগত কয়েক বছর ধরে, তার নেপথ্যেও রয়েছে সুলতান কাবুসের পূর্ব-ধারণাপ্রসূত অতিমাত্রায় তেল সংগ্রহের নগ্ন প্রতিযোগিতা। সামরিক বিচক্ষণতায় সুলতান কাবুস ছিলেন এক অসাধারণ প্রতিভা। তিনি অস্ত্র ব্যবসায়ী দেশ ও কোম্পানির ফাঁদে পা দিয়ে রাতারাতি দেশের অস্ত্রভান্ডার ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বৃত্তে আবদ্ধ হননি। এ বৃত্তে ওমানের যেসব প্রতিবেশী দেশ আবদ্ধ হয়েছে, তাদের অর্থনীতির এক বিরাট অংশ আজ সামরিক খাতে ব্যয় হচ্ছে। বিদেশি সৈন্যদের সামরিক ঘাঁটি স্থাপন ও সরব উপস্থিতি এসব দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলেও মধ্যপ্রাচ্যের ওইসব দেশের শাসকরা অসহায়ভাবেই তা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু সুলতান কাবুসের অবস্থান বরাবরই ছিল এসবের বিরুদ্ধে। বিদেশি কূটকৌশলে ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, ইয়েমেনসহ নানা দেশে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হলেও তাঁর শাসনামলের ৫০ বছরে ওমান ছিল শান্তির জনপদ। আঞ্চলিক শান্তি রক্ষা ও মুসলিম বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নীরবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন সুলতান কাবুস। ব্রিটিশদের সঙ্গে আন্তরিকতার সুযোগ এবং জার্মানির সঙ্গে বিশেষ সম্পর্কের কারণে পশ্চিমা বিশ্ব ও মধ্যপ্রাচ্যের মাঝে যোগসূত্র স্থাপনে অসামান্য অবদান ছিল তাঁর। গোয়েন্দা সন্দেহে ইরানে আটক মার্কিন গণমাধ্যমকর্মীদের মুক্তি ও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিকে কেন্দ্র করে ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধ সহনীয় পর্যায়ে রাখতে অসামান্য কূটনৈতিক দক্ষতা দেখিয়েছেন এই ক্ষণজন্মা সুলতান। অতিসম্প্রতি কাতার ও সৌদি আরবের অঘোষিত যুদ্ধকে অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার কৃতিত্বও তাঁর গলায়। বাংলাদেশের প্রবাসীদের কাছে সুলতান কাবুস ছিলেন দেবতাতুল্য। মুসলমান অধ্যুষিত বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে তিনি বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। এ ক্ষেত্রে তৎপর থাকায় নব্বই দশকে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল আমিন আহাম্মেদ চৌধুরী (অব.) বীরবিক্রমকে ওমানের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ‘আল নোমান’ খেতাব দিয়েছিলেন সুলতান কাবুস বিন সাইদ। সেই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বাংলাদেশ ও ওমানের ভ্রাতৃপ্রতিম সম্পর্ক নিশ্চিতভাবে আরও অনেক দূর এগিয়ে যেত। তবু যা হয়েছে, তা কম নয়। ওমানে সরকারিভাবে আজ ৬ লক্ষাধিক বাংলাদেশি প্রবাসী রয়েছেন। বেসরকারিভাবে তা আরও বেশি। এসব সম্ভব হয়েছে সুলতান কাবুসের ব্যক্তিগত আগ্রহে। তাঁর ব্যক্তিগত স্টাফ, রান্নাঘরের শেফ, বাগানের পরিচর্যাকারী, ঘোড়াশালের সহিসসহ অনেকেই বাংলাদেশি। বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের জন্য ওমানের রাজধানীসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঁচটি স্কুল খোলার অনুমতি দেয় তাঁর সরকার। ওমানের বিভিন্ন মঞ্চ মাতিয়েছেন বাংলাদেশের শিল্পীরা। ওমানের খেলার মাঠেও ছিল বাংলাদেশি খেলোয়াড়দের আনাগোনা। ওমানের নাগরিকত্বও পেয়েছেন ব্যবসায়ী ও ডাক্তারদের কেউ কেউ। ওমান বাংলাদেশের অন্যতম রেমিট্যান্স প্রেরণকারী দেশ। সার্বিক বিচারে সুলতান কাবুস বিন সাইদের মৃত্যু বিশ্বশান্তি, মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং বাংলাদেশের প্রবাসীদের জন্য এক বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি করবে। তাঁর প্রদর্শিত পথেই হাঁটার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন নবনিযুক্ত সুলতান হাইথাম বিন তৈমুর। নতুন সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণ ও সম্পর্কোন্নয়নে দৌড়ঝাঁপ করছে বিভিন্ন দেশ। বাংলাদেশ সরকার এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকবে না- এটাই প্রত্যাশা।

লেখক : ওমানের বাংলাদেশ স্কুলের সাবেক পরিচালক, গবেষক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক।


আপনার মন্তব্য