শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ২২ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২১ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:২৮

ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের নাম দুর্নীতিবাজ ও সাম্প্রদায়িক শক্তি

পীর হাবিবুর রহমান

ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নের নাম দুর্নীতিবাজ ও সাম্প্রদায়িক শক্তি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের রাজনীতি থেকে উঠে আসা একসময়ের অর্থনৈতিক রিপোর্টার সওগাত আলী সাগর এখন কানাডাপ্রবাসী। সেখানকার নতুন দেশের প্রধান সম্পাদক। তাঁর আবেগ-অনুভূতিতে সাংবাদিকতা ও দেশপ্রেম বইছে বলে এখনো বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতির ওপর গভীর পর্যবেক্ষণ রাখেন এবং সামাজিক যোগাযোগ -মাধ্যমে ছোট্ট করে তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে আমাদের পূর্বপুরুষরা বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের মানুষ ভাগ্যের অন্বেষণে উন্নত জীবনের আশায় যুক্তরাজ্য গিয়েছিলেন। সেই সময় জাহাজে করে দীর্ঘ সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে সবাই গিয়ে আবাস গড়েছিলেন। সেই থেকে লন্ডনি ও বিলেতি শব্দটি আমাদের অঞ্চলে বহুল পরিচিত। অনেকে শ্বেতাঙ্গ সুন্দরীদের বিয়ে করলে বলা হতো, মেম সাহেব বিয়ে করেছেন। আমি আমাদের সেই পূর্বপুরুষদের নিয়ে প্রতিনিয়ত গর্ববোধ করি। শিল্প-বিপ্লবের সেই যুগে কলকারখানায় হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে বৈরী আবহাওয়া, কঠিন পরিবেশ এবং তাঁদের কাছে বিস্ময়কর ইংরেজি ভাষার সঙ্গে অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষের লড়াই করে সবকিছু জয় করে টিকে যাওয়ার মধ্য দিয়ে জীবনের যুদ্ধেই জয়ী হননি, পরের প্রজন্মের জন্য তাঁরা নিরাপদ জীবনের দরজা খুলেছিলেন। আজকে ব্রিটেনজুড়ে তাঁদের পথ ধরে অনেক শিক্ষিত এবং তাঁদের পরবর্তী কয়েক জেনারেশন উচ্চশিক্ষিত হয়ে ব্রিটেনের মূলধারায় বিভিন্ন পেশায় আলো ছড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। ব্রিটেনের সংসদ থেকে স্থানীয় সরকারে আমাদের আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু, স্বজনরা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছেন। শুধু ব্রিটেনেই নয়, ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ দেশে দেশে বাংলাদেশি প্রবাসীদের উন্নত জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে গড়ে তোলা নিরাপদ আবাসস্থল। একসময় বিদেশে পাড়ি জমাতেন ভাগ্যের উন্নয়নে, নিরাপদ জীবনের আশায়। আর এখন দেশের দুর্নীতিবাজ ও লুটেরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মতোন এ দেশের সম্পদ লুট করে নিরাপদে ভোগ করতে পালিয়ে যায় পরিবার নিয়ে। ওরা দেশবিরোধী পলাতক খুনির মতোন ভয়ঙ্কর অপরাধী।

অনেকে পেশাদারিত্বের ওপর অভিবাসন আইনে উন্নত জীবনের আশায় কানাডায় বসতি গড়েছেন। কেউ কেউ সন্তানদের নিরাপদ জীবনের আশায় বৈধ আয়ের একটি অংশ বিনিয়োগ করে সেখানে বসতি গড়ছেন। কেউ বা গড়ছেন শরণার্থী হিসেবে। আর একদল এ দেশের ব্যাংক, শেয়ারবাজার লুটে ও অবাধ দুর্নীতিতে জনগণের অর্থ আত্মসাৎ করে দুর্নীতিবাজের তকমা নিয়ে সেখানে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আলিশান জীবন যাপন করছেন। আইনের চোখে অপরাধী হলেও তাদের কিছু হয় না। চট্টগ্রামের বাদশা গ্রুপের স্বত্বাধিকারী ঈশা ৬০০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পরিশোধ না করে সেখানে চলে গেছেন তাঁর ভাই মুসাকে সঙ্গে করে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি মোর্শেদ মুরাদ ইব্রাহীম হাজার কোটি টাকা ঋণ খেলাপি রেখে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কানাডায় পালিয়ে গেছেন। কানাডা সরকারের তথ্যমতে, পাঁচ বছর ধরে প্রতি বছর ৩ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কানাডায় স্থায়ী বসবাসের সুযোগ পেয়েছেন। ২০০৬ সাল থেকে বিদায়ী বছরের নভেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী রেসিডেন্স পেয়েছেন ৪৪ হাজার ১৮৬ জন বাংলাদেশি। বিনিয়োগকারী কোটায় কানাডায় এ সুযোগ নেওয়া বড় অংশটি গেছেন অবৈধভাবে অর্জিত টাকায়। বেসিক ব্যাংকের ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে সেখানে পালিয়ে যান জাহাজভাঙা শিল্পের ব্যবসায়ী গাজী বেলায়েত হোসেন মিঠু। ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ না করেই চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী দিদারুল আলম ২০০ কোটি টাকা নিয়ে সেখানে পালিয়ে গেছেন। মিশম্যাকের তিন ভাই হুমায়ূন কবীর, মিজানুর রহমান শাহীন ও মজিবুর রহমান মিলন বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে প্রথম দুজন পরিবার নিয়ে কানাডায় যান। ১২টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৮০০ কোটি টাকার বেশি পাওনা না দিয়ে কানাডায় বাস করছেন। আরেক ব্যবসায়ী জয়নাল আবেদীন কানাডার প্রচলিত আইন কাঠামোর মধ্যে থেকেই দেশের সম্পদ লুট করে সেখানে আলিশান বাড়ি-গাড়ি, পেট্রল পাম্প ও রেস্তোরাঁ ব্যবসা করছেন। সবাই চোখ-ধাঁধানো জৌলুসময় জীবনযাপন করছেন নির্লজ্জ বেহায়ার মতো দুর্নীতি ও লুটের টাকায়। এভাবে অসংখ্য সিন্ডিকেটের লুটপাটের টাকায় গড়ে উঠেছে ঝলমলে আবাসন পল্লী। কয়েক বছর থেকে অনেকে প্রথমে স্ত্রী-সন্তানদের পাঠিয়ে দেওয়ায় তার নাম হয়েছিল বেগমপাড়া। এখন ডাকাত ও বেগমদের পাড়া।

পরিশ্রমী প্রবাসীরা যেখানে স্বামী-স্ত্রীসহ ৪০ ঘণ্টা কাজ করে বাস করেন, সেখানে দেখতে হয় লুটেরাদের লুটপাটের অর্থে ভোগ-বিলাসের দাম্ভিক জীবন। নগদ টাকায় আলিশান বাড়ি কেনে। সওগাত আলী সাগর বলেছেন, যারা দেশের সম্পদ লুট করে নিয়ে কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন, তারা ঠান্ডা মাথায় দীর্ঘদিন এই পরিকল্পনা করেছেন। তাদের দৃশ্যমান আয় না থাকলেও বিলাসবহুল জীবনযাপনই করছেন না, অর্থ ব্যয় ও অনুদানের ক্ষেত্রে প্রবাসী কমিউনিটিকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন। এতে করে সেখানে পরিশ্রমী প্রবাসীরা এই দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় তুলেছেন। বরফের নিচে চাপা পড়া কনকনে ঠান্ডায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাতে লেখা পোস্টার নিয়ে প্রবাসীরা মানববন্ধন করেছেন টরন্টোর ডেনফোর্থে। সেখানকার সরকারের বিভিন্ন সংস্থা দুর্নীতিবিরোধী বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এসব দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের দিকটি খতিয়ে দেখছে। এই দুর্নীতিবাজ ও ব্যাংক লুটেরাদের পরিশ্রম করে হালাল খাওয়া প্রবাসীরা সমাজ ও দেশের শত্রু হিসেবে তাদের চিহ্নিত করে আন্দোলনে নেমেছেন। দেশে যেমন লুটেরা, দুর্নীতিবাজদের পক্ষে একদল অন্ধ সুবিধাভোগী সাফাই গায়, সেখানেও আশ্রয় নেওয়া ডাকাতদের পক্ষে কেউ কেউ গায়।

দেশের সম্পদ লুটে কানাডায় আত্মগোপনকারী ডাকাতদের বিরুদ্ধে সেখানকার প্রবাসী নাগরিকদের ঘৃণা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে এবং প্রবাসী কমিউনিটিতে সামাজিকভাবে বর্জনের ডাক জোরালো হচ্ছে।

বিগত বছর দেশ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে খবর এসেছে গণমাধমে। গত এক দশকে যার পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ হাজার কোটি টাকা। শুধু কানাডায় নয়, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, মধ্যপ্রাচ্য, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়াসহ দেশে দেশে দুর্নীতিবাজরা রাষ্ট্রের সম্পদ লুট করে নিয়ে গেছে। দেশের ব্যাংকিং খাতেই লুটপাট হয়নি, শেয়ারবাজার থেকেও হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হয়েছে। ১০ বছরে শেয়ারবাজারের ৪৭ হাজার কোটি টাকার মূলধনই তামাদি হয়ে গেছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা তাঁর শাসনামলে দেশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের মহাসড়কে তুললেও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা থেকে সমাজ জীবনে ছড়িয়ে থাকা ক্ষমতাধর সিন্ডিকেট দেশটাকে লুটপাটের লীলাভূমিতে পরিণত করেছে। তিনি প্রতিটি নির্বাচনে তাঁর অঙ্গীকার ইমানের সঙ্গে পালনের পদক্ষেপ নিয়েছেন। উন্নয়নের পাশাপাশি বিশাল বিশাল মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। কিন্তু একটি অসৎ ক্ষমতাধর রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক চক্রের কর্তৃত্ববাদী সিন্ডিকেটের কারণে সুশাসনকে প্রতিরোধ করে দুর্নীতিপরায়ণদের উল্লাসমঞ্চ বানিয়েছে প্রিয় স্বদেশকে। বিগত নির্বাচনের অঙ্গীকার অনুযায়ী জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ দমনের সাফল্য অর্জন করে মাদকের বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধের মুখে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করলে সেখানে সারা দেশে তাঁর সমর্থনে কোথাও একটি রাজনৈতিক বা নাগরিক সমাজ কিংবা আদর্শিক তারুণ্যের স্বাগত মিছিল হতে দেখা যায়নি। জনগণের সম্পদ লুটের বিরুদ্ধে জনগণ জেগে উঠতে পারছে না। ক্ষমতাধর দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে জনগণ জেগে ওঠার বদলে একটি অংশ তাদের সমর্থন এমনকি সাফাই গাইতেও কার্পণ্য করছে না। দেশে-বিদেশে সবখানে কানাডার ডেনফোর্থের মতো দুর্নীতিবাজ ও চোরদের বর্জন প্রতিরোধের ডাক দিয়ে আইনের হাতে তুলে দেওয়া উচিত। দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান তাঁর সংস্থাটিকে নিয়ে অভিযান অব্যাহত রাখলেও সেখানেও অনেকে প্রভাব খাটান। আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাচ্ছেন। বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। দুর্নীতিবাজ, রাষ্ট্রের সম্পদ লুটেরা দেশ ও জনগণের শত্রু, এটি যেমন জাতির মহান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরিষ্কার করে রুখে দাঁড়াতে বলেছেন, তেমনি মুজিবকন্যা শেখ হাসিনাও বারবার বলেছেন, রেহাই নেই।

দুর্নীতিবাজ শক্তি এতটাই বেপরোয়া যে, স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কর্মচারী আবজাল তাঁর স্ত্রীসহ দেড় হাজার কোটি টাকা নিয়ে অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দিয়েছেন নিরাপদে। একজন প্রশান্ত হালদার সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছেন। এর মধ্যে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্সের রেকর্ড ছিল বড় আশার আলো। প্রবাসীদের রেমিট্যান্স আমাদের কৃষকের হাড়ভাঙা পরিশ্রম বড় বড় শিল্পকারখানার দেশপ্রেমিক বিনিয়োগকারী ও ঘাম ঝরানো শ্রমিকের রক্তে দেশের অর্থনীতি সচল রয়েছে। জনগণ ট্যাক্স দিচ্ছে ভ্যাট দিচ্ছে। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা দেশপ্রেম নিয়ে দেশের অভ্যন্তরে মানুষের কল্যাণে একদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন, আরেকদিকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অসাধারণ ভূমিকা রাখছেন। অথচ ঘাটে ঘাটে দাপুটে আমলাতন্ত্রের জালে তাঁদের ভোগান্তির শিকার হতে হয়। অবস্থাটা এমন দেশপ্রেম নিয়ে দেশে বিনিয়োগ করে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখা অপরাধ ও কঠিন কাজ। অন্যদিকে দেশের সম্পদ লুট করে বিদেশে চলে যাওয়া বা পাচার করা বীরত্বের কাজ। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে এখনই রাষ্ট্র, সরকার ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়াতে না পারলে, সুশাসন নিশ্চিত হলে আগামী দিন দেশের অর্থনীতির জন্য ভয়ঙ্কর। আমি ভবিষ্যতের ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখছি।

একজন শরিয়ত বয়াতি লাখো শহীদের রক্তে ভেজা অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে মহাকালের ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারিত্ব নিয়ে রাত জেগে চারণের মতো গ্রামে গ্রামে গান করে বেড়ান। সেই শরিয়ত বয়াতি গ্রেফতার হন। এ দেশের সাংস্কৃতিক কর্মীরা ব্যক্তিগত লাভ-লোকসানের গলিপথে এতটাই ডুবেছেন যে, এই গরিবের জন্য মুক্তি চাওয়ার সময় পান না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় উঠলেও রিমান্ডের মুখোমুখি হয়ে তাঁকে জেলে যেতে হয়। শতবর্ষী হেফাজতের আল্লামা শফী বাংলাদেশের একজন ইসলামী চিন্তাবিদ ও বাংলাদেশ কওমি মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান হয়ে একবার শাপলা চত্বরে তাঁর সমর্থকদের এনে রাষ্ট্রকে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সেই ভয়াবহ তান্ডব তাঁর প্রশাসনের দক্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলাই করেননি, রাজনৈতিক দূরদৃষ্টি দিয়ে পরবর্তীতে সামাল দিয়েছিলেন। সেই প্রলয়ে সরকার উৎখাতের আশায় জামায়াত-শিবিরের জোটসঙ্গী বিএনপি তাদের উসকে দিয়েছিল। আজকের কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া তাঁর নেতা-কর্মীকে এদের সঙ্গে রাস্তায় নেমে আসতে বলেছিলেন। একটা মডারেট দলের নেত্রী হিসেবে কখনো এ ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। একদিকে জামায়াতকে সঙ্গে রাখা আরেকদিকে হেফাজতের সঙ্গে একাত্ম হওয়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিকই নয়, সংবিধান, আইন ও গণতান্ত্রিক রাজনীতির চরম পরিপন্থী। ধর্মান্ধ সেই শক্তিকে সেদিন তাঁরা নির্লজ্জের মতো সমর্থন দেওয়ায় সরকারকেও রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে তাঁদের শান্ত করার পথ নিতে হয়েছিল। সরকারের অনেক মন্ত্রী সেই ধর্মান্ধ শক্তির ডেরায় গিয়ে দোয়া নিয়েছেন। একদল ধর্মান্ধ শক্তি এই শতবর্ষী মানুষটাকে এখনো এনে কথা বলায়, আর লাখো শহীদের আত্মা ক্রন্দন করে ওঠে। তিনি একদিন বলেছিলেন মেয়েদের পড়ালেখা না করাতে। সর্বশেষ বললেন, দেশের স্কুল-কলেজ জেনার বাজার। তিনি এও বলেছেন, শিক্ষকরা জেনা করছেন। ছাত্রছাত্রীরা তো জেনা করেই।

মুক্তিযুদ্ধের রক্তে ভেজা অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের মধ্য দিয়ে আমরা রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষতাসহ অনেক মূলনীতিকে সংবিধান থেকেই হারাইনি, সাম্প্রদায়িক ধর্মান্ধ রাজনীতিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে প্রতিযোগিতামূলকভাবে প্রতিটি সরকারের আমলে উদারতার দরজা খুলেছি। অথচ ওরা নারীর ক্ষমতায়নই নয়, বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা-ভাবনা, গবেষণা, শিক্ষার প্রসার, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক শিক্ষিত জাতি গঠনে একটি বড় বাধা। এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান সত্য। এ দেশের আলেম-ওলামাদের মানুষ সম্মান করে, প্রকৃত ইসলামী চিন্তাবিদদের শ্রদ্ধা করতে কার্পণ্য করে না। কিন্তু এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ধর্মবর্ণনির্বিশেষে মানুষ জীবন দিয়েছে। সব ধর্মের মানুষের জন্য এই রাষ্ট্র। সব ধর্মই তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ধর্মের প্রচারণা স্বাধীনভাবে পালন করবে। কিন্তু ধর্মকে ব্যক্তিজীবন থেকে রাজনীতিতে টেনে আনা যাবে না। ধর্মের নামে সমাজে বিদ্বেষ, অশান্তি, অস্থিরতা তৈরি করা সংবিধানের চেতনার পরিপন্থীই নয়, আইনবিরুদ্ধ কর্মকান্ড। সব মত-পথের মানুষ থাকবেন। তাই বলে কোনো ধর্মের আবেগ-অনুভূতিতে আঘাত করা সমর্থনযোগ্য নয়। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের উত্তরাধিকারিত্বের বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের রাজনীতির পরিপন্থী। সংবিধান ও আইন ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সবার নাগরিক ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে। এর ঊর্ধ্বে কেউ নন। স্কুল-কলেজকে জেনার বাজার বলা মানে, ছাত্রছাত্রীদের অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক বলা মানে শিক্ষার বিরুদ্ধে কালো দেয়াল তুলে দেওয়া। এমন ঢালাও অসত্য বক্তব্য দেশের সব ধর্মের মানুষের জন্য অবমাননার। সব পিতা-মাতার জন্য অপমানের। অন্যায়ভাবে ধর্মের নামেই হোক আর যে নামেই হোক, আমাদের সন্তানদের নিয়ে অশ্লীল, অশোভন বক্তব্য রাখার এখতিয়ার রাষ্ট্র কাউকে দেয়নি। জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ যেখানে নিষ্ঠুরভাবে দমন করা হয়েছে, সেখানে দেশের মানুষের মনে আঘাত করা অশোভন বক্তব্যের লাগাম টেনে ধরাও জরুরি। রাষ্ট্র এখানে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারে না। মাদ্রাসায় ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষকদের হাতে ধর্ষিত হচ্ছে। গ্রেফতার হচ্ছে। কত ঘটনা অজানা।

আগের লেখায় আমি বলেছিলাম, এ দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। কুসংস্কারে বিশ্বাসী নয়। ধর্মে ধর্মে সম্প্রীতির বন্ধনে ভ্রাতৃত্ববোধ নিয়ে মানবতার আদর্শিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত। যারা এটিকে ইসলামী রাষ্ট্র রাখতে চেয়েছিলেন, লাখো প্রাণের বিনিময়ে আমরা সেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসরদের আমাদের পূর্বপুরুষদের বীরত্বে সুমহান মুক্তিযুদ্ধে রক্ত দিয়ে কবর রচনা করেছি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর নিষিদ্ধ সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিতই করিনি, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অংশীদারিত্বই দিইনি, মানবতাবিরোধী অপরাধীদের গাড়িতে তুলে দিয়েছি শহীদের রক্তে লেখা স্বাধীন দেশের পতাকা। আমাদের তারুণ্য সেনা শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি, যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে আদর্শিক রাজনীতির মঞ্চ থেকে প্রতিরোধ গড়েছি।

জামায়াতের দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী মানবতাবিরোধী অপরাধের দন্ডে আজীবন কারাভোগ করছেন। জামায়াতে যোগ দেওয়ার আগে সাঈদীর বাগ্মিতাকে কাজে লাগাতে নেপথ্যে জামায়াত-শিবির থেকে কোরআনের তাফসিরের নামে দেশে-বিদেশে ওয়াজ মাহফিলে পাঠানো হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের ঢল নেমেছে। সেখানে তিনি বহুল বিতর্কিত আবুল আলা মওদুদীর দর্শনে বিশ্বাসী জামায়াতের রাজনীতিকেই শক্তিশালী করেছেন। সাঈদীর ভক্ত তারেক মনোয়ার ওয়াজ মাহফিলে মিথ্যাচারের নমুনা দেখাচ্ছেন। আজগুবি সব কথাবার্তা বলছেন। ইংল্যান্ডের ব্রাইটনে ছিলেন। বয়সে তরুণ থাকতে ইংল্যান্ডের ফুটবল লিগে খেলেছেন। পরে দেখেছেন ফুটবল খেলা হারাম, তাই ছেড়ে দিয়েছেন। আফগানিস্তানের তালেবানি শাসকরা বিশ্বের জনপ্রিয় ফুটবল খেলা নিষিদ্ধ করেছিল। তারেক মনোয়ার আরও মিথ্যাচার করে বলেন, আইফোনের মালিক বিশ্বের ধনাঢ্য বেলগ্রেডের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছে! ট্রাম্পের অনুষ্ঠানে তিনি যাননি। এমনকি বিশ্ববিখ্যাত অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে তিনবার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত করেছে। তিনি কখনো কাউকে বলেননি। তাঁর পরিবারকেও না। ওয়াজ মাহফিলে নাকি ফট করে বলে দিলেন। মহান আল্লাহর নামে এমন মিথ্যাচার আরশ কাঁপিয়ে দেয়। তাঁর শিষ্য কারাবন্দী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আদর্শপুত্র তরুণ মিজানুর রহমান আজহারী ইংরেজি, বাংলা, আরবিতেও গানে গানে ওয়াজ করে বেড়াচ্ছেন। সিলেটের ওয়াজ প্রশাসন নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। ভোটের আশায় আওয়ামী লীগের অনেক এমপি-মন্ত্রী, নেতাও তাঁর ওয়াজ মাহফিলে যাচ্ছেন। তিনি একবার বলেন, আল্লামা কেউ লিখতে পারে না। আল্লামা বলতে আল্লাহকে বোঝায়। আবার বলেন, ঘরে ঘরে আল্লামা সাঈদীর জন্ম দাও। সাঈদীর কারাজীবনের প্রতিবাদ করে মুক্তি চান। তিনি শ্রেষ্ঠ কোরআনের আলোচক বলে সাঈদীর নামে ওয়াজ মাহফিলে মানুষকে উত্তেজিত করেন। তিনি নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মানুষকে ধর্মের নামেই উত্তেজিত করেন না, হিজাব পরাতেও সবার রক্তে আগুন ধরিয়ে দেন। ইসলামের জন্য যুদ্ধের জন্য আধুনিক সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত বাহিনী গড়তে বলেন! সাঈদীর পর জামায়াতের বেস্ট প্রোডাক্ট মিজানুর রহমান আজহারী চতুরতার সঙ্গে বাগ্মিতায় স্মার্টলি ফ্যাশনেবল পোশাকে ও গানে গানে লাখো মানুষের ঢল নামান। রাজনীতিতে নীরব জামায়াত সুকৌশলে তাঁকে নিয়ে সারা দেশে ধর্মের নামে মানুষকে আবেগাপ্লুত করে সুসংগঠিত করছে। সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক শক্তি নির্বিকার।

অনেক আওয়ামী লীগ সমর্থকও দেউলিয়া রাজনীতির যুগে হৃদয়ে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিশ্বাস না রাখার সুবাদে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্লজ্জের মতো প্রচার করেন। আওয়ামী লীগের মহাদুঃসময়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে উঠে আসা বাকসুর নির্বাচিত ভিপি ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল মান্নানের মৃত্যুতে সংসদে আবেগাপ্লুত আলোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রবীণ ও নবীন সদস্যরা। একালের অনেক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী-এমপি আবদুল মান্নানের সময়কার দল, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতির জন্য কতটা দুঃসময় ছিল, সেটা জানেন না। দল, রাজনীতি ও জাতির মহাদুঃসময়ের মহাসংকটের কালের ইতিহাস ক্ষমতার সুবাদে স্মরণেও নেই।

বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা হৃদয়ের আবেগ-অনুভূতি দিয়ে সবাই পাঠ করেছেন কিনা আমার সন্দেহ হয়। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি দূরে থাক, তাঁর হাত ধরে উঠে আসা জাতীয় বীরদের সংগ্রাম ও বৈরী পরিস্থিতি সম্পর্কে এই দলের ও মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরের ভয়াবহতা সম্পর্কে কতটা উপলব্ধি করেন সেটাও জানি না। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় দেখছেন আর নিজেরা অনেকে ক্ষমতার দম্ভে ভুগছেন। কিন্তু মুজিবকন্যার ৩৯ বছরের বেদনাবহ সংগ্রামের রাজনীতির পাঠ তারা নিয়েছেন কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কিন্তু এ কথা নিশ্চিত বলা যায়, দুর্নীতিবাজ ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আবেগ-অনুভূতি দিয়ে চেতনা ও বিবেককে জাগ্রত করে জনগণের হৃদয় জয় করে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখতে না পারলে কাল বঙ্গবন্ধুকন্যা ক্ষমতায় না থাকলে জাতির জীবনে যে অন্ধকার দুঃসময় এসে হাজির হবে, সেটি দেখছেন না। আমি আমার গভীর পর্যবেক্ষণ থেকে অবলীলায় বলতে পারি, বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা কাল ক্ষমতায় না থাকলে গুলি খাওয়া বাঘের মতো সাম্প্রদায়িক শক্তি ও দুর্নীতিবাজদের দৈত্যের রূপ যে বেপরোয়া হয়ে আসবে সেটি হবে জাতির জীবনে এক ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শিক চেতনায় বঙ্গবন্ধুর দর্শনে শক্তিশালী জনগণের ঐক্য না হলে সেটিকে রুখে দাঁড়ানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন।


আপনার মন্তব্য