শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:০৬

স্বাধীনতা শুধু এক পক্ষের কেন

তসলিমা নাসরিন

স্বাধীনতা শুধু এক পক্ষের কেন

সংগীতশিল্পী এ আর রহমানের কন্যা খাতিজা রহমানের বোরখা নিয়ে আমার মতপ্রকাশ করার পর খাতিজা রীতিমতো আমাকে লিখেছেন যে আমি যেন ‘নারীবাদ’ কাকে বলে তা গুগল করে জেনে নিই। চার দশক ধরে নারীর সমানাধিকার নিয়ে কথা বলে ফতোয়া, মামলা, নিষেধাজ্ঞা, নির্বাসন ইত্যাদির শিকার হওয়ার পর খাতিজা আমাকে বলছেন আমি যেন নারীবাদ কাকে বলে তা গুগল করে জেনে নিই। খাতিজার কথা, বোরখা তিনি পরেন কারণ এটা তাঁর ইচ্ছে। মেয়েরা তাদের ইচ্ছে অনুযায়ী পোশাক পরবে, এতে কারো আপত্তি কেন? আমি মানছি খাতিজার ইচ্ছে শুধু বোরখা নয়, নিকাব পরা। নিকাবে মুখ ঢাকা থাকবে, চোখ দুটোকে ঢাকলে অবশ্য চলবে না, কারণ ও দুটোকে খোলা রাখতে হবে চলাফেরা করতে গিয়ে দুর্ঘটনা যেন না ঘটে তা দেখার জন্য। তাছাড়া চুল, কপাল, নাক, ঠোঁট, গলা সবই ঢাকা থাকবে। খাতিজা কি জানেন অনেক মেয়েই তাদের ইচ্ছেয় বোরখা পরে না, পরে অন্যের ইচ্ছেয়। বাপ-ভাই বা শ্বশুরবাড়ির ইচ্ছেয়। আজকাল তো আবার মেয়েদের কিছু কলেজও, কিছু অফিসও আইন করে দিচ্ছে সব মেয়েকেই হিজাব পরতে হবে। অনেক দেশেই হিজাব বা বোরখা না পরার স্বাধীনতা নেই। অনেক দেশেই জিন্স বা ট্রাউজার পরার স্বাধীনতা নেই। পরলে, নীতি-পুলিশ এসে রাস্তায় পেটায় মেয়েকে। ভারতবর্ষে পোশাকের ব্যাপারে বাধ্যতামূলক কোনও আইন নেই বলেই খাতিজা পোশাক পরার স্বাধীনতার কথা বলতে পারেন। আমি জানি না, বোরখা পরার ইচ্ছের ব্যাপারে যত তিনি সচেতন, বোরখা পরার না ইচ্ছের ব্যাপারে তিনি ততটাই সচেতন কি না। তিনি কি কখনও সেইসব মেয়ের পাশে দাঁড়িয়েছেন, যাদের ইচ্ছে নেই বোরখা পরার, কিন্তু রাষ্ট্রের সমাজের পরিবারের চাপে বাধ্য হয়ে পরছে?

নিরাপত্তার কারণে ইউরোপের কিছু দেশ মুখ ঢাকা বোরখা নিষিদ্ধ করেছে। চোর, ডাকাত, জেল পালানো আসামি, ক্রিমিনাল, সন্ত্রাসী খুনি পুরুষকে বোরখার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে দেখা গেছে, সে কারণে বোরখা পরো ক্ষতি নেই, মুখ ঢেকো না... ঢাকলে জরিমানা দিতে হবে এই আইনটি থাকা সত্ত্বেও যে মহিলারা মুখ ঢাকছে, তাদেরকে কিন্তু কোনও পুলিশ পেটাচ্ছে না।

আমরা কি লক্ষ করছি না স্বাধীনতা শুধু এক পক্ষই ভোগ করছে। যারা নামাজ পড়তে চায়, তাদের জন্য মসজিদ বানানো হয়েছে যেন সেখানে গিয়ে নামাজ পড়তে পারে, মসজিদে জায়গা না হলে রাস্তা বন্ধ করে হলেও, ট্রাফিক বাড়িয়ে, যানবাহন এবং পথচারীদের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে হলেও নামাজ পড়ার স্বাধীনতা তারা ভোগ করে। তারা রোজা রাখার স্বাধীনতাও ভোগ করে, কিন্তু যারা রোজা রাখতে চায় না, তাদের কি আদৌ স্বাধীনতা আছে রোজা না রেখে ঘরের বাইরে খাওয়ার?

আজ মসজিদে, মাদ্রাসায়, ওয়াজে, মাহফিলে ইসলাম প্রচার হচ্ছে। মোল্লাদের যেমন ইচ্ছে সেভাবে কোরআন হাদিসের ব্যাখ্যা করছে। দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ সেসব শুনছে, কিন্তু এসবের সমালোচনা করার স্বাধীনতা কারো আছে কি? সে কারণেই বলছি স্বাধীনতা শুধু এক পক্ষের। যারা ধার্মিক, তাদের। যারা ধার্মিক নয়, তাদের কোনও স্বাধীনতা নেই। তারা আজ মুখ বন্ধ করে রাখে। নয়তো তারা কারাগারে, নির্বাসনে, নয়তো নিহত।

তাহলে কি ধার্মিকদেরই শুধু যেমন ইচ্ছে তেমনভাবে কথা বলার, কাজ করার, বাঁচার অধিকার আছে এবং অধার্মিকদের তা নেই? একটি গণতন্ত্র কি যে ধর্ম মানে এবং যে মানে না... দুজনের অধিকারকে সমানভাবে দেখে না? সমানভাবেই কিন্তু দেখা উচিত। গণতন্ত্র মানে তো এক ধর্মগোষ্ঠীকে উৎসাহ দেওয়া, এক ধর্মগোষ্ঠীর সব আদেশ-নির্দেশ, আবদার-অনুরোধ মেনে নেওয়া কারণ সংখ্যায় তারা বেশি! আর গণতন্ত্র তাকেও দেখভাল করে, যে সব ধর্মগোষ্ঠীর বাইরে, যে একা, যার মতের সংগে কারও মতের মিল নেই। সে কারণে এই তন্ত্রের নাম গণতন্ত্র, তা না হলে এটা হতো ‘জোর যার মুল্লুক তার’, ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের রাজ্য’, অথবা পাকিস্তানের মতো ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্র’।

যারা ইসলাম ইসলাম করছে, যেন ইসলামের সবকিছু মেনে চলছে, তারা কিন্তু আসলে ইসলামের কিছুই মানছে না। তারা ঘুষ খাচ্ছে, মদ খাচ্ছে, ধর্ষণ করছে... যত অনৈতিক কাজ আছে সব করছে, তারা কিন্তু হিজাব পরলেই বা মাথায় টুপি পরলেই বা দাড়ি রাখলেই সাচ্চা মুসলমান হয়ে যাচ্ছে না, সাচ্চা মুসলমান হতে গেলে ইসলামের বিধিনিষেধগুলো মানতে হবে।

কোরআনে সংগীত নিষিদ্ধের কথা বলেনি... এই কথা বলাতে শরিয়ত বয়াতিকে জেল খাটতে হচ্ছে। তাহলে কোরআন যদি নাচ গান বাজনা, প্রাণীর ছবি আঁকা নিষিদ্ধই করে, তাহলে নাচ গান বাজনা ছবি আঁকা ছবি তোলাও তো হারাম। হারাম কাজ করে মাথায় টুপি বা হিজাব পরেই কি সত্যিকার মুসলমান হওয়া সম্ভব? সত্যিকার মুসলমান না হয়েই মুসলমান হওয়ার গর্বে মাটিতে লোকের পা পড়ে না। নিরবধি বিচার করেই যাচ্ছে কে কতটা মুসলমান, কে কতটা নয়, কে কার ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিল, কাকে ফাঁসি দিতে হবে! যারা ধার্মিক নয়, তাদের বিরুদ্ধে যখন একের পর এক হত্যা, জখম, নিষেধাজ্ঞা, হুমকি ইত্যাদি আসতে থাকে, রাষ্ট্রের নাম গণতন্ত্র। কিন্তু কাজে গণতন্ত্র নয়। এই রাষ্ট্রে শুধু এক পক্ষের অধিকার। অন্য পক্ষের মতপ্রকাশের অধিকারের পক্ষে রাষ্ট্র দাঁড়ায় না, বরং তাদের জেলে পোরে। এই রাষ্ট্রকে সত্যিকার গণতন্ত্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার ব্যাপারে কেউ কি নেই পরামর্শ দেওয়ার। বিশ্বের বাজারে গণতন্ত্রের মূল্য ভালো, ধর্মতন্ত্র বা রাজতন্ত্রকে যে করেই হোক পাততারি গুটোতে হবে।

 

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা


আপনার মন্তব্য