শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৩০ জুন, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৯ জুন, ২০২০ ২৩:৪১

‘হিলারি’ না বলে ‘মনিকা মনিকা’ কেন

আবু তাহের

‘হিলারি’ না বলে ‘মনিকা মনিকা’ কেন

বড় টমেটোর দর বেশি। ছোট টমেটোর দর কম। তবু ক্রেতার মন আঁইগুই করে বড়র জন্য। কিনতে না পারলে আফসোস। অথচ খাদ্যমূল্য বড়র যা, ছোটরও তা-ই। স্কুলে আমাদের বাংলার পণ্ডিত স্যার ক্ষিতিশ মজুমদার বলতেন, ‘আহাম্মকরা বড় টমেটো কেনে। আমিও বড় বড় দেখে কিনি। বড় দেখতে সুন্দর, সেজন্য কিনি। কিন্তু আমার যা রোজগার তাতে বড় টমেটো কেনার ফুটুনি মানায় না। তোরা যখন আয়-রোজগার করবি, কখনো বড় টমেটো খাওয়ার অভ্যাস করবি না।’

‘ব্যাডায় কয় কী? আমরা সবতে কী তোমার মতন অল্প বেতনের পণ্ডিত হমু যে টাকার অভাবে বড় সাইজের টমেটো খাইবার পারুম না?’ ফিসফিস করে বলল সহপাঠী সুবোধ মজুমদার, ‘আহাম্মকরা কোন সাইজের টমেটো খায় সেটা আমাদের জাননের দরকার নাই। আমাদের জানা দরকার আহাম্মক মাত্রই তোমার মতো বাংলার পণ্ডিতের পোস্টের ফকিইররা চারকি করে কিনা।’ (সুবোধ ‘চাকরি’ উচ্চারণে অক্ষম)। পণ্ডিত স্যারের পুত্র সুবোধ মজুমদার। আমাদের মধ্যে একটা কথা চালু ছিল- এক ডজন বিচ্ছুকে এক জায়গায় জড়ো করে রান্নায় চড়ালে একটা সুবোধ পাওয়া যাবে। পিতা মাস্টারি করেন, এটা সুবোধের মোটেই পছন্দের নয়। তার বিশ্বাস ‘ব্যাডায় মাস্টারি করে বলেই ফকিইররা।’ সুবোধের বড় ভাই রতন মজুমদার বলেন, ‘অরে কইস্ বড়লোক দেইখ্যা কাউরে বাপ ডাকতে!’

হাল ফ্যাশনের জামা-জুতো পরবার আগ্রহ সুবোধের। সীমিত আয়ের পিতার সাধ্য নেই পুত্রকে ওগুলো কিনে দেওয়ার। এজন্য পিতাকে সে ‘ব্যর্থ মানুষ’ বলেই প্রচার করে। আমরা তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। এখন, বহু বছর পর ভাবী, ওই বয়সে সুবোধ ব্যর্থতা-সাফল্যকে এতটা নিখুঁত বিশ্লেষণ করতে পেরেছিল কীভাবে! সে যা বলত তা এরকম : হিমালয়ের ডগায় ওঠা ল্যাংড়াদের পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। অক্ষমতার ওই বেদনা ঢেকে রাখার জন্য তারা বলে বেড়ায় বিস্তর টাকা-পয়সা খরচ করে ঝুঁকি নিয়ে পাহাড়ে ওঠার চাইতে অনেক ভালো ভালো কাজ পৃথিবীতে আছে।

ক্ষিতিশ মজুমদার সন্তানদের বোঝাতেন, বেশি বেশি সুখসন্ধান অতৃপ্তির জন্ম দেয়। মাত্রাধিক সম্পদ অর্জনের বাসনা মানুষকে লোভাতুর করে তোলে। অল্পে সন্তুষ্ট যে জন সে-ই প্রকৃতপক্ষে সুখী। বিলাসের প্রতি দুর্বলতা ব্যয় প্রবণতা বাড়ায়। ব্যয় প্রবণতা বৃদ্ধি অপচয়ে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি ছাত্রদের যেমন বলতেন তেমনই বলতেন সন্তানদের, ‘বাবারা অপচয় করিস না। অপচয় উন্নতিবিনাশক। যারা অপচয় এড়িয়ে চলে তারাই ধাপে ধাপে উন্নতি অর্জন করে। শক্তি, মেধা, বিত্ত কোনোটারই অপচয় ঈশ্বর সহ্য করেন না।’

পিতার এসব হিতকথাকে কানাকড়ির মূল্য দিত না সুবোধ। সে বলত, ‘ল্যাংড়ার উপদেশ শিরোধার্য করবি? কর। করে ডাইরেক্ট নরকে যা।’ পেশাজীবনে সুবোধ হয়েছে প্রকৌশলী। পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে সে সরকারি পদে উন্নতিও পায়। ওখানে আমরা কয়েক বাল্যবন্ধু ১৯৯২ সালে ওর অতিথি হয়েছিলাম। আমরা বিস্মিত হয়ে দেখি, সে পুরোপুরি বিচ্ছুরহিত। কেমন করে সম্ভব হয় এমন? সুবোধ জেলাভিত্তিক বিশুদ্ধ আঞ্চলিক ভাষায় বলে, ‘হলদ্ খাইলে কুত্তার ল্যাঁজ সোজা অই যায় হুনছ ন?’ (পিটুনি খেলে কুকুরের লেজ সোজা হয়ে যায় শুনিসনি?)।

প্রয়াত পিতার প্রসঙ্গ উঠলে সুবোধ অনেকক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল। কিছুক্ষণ পরে স্বাভাবিক হয়ে জানতে চাইল আমরা কে কে ওর পিতার উপদেশ মেনে অপচয় করছি না। তাকে আমরা জানাই, সুযোগের অভাবে মানুষ সৎ থাকতে বাধ্য হয়। যারা অপচয় করে তারা শয়তানের ভাই। আমরা অপচয় করছি না। শক্তি মেধা বিত্ত কোনোটাই তো আমাদের নেই। যা নেই, তা অপচয়ের প্রশ্নই ওঠে না।

কলেজজীবনের সহপাঠী বন্ধু আবুল কাশেম কেমন আছে জানতে চাইল সুবোধ। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকাররা কাশেমকে খুন করেছে শুনে আবারও কাঁদল সুবোধ মজুমদার। জেলা জজের ছেলে কাশেম ছিল হাফডজন বিচ্ছুসমান। ফলত সুবোধের সঙ্গে ওর অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কলেজের বার্ষিক নাটকে নায়কের ভূমিকা না পেয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে কাশেম বলেছিল, ‘নিক্ষেপবেদনায় পরান অস্থির কইরা ফালাব।’ নাটকের নায়ক গোলাম কিবরিয়া মঞ্চায়ন রজনিতে সংলাপ করছে- ‘জীবনকে ফাঁকি দিয়ে জীবন ভরানো যায় না শেফালী।’ শান্তা (যে ছাত্রীটি নায়িকা শেফালীর চরিত্রে অভিনয় করেছিল) পরে জানায়, সে নায়কের উদ্দেশে সংলাপ করতে যাচ্ছিল, ‘আমার জীবন আমার। তাকে আমি রাখব না চুরমার করব তাতে তোমার কী আসে যায়।’ ঠিক ও সময়, শান্তার ভাষায়, ‘কাশেম ভাই সদলে এসে যায়। মঞ্চে ছুড়তে থাকে পচা ডিম। দর্শকদের গায়ে পড়ে সেই ডিম। ভয়ঙ্কর দুর্গন্ধ। পণ্ড হয়ে গেল নাটক।’

নায়ক কিবরিয়ার গায়ে একের পর এক পচা ডিম পড়তে থাকলে সে চিৎকার করে, ‘ধর, ধর! শুয়োরের বাচ্চাদের ধর।’ আমরা কাশেমের পচা ডিম নিক্ষেপ অভিযানের নিন্দা করেছিলাম। করতেই হয়েছে। কেননা আমরা নিজেদের কালচার্ড বলে দাবি করি। কাশেম বলে, ‘তোরা এতই যখন কালচার্ড তোদের উচিত ছিল অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা। কিরবিরিয়ার (নায়ক চরিত্র পাওয়া কিবরিয়ার ওপর ক্ষিপ্ত কাশেম ওভাবেই উচ্চারণ করত- কিরবিরিয়া) গান শোনা।’

কিবরিয়া গান গেয়েছিল? কাশেম সিগারেটে সুখটান মেরে বলে, ‘তোরা যাকে চিৎকার বলছিস, ওটাই গান। নিক্ষেপবেদনার সুরে গাওয়া গান আর কি।’ শান্তা বলে, ‘ত্রিশ দিন রিহার্সেল শেষে নাটক হচ্ছিল। কত কষ্টের নাটক! আপনি পণ্ড করে দিলেন। আপনার একটু লজ্জাও হয় না কাশেম ভাই?’

শান্তার বাবা সার্কেল অফিসার (ডেভেলপমেন্ট) ছিলেন (পদটি ছিল এ যুগের ‘ইউএনও’ ধরনের)। রটনা এই যে, ভদ্রলোক ঘুষ খেতে পারঙ্গম। তাই কাশেম বলে, ‘দেখলি! ঘুষখোরের মাইয়া আমারে লজ্জা শিখাইতেছে। শোনো গো সুন্দরী। লজ্জা না। আমার হইতেছে দুঃখ। তাজা ডিমের ডবল দামে কিইনা আনছি পচা ডিম। পঞ্চাশটা ডিম আনছিলাম। আটটা ডিম আনইউজড রয়া গেছে। সেজন্যই দুঃখ। মূল্যবান দুই হালি জিনিসের অপচয় হয়া গেলরে বইন!’

জগতের কতরকম লীলা! কার দুঃখ কী কারণে যে জেগে ওঠে বুঝে ওঠা দায়। আমাদের প্রিয় বন্ধু কাশেমের দুঃখ জাগিয়ে দিয়েছিল আটটি পচা ডিম। শান্তা ব্যাখ্যা করল, যত কথাই বলা হোক না কেন ডিম নিক্ষেপ ঘটনা খুবই অশোভন কাজ হয়েছে। অতএব, নতুন যে তারিখে আবার নাটকের মঞ্চায়ন সে রাতে কাশেম যেন ক্যাম্পাসের ত্রিসীমানায় না থাকে।

আমরা বললাম, ‘শান্তা ঠিকই বলেছে। শান্তা ঠিকই বলেছে। শান্তা ঠিকই বলেছে।’ কাশেম বলে, ‘শান্তার চামচারা নিপাত যাক। এখন একটা নতুন ঘোষণা দিচ্ছি। কালচার্ডরা আপত্তি করায় ডিম নিক্ষেপ প্রোগ্রাম বাতিল করা হলো। ফ্রম নাউ অন কিরবিরিয়া যেখানে/টমেটো যাবে সেখানে। দুর্গন্ধে যাতে কারও বমি না আসে সেজন্য নাটকের মঞ্চে ছোড়া হবে ট..... মে..... টো।’

দুর্গন্ধ নেই, অস্বস্তি আছে। বস্তু যদি মানহরণের মতলবে নিক্ষিপ্ত হয়, তাতে তো পুলকিত হওয়ার কিছু থাকে না। জুতা হোক কিংবা পচা ডিম অথবা তাজা টমেটো ‘রসাতলে যা!’ উচ্চারণ করতে করতেই ওগুলো নিক্ষেপ করার নিয়ম। আমায় যদি কেউ জুতো ছুড়ে মারে তখন তো তাকে বলতে পারি না, ‘ধন্যবাদ মহাশয়।’ নিজেকে উদার চিত্তের মানুষ প্রমাণের জন্য বলতে পারি, অপমানিত হয়েছি সেজন্য দুঃখ নেই। দুঃখ হচ্ছে ওদের পায়ের দামি জুতোগুলো বরবাদ হয়ে গেল। ওদের তো ফের জুতো কিনতে হবে। এটা টাকার অপচয়।’

পচা ডিম ছুড়ে মারলে নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য কী যে বলব ভাবতে গেলে মাথার মগজে পচন ধরতে চায়। তবে আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে জনতা যদি কখনো টমেটো ছুড়ে মারে তাহলে নিজেকে মহান প্রতিপন্ন করবার জন্য যা বলতে হবে তা ছকে নিয়েছি। এই বুদ্ধি অর্জনে পরোক্ষ সহায়তাদানে আমি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের কাছে কৃতজ্ঞ।

হিলারি মিসরের আলেকজান্দ্রিয়া শহরে গিয়েছিলেন ২০১২ সালের ১৫ জুলাই। সেখানে তাঁর মোটর শোভাযাত্রার ওপর বিক্ষোভকারীরা টমেটো ছুড়তে ছুড়তে ‘মনিকা মনিকা’ আওয়াজ দেয়। হিলারি হিলারি না বলে ‘মনিকা মনিকা’ কেন? মনিকা ছিল হিলারির স্বামী প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের গোপন প্রেমিকা। দুজনের দৈহিক সম্পর্ক হয়েছে অনেকবার। এ অনৈতিক সম্পর্কের জন্য ক্লিনটন তাঁর দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়ে ক্ষমা পেয়েছেন।

কিন্তু মিসরীয়রা ক্লিনটনকে ক্ষমা করেননি। তাই তারা ‘ফিরে যাও হিলারি’ স্লোগান দিয়ে টমেটো ছুড়েছেন। এ বিষয়ে হিলারি মিসরে থাকতে কিছুই বলেননি। মিসর থেকে ইসরায়েলে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ‘টমেটো ছোড়ায় কষ্ট পাইনি। কষ্ট পেয়েছি ভালো টমেটোগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ায়।’

নিক্ষেপজনিত বেদনায় প্রাণকে স্বস্তি দেওয়ার কী সুন্দর পদ্ধতি! আমার অত্যন্ত প্রিয় মরহুম এক ব্যক্তি গান গাইতেন; তাঁর স্ত্রীও গায়িকা। স্ত্রীর ঘ্যানর ঘ্যানর সইবার ঈর্ষণীয় শক্তি তাঁর। টানা ত্রিশ মিনিট স্বামীকে বকাঝকা করে শ্রান্ত মহিলা গার্হস্থ্য কাজে মন দিতেন। পরে, দুপুরের খাবার খেতে দুজনে টেবিলে বসলে গায়িকা বলতেন, ‘তুমি কি সকালে আমার কথাবার্তায় দুঃখ পেয়েছ?’

‘না। না। সেজন্য দুঃখ পাইনি’ বলেন গায়ক, ‘দুঃখ আমার অন্য জায়গায়। গানের গলা সাধায় ব্যবহার না করে তোমার ঠোঁট দুটি ত্রিশ মিনিট ধরে বকাবকির মতো একটা বাজে কাজে ব্যবহার করছ। আহা, সম্পদের কি অপচয়!’

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।


আপনার মন্তব্য