সোমবার, ১২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা

একটি দিন-দুটি সন

বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম

একটি দিন-দুটি সন

১৯৭০-এর জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সাধারণ নির্বাচনে এ দেশের আপামর জনগণ নিরঙ্কুশভাবে বিজয়ী করেছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর দল আওয়ামী লীগকে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদে ১৬৯ আসনের মধ্যে ১৬৭টি এবং প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ প্রার্থীগণ। নির্বাচনের ফলাফলের পর বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ও শাসনতন্ত্র যাতে রচিত হতে না পারে সে লক্ষ্যে শুরু হয় পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বহুমুখী ও রূপী ষড়যন্ত্র ও তৎপরতা। ৩ মার্চ ’৭১ আহূত জাতীয় পরিষদের অধিবেশন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কর্তৃক স্থগিত ঘোষণার মধ্য দিয়ে ষড়যন্ত্রের নগ্ন রূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। পাকিস্তানি জান্তার এরূপ পদক্ষেপে বাংলার মানুষ ক্ষোভে-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে; শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে দুনিয়া কাঁপানো ও সাড়া জাগানো অসহযোগ আন্দোলন। ৭ মার্চ ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে) বঙ্গবন্ধু লাখ লাখ মানুষের সামনে ঘোষণা করলেন বাঙালির ‘মুক্তি’ ও ‘স্বাধীনতা’ সংগ্রামের। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে শত্রু বাহিনীকে মোকাবিলা করার প্রস্তুতি গ্রহণের আহ্বান জানালেন। ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নীলনকশা অনুযায়ী ঢাকাসহ সারা দেশে ঘুমন্ত নিরস্ত্র নিরীহ বাঙালি হত্যাযজ্ঞে নেমে পড়ে। নিরস্ত্র বাঙালি প্রতিরোধে এগিয়ে আসে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে। ২৬ মার্চ ’৭১-এর প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের আগ মুহূর্তে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন মাধ্যমে।

বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার ধারাবাহিকতায় রচনা করেন স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র। এই ঘোষণাপত্রই মূলত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আইনগত কাঠামোর ভিত্তি প্রদান করে। ঘোষণাপত্রের প্রথম অংশে ঘোষণার প্রেক্ষাপট হিসেবে- একটি শাসনতন্ত্র রচনার অভিপ্রায় ’৭০-এর নির্বাচন, নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়, ৩ মার্চ আহূত জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্বেচ্ছাচারী ও বেআইনিভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তাদের প্রতিশ্রুতি পালনের পরিবর্তে বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলাকালে একটি অন্যায় ও বিশ্বাস ঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা, উদ্ভূত পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার অর্জনের আইনানুগ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা এবং বাংলাদেশের অখ-তা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান, পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর বর্বর ও নৃশংস যুদ্ধ পরিচালনাকালে দেশের অসামরিক ও নিরস্ত্র জনসাধারণের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও নজিরবিহীন নির্যাতনের বিষয়সমূহ বর্ণনা করা হয়। প্রেক্ষাপট হিসেবে আরও উল্লেখ করা হয় যে, ‘পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী অন্যায় যুদ্ধ, গণহত্যা ও নানাবিধ নৃশংস অত্যাচার চালিয়ে বাংলাদেশের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের একত্র হয়ে একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করতে ও নিজেদের সরকার গঠন করতে সুযোগ করে দিয়েছে এবং জনগণ তাঁদের বীরত্ব, সাহসিকতা ও বিপ্লবী কার্যক্রমের দ্বারা বাংলাদেশের ভূখন্ডের ওপর তাঁদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছেন।’

ঘোষণাপত্রে উপরোক্ত প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী বাংলাদেশের জনগণ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের পক্ষে যে রায় দিয়েছেন, তা উল্লেখ করে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা দেওয়া হয় যে, “আমরা বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী জনগণ কর্তৃক আমাদিগকে প্রদত্ত কর্তৃত্বের মর্যাদা রক্ষার্থে নিজেদের সমন্বয়ে যথাযথভাবে একটি গণপরিষদরূপে গঠন করলাম এবং পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা আমাদের পবিত্র কর্তব্য বিবেচনা করে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করলাম এবং এতদ্বারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ইতিপূর্বে ঘোষিত স্বাধীনতা দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করছি এবং এতদ্্দ্বারা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছি যে, শাসনতন্ত্র প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি ও সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপ-রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন।” ঘোষণাপত্রে আরও উল্লেখ করা হয় যে, রাষ্ট্রপ্রধান প্রজাতন্ত্রের সশস্ত্র বাহিনীসমূহের সর্বাধিনায়ক এবং ক্ষমা প্রদর্শনসহ সর্বপ্রকার প্রশাসনিক ও আইন প্রণয়নের ক্ষমতার অধিকারী হবেন এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী ও প্রয়োজন বোধে মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্য নিয়োগ করতে পারবেন। রাষ্ট্রপ্রধানকে করধার্য, অর্থব্যয়, গণপরিষদের অধিবেশন আহ্বান ও মুলতবির ক্ষমতা দেওয়া হয় এবং আইনানুগ ও নিয়মতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য অন্য সব ক্ষমতাও অর্পণ করা হয়। ঘোষণাপত্রে আরও উল্লেখ করা হয় যে, রাষ্ট্রপ্রধান কোনো কারণে না থাকেন অথবা কাজে যোগদান করতে না পারেন অথবা তাঁর দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে যদি অক্ষম হন, তবে রাষ্ট্রপ্রধানকে প্রদত্ত সব ক্ষমতা ও দায়িত্ব উপ-রাষ্ট্রপ্রধান পালন করবেন। জনপ্রতিনিধিরা ঘোষণাপত্রে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন যে, ‘বিশে^র একটি জাতি হিসেবে এবং জাতিসংঘের সনদ মোতাবেক আমাদের ওপর যে দায়িত্ব ও কর্তব্য আরোপিত হয়েছে তা আমরা যথাযথভাবে পালন করব এবং আমাদের স্বাধীনতার এ ঘোষণা ১৯৭১ সনের ২৬ মার্চ থেকে কার্যকরী বলে গণ্য হবে।’

অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ওই দিনেই ‘লজ অব কনটিনুয়্যান্স এনফোরসমেন্ট অর্ডার ১৯৭১’ অর্থাৎ আইনের ধারাবাহিকতা বা বলবৎকরণ আদেশ জারি করেন। ওই আদেশে উল্লেখ করা হয় যে, ঘোষণাপত্র সাপেক্ষে ২৫ মার্চ ১৯৭১ তারিখে বাংলাদেশে বিদ্যমান সব আইন কার্যকর থাকবে; সিভিল, মিলিটারি, বিচার বিভাগ ও কূটনৈতিক বিভাগে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ যারা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছেন-করবেন তারা নিজ নিজ পদ থেকে একই শর্তে দায়িত্ব পালন করবেন। ওই আদেশের কার্যকারিতা দেওয়া হয় ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে। ১৭ এপ্রিল ’৭১ মুজিবনগরে (মেহেরপুরে) বাংলাদেশের প্রথম সরকার, যা মুজিবনগর সরকার হিসেবে পরিচিতি পায়, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিনিধিবৃন্দ ও গণমাধ্যম কর্মীদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্বগ্রহণ করেন। এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে, অনেকের একটি ধারণা আছে যে, ১৭ এপ্রিল ’৭১ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রচিত হয়েছিল এবং মুজিবনগরে গঠিত সরকার ছিল অস্থায়ী কিংবা প্রবাসী। মূলত বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা ১০ এপ্রিল ’৭১ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রচনা করেন নিজেদের গণপরিষদের সদস্য গণ্য করে। ১০ এপ্রিল রচিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রই হলো বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সাংবিধানিক দলিল ও ভিত্তি এবং এরই ভিত্তিতে ১৭ এপ্রিল ’৭১ মুজিবনগরে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সরকার প্রতিষ্ঠার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। ওই সরকারকে অস্থায়ী বা প্রবাসী সরকার বলার কোনো সুযোগ নেই। ’৭১-এর মহান স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ আইনানুগভাবে গঠিত সরকারের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামরিক কর্তৃত্বে ও নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়েছিল। এই সরকারই সামরিক অভিযান-যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে এবং বেসামরিক প্রশাসন পরিচালনার জন্যও ১১টি জোন সৃষ্টি করে। সব সেক্টর কমান্ডারগণ সরকার কর্তৃক মনোনীত ছিলেন এবং তাদের আনুগত্য ছিল সরকারের প্রতি।

১০ জানুয়ারি ১৯৭২ বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে, যেখানে তাঁর জন্য তৈরি করা হয়েছিল ফাঁসির মঞ্চ, ফিরে এসেছিলেন তাঁর স্বপ্নের স্বাধীন স্বদেশ- ‘বাংলাদেশে’।

১১ জানুয়ারি ১৯৭২ অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান কর্তৃক জারি করা হয় ‘দ্য প্রভিশনাল কন্সটিটিউশন অব বাংলাদেশ অর্ডার, ১৯৭২’। ফলে, নতুন সরকার ব্যবস্থা চালু হয়। ওই আদেশের বিধান অনুযায়ী ১২ জানুয়ারি ’৭২ রাষ্ট্রপ্রধান বঙ্গবন্ধু, প্রধান বিচারপতি হিসেবে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে শপথ বাক্য পাঠ করান। পরবর্তীতে একই দিন প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি হিসেবে আবু সাঈদ চৌধুরীকে শপথ বাক্য পাঠ করান এবং নতুন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু-কে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ বাক্য পাঠ করান।

১৯৭২ সালের ১০ এপ্রিল দিনটিও আমাদের জাতীয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ওই দিন গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত পরিষদনেতা বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবে পরিষদের প্রবীণতম সদস্য মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগিশ বৈঠকে সভাপতিত্ব ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনা করেন। তিনি প্রথমে নিজেই নিজের শপথ বাক্য পাঠ করেন এবং পরবর্তীতে পরিষদের অন্যান্য সদস্যদের শপথ পাঠ করান। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তাবে এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামের সমর্থনে শাহ আবদুল হামিদ স্পিকার এবং তাজউদ্দীন আহমদের প্রস্তাবে এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীর সমর্থনে মুহম্মদুল্লাহ ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হন সর্বসম্মতভাবে। পরিষদনেতা বঙ্গবন্ধু নবনির্বাচিত স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারকে অভিনন্দন জানিয়ে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্বাধীনতা-সংগ্রামে অংশগ্রহণ করে বাংলার যে লাখ লাখ মানুষ আত্মাহুতি দিয়েছেন তাঁদের মহান আত্মার প্রতি পরিষদের শ্রদ্ধা এবং তাঁদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করে একটি শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করেন। শোক প্রস্তাবটি গৃহীত হলে শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। এরপর সৈয়দ নজরুল ইসলাম গণপরিষদে ‘স্বাধীনতা’ সম্পর্কীয় একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবের ওপর সদস্যবৃন্দের আলোচনা শেষে প্রস্তাবটি গৃহীত হয় নিম্নোক্তভাবে :

“বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ঐতিহাসিক স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলাদেশের যে বিপ্লবী জনতা, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক, বুদ্ধিজীবী, বীরাঙ্গনা, প্রতিরক্ষা বিভাগের বাঙালি, সাবেক ইপিআর, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ ও রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের রক্ত দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জন করেছেন-আজকের দিনে বাংলাদেশের জনগণের ভোটে নির্বাচিত বাংলাদেশ গণপরিষদ সশ্রদ্ধচিত্তে তাঁদের স্মরণ করছে।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার যে ঘোষণা করেছিলেন এবং যে ঘোষণা মুজিবনগর থেকে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বীকৃতি ও সমর্থিত হয়েছিল এই সঙ্গে গণপরিষদ তাতে একাত্মতা প্রকাশ করছে।

স্বাধীনতা সনদের মাধ্যমে যে গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল আজ সে সনদের সঙ্গেও এ পরিষদ একাত্মতা ঘোষণা করছে।

এক্ষণে এই পরিষদ বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার সেই সব মূর্ত আদর্শ যথা, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা, যা শহীদান ও বীরদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছিল, তার ভিত্তিতে দেশের জন্য একটি উপযুক্ত সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করছে।”

১০ এপ্রিল ’৭২-এ গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন গৃহীত উপরোক্ত প্রস্তাবটি থেকে এটা সুস্পষ্ট যে, গণপরিষদ- বঙ্গবন্ধু ২৬ মার্চ ’৭১ স্বাধীনতার যে ঘোষণা করেছিলেন যা ১০ এপ্রিল ১৯৭১ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বীকৃত ও সমর্থিত হয়েছিল, ১০ এপ্রিল ’৭১-এর স্বাধীনতা সনদ বা ঘোষণাপত্র এবং জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে যে গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল, তার সঙ্গে গণপরিষদ একাত্মতা ঘোষণা করে। সর্বোপরি গণপরিষদ বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার মূর্ত আদর্শ জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা, যা শহীদান ও বীরদের স্বাধীনতা-সংগ্রামে আত্মত্যাগে উদ্বুদ্ধ করেছিল, তার ভিত্তিতে একটি উপযুক্ত সংবিধান প্রণয়নের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল।

সেদিন প্রস্তাবের ওপর আলোচনা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু দেশের সংবিধান হিসেবে কিসের ভিত্তিতে রচিত হবে সে সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দিয়ে বলেছিলেন- “জনাব স্পিকার সাহেব, আজ স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি, এর সঙ্গে সঙ্গে আমি চারটি স্তম্ভকে স্মরণ করতে চাই, যে স্তম্ভকে সামনে রেখে আমাদের দেশের সংবিধান তৈরি করতে হবে। জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। আমরা গণতন্ত্র দিতে চাই এবং গণতন্ত্র দিতেই আজ আমরা এই পরিষদে বসেছি। কারণ, আজ আমরা যে সংবিধান দেব, তাতে মানুষের অধিকারের কথা লেখা থাকবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ জনগণের জানমাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে না পারে। এমন সংবিধানই জনগণের জন্য পেশ করতে হবে। আজ এখানে বসে চারটি স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য এমন সংবিধান রচনা করতে হবে, যাতে তাঁরা দুনিয়ার সভ্য দেশের মানুষের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।”

৪ নভেম্বর ১৯৭২ গণপরিষদে সংবিধান গৃহীত হয়। বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনার আলোকে গণপরিষদে সংবিধান রচিত হয় জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা-এই চার নীতির ভিত্তিতে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫০-এ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ১৯৭১ এর ভাষণ, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্য রাত শেষে অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক প্রদত্ত স্বাধীনতার ঘোষণা এবং ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার কর্তৃক জারিকৃত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি-সংগ্রামের ঐতিহাসিক ভাষণ ও দলিল উল্লেখে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ থেকে ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর অর্থাৎ সংবিধান প্রবর্তন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়কালের জন্য ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলি হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং ওই ভাষণ ও দলিলসমূহ সংবিধানে পঞ্চম, ষষ্ঠ ও সপ্তম তফসিল হিসেবে সংযোজিত হয়েছে।

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে একাত্তর এবং বাহাত্তর উভয় সালের ১০ এপ্রিল দিনটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন। সে কারণে দিনটি সম্পর্কে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে প্রয়োজন সব মহলের উদ্যোগ।

লেখক : বিচারপতি, হাই কোর্ট বিভাগ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।

এই রকম আরও টপিক