শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:১৪

এ যেন মৃত্যুর মিছিল

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

এ যেন মৃত্যুর মিছিল

শেষ পর্যন্ত হেফাজত নেতা মামুনুল হককে গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন সরকার কী করবে দেখার বিষয়। তবে হেফাজতকে তলে তলে অতটা মাথায় তুলে সরকার যে তেমন ভালো করেনি তা মনে হয় তারা বুঝতে পেরেছে।

মৃত্যু জীবজগতের এক চরম সত্য। মৃত্যুর চাইতে পরম সত্য আর কিছু নেই। যে জন্মাবে সে মৃত্যুবরণ করবে এর থেকে কারও রেহাই নেই। কিন্তু কখনো কখনো কোনো কোনো মৃত্যু বেশ নাড়া দেয়। এ সপ্তাহটা ছিল আমার জন্য এক মৃত্যুমিছিল। ১১ এপ্রিল কাদেরিয়া বাহিনীর একমাত্র পাঠান যোদ্ধা মমতাজ খান পাঠান ইহলোক ত্যাগ করেছে। তার পূর্ণ বয়স হয়েছিল। কিন্তু বড় অবহেলা ও দুঃখ-দারিদ্র্য নিয়ে তাকে জগৎ ছাড়তে হয়েছে। সত্তরের দশকে মমতাজ খান পাঠান ছিল এক পাতার ব্যবসায়ী। সে সময় লাখ লাখ টাকার কারবার ছিল তার। মুক্ত এলাকার মধ্যেই ছিল মমতাজ খানের পাতার কারবার। প্রথম দিনই তার লোকজন মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করেছিল। সে তখন ঢাকায় ছিল। কদিন পর সেও একাত্মতা ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যে কারণে বঙ্গবন্ধু তাকে ভীষণ ভালোবাসতেন, আদর করতেন। একমাত্র পাঠান মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিঠি লিখেছেন। কতবার দেখা দিয়েছেন তার লেখাজোখা নেই। বাংলাদেশের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার কারণে পাকিস্তানে সে বেইমান, বিশ্বাসঘাতক, দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত, সব সম্পদ থেকে বঞ্চিত। এখনো খাইবারের কাছে তাদের পরিবারের কোটি কোটি টাকার জমিজমা আছে, আছে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্য। এতসব থাকতেও সে বাংলাদেশে নাম-গোত্রহীন অসহায়ের মতো পরলোকে চলে গেল, কোনো সম্মান পেল না।

বীরবিক্রম সবুর খান একজন বর্ণাঢ্য চরিত্রের মানুষ। একেবারে ছোটবেলায় চাঁদপুরের মতলব থেকে টাঙ্গাইলে এসেছিল। কীভাবে যেন ভাতকুড়ার আমজাদ খাঁর হাতে পড়ে। সে তাকে সন্তানের মতো লালনপালন করত। তারপর যায় হুজুর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কাছে। কর্মজীবনে চমৎকার রডমিস্ত্রি ছিল। অমন প্রতিভাবান রডমিস্ত্রি আমার জীবনে দেখিনি। পাস করা বিএসসি ইঞ্জিনিয়াররাও তার সঙ্গে পেরে উঠত না। স্বাধীনতার পর আমরা ঢাকা-টাঙ্গাইলের বিধ্বস্ত সেতুগুলো মেরামত করছিলাম। পাকুল্যা ব্রিজের গার্ডারের রড বাইন্ডিং নিয়ে চরম জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। কাজ পরিদর্শনে একবার রোডস অ্যান্ড হাইওয়েজের চিফ ইঞ্জিনিয়ারসহ কয়েকজনকে নিয়ে তখনকার যোগাযোগ সচিব আবদুস সামাদ পাকুল্যা এসেছিলেন। ইঞ্জিনিয়াররা যখন আবদুস সবুর খান বীরবিক্রমের ভুল ধরেন তখন সে ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। যোগাযোগ সচিব সামাদ সাহেবও বলেকয়ে তাকে শান্ত করতে পারেন না। আমি তখন নকশা পড়তে জানতাম না। চিফ ইঞ্জিনিয়ার বলছিলেন, রড কম বাঁধা হয়েছে। সবুর খানের সাফ জবাব, নকশামতো বাঁধায় কোনো ভুল হয়নি। সে এক বিরাট উত্তেজনা। যে সবুর আমার মুখের দিকে তাকিয়ে কখনো কথা বলেনি চিফ ইঞ্জিনিয়ার ও সচিবের দু-চারটি খোঁচামারা কথায় সে এতটা উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল যে আমারও তাকে সামাল দেওয়া মুশকিল হয়ে পড়েছিল। আসলে তাদের খোঁচামারা সত্যিই কঠিন ছিল। শিক্ষিত ভদ্রলোকেরা বলেছিল, ‘এক অক্ষর লেখাপড়া জানে না আমাদের সঙ্গে ডিজাইন নিয়ে তর্ক করে! এমন অশিক্ষিত লোক নিয়ে কাজ করাই ঠিক নয়। এসব লোক বাদ দিয়ে দিন।’ সবুরের ব্যবহারে আমিও কিছুটা মর্মাহত হয়েছিলাম। কিন্তু সে যে ভুল তা মনে হচ্ছিল না। গেল তিন-চার দিন। যোগাযোগ সচিব সামাদ সাহেব হঠাৎই ফোন করেন,

-স্যার, আপনার টাঙ্গাইলের বাড়িতে খেতে আসতে চাই।

- বেশ তো, আসুন। অসুবিধা কী?

- স্যার, কিছু মনে না করলে এ দাওয়াতে সবুর খান সাহেবকেও রাখবেন।

- ঠিক আছে, রাখব।

চার বা পাঁচ দিন পর তাঁরা প্রায় ১২ জন এসেছিলেন। সামাদ সাহেবের সঙ্গে দুজন যুগ্মসচিব, চিফ ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে আর সব ইঞ্জিনিয়ার। খেতে বসে সামাদ সাহেব বলছিলেন, ‘স্যার, সবুর খান সাহেবও যদি আমাদের সঙ্গে বসেন তাহলে ভালো হয়। সবুর খান ছিল আমার সন্তানের মতো। বলার সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ে। আমাদের পক্ষে আবু মোহাম্মদ এনায়েত করীম, রঞ্জিতকান্ত সরকার, বল্লার নজরুল, কাউলজানীর আবদুল হালিম, চাপায় বাঙাল মোয়াজ্জেম হোসেন খান আরও কয়েকজন। মনে হয় টেবিলে ৫০ জনের মতো হবে। খাওয়ার শুরুতে সামাদ সাহেব বলেছিলেন, ‘স্যার, অনুমতি দিলে খাবার আগেই দু-চারটা কথা বলতে চাই।’ বলুন। ‘আমাদের আসার আর কোনো কারণ নেই। সেদিন আমরা সবুর খান সাহেবকে যে খারাপ খারাপ কথা বলেছিলাম তার জন্য মাফ চাইতে এসেছি। ডিজাইন অনুসারে সবুর খান সাহেবই ঠিক, আমরা ভুল। শিক্ষার বড়াই করেছিলাম। আমরা সেজন্য তার কাছে মাফ চাইতে এসেছি। আশা করি তিনি আমাদের মাফ করে আপনার এ খাবার খাওয়ার সুযোগ করে দেবেন।’ সামাদ সাহেবের কথা শুনে সবুর যেমন গর্বিত হয়েছিল তেমনি লজ্জিত হয়ে যা বলেছিল তা অনেক জ্ঞানী-গুণী-শিক্ষিতের পক্ষেও বলা সম্ভব না।

এই সবুর খানকে আমি চিনতাম না। মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় টাঙ্গাইল সার্কিট হাউস আক্রমণের সময় বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকী সবুর খানকে আমার কাছে এনেছিলেন। এরপর দিঘুলিয়ার গুন্ডা নজরুলের এক ফাঁকা গুলিতে টাঙ্গাইলে কেয়ামত হয়ে গিয়েছিল। তার পরও সার্কিট হাউস দখল ও অন্যান্য কাজে সবুর খান ছিল সবার আগে। সাটিয়াচরা যুদ্ধে পিছিয়ে পড়ার পর অস্ত্রসহ সবুর খানকে নিয়ে সখীপুরের মরিচা-বাঘেরবাড়ী হয়ে বড়চওনা ইদ্রিসের কাছে অস্ত্র রেখেছিলাম। তারপর হালুয়াঘাট-ফুলপুর-ময়মনসিংহ-জামালপুর নানা জায়গা ঘুরে সবাইকে বিদায় দিয়ে একমাত্র সিলেটের ফারুককে নিয়ে উপলদিয়ার ফজলুদের বাড়িতে উঠেছিলাম। সেখান থেকে আবার চর-ভর-পাহাড়ুজঙ্গল নানা জায়গা ঘুরে যখন সখীপুর স্কুলমাঠে প্রথম মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ করি তার দুই দিন পর বাসাইলের বর্নিতে সবুর খান এসে শামিল হয়। এমন সাহসী তীক্ষè বুদ্ধিসম্পন্ন আর কোনো দ্বিতীয় যোদ্ধা বা কমান্ডার আমি দেখিনি। ওরপর আমরা চারানে হানাদারদের ওপর আচমকা আক্রমণ করে বিরাট সাফল্য অর্জন করি। এরপর বল্লা যুদ্ধ। সেখানে সে অভাবনীয় সাহসের পরিচয় দেয়। সবার আগে নদী সাঁতরে আবদুস সবুর আর আবদুল মালেক পাকিস্তানি হানাদারদের লাশ আনে। এরপর যুদ্ধ চলতে থাকে। কমান্ডার বলতে সবুর খান বীরবিক্রম আর সাহসী যোদ্ধা বলতে আবদুল্লাহ বীরপ্রতীক। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা-ধলেশ্বরীর পানি অনেক গড়িয়ে যায়। সেটা যুদ্ধের প্রায় শেষ পর্যায়ে। সবুর খান তখন কয়েক শ যোদ্ধার কমান্ডার। ২ ডিসেম্বর নাগরপুরে হানাদার ঘাঁটি আক্রমণ করে দখল নিতে পারিনি। মাঝখানে আমাদের দল মনে করে হানাদার দলের সামনে পড়েছিলাম। যখন ভুল ভাঙল তখন আমাদের আর ফেরার পথ ছিল না। দৌড়ে পিছিয়ে আসতে গিয়ে অথই পানিতে পড়ে গিয়েছিলাম। আমার হাতে ছিল ভারী ব্রিটিশ এলএমজি। এলএমজি নিয়ে পার হতে পারছিলাম না। বারবার ডুবে যাচ্ছিলাম। সবুর বুঝতে পেরে চিৎকার করছিল, ‘স্যার, আমি বুঝছি, ছেড়ে দেন, ছেড়ে দেন। চলে আসেন।’ নিজেকে বাঁচাতে এলএমজি ছেড়ে দিয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধে আর কখনো হাতের অস্ত্র ছেড়ে দিইনি। অস্ত্র ছেড়ে সন্তানহারার মতো শোকে শোকাহত হয়েছিলাম। কিন্তু আর দু-এক মিনিট দেরি হলে সবুরসহ আরও ১০-১২ জন মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে অঘোরে প্রাণ হারাতাম। যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে ২-৩ মাইল পেছনে এসে ক্লান্ত-শ্রান্ত দেহে এলিয়ে পড়েছিলাম। সকাল থেকে খাওয়া হয়নি। ক্ষুধায় ছিলাম কাতর। পাশে ঘরবাড়ি থেকে মরিচ-পিঁয়াজ দিয়ে পান্তাভাত এনে দিলে আমি তা খাচ্ছি না দেখে সবুর বলেছিল, ‘স্যার, আপনি ভাত মুখে দেন। আমি রাতে আপনার এলএমজি এনে দেব।’ অনেক পীড়াপীড়ি করেও সেদিন সবুর খাওয়াতে পারেনি। কিন্তু রাত ৯টার মধ্যেই সে সেই এলএমজি এনে দিয়েছিল। সবুর কখনো কথার খেলাপ করেনি। ওকে শেষ দেখতে গিয়েছিলাম চার-পাঁচ মাস আগে। কী যে খুশি হয়েছিল বলার মতো নয়। এবার টাঙ্গাইল জেলা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ ২৪ জানুয়ারি ’৭২ বঙ্গবন্ধুর হাতে কাদেরিয়া বাহিনীর অস্ত্র জমাদানের বর্ষ পালন করছিল। সেখানে যেমন টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি ফজলুর রহমান খান ফারুক প্রধান অতিথি ছিলেন, তেমনি সবুর খান বীরবিক্রম সে অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেছিল। সবুর চলে গেল। ১৩ তারিখ টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী স্কুলমাঠে তার নামাজে জানাজায় শরিক হতে পারিনি। যে ছিল আমার অস্তিত্ব, শরীরের অংশ। কী দুর্ভাগ্য করোনার কারণে তার জানাজায় শরিক হতে পারলাম না! স্ত্রী এবং বেশ কয়েকজন ছেলেমেয়ে রেখে সবুর চলে গেছে। তারা শান্তিতে সবাই মিলেমিশে বসবাস করুক আর আল্লাহ তাকে বেহেশতবাসী করুন এ কামনাই করি।

আরেক প্রিয় পরমহিতৈষী আবদুল মতিন খসরু করোনায় আক্রান্ত হয়ে সেদিন পরপারে চলে গেছেন। আবদুল মতিন খসরুর সঙ্গে কত স্মৃতি, কত কথা। ’৭৫-এর আগে মতিন খসরুকে আমি জানতাম না, ’৯০-এ দেশে ফেরার পর তাঁর নির্বাচনী এলাকা বুড়িচংয়ে বেশ কয়েকবার সভা করতে গেছি। আবদুল মতিন খসরু লতিফ ভাইয়ের কর্মী ছিলেন। তাঁকে খুব মান্য করতেন। ’৯৬-এ আইনমন্ত্রী হলে অ্যাডভোকেট সোহরাওয়ার্দীকে টাঙ্গাইলের পিপি করতে মতিন খসরুকে বলেছিলাম। প্রবীণ জননেতা মান্নান ভাই হয়তো অন্য কারও কথা বলেছিলেন। মতিন খসরু মান্নান ভাইকে বলেছিলেন, ‘লিডার, আপনার কথা অমান্য করার ক্ষমতা আমার নেই। কিন্তু টাঙ্গাইলের পিপির জন্য এমন একজন অনুরোধ করেছেন একমাত্র নেত্রী না বললে আমি তাঁর অনুরোধ ফেলতে পারব না।’ অনেক সময় অনেক জায়গায় কর্মসূচিতে গেছি। ভীষণ আন্তরিক ছিলেন, হাস্যোজ্জ্বল ছিলেন। আওয়ামী লীগ ছেড়ে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গঠনের পরও অনেকবার যোগাযোগ হয়েছে। এমনকি তার বকশীবাজারের বাড়িতেও গেছি। তার স্ত্রী অনেক গরু পালতেন। সব সময় দুধে ভরা থাকত তাঁর বাড়ি। হাঁস-মুরগির অভাব ছিল না। কী যে যত্ন করে খাওয়াতেন বলে বোঝাতে পারব না। হাই কোর্টে কতবার দেখা হয়েছে, তার চেম্বারে না বসিয়ে ছাড়তেন না। রুমিন ফারহানা তখন তার সহকারী। অলি আহাদ ভাইয়ের মেয়ে, বড় সুন্দর ব্যবহার। সর্বশেষ আবদুল মতিন খসরু যখন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি নির্বাচিত হন তার দু-এক দিন পর ফোন করেছিলাম। তারপর প্রায় পাঁচ-সাত দিন একনাগাড়ে বারবার ফোন করেছি। কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি। পরে খবর পেলাম করোনায় আক্রান্ত। তখন মনে হলো এজন্যই হয়তো সাড়া পাইনি। একজন ভালো লোক, নির্ভর করার মতো একজন মানুষ চলে গেলেন। আল্লাহ তাকে বেহেশতবাসী করুন, তার পরিবার-পরিজনকে এ শোক সইবার শক্তি দিন।

বাংলাদেশের চিত্রজগতের শ্রেষ্ঠ নায়িকা, মিষ্টিমুখ কবরী সরোয়ার চলে গেল। ’৬৪ সালে সুতরাং ছবিতে সুভাষ দত্ত এনেছিলেন। নাম ছিল মীনা পাল। অসাধারণ সাড়া ফেলেছিল তখনকার পূর্ব পাকিস্তানের সিনেমাজগতে। তাকে নিয়ে অনেক মূল্যায়ন শুনছি, অনেক কথা শুনছি। ভালো লেগেছে সবাই যে তাকে ভুলে যায়নি। কিন্তু তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অবদান আমার চোখে মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা অনন্যসাধারণ। অনেকে হয়তো ভুলেই গেছেন মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় আকাশবাণী থেকে কলকাতা পাকিস্তান ডেপুটি হাইকমিশনার হোসেন আলীর স্ত্রী এবং তখনকার দিনের শ্রেষ্ঠ নায়িকা কবরীর এক হৃদয়গ্রাহী সাক্ষাৎকার প্রচার হয়েছিল। সেখানে কবরীর কান্না কোনো অভিনয় ছিল না। তার কান্না সারা জাতিকে নাড়া দিয়েছিল, আমাকেও দিয়েছিল। সে কান্নায় ছিল শক্তি, সে কান্নায় ছিল দেশপ্রেম। সারা পৃথিবী কবরীর সে কান্নার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের ঢাকার বুকে নির্মম হত্যাযজ্ঞের কথা জেনেছিল। সারা ভারত বিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। আমার চোখে কবরীর সেটাই ছিল শ্রেষ্ঠ কর্ম। কবরীর সঙ্গে দেখা হবে পরিচয় হবে কখনো ভাবিনি। কিন্তু কী আশ্চর্য! স্বাধীনতার পর আমার ছোটবোন শুশুর সঙ্গে ওরও প্রগাঢ় বন্ধুত্ব হয়। ধীরে ধীরে পরিবারের সদস্যদের মতো হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর আমি যখন নির্বাসনে তখন কবরীকে ছোটবোন রহিমা-শুশু-শাহানা থেকে আলাদা মনে হতো না। কবরীকেও দেখতাম আমার ছোট বোনেরা কখনোসখনো আমাকে জড়িয়ে ধরে যে আনন্দ পায় ওও পেত। সর্বশেষ দেখা হয়েছিল নারায়ণগঞ্জের এক বিয়ের অনুষ্ঠানে। আমি বেরিয়ে আসছিলাম কবরী কেবলই ঢুকছিল। গাড়ি থেকে নেমে আমাকে দেখেই পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে জড়িয়ে ধরেছিল ছোট বোনদের মতো। কেমন আছি, শরীর কেমন, ছেলেমেয়েরা কেমন, ভাবী কেমন আছে এক নিঃশ্বাসে বলেছিল। কবরীর স্বামী বাবু সরোয়ার, সেও ছিল আমার চরম ভক্ত। এক কথায় জোহা পরিবারকে আমরা যতটা ভালোবেসেছি, নাসিম-নাসিমের স্ত্রী পারভীন-শামীম অন্যরা সবাই আমাকে তার চাইতে বেশি ভালোবেসেছে। কবরীর মৃত্যু আমাকে অনেকটাই নাড়া দিয়েছে। আল্লাহ ওকে বেহেশবাসী করুন, নিকটজনদের এ শোক সইবার শক্তি দিন।

সেদিন আবার টাঙ্গাইলের একসময়ের বিএনপি সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান বুলবুল হঠাৎই পরপারে চলে গেছে। জেলা সদর রোডে বুলবুলের বাড়ি। একটা বিল্ডিং তুলে ভাড়া দিয়েছে। মাঝেমধ্যে বাড়ির সামনে বসে থাকত। দেখা হলে ছুটে এসে সালাম দিত। বানিয়ারার বুলবুল আমাদের আত্মীয়ও হয়। আমার থেকে অনেক ছোট, কিন্তু চলে গেল।

সেদিন ঘুম থেকে উঠেই খবর পেলাম বীর মুক্তিযোদ্ধা নারিন্দার বাদশা চলে গেছে। রুমনের বাবা বাদশা মুক্তিযুদ্ধের সময় কম করে ১৫ বার ভারতের মানকার চরে গেছে, যেত আমাদের চিঠি নিয়ে, ভারত থেকে আসত অস্ত্র-গোলাবারুদ আর মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে। ভারতের সঙ্গে মূলত যোগাযোগের সূচনা করেছিল আমেরিকাপ্রবাসী ড. নুরুন্নবী, বাছেত সিদ্দিকী এমপি, সরিষাবাড়ীর লুৎফর ও পারদিঘুলিয়ার নুরুল ইসলাম। জনাব নুরুল ইসলাম, মোয়াজ্জেম হোসেন খান আর এ বাদশাই ভারত থেকে সব খবরাখবর, গোলাবারুদ আনত। যদিও কাদেরিয়া বাহিনী আগস্টে হানাদারদের অস্ত্রবোঝাই জাহাজ দখল করে বিপুল অস্ত্রভান্ডার গড়ে তুলেছিল। তার পরও বাদশা ছিল ভারতে আমাদের দূত। তাকে আমরা যুদ্ধের সময়ই ‘বিদেশমন্ত্রী’ বলে ডাকতাম। সেই যৌথ বাহিনীর সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একমাত্র সদস্য ক্যাপ্টেন পিটারকে নিয়ে এসেছিল। ক্যাপ্টেন পিটার অসাধারণ ভূমিকা রেখেছে মুক্তিযুদ্ধে। দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত হয়ে বলতে গেলে একেবারে অর্ধাহারে-অনাহারে বাদশা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে। আল্লাহ তার বিদেহী আত্মার শান্তি প্রদান করুন এবং তাকে বেহেশতবাসী করুন।

প্রথম রোজার দিন আমাদের এক দলীয় নেতা ফুলবাড়িয়ার ডা. আবদুর রাজ্জাক রাজা ইন্তেকাল করেছে। আগের দিন বিকালেও দলীয় কর্মীদের নিয়ে চা খেয়েছে, আলাপ-আলোচনা করেছে। এমনকি রোজা রাখার জন্য সাহরিও খেয়েছিল। অথচ সকালে সে আর নেই। মানুষের কী জীবন! এক মুহূর্তে যার ভরসা নেই, তার আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে মানুষকে কষ্ট দেওয়া, নিজেকে হোমরা-চোমরা বিরাট একটা কিছু ভাবা মোটেই ভালো নয়। আল্লাহ রব্বুল আলামিনের কাছে প্রার্থনা করি- ডা. আবদুর রাজ্জাক রাজা মিয়াকে যেন বেহেশতবাসী করেন এবং তার পরিবারকে এ শোক সইবার শক্তি দেন।

                লেখক : রাজনীতিক।

               www.ksjleague.com