শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৩ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১২ জুলাই, ২০২১ ২৩:২৭

শতবর্ষে কেমন হওয়ার কথা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন

শতবর্ষে কেমন হওয়ার কথা ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
Google News

পূর্ববঙ্গের ঢাকায় পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর উচ্চশিক্ষার জন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই উত্থাপিত হতে থাকে। বোধগম্য কারণেই মুসলিম নবাব, জমিদার, উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দই এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য উচ্চকণ্ঠ ছিলেন। এঁদের মধ্যে স্যার নবাব সলিমুল্লাহ, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হুদা প্রমুখ অসাম্প্রদায়িক ও উদারমনা হলেও অধিকাংশই ‘বিশ্ববিদ্যালয়’ বলতে কী বোঝায় তা যেমন বুঝতেন না; উপরন্তু তাঁরা ঢাকায় একটি ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ বা ‘আরবি বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছিলেন এবং তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল সাম্প্রদায়িক।

১৯০৮ সালে ময়মসিংহে অনুষ্ঠিত ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রাদেশিক মুসলিম শিক্ষা সমিতি’র দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনের সভাপতি মৌলভি আবদুস সালাম তাঁর ভাষণে বলেন, ‘যথাসময়ে আমি “ঢাকায় একটি আবাসিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়” দেখতে চাই, যার সঙ্গে থাকবে আবাসিক ইসলামী কলেজ ও স্কুল। আলিগড় কলেজের আদর্শে সেখানে আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে পড়ানো হবে ইসলামী ধর্মতত্ত্ব ও নৈতিক আদর্শ সংক্রান্ত বিষয়।’ উল্লেখ্য, তখন পর্যন্ত ১৮৭৭ সালে আলিগড়ে প্রতিষ্ঠিত আলিগড় কলেজই ছিল গোটা ভারতের মুসলমানদের সামনে উচ্চশিক্ষার আদর্শ প্রতিষ্ঠান।

মুসলমানদের অব্যাহত দাবি ও চাপ সৃষ্টি, বঙ্গভঙ্গ রদের কারণে মুসলমানদের মনোবেদেনা এবং ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক পূর্ববঙ্গের ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে আজ হোক বা কাল ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হতোই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেমন হওয়ার কথা ছিল সেই বিশ্ববিদ্যালয়টির, আর শেষ অব্দি বিশ্বদ্যিালয়টি কেমন হয়েছিল? অধিকাংশ মুসলিম নেতার দাবি অনুযায়ী ঢাকায় একটি ‘ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়’ হলে তা কি সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর ‘জ্ঞানবিভাসিত আলোকবর্তিকা’ হতে পারত?

দুই. ঔপনিবেশিক শাসকদের সম্পদ লুন্ঠন, শোষণ ইত্যাদির যতই সমালোচনা করা হোক না কেন এবং যে সমালোচনার ন্যায্যতাও আছে; এটা মানতে হবে তাদের শিক্ষার মান, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার মৌলিকত্ব এবং প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সক্ষমতা ও দূরদৃষ্টির কারণেই তারা আধুনিক সভ্যতা গড়ে তুলেছে। কয়েকজন যোগ্য ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ, প্রশাসক ও পরিকল্পনাবিদ পূর্ববঙ্গের কয়েকজন মুসলিম নবাব, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক নেতার সহযোগিতা ও ঐকান্তিক চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলেন। পরে একদল নিবেদিতপ্রাণ উঁচুমানের হিন্দু শিক্ষকও বিশ্ববিদ্যালয়টিকে গড়ে তোলার কাজে শরিক হন। ফলে ব্রিটিশ-মুসলিম-হিন্দু পরিচয়ের একদল শিক্ষিত, উদার ও আলোকিত মানুষের সামগ্রিক চেষ্টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশটি হয়ে ওঠে ধর্মনিরপেক্ষ ও অসাম্প্রদায়িক। মুসলিম হলে মিলাদ মাহফিল এবং জগন্নাথ হলে পূজা-অর্চনা হলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা ও উদার মানবিকতাবোধ। এদিকে শিক্ষার মানের ব্যাপারে প্রথম থেকেই কোনো আপস না করায় এ বিশ্ববিদ্যালয়টি হয়ে ওঠে উচ্চশিক্ষার একটি আদর্শ পীঠস্থান। শিক্ষা-সংস্কৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তির চর্চায় এবং মৌলিক ও গভীর গবেষণার কারণে প্রতিষ্ঠার দুই দশকের মধ্যেই এটি হয়ে ওঠে ভারত উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি উঁচুমানের উচ্চশিক্ষার প্রাণকেন্দ্র ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বসাধারণের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার জন্য মূল কৃতিত্বটি ব্রিটিশ শাসক ও শিক্ষাবিদদের। আগে-পরে মুসলিম ও হিন্দু শিক্ষাবিদরা এ প্রক্রিয়ার অংশীদার হলেও ভারতীয়রা ‘আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়’ গড়ে তুলতে পারতেন কি না সন্দেহ থেকেই যায়। প্রাসঙ্গিকভাবেই উল্লেখ্য, স্যাডলার কমিশন ভবিষ্যতের বিশ্ববিদ্যালয়টিকে স্বনির্ভর ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চেয়েছিল। ১৯১২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি হিন্দু প্রতিনিধি দল লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে দেখা করে বলেছিলেন, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে তা হবে একটি সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু লর্ড হার্ডিঞ্জ তাঁদের আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়টি হবে সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ ও সর্বসাধারণের।

তিন. ১৯২০ সালের ১১-১২ মার্চ বাংলাবাজারের নর্থব্রুক হলে ‘ঢাকা সোশ্যাল সার্ভিস এক্সিবিশন’ অনুষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত এবং কী ধরনের ‘টিচিং ও রেসিডেনশিয়াল’ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান এটি হতে যাচ্ছে তা-ই ছিল ওই অনুষ্ঠানের মূল আলোচনার বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ অফিসার এইচ ই স্টেপলটন অনুষ্ঠানে ‘আ ইউনিভার্সিটি ইন দ্য মেকিং’ শীর্ষক পেপার উপস্থাপন করেন। স্টেপলটন বর্ণনা দেন কীভাবে ইমপেরিয়াল গভর্নমেন্ট ১৯১২ সালের ২৭ মে স্যার রবার্ট নাথানকে সভাপতি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করে। বাংলা ও ভারতের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বিভিন্ন স্তরের মানুষের মতামত বিশ্লেষণ করেন স্যার নাথান ও আরেক শিক্ষাবিদ আর্চবোল্ড। ছয় মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করে ১৯১৩ সালের জুনে বাংলার গভর্নরের কাছে তাঁরা প্রতিবেদন প্রদান করেন।

এ-বিষয়ক নানা তথ্য-উপাত্ত সন্নিবেশ করে বহুমাত্রিক লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর অনবদ্য গবেষণাগ্রন্থ ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা’য় জানাচ্ছেন, ঢাকা ইউনিভার্সিটি কমিটির মূল লক্ষ্য ছিল এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, যা হবে ভারতীয় প্রয়োজনীয়তা পূরণের অতি উপযোগী- এ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যা পারেনি। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়টি হবে একই সঙ্গে সর্বাধুনকি ও ভারতীয় উপমহাদেশের উপযোগী। স্টেপলটন আরও বলেন, ‘আমরা চেয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি অটোনমাস বা স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানরূপে গড়ে তুলতে।’ স্টেপলটন ছিলেন একজন পুরাতাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিষয়ক লেখক। তিনি বলেন, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দর্শনচর্চা তো করতেই হবে, তার সঙ্গে চলবে সামাজিক অর্থনীতি গবেষণা -  a practical school of Social Economics is one of the chief desiderata at Dacca.

স্টেপলটন বলেছিলেন, শিক্ষাদানে লেকচার ও সেমিনার কাজের জন্য থাকবেন অতি উঁচু মাপের সীমিতসংখ্যক প্রফেসর, যাঁদের ব্যক্তিত্বের ওপর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। তা ছাড়া থাকবেন রিডার, যাঁরা হবেন ‘টিচারস অব নোট’ এবং তাঁদের মূল্যবান গবেষণাকর্ম থাকতে হবে। যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলে একপর্যায়ে তাঁরা প্রফেসরশিপ পাবেন। আরও থাকবেন সুযোগ্য লেকচারার, সহকারী লেকচারার ও ডেমনস্ট্রেটর। সুযোগ্য ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন এই শিক্ষাবিদ বলেন, ক্যামব্রিজ ও অক্সফোর্ডের নিয়মকানুন অনুসারে চলবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।’ (পৃষ্ঠা, ১০১-১০৩, তৃতীয় ভাগ, উদ্বোধন; পৃষ্ঠা, ৪৭-৫০, প্রথম ভাগ, প্রস্তুতি পর্ব।)

চার. প্রতিষ্ঠার ১০০ বছর পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে যে কেউ হতাশ হবেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয় আদৌ বিশ্ববিদ্যালয় পদবাচ্য কি না? বিশ্ববিদ্যালয়টি কতটা বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠতে পেরেছে? কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কতটা কামিয়াব হয়েছে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়ার জন্য কিছু প্রমিত মানদন্ড আছে। যেসব মানদন্ডের ভিত্তিতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে যাচাই-বাছাই করা হয় সেগুলো হচ্ছে মানসম্পন্ন শিক্ষক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, মৌলিক গবেষণা, গ্রন্থাগার ও ল্যাবরেটরিসহ শক্তিশালী অবকাঠামো, শিক্ষা ও গবেষণার মান ইত্যাদি। এসব মানদন্ডের বিচারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আজ কতটা উত্তম বিশ্ববিদ্যালয় বলা যাবে তা তর্কসাপেক্ষ। এশিয়ার প্রথম ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নেই, বৈশি^ক অবস্থান অরও নাজুক।

এই সেদিন, ২০২১ সালের ৯ জুন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত কিউএস বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিংয়ে (Quacquarelli Szmonds (QS) world university ranking of 2022) বলা হয়েছে, গত বছরের মতো এবারও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানের কোনো উন্নতি হয়নি। বৈশি^ক এ র‌্যাংকিংয়ে উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৮০১-১০০০-এর স্তরে। উল্লেখ্য, ২০১২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ৬০১-এর স্তরে ছিল, যেখান থেকে ২০১৪ সালে এর অবনমন ঘটে ৭০১-এর স্তরে, ২০১৯-এ আরও অবনমন ঘটে। অথচ গত শতাব্দীর বিশ ও ত্রিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলা হতো। যাঁরা এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেই ব্রিটিশ শাসকরাই একে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ বলতেন। কেননা কলকাতা, মাদ্রাজ ও বোম্বে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একদম স্বতন্ত্রভাবে গড়ে তোলা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে। লন্ডনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে আবাসিক ও টিউটোরিয়াল পদ্ধতিসমেত পূর্ববঙ্গের ঢাকায় এ বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

পাঁচ. শুধু একটি উঁচুমানের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, ব্রিটিশ সরকার চেয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বাপেক্ষা উত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। হিন্দু-মুসলি-ব্রিটিশ একদল উঁচুমানের নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক মুসলমান নবাবদের সহযোগিতায় এবং পূর্ববঙ্গের ব্রাত্য জনগণের ভালোবাসায় নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে রমনার প্রকৃতি, ফুল ও গাছগাছালির মধ্যে এমন এক মুক্ত ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশ গড়ে তোলেন যে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা তিন দশকের মধ্যে তাঁদের মানসম্পন্ন গবেষণা, শিক্ষা, সৃজনশীল সাহিত্যকর্ম, বুদ্ধিবৃত্তিক ও পরার্থপর কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে একটি আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ’৪৭ সালের দেশভাগের সময় উঁচুমানের অনেক হিন্দু শিক্ষক কলকাতা চলে গেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গভীর শূন্যতার সৃষ্টি হয়; কিন্তু ’৫০-এর দশকের প্রথমার্থেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মানে ভাটার টান ধরে। নানা নৈরাজ্যের মধ্যেও ’৭০ ও ’৮০-এর দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার ‘বিশ্ববিদ্যালয় সত্তাটি নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু ’৯১ সালে সামরিক স্বৈরাচারের পতনের পর বড় দুটি দলের ‘কথিত গণতন্ত্রে’র সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিশ্ববিদ্যালয় সত্তা’টির ক্ষয় চলছে ভিতর থেকে।

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি আদায়ে ব্যর্থতা, গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দের অভাব, কম যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নানা বিবেচনায় শিক্ষক ও উপাচার্য নিয়োগ, একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নতুন ও উচ্চতর জ্ঞান সৃষ্টির প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যা যা প্রয়োজন তা উপলব্ধিতে সরকার ও নীতিনির্ধারকদের উপলব্ধির ঘাটতি হচ্ছে একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈন্যদশার কারণ। এ যে সম্ভাবনাময় একটি বিশ্ববিদ্যালয় যা নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠার ৫০ বছরে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত মুসলিম জনগোষ্ঠী গড়ে তোলা, জাতিসত্তার বিকাশসহ একটি দেশের স্বাধীনতার পেছনে অনুঘটকের কাজ করেছে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্ষয়িষ্ণুতা ও পশ্চাদপদতা শুধু যন্ত্রণার নয়, এই পুরো জনগোষ্ঠীর জন্য অশনিসংকেত।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।