শুক্রবার, ১৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ টা

বেস্ট ক্রাইসিস ম্যানেজার

শ ম রেজাউল করিম

বেস্ট ক্রাইসিস ম্যানেজার

শেখ হাসিনা। বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্ত ও আদর্শের উত্তরসূরি। বিশ্ব পরিমন্ডলে কখনো ‘ভ্যাকসিন হিরো’, কখনো ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’, কখনো ‘চ্যাম্পিয়ন্স অব দি আর্থ’, কখনো ‘ইস্টার অব ইস্ট’, কখনো ‘স্টেটসম্যান’, কখনো শান্তির অগ্রদূত, কখনো নারীর ক্ষমতায়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সোচ্চার কণ্ঠস্বর, কখনো বিশ্বের অন্যতম সেরা সৎ ও পরিশ্রমী প্রধানমন্ত্রী, কখনো গণতন্ত্রের মানসকন্যা আবার কখনো তিনি উন্নয়নের ম্যাজিশিয়ান। তিনি আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে নিকষ কালো অন্ধকারের বাংলাদেশকে আলোকোজ্জ্বল উন্নয়ন অভিযাত্রায় শামিল করেছেন, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল বিশ্বের কাতারে নিয়ে গেছেন। এখন বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ের বাতিঘর, আশা-আকাক্সক্ষার শেষ আশ্রয়স্থল। কোটি কোটি মানুষের কাছে পরম মমতাময়ী মায়ের স্থানে অধিষ্ঠিত।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতাকে নির্মমভাবে হত্যার পর সামরিক শাসনের জাঁতাকালে পিষ্ট হতে থাকে বাংলাদেশ। বিদেশে থাকায় ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। স্বৈরশাসকরা যখন নানা ষড়যন্ত্রের রাজনীতিতে লিপ্ত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যখন বিচ্যুত, রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলো সংকটে নিমজ্জিত, তখনই ১৯৮১ সালের ১৭ মে জীবনের মায়া উপেক্ষা করে দেশে ফেরেন শেখ হাসিনা। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে দলের কাউন্সিলে তিনি সর্বসম্মতিক্রমে সভানেত্রীর দায়িত্ব পান। নেতৃত্বের কোন্দলে বিভাজিত দলের নেতা-কর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে ক্রাইসিস মোকাবিলায় সফল হন। তখন সময়টা ছিল তাঁর জন্য খুবই প্রতিকূল। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত টানা নয় বছর রাজপথে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর নেতৃত্বেই ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন তিনি। পরে ১৯৯৬ সালে সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বে বিপুল ভোটে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ২১ বছর পর পথ হারানো বাংলাদেশ আবার সঠিক পথে চলতে শুরু করে। প্রশাসন ও অন্যান্য স্তরে তখন স্বাধীনতাবিরোধী ও আওয়ামীবিরোধীদের দোর্দন্ড প্রতাপ। সেই জঞ্জালপূর্ণ অবস্থায় সরকারের দায়িত্ব নিয়ে জমাট বারুদের ওপর থেকে সামনে এগিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। দক্ষতার সঙ্গে তিনি সব সামলে নেন। দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত গঙ্গা-পদ্মা নদীর পানি বণ্টনে ৩০ বছর মেয়াদি চুক্তি করেন। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে কয়েক দশকের চলমান চরম সংকট নিরসন করে পাবর্ত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৮ সালের বন্যায় ২ কোটি বন্যার্ত মানুষের কাছে বিনামূল্যে খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিয়ে বিশ্বমানচিত্রে অনন্য নজির স্থাপন করেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে ২০০৮, ২০১৪ এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে টানা তিন মেয়াদে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। তলাবিহীন ঝুড়ির বাংলাদেশকে শেখ হাসিনা বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছেন।

বাংলাদেশের প্রতিটি সংকটময় পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা আবিভর্‚ত হয়েছেন দেবদূতের মতো। সংকট মোকাবিলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার সম্প্রতি সাতটি প্রতিকূল পরিস্থিতি তথা ঘূর্ণিঝড় আম্ফান, বুলবুল, ইয়াস, বৃষ্টি, নদীভাঙন এবং করোনাভাইরাস মোকাবিলা করেছে অত্যন্ত সফলভাবে। তাঁর দৃঢ় মনোবল ও কঠোর পরিশ্রমের ফলে কোনো দুর্যোগকালে দেশে আকাল হয়নি। বিশ্বের বড় বড় রাষ্ট্র যখন হিমশিম খাচ্ছে, বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতি এমন সংকটময় পরিস্থিতিতেও ৭৪ বছর বয়সের এই মহামানবী করোনা মহামারী মোকাবিলায় সাফল্য দেখিয়ে যাচ্ছেন। কীভাবে মাস্ক পরতে হয় এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হয় তা শিখিয়েছেন। বারবার দেশের মানুষকে অ্যাড্রেস করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে নিজেকে এবং অন্যকে করোনা থেকে সুরক্ষার নির্দেশনা দিচ্ছেন। দাফতরিক কাজের পাশাপাশি নিয়মিত তৃণমূল প্রশাসনকে দিকনির্দেশনা দিয়ে তদারকি করছেন। করোনায় দলীয় প্রধানের আহ্‌বানে সাড়া দিয়ে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগসহ অন্য সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা জনগণের পাশে দাঁড়াচ্ছেন।

সারা বিশ্ব যখন বিপর্যস্ত শেখ হাসিনা তখন প্রশংসনীয় নেতৃত্ব দিয়ে মানুষের জীবন ও জীবিকা যুগপৎ চালিয়ে রেখেছেন। এত প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দেশের অর্থনীতিকে মুখ থুবড়ে পড়তে দেননি। মহামারীকালেও কৃষি ও শিল্প খাতের উৎপাদন অব্যাহত রাখার সব পদক্ষেপ নিয়েছেন। ঘোষণা করেছেন একের পর এক প্রণোদনা প্যাকেজ। ক্ষতিগ্রস্ত দিনমজুর, মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন, মন্দিরের পুরোহিত, কৃষক, শ্রমিক, সুইপার, নরসুন্দর, ধোপা, অটোচালক, মৎস্যজীবী, ডোম সম্প্রদায়, খামারি, শিক্ষক, কওমি মাদরাসার দুস্থ ও এতিম, সাংবাদিকসহ কে নেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবিক সহায়তার তালিকায়? সারা দেশে ৫০ লাখ পরিবারকে মানবিক সহায়তা প্রদানের নতুন রেকর্ড স্থাপন করেছেন শেখ হাসিনা। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হলে ৩৬ লাখ ৫০ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত দরিদ্র, অসহায় ও ছিন্নমূল পরিবারের জন্য ৯১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। পাশাপাশি ভবঘুরে, ভাসমান, দুস্থ ও শিশুখাদ্য দেওয়া প্রয়োজন এমন মানুষকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আরও ১০ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। তাঁর উদ্যোগে ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ থেকে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সহায়তার জন্য ৫ কোটি এবং ভূমিহীন ও গৃহহীনদের পুনর্বাসনের জন্য ৫ কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। এত বড় মহামারীর মধ্যেও গৃহহীন সবাইকে জমিসহ ঘর করে দেওয়া, সব উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রাখার বিস্ময়কর নজির স্থাপন করেছেন। তাঁর নির্দেশনায় মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ খাতে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৭ লাখ খামারিকে ৮৪৬ কোটি টাকা নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টে এ বছর ১০ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় আনা হয়েছে আমূল পরিবর্তন। উন্নত চিকিৎসার জন্য নতুন ৪ হাজার চিকিৎসক, ৫ হাজার ৫৪ নার্স, ১ হাজার ২০০ মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ১ হাজার ৬৫০ মেডিকেল টেকনিশিয়ান, ১৫০ জন কার্ডিওগ্রাফারসহ কয়েক হাজার স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ৪ হাজারের অধিক চিকিৎসককে করোনায় সেবা প্রদানের জন্য হটলাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালের সংখ্যা ১৫৬-তে উন্নীত করা হয়েছে, যেখানে ১ হাজার ১০০ আইসিইউ ও ১২ হাজার ৫০০ সাধারণ শয্যা রাখা হয়েছে। সর্বশেষ ১ হাজার শয্যাবিশিষ্ট ডিএনসিসি করোনা হাসপাতালে চিকিৎসা কার্যক্রম চালু হয়েছে।

বিশ্বের ১০০-এর অধিক দেশে এখনো করোনা ভ্যাকসিন পৌঁছায়নি। এমন বাস্তবতায় তাঁর সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত ও কর্মপরিকল্পনায় বাংলাদেশের প্রতিটি জেলায় করোনার ভ্যাকসিন পৌঁছে গেছে। দেশে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ডোজ ভ্যাকসিন ইতিমধ্যে সংগ্রহ করা হয়েছে। এ এক অভাবনীয় সাফল্য, যা বিস্ময়কর। ক্রমান্বয়ে দেশের সব মানুষকে বিনামূল্যে করোনা টিকার আওতায় আনা হচ্ছে।

বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষ মারা যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। সংকট উত্তরণে দৃঢ়চেতা মনোভাব ও সময়োপযোগী পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনা মোকাবিলায় নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। আশঙ্কা ভুল প্রমাণ করেছেন। আন্তর্জাতিক মহলে হয়েছেন ব্যাপক প্রশংসিত। যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্বস ম্যাগাজিনে ২০২০ সালে প্রকাশিত ‘লিডারশিপ স্ট্র্যাটেজি’ শিরোনামে করোনা মোকাবিলায় ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে কয়েকজন বিশ্বনেতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামও করোনাকালে তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করেছে। কমনওয়েলথ মহাসচিব প্যাট্রিসিয়া স্কটল্যান্ড শেখ হাসিনাকে বিশ্বের শীর্ষ তিনজন অনুপ্রেরণা প্রদানকারী নারী নেত্রীর একজন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে তাঁর নেতৃত্বে সংকট কাটিয়ে অদম্য গতিতে ঘুরে দাঁড়াবে বাংলাদেশ। বাবা-মাসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের নির্মম হত্যাকান্ডের পর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশে ফিরে তাঁকে মোকাবিলা করতে হয়েছে অসংখ্য চ্যালেঞ্জ। নানা বিরোধ ও কোন্দল দূর করে দলকে সুসংগঠিত করা, বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে দেশি ও আন্তর্জাতিক বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছে। বিডিআর বিদ্রোহ এবং ওই ঘটনায় সেনা সদরে ভুল তথ্য দিয়ে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা বন্ধ করা, দ্রুততম সময়ে বিডিআর হত্যাকান্ডের বিচার সম্পন্ন  করেছেন। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও নির্বাচন ব্যাহত করার নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি মোকাবিলা, সেরা কূটনৈতিক সাফল্যের মাধ্যমে দীর্ঘ সময়ের ছিটমহল সমস্যার সমাধান ও সমুদ্রসীমায় বিজয় অর্জন, ১/১১ সরকারের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা, দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ফিরিয়ে আনা তাঁর অকল্পনীয় সাফল্য। যদিও এর কোনোটাই সহজ ছিল না। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ভয়াবহ প্রতিকূলতা ও ক্রাইসিসকে দৃঢ়তার সঙ্গে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়ে মোকাবিলা করেছেন তিনি। তিনি গোটা জাতির দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে জেগে থাকেন, তাই তো ১৭ কোটি বাঙালি নিশ্চিন্তে থাকে। জাতির পিতা ও রাষ্ট্রপতির কন্যা হলেও তাঁর চলার পথ কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না কখনো। তিনি বিশ্বকে দেখিয়েছেন সততা, সাহসিকতা, দেশপ্রেম ও নিষ্ঠা দিয়ে সব প্রতিকূলতা জয় করা সম্ভব। শেখ হাসিনা জীবনে যত সংকটে বিজয়ী হয়েছেন তা বোধ করি বিশ্বের বিস্ময়। রাজনীতি ও প্রশাসনে তাঁর অভিজ্ঞতা ও সাফল্য তাঁকে আজ বিশ্বনেতৃত্বে আসীন করেছে। তাই তো গণমাধ্যমের যথার্থ শিরোনাম ‘শেখ হাসিনা, দ্য বেস্ট ক্রাইসিস ম্যানেজার’। দীর্ঘায়ু হোন শেখ হাসিনা।

লেখক : মন্ত্রী, মৎস্য ও প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয়।