মঙ্গলবার, ১৭ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা

পাহাড়ে পানি ব্যবস্থাপনা

ড. মো. জামাল উদ্দিন

পাহাড়ে পানি ব্যবস্থাপনা

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল কৃষি বৈচিত্র্যময় একটি এলাকা। কৃষির উন্নয়নের দিক থেকে এ অঞ্চলের গুরুত্ব অপরিসীম। এখানকার জনসংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের  জনগোষ্ঠীর জন্য খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও জোরালো হচ্ছে। কভিড পরিস্থিতিতে এ গুরুত্ব আরও বেড়ে গেছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনামতে এক ইঞ্চি জমিও যেন খালি পড়ে না থাকে তার বাস্তবায়নসহ ফসলের ফলন বৃদ্ধি জরুরি। ফলন বৃদ্ধির জন্য পানি একটি বড় নিয়ামক। সঠিক সময়ে গাছে পানি দিতে না পারলে ফলন অনেক কমে যায়। এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ২০৩০ সালের মধ্যে ফলন দ্বিগুণ করার তাগিদ রয়েছে। অনেকটা উভয় সংকট বলা যায়। পাহাড়ি এলাকার সেচ সমস্যা বহুকাল ধরে। জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে এ সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে। এ সমস্যা দূরীকরণে সরকারি, বেসরকারি ও উন্নয়ন সংস্থাগুলো প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষ সফল হচ্ছে আবার ব্যর্থও হচ্ছে। মূলত ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এ সমস্যাটি বিরাজমান। আলাদা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত তিন পার্বত্য জেলা বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি এ সমস্যাটি নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। শুষ্ক মৌসুমে সমস্যাটি প্রকট আকার ধারণ করে। বৃষ্টিনির্ভর জুম চাষের ওপর ভিত্তি করে অনেকে জীবিকা নির্বাহ করে। বাকিরা ফলফলাদি বিক্রি করে অথবা অন্য পেশায় সম্পৃক্ত থেকে জীবন চালায়।

শুষ্ক মৌসুমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফসলের জন্য শুধু নয় নিজেদের ব্যবহারেও পানির জন্য হাহাকার দেখা যায়। দুর্গম পাহাড়ি পথ হেঁটে ঝরনায় গোসল সেরে উপজাতি মহিলাদের দু-তিনটি কলসি মাথায় নিয়ে পানি আনার দৃশ্য দেখে বিদেশিরা থমকে যায়। সরকারি-বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার বদৌলতে খাবার ও ব্যবহারের পানির প্রয়োজন কিছুটা মিটলেও গাছের জন্য নেই বললেও চলে। শহুরে এলাকার কাছাকাছি অনেক সামর্থ্যবান ব্যক্তি নিজেদের প্রচেষ্টায় পানির ব্যবস্থা করতে পারলেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বেশির ভাগ এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর এ অঞ্চলটিতে রয়েছে উঁচু-নিচু পাহাড়, ভ্যালি, বন, হ্রদ, জলপ্রপাত, পাহাড়ি ঝরনা, নদী, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, প্রাণী ও আর্কষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ২০১৩ অনুসারে তিন পার্বত্য জেলায় ৬৫৯টি ওয়াটারশেড বা জলবিভাজিকা/ জলাধার বা সচল ঝিরি আছে যার মধ্যে খাগড়াছড়িতে ১১৯টি, রাঙামাটিতে ২৭৩টি এবং বান্দরবানে ২৬৭টি। আর তিন পার্বত্য জেলায় ৪ হাজার ৫৭৩টি ক্রিক রয়েছে যার মোট আয়তন ১ হাজার ৫৩৭ হেক্টর। এ ওয়াটারশেড ও ক্রিকগুলোয় টেকসই বাঁধ দিয়ে বড় আকারের পানির জলাধার তৈরি করে পাহাড়ের চূড়ায় পানির ট্যাংক বসিয়ে পাম্পের সাহায্যে জলাধার থেকে পানি তুলে বাগানের সেচ সমস্যা সমাধান করা যেতে পারে। এসব জলাধারে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষেরও সুযোগ রয়েছে। গৃহস্থালির কাজেও এসব পানি ব্যবহার করে বসতবাড়িতে বছরব্যাপী সবজি চাষ করতে পারে; অনেক ক্ষেত্রে অ্যাগ্রো-ট্যুরিজম প্লেস হতে পারে। এতে জীববৈচিত্র্যও রক্ষা পাবে। বিশাল পার্বত্য এলাকায় উপযুক্ত জলাধারগুলোয় বাঁধ দিয়ে পানির সুষ্ঠু বণ্টন ও ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব শ্যামলকান্তি ঘোষ সম্প্রতি ফোনিক আলাপে বলেন, পাহাড়ে ক্রিক বা ঝরনা বা ছোট নদীগুলোয় কিছু সময় পরপর ছোট ছোট ক্রসড্যাম বা ছোট বাঁধ দিয়ে এবং দুই পাশে গর্ত করে জল ধরে রাখার জন্য তাঁর সময়ে একটা পরিকল্পনা ছিল। সেটা নিয়ে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন কিছু কাজও করেছিল। তিনি উল্লেখ করে বলেন, বাঁধ দেওয়ার পর জল একটা পর্যায় পর্যন্ত ওপরে ক্রিক/ঝরনা/নদী বা পাশের জলাধারে থাকলেও তারপর আবার নিচে চলে আসবে। অর্থাৎ যেটুকু প্রয়োজন তার বাইরে আটকে রাখা কোনো দরকার নেই, যাতে বাঁধ ভেঙে না যায়। এভাবে করলে শুকনো মৌসুমে তারা জল পেতে পারেন। আর পাহাড়ের ওপরে বৃষ্টির জল ধরে রাখার ব্যবস্থা করা এবং তা থেকে অন্তত ফল বা কিছু সবজি চাষ করা যেতে পারে। এটা যুক্তিযুক্ত। এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যাপক আকারে প্রত্যন্ত অঞ্চলের উৎপাদন এলাকায় ছড়িয়ে দিলে শুষ্ক মৌসুমে পানি সমস্যা থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে। সঠিক উপায়ে বা প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব বাঁধ নির্মাণ করতে না পারলে পাহাড়ের পলি জমে দু-এক বছরে তা ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এ রকম নজিরও বেশ রয়েছে। সামাজিকভাবে এ ধরনের বাঁধের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।

সম্প্রতি কাজুবাদাম ও কফি চাষের ওপর একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। কাজুবাদামে সেচের বেশি প্রয়োজন না থাকলেও কফি গাছের জন্য সেচ কিছুটা প্রয়োজন। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কফিবাগান করলে সেখানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণপূর্বক সেচ সুবিধা বাড়ানো গেলে নতুন বাগান টিকবে, ফলন বাড়বে। অতীতে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা কর্তৃক বিভিন্ন সময়ে নির্মিত অকেজো বাঁধগুলো চিহ্নিত করে সংস্কারপূর্বক সচল করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। পাড়ার লোকদের সম্পৃক্ত করে এ কাজ করা যেতে পারে।

নতুন করে ক্রিকড্যাম তৈরিসহ বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে অথবা গভীর নলকূপ বসিয়ে পাহাড়ে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা করতে পারলে পাহাড়ি কৃষির অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটবে এতে কোনো সন্দেহ নেই।

 

লেখক : সাবেক ন্যাশনাল কনসালট্যান্ট-সংশ্লিষ্ট প্রকল্প, এফএও; ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্র, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম।