মঙ্গলবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০২৪ ০০:০০ টা

পানি সমস্যায় বাংলাদেশ

আলম রায়হান

পানি সমস্যায় বাংলাদেশ

মা নিয়ে অনেক গান-কবিতা-নাটক-গীত আছে, গদ্য-পদ্যে একাকার। এর বাইরেও চলে অনেক আদিখ্যেতা। কিন্তু কত শতাংশ মা বাস্তবে সমাদর-সম্মান-গুরুত্ব পান? বাস্তব চিত্র হতাশাজনক। একইভাবে পানি নিয়ে অনেক কথা বলা হয়। বলা হয় পানি জীবন। পানি নিয়ে ভাবতে হবে, পানি বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র কী? এককথায়, ভয়ংকর! মাদক যেমন আমাদের খেয়ে ফেলছে তেমনই আমরা পানি খেয়ে ফেলছি। এর সঙ্গে আছে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের পানি প্রত্যাহার। আর পানি ব্যবস্থাপনার নামে রাষ্ট্র যা করে চলেছে তা কতটা বাস্তবসম্মত সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে অনেক আগেই। এর সঙ্গে চলে পানি হরিলুট এবং পানি বিনষ্টের তান্ডব এবং রাষ্ট্রের কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার গচ্চা। এ ব্যাপারে একটি অতি ছোট উদাহরণ দেওয়া যাক। পানি উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের একটি খুবই ছোট প্রকল্প, ৬৪টি জেলার অভ্যন্তরস্থ ছোট নদী, খাল এবং জলাশয় পুনঃখনন (প্রথম পর্যায়) (দ্বিতীয় সংশোধিত) প্রকল্প। বরাদ্দ ২ হাজার কোটি টাকা মাত্র! পানি মন্ত্রণালয়ের কাজের ক্ষেত্রে এ টাকা একেবারে নস্যি। তেজপাতাসম। কিন্তু এ প্রকল্পের কাজের নমুনায় সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ বিক্ষুব্ধ। খবর পেয়ে সতর্ক হলেন সদ্য সাবেক পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম। খোঁজখবরের ভিত্তিতে তিনি নির্দেশনা দিয়েছিলেন, ‘কাজের আগের ছবি, কাজের পরের ছবি এবং এক বছর পরের ছবি মন্ত্রণালয়ে দাখিল করতে হবে।’ নিশ্চয়ই তিনি আরও অনেক প্রকল্পের বিষয়ে এরকম নির্দেশনা দিয়েছেন। এতে তার ওপর একটি মহল নিঃসন্দেহে রুষ্ট হয়েছে। কে জানে এ কারণেই তিনি এবার মন্ত্রিসভার বাইরে কি না। বিনয়ের সঙ্গে বলে রাখা ভালো, মাদক কারবারি এবং পানি খাদকরা খুবই ক্ষমতাধর। বলা হয়, এদের হাত আসমান পর্যন্ত লম্বা। যে কারণে উল্লিখিত অতিক্ষুদ্র প্রকল্পেরও এক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রকাশ্যে বলতে পারেন, ‘পাঁচটা সচিব আমার পকেটে থাকে।’ এই দম্ভোক্তি থেকে বোঝাই যাচ্ছে, পানির টাকা আসলে কোথায় যায়। যাক এ অন্য প্রসঙ্গ। ফেরা যাক পানি প্রসঙ্গে। পানি নিয়ে প্রধানত দুই ধরনের অরাজকতা চলে। এক. দেশের অভ্যন্তরে তান্ডব। দুই. সীমান্তের ওপারের শোষণ। দেশের অভ্যন্তরে ত্রুটিপূর্ণ পানি ব্যবস্থাপনা এবং অপরিকল্পিত বাঁধ-সড়ক-সেতু নির্মাণসহ এমন অনেক কান্ড করা হয়েছে এবং হচ্ছে, যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এককথায় ভয়াবহ। পাশাপাশি চলেছে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের পানি প্রত্যাহার। তবে এটি অধুনা কোনো বিষয় নয়।  আমাদের ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের দুই দশক আগেই ১৯৫১ সালের ২৯ অক্টোবর সেই পাকিস্তান আমলে শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গা নদী থেকে বিপুল পরিমাণ পানি প্রত্যাহারের পরিকল্পনা করে ভারত। এ বিষয়ে পাকিস্তান সরকার জানতে চাইলে ১৯৫২ সালে প্রত্যুত্তরে ভারত জানায় যে, ‘পরিকল্পনাটি মাত্র প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে পাকিস্তানের উদ্বেগ সম্পূর্ণ অনুমাননির্ভর।’ এ ঘটনা থেকেই গঙ্গার পানি বণ্টনসংক্রান্ত আলোচনার দীর্ঘ ইতিহাসের সূত্রপাত। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান ও ভারত সরকার বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে সরকারপ্রধান পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে গঙ্গার প্রবাহ বণ্টনের ব্যাপারে বহুবার আলোচনায় বসেছেন। ইতোমধ্যে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তের প্রায় ১৮ কিমি উজানে ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের কাজ সমাপ্ত করেছে। অভাব-অনটন-সমস্যা-সংকটের বাংলাদেশে যখন একটা শক্ত ভিত্তি পাচ্ছিল তখন সামনে এলো ফারাক্কা বাঁধ ইস্যু, ১৯৭৪ সালে। 

ভারত কর্তৃক নির্মিত ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারের সঙ্গে গঙ্গা প্রশ্নে জরুরি আলোচনা শুরু করে। ১৯৭২ সালে গঠিত হয় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে ভারত ও বাংলাদেশের দুই প্রধানমন্ত্রীর যৌথ ঘোষণায় ‘দৃঢ় প্রত্যয়’ ব্যক্ত করা হয়, ফারাক্কা প্রকল্প চালু করার আগে গঙ্গায় বছরে সর্বনিম্ন প্রবাহের সময়কালে নদীর পানি বণ্টন প্রশ্নে তারা পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য একটি মতৈক্যে উপনীত হবেন। ওই শীর্ষ বৈঠকে আরও স্থির হয়, শুষ্ক মৌসুমের পানি ভাগাভাগির পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো চুক্তিতে উপনীত হওয়ার আগে ফারাক্কা বাঁধ চালু করা হবে না। ১৯৭৫ সালে ভারত বাংলাদেশকে জানায়, ফারাক্কা বাঁধের ফিডার ক্যানাল পরীক্ষা করা তাদের প্রয়োজন। সে সময় ভারত ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ১০ দিন ফারাক্কা থেকে গঙ্গার প্রবাহ প্রত্যাহার করার ব্যাপারে বাংলাদেশের অনুমতি ‘প্রার্থনা’ করে। বাংলাদেশ এতে সম্মতি জানায়। এভাবেই ভারত বাঁধ চালু করে দেয় এবং নির্ধারিত সময়ের পরও একতরফাভাবে গঙ্গার গতি পরিবর্তন করতে থাকে। যা ১৯৭৬ সালের পুরো শুষ্ক মৌসুম পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশ এ ব্যাপারে জাতিসংঘের শরণাপন্ন হয়। ১৯৭৬ সালের ২৬ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে একটি সর্বসম্মত বিবৃতি গৃহীত হয়, যাতে অন্যান্যের মধ্যে ভারতকে সমস্যার একটি ন্যায্য ও দ্রুত সমাধানের লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনায় বসার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর জের ধরে কয়েকদফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর দুই দেশ ফারাক্কায় প্রাপ্ত শুষ্ক মৌসুমের পানি বণ্টনের ওপর ৫ বছর মেয়াদি (১৯৭৮-৮২) একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে।

১৯৮২ সালের অক্টোবর মাসে দুই দেশের মধ্যে ১৯৮৩ ও ’৮৪ সালের জন্য গঙ্গার পানি বণ্টনসংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। কোনো সমঝোতা চুক্তি না থাকায় ১৯৮৫ সালে গঙ্গার পানির ভাগবাঁটোয়ারা হয়নি। ১৯৮৯ সালের পর শুষ্ক মৌসুম থেকে পানি ভাগাভাগিসংক্রান্ত কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা চালু ছিল না। এ সুযোগে ভারত শুষ্ক মৌসুমে একতরফা নদীর পানি ব্যাপকভাবে প্রত্যাহার শুরু করে। ফলে বাংলাদেশে গঙ্গার পানিপ্রবাহ দারুণভাবে হ্রাস পায়। ১৯৯২ সালের মে মাসে দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে বৈঠকে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী দ্ব্যর্থহীনভাবে আশ্বাস দেন যে, ফারাক্কায় গঙ্গার পানি সাম্যতার ভিত্তিতে বণ্টনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ‘অযথা হয়রানি’ থেকে রেহাই দিতে সম্ভাব্য সব প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হবে। সেই থেকে দুই দেশের মধ্যে দুটি মন্ত্রী পর্যায় ও দুটি সচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। যদিও বণ্টনসংক্রান্ত কোনো চুক্তিতে উপনীত হওয়া যায়নি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৩ সালের এপ্রিল মাসে আবার বৈঠকে মিলিত হন। কিন্তু বাংলাদেশকে ‘অযথা হয়রানি’ থেকে মুক্তি দেওয়ার ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অধরাই থেকে গেছে।

পরে ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টনসংক্রান্ত একটি চুক্তিতে উপনীত হয়। এই চুক্তিকেই যেন ধরে নেওয়া হয়েছে ‘পানি প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে আলোচনার চূড়ান্ত অর্জন।’ ভাবখানা এই, ম্যাওয়া পাওয়া গেছে; এরপর আর কিছুই করার থাকে না। কিন্তু কারোরই অজানা নয়, শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির ব্যাপক প্রত্যাহার বাংলাদেশের গঙ্গানির্ভর এলাকার জনগণের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে  বিরূপ প্রভাব পড়েছে। ফারাক্কা বাঁধের ফলে কেবল ভূ-উপরস্থ পানি নয়, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে গেছে। পানির গুণগতমানও কমেছে। ফারাক্কা-উত্তর সময়কালে ভূগর্ভস্থ পানির গতিপথ ধীরে ধীরে দক্ষিণ থেকে উত্তর দিকে পরিবর্তিত হচ্ছে। গঙ্গা নদী বর্তমানে বছরের অধিক সময় ধরে, অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুলাই এবং অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর সময়কাল পর্যন্ত আশপাশের ভূগর্ভস্থ পানি স্তর থেকে পানি সংগ্রহ করছে আর ভূগর্ভস্থ পানি স্তরে আনুভূমিক পুনঃসঞ্চারণ ঘটাচ্ছে মাত্র দুই কি তিন মাস। কিন্তু ফারাক্কায় গঙ্গার পানি প্রত্যাহার শুরু হওয়ার আগে আশপাশের ভূগর্ভস্থ পানি স্তরগুলো গঙ্গা থেকে অধিকতর সময় ধরে সর্বোচ্চ পরিমাণ পানি লাভ করত। এর অর্থ ফারাক্কা বাঁধ চালু করার পর গঙ্গানির্ভর অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানি শুকিয়ে আসছে, যে কারণে গঙ্গানির্ভর অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ জলের বিদ্যমানতা হ্রাস পাচ্ছে। এর বিপরীতে আমরা কেবল একই গীত গেয়ে যাচ্ছি।

সবারই জানা, হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যে শ্রীকৃষ্ণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছেন। বাংলা ভাষায় যে বিষয় একটি প্রবাদ আছে ‘কানু বিনে গীত নেই’। কেবল প্রবচন নয়, এর সত্যতাও রয়েছে। পাশাপাশি এই প্রবচনের কপির পেস্ট প্রতিফলন স্পষ্ট আমাদের দেশের পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে, ‘পানি নিয়ে ভারত বিনে গীত নেই।’ এক্ষেত্রে ফারাক্কা বাঁধ ইস্যু থেকে নেমে ৫৪ নদী, সেখান থেকে নেমে অতঃপর বহু বছর ধরে তিস্তাই যেন সব। অনবরত এক কথা বলার প্রবণতায় আক্রান্ত বিকারগ্রস্ত মানুষের সঙ্গেও অনেক মিল আছে। এমনকি মিলে যায় গঞ্জিকাসেবীদের সঙ্গেও। রসিকজন যেমন গাঁজায় বুঁদ হয়ে একটি কথাই বলে, ‘ভোম ভোলানাথ!’ আমাদের কর্তাদের অনেকেই বলেন, ‘ওম তিস্তা!’ যেন পানি নিয়ে তিস্তা ছাড়া আর কোনো সমস্যাই নেই। আমাদের দেশের অভ্যন্তরেও যেন আর কোনো কিছুই করার নেই। কেবল চাতক পাখির মতো ভারত পানে তাকিয়ে থাকলেই হবে। আর সেই ‘কানুবিনে গীত নেই’ ধারায় কিছুদিন পরপর বলা, এই তো তিস্তা সমস্যার সমাধান হচ্ছে! পাশাপাশি নানান উন্নয়নের নামে অভ্যন্তরীণ পানির সর্বনাশ করা।

মানতেই হবে, পানি নিয়ে ভারতকেন্দ্রিক বিষয়টি হিমালয়সম বিশাল। এ পাহাড় কবে টলবে, আদৌ টলবে কি না তা বলা কঠিন। এ নিয়ে ইদানীং কথাবার্তাও তেমন হয় না। ভারতের ৭৫তম প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন উপলক্ষে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন আয়োজিত ২৪ জানুয়ারি রাতে জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন, ‘আগামী দিনে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক আরও গভীর হবে।’ খুবই আশার কথা। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- আমাদের প্রাণভোমরা পানি ভারতের হাতে, তার কী হবে? পাহাড় টললেও নিশ্চয়ই এ প্রশ্নের উত্তর মিলবে না। আর অলৌকিক কোনো এক কারণে কোনো এক দিন ভারতের সঙ্গে পানি সমস্যার পাহাড় অপসারিত হবে- এ আশা নিশ্চয়ই অবান্তর। এরপরও কী কারণে পানি নিয়ে নিজের অভ্যন্তরীণ করণীয় থেকে দূরে রয়েছে বাংলাদেশ? আর এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে কেন একজন প্রতিমন্ত্রী! তাও ছোটবেলায় পানিতে নানান ধরনের সাঁতার কাটা ছাড়া পানি বিষয়ে তাঁর আর কোনো ধারণা আছে কি না তাও বলা কঠিন। আর দেশরক্ষার গভীর জ্ঞান নিয়ে দেশের পানি রক্ষা করার কাজ করা যায় কি না তা তো মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন!                

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

সর্বশেষ খবর