শিরোনাম
বৃহস্পতিবার, ১১ জুলাই, ২০২৪ ০০:০০ টা

সব খাবারই হালাল

তাসলিমা নাসরিন

সব খাবারই হালাল

কলকাতার হিন্দু, যারা শিল্প-সাহিত্যের সঙ্গে জড়িত, তাদের অনেকে খুব বিফ খেতে আগ্রহী। বিশেষ করে তারা, যারা জানে যে পৃথিবীর উন্নত এবং সভ্য দেশগুলোয়, বিশেষ করে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ায় গরুর মাংসকে সব মাংসের সেরা মাংস বলে বিচার করা হয়। কেউ কেউ গরুর মাংস খাওয়া নিষেধ বলেই, নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি আকর্ষণ থেকেই গরুর মাংস খাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। কেউ আবার সব সংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে প্রগতিশীল হিন্দুর খাতায় নাম লেখাতে চায় বলে বিফ খেতে চায়।

কলকাতায় আমি যখন প্রায়ই যেতাম, আশির দশকের শেষে এবং নব্বই দশকের শুরুতে, আমার সঙ্গে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের বেশ সখ্য ছিল। তিনি একবার আমাকে খুব অনুরোধ করলেন, বাংলাদেশ থেকে তাঁর জন্য যেন অন্য কিছু নয়, বিফ নিয়ে আসি। বিফ খাওয়ার জন্য তাঁর প্রাণ আকুলি বিকুলি করছে, আমিই একমাত্র তাঁর স্বপ্ন পূরণ করতে পারি। তো, পরের ভিজিটে আমি কিছু বিফ নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি যে কী ভীষণ খুশি হয়েছিলেন! বউ-বাচ্চাদের নিয়ে বিরাট উৎসব করে খেয়েছিলেন সেই বিফ। বাংলাদেশে থাকাকালীন আমি বিফ-এর ভক্ত একেবারেই ছিলাম না। আমি ভালোবাসতাম খাসির মাংস আর কান্ট্রি চিকেন। মূলত পছন্দ ছিল নানা রকম বড় মাঝারি ছোট মাছ।

সুভাষ মুখোপাধ্যায় বাংলাদেশ থেকে বিফ আনতে বলেছিলেন, এই তথ্য শুনে দুই-তিনজন লোক আমাকে পরে বলেছে, বিফ খেতে চাইলে বাংলাদেশ থেকে আনতে হবে কেন, কলকাতায় তো বিফ পাওয়া যায়। তা ঠিক, কলকাতায় বিফ পাওয়া যায়। সম্ভবত সুভাষ মুখোপাধ্যায় বাংলাদেশের বিফের স্বাদ বেশি বলে মনে করতেন বলে বাংলাদেশের বিফ খেতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ কি আর আলাদা করে বিফ তৈরি করে! ভারতের গরুই তো আসে বাংলাদেশে! কেউ কেউ মন্তব্য করলেন, হয়তো কলকাতার বাজার থেকে বিফ কিনতে গেলে অস্বস্তিতে পড়বেন, সে কারণে বাংলাদেশ থেকে আনা হোক চেয়েছিলেন। অনেকে জানে না ভারতের কোন কোন অঞ্চলে গরু জবাই করা আইনত বৈধ, কোন কোন অঞ্চলে বৈধ নয়। বাই দ্য ওয়ে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, গোয়া, ত্রিপুরা, অরুণাচল প্রদেশ, মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ডে গরু জবাই করা বৈধ, ভারতের বাকি সব রাজ্যে এটি অবৈধ। যে সব অঞ্চলে গরু জবাই করা অবৈধ, সেখানে গরু জবাই করলে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের জেল, আর ৫ লাখ টাকা জরিমানা।

কলকাতায় যখন পাকাপাকিভাবে বাস করি, আমি বিফ কিনে খেতে পারতাম, আমি কিন্তু খাইনি। তবে একবার আমার এক হিন্দু কবিবন্ধু বিফ খাওয়ার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিল। আমার বাড়িতে বিফ এনে সে রান্না করে খেতে চায়। আমি বলে দিলাম, ওটি হচ্ছে না বাপু, আমি নিজে বিফ পছন্দ করি না, তার ওপর আমার বাড়ির কাজে যে মেয়েটি সাহায্য করে, সে হিন্দু। আমি অনাগ্রহ প্রকাশ করার পরও সেই কবি একদিন বিফ নিয়ে হাজির। এবং সে রান্না করল তার কাক্সিক্ষত বিফ কারি। সে একাই খেল। আমি বাসনপত্র মেজে ধুয়ে রাখলাম। বাড়ির সহকারী মেয়েটিকে রান্নাঘরের ধারে কাছে আসতে দিইনি। মেয়েটিকে বলেছি মাংস রান্না হবে, কিন্তু কী মাংস রান্না হবে তা আগ বাড়িয়ে বলিনি। সে নিজেও জানতে চায়নি। কাজ থেকে ছাড়া পেয়ে সে ড্রইংরুমে বসে মনের আনন্দে টিভি দেখেছে। মেয়েটি যা খায় না, তাকে সেটার কিছুই যেন দেখতে না হয়, সেটার গন্ধও যেন তার নাকে না যায়, সেই ব্যবস্থা আমি করেছিলাম। যে মুসলমান শূকর খায় না, আমি নিজে শূকর খেলেও তাকে আমি শূকর খেতে বলি না, তার পাতে আমি শূকরের শূ-ও দিই না, তাকে যথাসম্ভব দূরে রাখি শূকর থেকে। আমি এমনই, আমি নিজে কোনো ধর্মীয় উৎসব করি না, কিন্তু কাউকে পুজো বা ঈদ বা ক্রিসমাস বা হানুকা বা বুদ্ধ পূর্ণিমার উৎসব করতে বাধা দিই না। তারা নিজেরা যখন সিদ্ধান্ত নেবে ধর্মীয় সংস্কারের ঊর্ধ্বে ওঠার, যখন ধর্মান্ধতা থেকে বিজ্ঞান মনস্কতায় তাদের উত্তরণ ঘটবে, যখন বোধের উন্মেষ হবে তাদের, যখন তারা নিজেরাই যুক্তিবাদী হয়ে উঠবে, কোনো খাদ্যকে হালাল আর হারামে ভাগ করবে না, তখনই তারা খাদ্য নিয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা মানবে না। স্বেচ্ছায় এই কর্মটি করা উচিত। কারও চাপে নয়, কারও ভয়ে নয়। কারও দ্বারা মগজধোলাই হয়ে নয়। ঠিক বিপরীত একটি উদাহরণ আমি দিতে পারি, কেউ যদি হিজাব বা বোরখা পরতে চায়, সে তার নিজের একক সিদ্ধান্তে পরুক। কেউ তাকে জোর না করুক, কেউ হুমকি না দিক, কেউ ভয় না দেখাক। কেউ মগজধোলাই না করুক। নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা দিয়ে যদি সুস্থ মস্তিষ্কে হিজাব বা বোরখা পরার সিদ্ধান্ত কেউ নিয়ে থাকে, নিরাপত্তার প্রশ্ন না উঠলে তার হিজাব বা বোরখা খুলে নেওয়ার অধিকার কারও থাকা উচিত নয়। যদি পরিবারের বা অন্য কারও চাপে মানুষ কোনো ধর্মীয় পোশাক পরে, তখন সেই পোশাক পরার পক্ষে কোনো সচেতন মানুষ থাকে না। আমি তো কেউ যদি সিরিয়াসলি ভেবে-চিন্তে আত্মহত্যা করারও সিদ্ধান্ত নেয়, বিশেষ করে দুরারোগ্য ব্যাধিতে যে আক্রান্ত, এবং এমন যন্ত্রণায় ভুগছে, যে যন্ত্রণা থেকে এ জীবনে কোনো ওষুধেও মুক্তি পাবে না আর, আমি তার আত্মহত্যার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কিছু বলব না। বেঁচে থাকার যেমন অধিকার আছে মানুষের, মরে যাওয়ার অধিকারও আছে। ডাক্তারের সহযোগিতায় স্বেচ্ছামৃত্যু আজকাল সভ্য দেশগুলো ধীরে ধীরে মেনে নিচ্ছে।

কলকাতায় কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় আর আমার এক কবিবন্ধুর বিফ খাবার ঘটনা উল্লেখ করলাম এই জন্য যে, সুদীপা চট্টোপাধ্যায় নামের এক সেলিব্রিটি শেফ বাংলাদেশের এক টিভি চ্যানেলে ঈদের রান্নার একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, যেখানে গরুর মাংস রান্না হচ্ছিল। চ্যানেলের উচিত হয়নি একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে আমন্ত্রণ জানিয়ে গরুর মাংস রান্নার আয়োজন করা। ভাবা উচিত ছিল কলকাতার কোনো রান্নার অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ইসলাম ধর্মাবলম্বী কাউকে আমন্ত্রণ জানিয়ে শূকরের মাংস রান্নার আয়োজন করলে কেমন বোধ করবে আমন্ত্রিত অতিথি। অনুষ্ঠানের সেদিন যে মেয়েটি গরুর মাংসের কোফতা রান্না করেছিলেন, তিনি বলেছেন, টেলিভিশন চ্যানেলের ওই রান্নার অনুষ্ঠানে কবে কী রান্না হবে, তা আগে থেকেই ঠিক করা থাকে। আগে থেকে ঠিক করা থাকলেও জরুরি ভিত্তিতে কোনো রান্না বদলানো যায় না, তা আমি বিশ্বাস করি না। গরুর মাংসের কোফতার বদলে খাসির মাংসের কোফতা বানালে কী এমন তাণ্ডব ঘটে যেত! সুদীপা সেদিন গরুর মাংসের কোফতা রান্নাও করেননি, খানওনি। কিন্তু কলকাতায় ফেরার পর তিনি হুমকি পাচ্ছেন, তাঁকে নাকি মেরে ফেলা হবে, তাঁর ছেলেকে অপহরণ করা হবে। তিনি ছেলেকে স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। যে মানুষটি বিফ খাওয়ার পক্ষে কোনো কথা বলেননি, বিফ খাননি, বিফ রান্নার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বলে বারবার ক্ষমা চেয়েছেন, তাঁকে আশঙ্কায় কুঁকড়ে থাকতে হচ্ছে, তাঁকে ভুগতে হচ্ছে। যে উগ্রবাদীরা তাঁকে ভোগাচ্ছে, তারা কেন সেসব হিন্দু বিফখোরকে হুমকি দেয় না, যারা কলকাতা শহরে প্রকাশ্যে গরুর মাংস খেয়ে অসাম্প্রদায়িক হতে চেয়েছিল? তারা ক্ষমতাবান বলে? তাহলে হুমকি শুধু ক্ষমতাহীনদের বিরুদ্ধে, নারীর বিরুদ্ধে, অসহায় মানুষের বিরুদ্ধে?

মাঝে মাঝে আমার মনে হিন্দু উগ্রবাদীরা মুসলিম উগ্রবাদীদের কাছ থেকে শিখেছে পান থেকে চুন খসলেই হুঙ্কার দেওয়া, অতি ছোট ছোট কারণে বড় বড় হুমকি দেওয়া, এমনকী প্রাণে মেরে ফেলার প্রতিজ্ঞা করা। ব্রাহ্মণদের বিফ খাওয়ার কথা তো বেদেই আছে। ভারতীয় সংবিধানের জনক আম্বেদকার বলেছিলেন, ‘ব্রাহ্মণরা এক সময় গরুসহ নানা রকম পশু জবাই করত, এবং তারা ছিল সর্বশ্রেষ্ঠ গোমাংস ভক্ষক। এই ব্রাহ্মণরা এক সময় নিজেরাই শুধু গরুর মাংস খাওয়া ছেড়ে দেয়নি বরং একটি ইচ্ছাকৃত কৌশল হিসেবে গরুর পূজাও শুরু করে। ধারণা করা হয়, বৌদ্ধ ধর্ম এবং ব্রাহ্মণ্যবাদের মধ্যে লড়াই চলছিল, এবং বৌদ্ধ ধর্মের ওপর ব্রাহ্মণ্যবাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য গরু পূজার সূচনা করা হয়েছিল।’

ভারতের বিখ্যাত এবং প্রভাবশালী হিন্দু মুসলিম বৌদ্ধ খ্রিস্টান অনেকেই ভালোবেসে বিফ খান। কিন্তু উগ্রবাদীরা তাঁদের টিকির নাগাল পায় না, কিন্তু মেরে ফেলে রাস্তাঘাটের আর বাস-ট্রেনের সাধারণ মানুষকে, অসহায় দরিদ্র লোককে, মহারাষ্ট্রের আফান আবদুল আনসারি আর নাসির হুসেনকে, উত্তরপ্রদেশের মোহাম্মদ আখলাককে, বিহারের নাসিম কুরেইশিকে, হরিয়ানা-রাজস্থানের জুনাইদ আর নাসিরকে।

খাদ্যে ধর্ম থাকে না, ধর্ম থাকে মনে। ভালো মানুষ হিসেবে পৃথিবীতে বাস করার ধর্ম এক, স্বর্গে যাওয়ার বা জান্নাতে যাওয়ার ধর্ম আরেক। স্বর্গে বা জান্নাতে যাওয়ার স্বার্থে যে ধর্ম, সেই ধর্ম মানুষকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করতে দ্বিধা করে না। এই ভায়োলেন্ট ধর্মটিই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

শূকরের মাংস খাওয়া নিষেধ ইহুদিদের, মুসলমানদের আর খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সেভেন্থ ডে অ্যাডভেন্টিস্টদের, তাই বলে তারা খাচ্ছে না শূকর? প্রগতিশীলরা তো খাচ্ছেই। যে সম্প্রদায়ে প্রগতিশীলের সংখ্যা বেশি, সে সম্প্রদায়ে খাবারকে হারাম হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা কম।

আমি মনে করি, সব খাবারই হালাল। যার যা খেতে ইচ্ছে করে, সে সেটা খাবে। কোনো ধর্মের নামে কারও স্বাধীনতাকে আক্রমণ করা হলে, সেই ধর্মের প্রতি মানুষের বিতৃষ্ণা জন্মায়। কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ- স্বাধীনতা। উগ্রবাদীরা প্রতিটি ধর্মকেই মনস্টার বানিয়ে ফেলতে চাইছে। উগ্রবাদীদের হাত থেকে ধর্মকে রক্ষা করতে সবারই এগিয়ে আসা উচিত।

লেখক : নির্বাসিত লেখিকা

এই রকম আরও টপিক

সর্বশেষ খবর