শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২৫ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৪ মার্চ, ২০১৯ ২৩:৩৯

সে হারালো কোথায় কোন দূর অজানায়...

আলী আফতাব

সে হারালো কোথায় কোন দূর অজানায়...
জন্ম : ২ জানুয়ারি, ১৯৫২ ॥ মৃত্যু : ২৩ মার্চ, ২০১৯

যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়/ সে হারালো কোথায় কোন দূর অজানায়/ সেই চেনা মুখ কতদিন দেখিনি/ তার চোখে চেয়ে স্বপ্ন আঁকিনি/...। বাংলা গানে কিংবদন্তিতুল্য খ্যাতিসম্পন্ন গায়িকা শাহনাজ রহমতুল্লাহ নিজের গাওয়া গানের কথার মতোই মানুষের দৃষ্টিসীমার বাইরে চিরদিনের মতো চলে গেলেন। শনিবার রাত প্রায় সাড়ে ১১টায় আকস্মিকভাবে বারিধারার নিজ বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

দেশাত্মবোধক গানে এদেশে অপ্রতিদ্বন্দ্বী এক কণ্ঠস্বর শাহনাজ রহমতুল্লাহ। তার গাওয়া কালজয়ী দেশাত্মবোধক অজস্র গানের মধ্যে তিনটি- ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল’ বিবিসি জরিপে সর্বকালের সেরা কুড়িটি বাংলা গানের তালিকায় স্থান অর্জন করে নেয়। এ ছাড়া শাহনাজ রহমতুল্লাহর গাওয়া দেশাত্মবোধক ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’, ‘আমায় যদি প্রশ্ন কর’ বাংলা গানের ভুবনে চিরস্থায়ী আসন পেয়েছে।

শাহনাজ রহমতুল্লাহর জন্ম ১৯৫২ সালের ২ জানুয়ারি ঢাকায় এক সম্ভ্রান্ত সাংস্কৃতিক পরিবারে। তার বাবা এম ফজলুল হক, মা আসিয়া হক। বাবার অনুপ্রেরণা আর মায়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে একেবারে ছোটবেলায় শাহনাজের গানে হাতেখড়ি। তার দুই বড় ভাই সুরকার আনোয়ার পারভেজ ও নায়ক-কণ্ঠশিল্পী জাফর ইকবাল নিজ নিজ ক্ষেত্রে বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। তারা দুজনও এখন প্রয়াত। মাত্র ১১ বছর বয়সে ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান রেডিওতে গান গাইতে শুরু করেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ। সে সময় তার নাম ছিল শাহনাজ বেগম। একই বছর চলচ্চিত্রের গানে তার আত্মপ্রকাশ। ১৯৬৪ সালে শুরু করেন টেলিভিশনে গান গাওয়া। অল্পকালের মধ্যে সারা দেশে গায়িকা হিসেবে তুমুল জনপ্রিয়তা লাভ করেন কিন্নরকণ্ঠের এ গায়িকা। বড় ভাই আনোয়ার পারভেজের সুর ও গাজী মাজহারুল আনোয়ারের কথায় অজস্র গানে কণ্ঠ দেন শাহনাজ। আনোয়ার পারভেজ ছাড়াও আলাউদ্দীন আলী, খান আতাসহ দেশের প্রথিতযশা সুরকার-গীতিকারদের গানে কণ্ঠ দেন তিনি। ষাটের দশকে পশ্চিম পাকিস্তানে গজল সম্রাট মেহেদী হাসানের কাছে সরাসরি গান শেখেন তিনি। ১৯৭৩ সালে আবুল বাশার রহমতুল্লাহর সঙ্গে তার বিয়ে হয়। শাহনাজ রহমতুল্লাহ ক্যারিয়ারের ৫০ বছর পূতির্র সঙ্গে সময় থাকতেই গান থেকে বিদায় নেন। এ ছাড়া আরও একটি কারণ হলো ধর্মপরায়ণ জীবন বেছে নেওয়া।

শাহনাজ রহমতুল্লাহকে ১৯৯২ সালে একুশে পদক দেওয়া হয়। ১৯৯০ সালে ‘ছুটির ফাঁদে’ ছবিতে গান গেয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়া ২০১৬ সালে ‘চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’ আয়োজনে আজীবন সম্মাননা, ২০১৩ সালে সিটি ব্যাংক থেকে গুণীজন সংবর্ধনা দেওয়া হয় তাঁকে। এ ছাড়া গান গেয়ে আরও অসংখ্য পুরস্কার আর সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।

১৯৬৩ সালে ‘নতুন সুর’ ছবির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে গান গাওয়া শুরু করেছিলেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ। গানের জগতে ৫০ বছরে শাহনাজ রহমতুল্লাহর চারটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমটি ছিল প্রণব ঘোষের সুরে ‘বারোটি বছর পরে’, তারপর প্রকাশিত হয় আলাউদ্দীন আলীর সুরে ‘শুধু কি আমার ভুল’।

 

উল্লেখযোগ্য গান

বিবিসির জরিপে সর্বকালের সেরা ২০টি বাংলা গানের তালিকায় শাহনাজ রহমতুল্লাহর গাওয়া গানই চারটি! এগুলো হলো- ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’ এবং ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল’। এছাড়া ‘যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়’, ‘ফুলের কানে ভ্রমর এসে’, ‘ওই ঝিনুক ফোঁটা সাগর বেলায়’, ‘পারি না ভুলে যেতে’, ‘যেভাবে বাঁচি বেঁচে তো আছি’, ‘আমি সাত সাগরের ওপার হতে’, ‘শোনেন শোনেন জাঁহাপনা’, ‘কে যেন সোনার কাঠি ছোঁয়ায় প্রাণে’, ‘আমি যে কেবল বলে তুমি’, ‘একটু সময় দিলে না হয়’, ‘স্বপ্নের চেয়ে সুন্দর কিছু নেই’, ‘আবার কখন কবে দেখা হবে’, ‘যদি চোখের দৃষ্টি দিয়ে চোখ বাঁধা যায়’, ‘তোমার আগুনে পোড়ানো এ দুটি চোখে’, ‘তুমি কি সেই তুমি’, ‘ও যার চোখ নাই’, ‘ঘুম ঘুম ঘুম চোখে’, ‘আমি তো আমার গল্প বলেছি’, ‘বন্ধুরে তোর মন পাইলাম না’, ‘খোলা জানালায় চেয়ে দেখি তুমি আসছ’, ‘একটি কুসুম তুলে নিয়েছি’, ‘আমায় তুমি ডাক দিলে কে’, ‘ওই আকাশ ঘিরে সন্ধ্যা নামে’, ‘আমার ছোট্ট ভাইটি মায়ায় ভরা মুখটি’, ‘আষাঢ় শ্রাবণ এলে নেই তো সংশয়’, ‘বারোটি বছর পরে’, ‘আরও কিছু দাও না দুঃখ আমায়’, ‘আমি ওই মনে মন দিয়েছি যখন’, ‘আমার সাজানো বাগানের আঙিনায়’, ‘দিগন্ত জোড়া মাঠ’ ইত্যাদি।


আপনার মন্তব্য