প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল, ২০২১ ২০:৩০
প্রিন্ট করুন printer

কার দুঃখগাঁথার গল্প কত বেদনার...

দেবী গাফফার

কার দুঃখগাঁথার গল্প কত বেদনার...
দেবী গাফফার

‘আমার নক্ষত্ররা’। এই চলচ্চিত্র জগতে আমার অনেক দিনের চলা। যদিও আমি কোন অভিনয় করিনি। কয়েকটি ছবিতে প্রযোজক ছিলাম মাত্র।ফ্রেন্ডস মুভি ছিলো আমাদের প্রোডাকশন এর নাম। আমার বড় ভাই ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম বোধহয় আশি সালের আগে থেকে চলচ্চিত্রকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন।

সেই সুবাদে ফিল্মের অনেক শিল্পীকে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। অনেকে আমার ভাই এর সাগরেদ ছিলেন বিধায় বাসায় কারাতে প্রেকটিস করতে আসতেন। নাম বলতে গেলে লেখা লম্বা হয়ে যাবে। কোন এক শুটিং-এ পারভেজ ভাই (সোহেল রানা উনাকে আমি ভাইয়া বলে ডাকি) কক্সবাজার উপল বা প্রবালে উনারা ছিলেন। আমার বয়স বোধহয় বাউ কি তেও হাহা। জিদ ধরলাম ভাইয়াকে দেখবো। আমার ভাই নিয়ে গেলেন।

ঐদিন প্রথম পারভেজ ভাইকে সামনা-সামনি দেখলাম। তারপর মেঘে মেঘে অনেক বেলা বয়ে গেল। ৮৫ সালে পাকাপাকিভাবে ঢাকা আমার জীবন শুরু হলো। আমি অতিরিক্ত শুকনা থাকার কারণে বয়স বোধ হয় কমই লাগতো। এফডিসিতে কোন এক ফ্লোরে কবরী ভাবির সাথে দেখা হয়। আদর করে পাশে বসিয়ে সব জিজ্ঞেস করলেন, বাড়ি কোথায় কয় ভাইবোন। বাড়ি কক্সবাজার শুনে বারবার আদর করছেন আর প্রডাকশন বয়কে ডেকে বলছেন, এই ভাবিকে এটা দাও ওটা দাও।

সেদিন থেকে আমিও উনাকে ভাবি বলেই ডাকি। যতক্ষণ ছিলাম দু’জন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলছিলাম। একসময় হাসতে হাসতে উনি বললেন, শুন তুমি তো বাল‍্যবিবাহের অপরাধে জেলে যাবে। সেটের সবাই হাসাহাসি করছিলেন। তারপরে ২০০৪ এফডিসির কোন এক কাজে কবরী ভাবি আমাকে বারবার ফোন করেছিলেন, তখন রাজীব সাহেব ক‍্যান্সার আক্রান্ত। কবরী ভাবির সেই কাজ আমার হাতে ছিলো না বলে আমি উনার কোন উপকারে আসতে পারিনি। এফডিসির কাজ।

এর মাঝে কতো জায়গায় দেখা হয়েছে। আর দেখা হবে না। চলে গেলেন। তেমন মনে পড়ছে রাজ্জাক ভাই এর কথা। ১৯৮৫ সালে কোন এক শুটিংয়ে আমার প্রথম রাঙ্গামাটি যাওয়া। সর্বনাশ তাও ফ্লাইটে (ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম)। আমি কোনদিন ফ্লাইটে চড়িনি, বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটা হচ্ছে কেমন করে ফ্লাই করবো কি হবে। নতুন বউ, কাতান শাড়ি পরতে হয়েছে। ঢাকা এয়ারপোর্টে যখন বেবিট্যাক্সি থেকে নামলাম আমি আমার ভিতরে মোটামুটি একটা ভূমিকম্প অনুভব করলাম।

মনে মনে উনার চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করছি, কেনো বাসে গেলেন না। বেবিট্যাক্সি থেকে নেমে দুই পা দিতেই আমি হাটু পরিমাণ পানির মধ্যে ধপাস। সাথে সাথে অনেকেই ছুটে আসলেন, উঠানোর জন‍্য। রাজীব সাহেব হেসে বললেন, বঙ্গোপসাগরের মেয়ে ভাই মাছ ধরার অভ‍্যাস।

সবাই হেসে আমাকে বুঝালেন কোন ব‍্যাপার না। রাঙ্গামাটি পৌঁছে বুঝলাম আমার ডান পা মাটিতে বসতে রাজি না। উনি আস্তে আস্তে হাতির পায়ের রূপ ধারণ করছেন। রাজ্জাক ভাই আগে থেকে পর্যটন হোটেলেই ছিলেন। রাজ্জাক ভাই সিনিয়র হিরো, আমার ফ্রেস হয়ে উনাকে সালাম করতে যেতে হবে।

কোনমতে উনার রুম অবধি পৌঁছনোর পর আমি তো আর পা মাটিতে ফেলতে পারছি না। রাজ্জাক ভাই খেয়াল করলেন। বললেন, কি হলো বউমা? রাজীব সাহেব বললেন, ঢাকা এয়ারপোর্টে মাছ ধরার চেষ্টা। ঐবার দেখলাম একজন দায়িত্ববোধ সম্পন্ন ভাই কি করেন।

সাথে সাথে বেয়ারা ডেকে গরম পানি লবণ দিয়ে আমার পা ভিজিয়ে রাখতে বললেন। নিজের ব‍্যাগ থেকে নাপা বের করে আমাকে খাওয়ালেন। ঐ মুহূর্তে মনে হয়নি আমি একা, মনে হয়েছিলো আমার বড় ভাই আমার পাশেই আছেন। তারপর সময়-সময়ের নিয়মে গড়াতে থাকলো। মাঝে মাঝে দেখা হয় এফডিসিতে। বউমা বলে যখন কথা বলতেন মন ভরে যেতো।

৯৫-তে আমার জয়-বিজয় চলে গেল। রাজ্জাক ভাই এর মেয়ে ও না ফেরার দেশে চলে গেলে। ৯৬-তে কক্সবাজার আরেকটা শুটিংয়ে বাচ্চাদের নিয়ে কক্সবাজার যাই। জাম্বু ভাই আমার বড় ছেলে দীপকে শুটিংয়ের রসি দিয়ে বেঁধে ক্রিস দিয়ে কাটার ভান করছেন, আর বড় কন‍্যা রোজার দিকে তাকাচ্ছেন।

মুহূর্তে রোজা কেঁদে শুটিং এর লাঠি নিয়ে জাম্বু ভাইকে ছোট ছোট হাত দিয়ে আঘাত করে আর বলে, আমার ভাইকে ছাড়। রোজা প্রচণ্ড গালি দিতো, কারণ কক্সবাজারের কাজের মেয়েরা ওদের দেখাশোনা করতো। কাজের মেয়েরা ঝগড়া করে একজন আর একজনকে যা গালি দিতো রোজা সব মুখস্থ করতো।

রোজার গালি লাঠিচার্জ সব মিলে সেদিন সবাই খুব মজা করেছিলো। সেই জাম্বু ভাই নেই। জাম্বু ভাই এর সাথে অনেক দুষ্টুমি করতাম। খুব মানতেন। ভাবিজি বলতেন। উনি ও নেই। বেলা গড়াচ্ছে, রাজ্জাক ভাই এর জন্য ক‍্যামেরা রেডি, কিন্তু ভাই আমার যাচ্ছেন না।

একের পর এক প্রশ্ন করছেন, জয়-বিজয় কেমন করে মারা গেলে, উনার মেয়ে কেমন করে মারা গেলে বলতে থাকলেন। আমরা ভাইবোন গুধূলি বেলায় বসে সন্তান হারানোর আর্তনাদ করে যাচ্ছি। কার দুঃখগাঁথার গল্প কত বেদনার শেয়ার করছি আর আমাদের দু’জনের চোখের পানির কাছে সমুদ্রের পানি লজ্জা পেয়ে হালকা শব্দ করে আছড়ে পড়ছে।

আমার রাজ্জাক ভাইও নেই। বউমা ডাকারও কেও রইলো না। 

চলবে...।

(ফেসবুক থেকে সংগৃহীত)

বিডি-প্রতিদিন/শফিক