Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : ২৪ জুলাই, ২০১৯ ১৭:৪৬
আপডেট : ২৪ জুলাই, ২০১৯ ১৯:১৮

‘কিং কং’ এর মত প্রাণী বাস্তবে আছে, নাকি নাই? (ভিডিও)

অনলাইন ডেস্ক

‘কিং কং’ এর মত প্রাণী বাস্তবে আছে, নাকি নাই? (ভিডিও)

‘কিং কং’কে মনে আছে আপনাদের? সেই যে বিশালাকারের প্রাণী? ১৯৩৩ সালে জন্ম নেয়া ‘কিং কং’ ভারত মহাসাগরের এক রহস্যময় দ্বীপে বাস করত। এই দানব গরিলা চরিত্র ‘কং’কে বারবার ফিরিয়ে আনা হয়েছে রুপালি পর্দায়। তার প্রত্যাবর্তন কখনও হয়েছে একা, কখনও বা তার সঙ্গী হয়েছে জাপানি জলদানব গডজিলা। যে রূপেই হোক, ‘কিং কং’কে ভালবেসে বারবার হলে গিয়েছে দর্শক। ব্যবসার মুখ দেখেছেন প্রযোজকরা। ১৯৩৩ সালের মুক্তি পাওয়া ‘কিং কং’ মুভিটি রোটেন টমেটোস এর রেটিং অনুযায়ী সর্বকালের অন্যতম ভীতিকর মুভি। 

এক দানব আকৃতির গরিলার সঙ্গে  নিতান্ত সাধারণ মেয়ের প্রেম হয়ে যায়। এরপর কত লড়াই, কত রক্তারক্তি- টিভি পর্দা কাঁপানো এমন ‘কিং কং’ এর দানবাকৃতির গরিলা কী বাস্তবে রয়েছে? কখনো কী ছিল? এ নিয়েই আজকের ফিচার।

বাস্তবে ‘কিং কং’ আছে নাকি নাই, সে বিতর্কে যাওয়ার আগে সবাইকে বলে রাখতে চাই ‘কিং কং’ এর ধারণা কিন্তু বাস্তব প্রাণী থেকেই এসেছে। গরিলা নামের এই প্রাণীকে আমরা সবাই চিনি। মূলত গরিলার স্বাভাবিক আকৃতিকে তিন-চারগুণ বড় দৈত্যকার প্রাণী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে ‘কিং কং’কে। তাই সবার আগে আসুন চিনি গরিলাকে। গরিলা মূলত প্রাইমেট বর্গেও বিশালাকৃতির একটি প্রাণী। শিম্পাজি, ওরাংওটান, বানর, নরবানর এবং মানুষ প্রাণী শ্রেণিবিন্যাস অনুসারে এই গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত।

রাতের বেলায় বিশালাকৃতির গরিলাকে দেখে পিলে চমকানো দৈত্যের কথা মনে হবে। গরিলাদের ওজন ৩০০  থেকে ৫০০ পাউন্ড হয়। এদের উচ্চতা প্রায় ৬ ফুট। এক একটি গরিলা মানুষের চেয়ে প্রায় ৪ থেকে ৮ গুণ বেশি শক্তি ধারণ করে। গরিলার হাত মানুষের হাতের চেয়ে শুধু লম্বা ও পেশিবহুলই নয়, গরিলার হাত তার পায়ের চেয়ে ২০% বেশি লম্বা। মুখ, বুক, হাত ও পায়ের তালু ছাড়া গরিলার দেহের প্রায় সবটাই ঘণ লোমে আবৃত থাকে।

গরিলা সাধারণত দু’হাত ও দু’পায়ে ভর দিয়ে হাঁটে। তবে দাঁড়িয়েও হাঁটতে পারে। মানুষের মতই গরিলাদেরও হাতে-পায়ে দশটি করে আঙুল আছে। এদের দাঁতের সংখ্যাও বত্রিশটি।  গরিলার কান ছোট আকৃতির। গরিলা এমনিতে লাজুক ও শান্ত প্রকৃতির। রেগে গেলে দু’হাত দিয়ে বুক চাপড়ায়-চিৎকার করে। কাতুকুতু দিলে গরিলা হাসে। কাঁদলেও চোখের পানি ফেলে না। গরিলা মানুষের মতো কথা বলতে পারে না, তবে প্রশিক্ষিত গরিলা সংকেতসহ মানুষের ভাষা বুঝতে পারে। এমনিতে বিচিত্র ধ্বনি ও শব্দ করে এবং গন্ধ শুঁকে শুঁকে তারা সামাজিক যোগাযোগ রক্ষা করে। এদের মধ্যে প্রেম, বিদ্বেষ, ঘৃণা, ভয়, আনন্দ ও লোভ এসব আবেগও আছে।

গরিলা নিরামিষভোজী। বিশ্রামে থাকা ছাড়া প্রায় সবসময়ই গাছের পাতা, কচিকাণ্ড, পোকামাকড়, ফল ও লতা খায়। মধ্য আফ্রিকা বিশেষত রুয়ান্ডা, উগান্ডা ও কঙ্গোর গভীর বন-জঙ্গলে গরিলাদের বসবাস। পার্বত্য অঞ্চলের গহিন বনে পাহাড়ি গরিলা দেখতে পাওয়া যায়। এরা অপেক্ষাকৃত বড় ও মোটা, হাত খাটো এবং লম্বা ঘণ লোমের অধিকারী। গরিলাকে খুবই বুদ্ধিমান প্রাণী মনে করা হয়। মূলত গরিলাদের এই জীবনকে চলচ্চিত্রের রূপালী পর্দায় তুলে আনতে গিয়ে কল্পনার মিশেলে জন্ম হয়েছে ‘কিং কং’ এর। স্বভাবতই প্রশ্ন আসে তাহলে ‘কিং কং’  কী কেবলই কল্পনা? নাকি দূর অতীতের গরিলারা ‘কিং কং’ এর মতোই দানবাকৃতির ছিল?

মজার ব্যাপার হলো ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক এ একবার একটা খবর বেরিয়েছিল। খবরটা একটা ১ লাখ বছর বয়সী ফসিলের। গিগান্টোপিথেকাস বলে খ্যাত সেই ফসিলটিা ইঙ্গিত দেয় যে ‘কিং কং’ ছিল। কিন্তু শরীরের দিক দিয়ে অনেক বড় হওয়ার কারণে তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। ১৯৩৩ সালে চলচ্চিত্র পরিচালক মেরিয়ান সি কুপার প্রথম ‘কিং কং’ এর মতো বিরাট প্রাণীর ধারণা আনেন। ‘কিং কং’ নামে তৈরি প্রথম সেই চলচ্চিত্রেটিতে দেখানো হয় একটি দ্বীপে বিরাট একটি প্রাণীর খোঁজে বেরিয়ে পড়ে কয়েকজন। সেই প্রাণীটির নাম ছিল কং। কং সেই দলের একজন মেয়ের প্রেমে পড়ে যায়। কোনোভাবে সেই মেয়ে সেখান থেকে বেঁচে যায় এবং সেই দল কং’কে নিউ ইয়র্কে নিয়ে আসে এবং খাঁচায় বন্দী করে সেটাকে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে। এরপর সেখান থেকে বের হয়ে কং পুরো শহরকে ধ্বংস করতে শুরু করে এবং পছন্দের মেয়েটিকে নিয়ে পালাতে চায়। এটির পরও ‘কিং কং’ নিয়ে অনেক চলচ্চিত্র এবং টিভি সিরিজ তৈরি হয়েছে। এখনো হলিউডে ‘কিং কং’ বেশ জনপ্রিয়।

চলুন জেনে নেয়া যাক ‘কিং কং’ বিষয়ে বিজ্ঞান কী বলে? বিজ্ঞান বলছে যে বাস্তবে  ‘কিং কং’ এর মত প্রাণী হওয়া সম্ভব নয়। সিনেমা-নাটকে আমরা যে দৈত্যাকার প্রাণীটি দেখে অভ্যস্ত, সেটি নেহায়েতই ফিকশনের প্রয়োজনে তৈরি। মানুষের উর্বর মস্তিষ্কের কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু বিজ্ঞানের ব্যাখাটা কী? এর ব্যাখ্যা বোঝার জন্য জ্যামিতি সম্পর্কে আপনার স্বচ্ছ ধারণা থাকতে হবে। বলে রাখা ভালো, আমাদের চেনা পৃথিবীর চেনা জানা সমস্ত প্রাণীই জ্যামিতিকভাবে সদৃশ বা পারফেক্ট। কোনো বস্তুর জ্যামিতিক সদৃশতা পরিমাপ করতে হলে, সেই বস্তু একই ধরনের পদার্থ দিয়ে তৈরি হতে হবে। আর এক্ষেত্রে সেগুলোর ওজন ভরের সমানুপাতিক হতে হবে এবং ভরকে আয়তনের সমানুপাতিক হতে হবে। 

বোঝার সুবিধার্থে আমরা একটি ঘণকের কথা চিন্তা করতে পারি এবং ‘কিং কং’কে একটি ঘণকের ন্যায় মনে করতে পারি।  ধরি, ‘কিং কং’ এর শরীর অনেকগুলো ছোট ছোট কিউব দিয়ে গঠিত। বিজ্ঞানের ছাত্ররা জানবে, যে কোনো প্রাণীর ভর সহ্য করার ক্ষমতা সে প্রাণীর ভেতরের হাড়গুলোর ক্ষেত্রফলের সমানুপাতিক।  এর ফলেই প্রাণীটি তার নিজের ভর নিজে নিতে পারবে এবং এই ভর পুরো শরীরের ক্ষেত্রফলের সমানুপাতিক হবে। এসব নিয়মে ‘আকার’ বলতে কোনও প্রাণী বা বস্তুর উচ্চতা, দৈর্ঘ্য-প্রস্থ ইত্যাদি বোঝানো হয়েছে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে উচ্চতা। যেহেতু ‘কিং কং’ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে, তাই তার মেরুদণ্ড এবং হাড়গুলোকে ‘কিং কং’ এর ওজন ধরে রাখতে হবে এবং চলাচল করার সময় ভার বহন করতে হবে। আর সমস্যাটা এখানেই। কোনো বস্তুর ওজন তার আকারের ঘণকের সমানুপাতিক। আবার কোনো প্রাণীর ভর সহ্য করার ক্ষমতা তার আকারের বর্গের সমানুপাতিক। এভাবে আমরা ধরে নিয়ে যদি পাঁচ ফুট গরিলাকে জ্যামিতিক সাদৃশ্যতা মেনে এর আকার বাড়াতে থাকি, তাহলে সেটার ওজন এবং শক্তি দুটোই বাড়তে থাকবে। কিন্তু এখানে ওজন এবং শক্তি একসাথে বাড়লেও এ দুটির মধ্যে কোনটি দ্রুত বাড়বে সেটাও দেখার বিষয়। এখানে দেখা যাচ্ছে, আকার বাড়ার সাথে সাথে শক্তির তুলনায় ওজন অনেক দ্রুত বাড়তে থাকে। আকার যদি ২ একক বাড়ে, তাহলে সূত্রমতে ওজন বাড়বে ৮ একক, আবার আকার যদি ২ একক বাড়ে তাহলে শক্তি বাড়বে ৪ একক।

বিভিন্ন চলচ্চিত্রে পাঁচ ফুট লম্বা কোনো গরিলাকে ধরে নিয়ে সেটা স্কেল দিয়ে পরিমাপ করে সেটার গাণিতিক অনুপাত ঠিক রেখে সেটাকে ত্রিশ ফুট লম্বা একটি প্রাণীতে পরিণত করা হয়েছে। পুরোটাই আসলে মানুষের ভিশন, গণিত এবং ক্যামেরার কারসাজিতে করা। আর গত বিশ বছরে অ্যানিমেশন এগিয়ে গেছে অনেক দূর। তাই সিনেমায় যে বিশালাকারের প্রাণীটিকে আমরা মানুষের মতো আচরণ করতে দেখি সেটি আসলে সিনেমাই। বাস্তবে আসলে এ ধরনের প্রাণী কখনো ছিলোই না। আর এই সময়ে এসেতো সেটা একেবারেই অসম্ভব।

এরপরও যদি কোনো কারণে কেউ বিশ্বাস করে যে এমন প্রাণী থাকতে পারে তাহলে তাকেও মানতে হবে এমন প্রাণীর আর যাই হোক এভাবে চলাচল করা ও এতো সহজে তাণ্ডবলীলা চালানোর ব্যাপারটি আরো বেশি অসম্ভব। ‘কিং কং’ এর মত এত বিশাল একটা প্রাণী নিজের ভার নিজেই বহন করতে পারবে না। কারণ তার শরীরের হাড়গুলোর এত ওজন নিতে সক্ষম হওয়ার কথা নয়, এটা বৈজ্ঞানিকভাবে মেলে না। তাই ‘কিং কং’ এর মত বড় প্রাণী তাণ্ডবলীলা চালানো দূরে থাকুক  নিজের ওজন আর না নিতে পারার কারণে তার ভেঙে পড়ার কথা! তাই বলা যায় সিনেমার ‘কিং কং’ বাস্তবিক হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই নেই।
 
ভিডিও 

বিডি-প্রতিদিন/শফিক


আপনার মন্তব্য