শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১১ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ জানুয়ারি, ২০১৭ ২৩:২৬

১/১১ এর খলনায়করা কে কোথায়

নিজস্ব প্রতিবেদক

Google News

ওয়ান-ইলেভেনে আলোচিত-সমালোচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমেদ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড স্টেটের পটোম্যাকে বসবাস করছেন। সেখানে তার দুটি বাড়ি। একটিতে সস্ত্রীক থাকছেন। অন্যটিতে থাকেন তার কন্যার পরিবার। সেখানেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সামনে খুব একটা বের হন না তিনি। একবার এক জানাজা অনুষ্ঠানে গিয়ে তোপের মুখে পড়ে দ্রুত কেটে পড়েন। স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা করেই দিন কাটে তার। ওই সময় সবচেয়ে বেশি সমালোচিত ছিলেন তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ। তিনিও থাকেন নিউইয়র্কের একটি ভাড়া বাড়িতে। ক্যান্সারে আক্রান্ত এক সময়ের প্রভাবশালী সেনা কর্মকর্তার এখন সময় কাটে নীরবে নিভৃতে। 

শুধু এই দুজনই নন, ওয়ান-ইলেভেনের সেই খলনায়কদের বড় অংশই থাকছেন দেশের বাইরে। দেশে দু-একজন যারা আছেন, তারাও অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালে। সেই দাপুটে খলনায়কদের কেউই ভালো নেই। রোগে-শোকে কেউ অসুস্থ। অর্থকষ্টে চাকরি করেও সময় কাটছে কারও কারও। শিক্ষকতা, ব্যবসা ও পরামর্শকসহ নানা কাজে নিয়োজিত অনেকেই। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিয়ে স্থায়ীভাবে সেখানে থাকছেন ফখরুদ্দীন আহমেদ ও সেনা প্রধান মইন উ আহমেদ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মামলা ও রাজনৈতিক হয়রানি থেকে নিজেদের রক্ষার জন্যই ২০০৯ সালের পরপরই মূল কুুশীলবরা দেশ ছাড়েন। তবে তারা দেশের বাইরে গিয়েও শান্তিতে নেই। সেখানেও প্রবাসী বাংলাদেশিদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়ে নিজেদের গুটিয়ে রেখেছেন। বাংলাদেশেও যারা অবস্থান করছেন, তারাও জনসমাগমে খুব একটা বেরোচ্ছেন না। পারিবারিক অনুষ্ঠানেও যান দেখে শুনে, সীমিত পর্যায়ে।

ওয়ান-ইলেভেনের সময় রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে নানান কর্মকাণ্ডে বিতর্কিত হওয়া অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ ৪ বছর আগে মারা যান। ২০১২ সালের ১০ ডিসেম্বর তিনি ৮১ বছর বয়সে থাইল্যান্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। শেষ সময়ে তিনি বয়সের ভারে মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেছিলেন। দিন কাটিয়েছেন গুলশানের বাসায়। দায়িত্ব ছাড়ার পর কোনো রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক অনুষ্ঠানেই যোগ দেননি।

২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ড. ফখরুদ্দীন আহমদ কিছুদিন দেশেই ছিলেন। প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর তার নিরাপত্তাও দিয়েছিল সরকার। ছিলেন সরকারের দেওয়া বাড়িতে। ড. ফখরুদ্দীনকে সংসদীয় কমিটিতে তলব করা হচ্ছে এমন আলোচনায় সরকারি বাড়ি ছেড়ে পরিবার নিয়ে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ায় ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ বিষয়ে ভিজিটিং স্কলার হিসেবে গবেষণা ও শিক্ষকতা করছেন তিনি। বেশ কিছুদিন আগে তার বন্ধু আবদুল মুনিম চৌধুরীর জানাজায় অংশ নিতে নিউইয়র্কে যান। জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে জানাজায় অংশ নিতে গিয়ে তোপের মুখে পড়েন ফখরুদ্দীন। জানাজা শেষে তিনি দ্রুত ওই স্থান ত্যাগ করেন। এরপর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।

এক-এগারোর সময়কার সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ অবসর নেন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের মাঝামাঝি। ওই বছরের ১৪ জুন তিনি চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। প্রথমে ফ্লোরিডায় ছোট ভাই ও ছেলের কাছে থাকতেন। পরে তার ক্যান্সার ধরা পড়লে চিকিৎসার জন্য নিউইয়র্ক চলে যান। সেখানে একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রী নাজনীন মইনকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের পার্কিং ফ্লোরে দুই কক্ষের একটি ছোট বাসায় বসবাস করছেন তিনি। সেখান থেকেই নিয়মিত চিকিৎসা নিচ্ছেন। সেখান থেকে পাবলিক বাসে করেই মাঝে মাঝে চিকিৎসকের কাছে যান তিনি। ক্যান্সারের সঙ্গে বোনম্যারোর সমস্যায়ও ভুগছেন সাবেক এই সেনাপ্রধান। ক্যান্সারের জন্য ক্যামো থেরাপি নিতে হচ্ছে। আর বোনম্যারোতে অস্ত্রোপচারও করা হয়েছে। তিনি এখন প্রবাসী বাংলাদেশিদেরও এড়িয়ে চলাফেরা করেন। ওয়ান-ইলেভেনের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দেশের দুর্নীতি-অনিয়ম দূর করার অভিযানের জন্য গঠন করা ‘গুরুতর অপরাধ দমন সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি’র প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুুরী (অব.)। সে সময় সাভারের নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি থাকা মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী পরে পদোন্নতি পেয়ে মেজর জেনারেল হয়েছিলেন। ২০০৮ সালের ৪ নভেম্বর হাইকমিশনারের দায়িত্ব নিয়ে অস্ট্রেলিয়া চলে যান তিনি। মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বর্তমান সরকার চার দফায় তার মেয়াদ বাড়ায়। সেখানে ছয় বছর দায়িত্ব পালনের পর ২০১৪ সালের শেষ নাগাদ ঢাকায় ফিরে আসেন তিনি। দেশে ফিরে তেজগাঁওয়ে একটি রেস্টুরেন্ট দিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। রেস্টুরেন্টের নাম ‘পিকাসো’। জেনারেল মাসুদ ও তার স্ত্রী এর দেখাশোনা করেন। বাইরের অনুষ্ঠানাদিতে খুব একটা দেখা যায় না তাকে।

ওই সময়ে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদফতরের (ডিজিএফআই) পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন মেজর জেনারেল এটিএম আমিন (অব.)। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও প্রভাবশালী এ কর্মকর্তা তার পদেই ছিলেন। অবসরের আগে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল আনসারে। ২০০৯ সালের ১৭ মে সব আর্থিক সুবিধাসহ সেনাবাহিনী থেকে অবসরে যান তিনি। পরে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক পরিচয়ে দেশত্যাগ করেন। বর্তমানে তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করছেন। মাঝে মধ্যে কানাডায় যান তিনি। সেখানে তিনি একটি আন্তর্জাতিক সংস্থায় কাজ করছেন। দেশ ছাড়ার পর মেজর জেনারেল আমিন আর দেশে ফিরেননি।

ওই সময় আলোচিত সামরিক কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারী অবস্থান করছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডালাসে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ সময়ে ব্রিগেডিয়ার বারী ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাসে সামরিক অ্যাটাশের চাকরি নিয়ে দেশ ত্যাগ করেছিলেন। পরে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাকে দেশে ফেরার নির্দেশ দিলেও তিনি আর ফেরেননি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই স্থায়ীভাবে বসবাসের সিদ্ধান্ত নেন। স্ত্রীর আবেদনে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পান ফজলুল বারী। সেখানে তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে জীবিকানির্বাহ করেন। এক-এগারোর আগে উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগ করা লেফটেন্যান্ট জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরী (অব.) বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ে রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ঢালাও অভিযোগ এবং একের পর এক মামলা করে আলোচনায় ছিল দুদক। পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন হাসান মশহুদ। সমালোচনার মুখে ২০০৯ সালের ২ এপ্রিলে পদত্যাগ করেন তিনি। এরপর থেকেই অনেকটা লোকচক্ষুর আড়ালে সাবেক এই  সেনা কর্মকর্তা। ঢাকার ডিওএইচএসের বাসাতেই সময় কাটান তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন ওই সময়ের ডিজিএফআইর অপর ক্ষমতাধর লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার (অব.)। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরজুড়ে মেজর জেনারেল এম এ মতিন (অব.) উপদেষ্টা ছিলেন। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামে নিজ বাড়িতে বসবাস করে একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল পরিচালনা করছেন।