Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
প্রকাশ : শনিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ নভেম্বর, ২০১৮ ২৩:১৭

ভোটের দামামা

চমকের শেষ নেই মনোনয়নে

দলে-জোটে যখন তখন পরিবর্তন, দল বদল মন বদল, বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষা মাঠকর্মীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক

চমকের শেষ নেই মনোনয়নে

কুমিল্লার লাকসামে দুই দিন আগেও বিএনপি কর্মীরা জানতেন এবার ধানের শীষে ভোট করবেন চৈতি গ্রুপের মালিক দলের নেতা আবুল কালাম। এ কারণে দল ছাড়তে হয়েছিল সাবেক এমপি কর্নেল (অব.) আনোয়ারুল আজিমকে। গতকাল হঠাৎ বদলে গেল দৃশ্যপট। আনোয়ারুল আজিমের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে তাকেই ধানের শীষ প্রতীক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইভাবে ফেনী-৩ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র নিয়েছিলেন ওয়ান-ইলেভেনের আলোচিত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাসুদ উদ্দীন চৌধুরী। বুধবার তিনি আবার জাতীয় পার্টির মনোনয়নপত্র নিয়েছেন। আর তার বিপরীতে বিএনপির মনোনয়নপত্র কিনেছেন ওয়ান ব্যাংক ও এইচআরসি গ্রুপের চেয়ারম্যান সাঈদ হোসেন চৌধুরী। এভাবেই সারা দেশে বিভিন্ন আসনে মনোনয়ন নিয়ে চলছে নানারকম চমক। একসময়ের কট্টর আওয়ামী লীগবিরোধীরা ঠাঁই পাচ্ছেন এবার নৌকায়। অন্যদিকে কট্টর বিএনপিবিরোধীরাও ধানের শীষ নিয়ে গ্রামে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাজনীতিতে চলছে গতি পরিবর্তনের এক মহাসমারোহ। শুধু আওয়ামী লীগ-বিএনপি নয়, ইসলামী দলগুলোর মন বদল হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী স্বতন্ত্র ব্যানার নিয়েই ভোট করবে বিএনপির সঙ্গে। তাদের আসনে ঐক্যফ্রন্টের থাকবে দুর্বল প্রার্থী। আবার এরশাদ থাকবেন তার লাঙ্গল নিয়ে। শেষ মুহূর্তে বিকল্পধারাকে নৌকায় চড়তে হতে পারে। তবে একসময়ের কট্টর আওয়ামী লীগাররা এবার লড়ছেন ধানের শীষ নিয়ে। এ নিয়ে দুই জোটের কর্মীদের মধ্যে একদিকে যেমন রয়েছে কৌতূহল, অন্যদিকে রয়েছে হতাশা ও বিস্ময়।

এদিকে এবারকার নির্বাচনে সর্বোচ্চসংখ্যক ব্যবসায়ী দুই দল থেকেই মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। শুধু দুই দল নয়, জাতীয় পার্টি, বিকল্পধারাসহ অন্য দলগুলোতেও ব্যবসায়ীর ভিড় রয়েছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা উৎকণ্ঠায় আছেন জোটের প্রার্থীদের মনোনয়ন নিয়ে। অনেক নির্বাচনী এলাকায় জোটের খুচরা দলে ২ শতাংশ ভোট না থাকার পরও তারা অনেক আসন দাবি করছেন। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় প্রার্থীদের বাদ দেওয়ার জন্য চাপেও রাখছেন। আওয়ামী লীগ স্বাভাবিকভাবে পরিস্থিতি উত্তরণের চেষ্টা করছে। তবে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী কঠোর দৃষ্টিকোণ থেকেই সব কিছু দেখছেন। তিনি চেষ্টা করছেন সার্বিক অবস্থায় জোট ধরে রেখে জরিপের ভিত্তিতে জনপ্রিয় অবস্থানে থাকা প্রার্থীদের মনোনয়ন দিতে। এ ক্ষেত্রে জোটের অজনপ্রিয় প্রার্থীদের অন্যভাবে মূল্যায়নের আশ্বাসও দেওয়া হচ্ছে। নারী  নেত্রীদের সংরক্ষিত আসন ছেড়ে মূল নির্বাচনে প্রার্থী রাখার চেষ্টা চলছে। একই অবস্থা বিএনপিতেও। তবে জোটকে আসন ছাড়ার বিষয়ে বিএনপি এবার অনেক উদার। কর্নেল অলি আহমদ, মাহমুদুর রহমান মান্না, মোস্তফা মহসীন মন্টু, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদসহ জোট-মহাজোটের অনেক প্রার্থীকে ভালোভাবে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে। এমনকি জোটের পুরনো দলগুলোকেও বিজয়ী করে আনতে সবাইকে দেওয়া হচ্ছে ধানের শীষ। সাবেক মহাহিসাব নিরীক্ষক ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মূল্যবোধের সংকট প্রকট। দীর্ঘদিনেও তাদের গুণগত কোনো পরিবর্তন আসেনি। এ কারণে যখন যেখানে সুবিধা সেখানে যাওয়া এবং যাকে দিয়ে সুবিধা তাকে নিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তেমন কোনো পরোয়া করে না। তিনি বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের একজন কুশীলব যখন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা করেন তখন বোঝা যায় মুখে যাই বলা হোক না কেন সেই দলের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা আছে। আবার যখন এমপি মনোনয়ন দেওয়ার বিষয়ে আওয়ামী লীগের নেতিবাচক ইঙ্গিত পেলেন সঙ্গে সঙ্গে তিনি চলে গেলেন জাতীয় পার্টিতে। সেই পার্টিও তাকে দলের সর্বোচ্চ ফোরামের পদ দিয়ে দিল। রাজনৈতিক এ খেলা শুধুই স্বার্থকেন্দ্রিক, এখানে মূল্যবোধের লেশমাত্র নেই।

এ বিষয়ে সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, প্রচলিত কথায় বলা হয়, ‘রাজনীতিতে শেষ কথা নেই’। আসলে রাজনীতিতে নীতি-আদর্শ থাকা উচিত। যে ব্যক্তি যে দলে থাকবে, তার সঙ্গে সেই নীতি-আদর্শ থাকা উচিত। বাম দলগুলো ছাড়া আমাদের দেশের মূল রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে নীতি-আদর্শ গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের কাছে মূল বিষয় হলো ক্ষমতা, ক্ষমতায় থাকা। এখন রাজনীতি আর সেবা নয়, এটা ভোগে পরিণত হয়েছে। এ পরিবর্তন ভয়াবহ রূপ নেবে। এখন অসুস্থ রাজনীতি চলছে। তিনি বলেন, নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলে কমপক্ষে তিন বছর থাকার বিধান আরপিও থেকে তুলে দিয়ে মূলত অপরাজনীতিকে উৎসাহিত করা হয়েছে। ইসির কর্মকর্তারা বলছেন, রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হতে হলে অন্তত তিন বছর সংশ্লিষ্ট দলে থাকার বাধ্যবাধতার বিধান (আরপিও ১২ অনুচ্ছেদের ১ দফা ঞ) যোগ হয়েছিল নবম সংসদ নির্বাচনে; তাতে ডিগবাজির পথ বন্ধ হয়েছিল ভোটের আগে। কিন্তু দশম সংসদ নির্বাচনের আগমুহূর্তে ২০১৩ সালের ২৮ অক্টোবর বিধানটি বিলোপ করে আরপিও সংশোধন হয়; এতে দল বদলের সুযোগ উন্মুক্ত হয়ে যায়। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন বাণিজ্য ও হঠাৎ হঠাৎ দল পরিবর্তন ঠেকানোর জন্য আমরা ২০০৮ সালে সব রাজনৈতিক দলের সম্মতি নিয়ে আইন করেছিলাম। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) রেখেছিলাম, কোনো রাজনৈতিক দল থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে ওই দলে কমপক্ষে তিন বছর থাকতে হবে। কিন্তু পরে সে আইন বাদ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এজন্য কোনো আপত্তিও তোলেনি।’ সাবেক এই নির্বাচন কমিশনার বলেন, আরপিও থেকে এ বিধান তুলে দিয়ে প্রকৃত রাজনীতিবিদদের বঞ্চিত করা হয়েছে। রাতারাতি দল পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। দলগুলো অন্য দল থেকে লোক বাগাতে এমনটা করেছে বলে মনে করছেন তিনি। এতে অরাজনীতিকরা রাজনীতিতে আসছে। নির্বাচনেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে। মনোনয়ন বাণিজ্য হতে পারে। নির্বাচনে টাকার ছড়াছড়িও হতে পারে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো তাদের সংকীর্ণ স্বার্থে এটা করছে।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে গত মাসে দেওয়া ভাষণের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। সেদিন রাষ্ট্রপতি বলেন, রাজনীতি হলো গরিবের বউ। ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, ভিসি, আইজি, আর্মির জেনারেল, জজ সাবরা, যারা ৬৭ বছর চাকরি করব। রিটায়ার্ড কইরা কইব আমিও রাজনীতি করিব।... ডাইরেক্ট রাজনীতির মধ্যে আইসা তারা ইলেকশন করবে, মন্ত্রী হয়ে যাবে, এটা কেমন কেমন লাগে। রাষ্ট্রপতি বলেন, আমার মনে হয়, আমাদের দেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হচ্ছে না। এটা বন্ধ হওয়া উচিত। এগুলো থামানো দরকার।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর