শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ২২:২৭

অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নিয়ে দুর্নীতি জালিয়াতির শেষ নেই

ক্ষতিগ্রস্তরা ঘুরে বেড়ান দ্বারে দ্বারে

বিশেষ প্রতিনিধি

অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ নিয়ে দুর্নীতি জালিয়াতির শেষ নেই

দেশব্যাপী সরকারের উন্নয়ন মহাযজ্ঞে ভূমি অধিগ্রহণের সম্পর্ক নিবিড় হলেও অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়া নিয়ে দুর্নীতি ও অনিয়মের শেষ নেই। বছরের পর বছর ঘুরেও অধিগ্রহণের টাকা হাতে পান না ভুক্তভোগীরা। সারা দেশে ভূমি অফিসকেন্দ্রিক দুর্নীতি, জালিয়াতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে জমির প্রকৃত মালিকরা দিনের পর দিন হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বর্তমান সরকারের গত দুই আমলে দেশব্যাপী অবকাঠামোগত উন্নয়নের সাফল্যের পাশেই ভূমি অধিগ্রহণ দুর্নীতির বিষবৃক্ষ বিকশিত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ভূমি খাতে ব্যাপক সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। তারা বলেন, সুষ্ঠুভাবে জমি অধিগ্রহণ সঠিক সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা ও ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়ে দুর্নীতির কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন বছরের পর বছর আটকে থাকছে।

সূত্র জানায়, দেশকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির মহাসড়কে গতিশীল রাখতে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, রেলপথ, সড়কপথ, নৌ ও সমুদ্রবন্দর, অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরিতে সাধারণ মানুষের জমি অধিগ্রহণ করা হয়। আওয়ামী লীগ সরকার গত ১০ বছরে সারা দেশে অসংখ্য প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর জন্য সরকারকে সাধারণ মানুষের বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করতে হয়েছে। সেই জমির ক্ষতিপূরণের টাকা নিয়েই নজিরবিহীন দুর্নীতি ও জালিয়াতির ডালপালা বিকশিত হয়েছে জেলা প্রশাসকের (ডিসি) সংশ্লিষ্ট অফিসগুলোয়। দেশের বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি বৃহত্তর চট্টগ্রামেও জমি অধিগ্রহণের নামে সাধারণ মানুষকে ব্যাপক হয়রানির শিকার হতে হয়। সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের অন্যতম দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্প ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় বিলম্বিত হয়েছে অর্ধযুগেরও বেশি। ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল প্রকল্পটি উদ্বোধন করা হলেও ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানে অনিয়মের কারণে বার বার পিছিয়ে যায় প্রকল্পের কাজ। ভূমি অধিগ্রহণের জটিলতায় প্রকল্পের কাজ দীর্ঘদিন ধরে শুরুই করা যায়নি। এ ছাড়া কর্ণফুলী-কালুরঘাট মেরিন ড্রাইভ সড়ক, কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়ন, কর্ণফুলী টানেলের সংযোগ সড়কসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারকে বিপুল পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ করতে হচ্ছে। এসব জমির বিপরীতে অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট শাখায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন থেকে সক্রিয় রয়েছে। প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ের মেরিন ড্রাইভ সড়কে ভূমি অধিগ্রহণ ও মাটি ভরাটের কাজ একসঙ্গে চলছে। সেখানে প্রায় ৬০০ ভূমি মালিক ক্ষতিপূরণের আবেদন করেছেন। তাদের ক্ষতিপূরণের টাকা লোপাটে তৎপর রয়েছেন প্রভাবশালী দালালরা। অন্যদিকে ইকোনমিক জোনের জন্য অধিগ্রহণ করা জমির মালিকরা যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন। গত বছর তৎকালীন ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের এলএ (ল্যান্ড অ্যাকুইজিশন) অফিসে ঝটিকা পরিদর্শন করে ভয়াবহ জালিয়াতি, দুর্নীতি ও অনিয়মের সন্ধান পান। ওই সময় তিনি কয়েকজনকে শাস্তিও দেন।

এসব প্রেক্ষাপট সামনে রেখে ভূমি অফিসের দুর্নীতি রোধে কঠোর বার্তা দিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে সব ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির হিসাব দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। মন্ত্রী বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনের সময় আমার হিসাব জমা দিয়েছি। মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে দেশের সব উপজেলা, ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদের হিসাব জমা দিতে হবে। ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সবাইকে বর্তমান সম্পদের হিসাব জমা দিতে হবে।’

জানা গেছে, স্থাবর সম্পত্তি ম্যানুয়াল, ১৯৯৭-এর ৫০ অনুচ্ছেদ আর ভূমি অধিগ্রহণ আইন, ১৯৮২-এর আলোকে প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণের আগে সম্ভাব্য এলাকায় তৃতীয় পক্ষ দিয়ে জরিপ চালিয়ে দেখা হয়, যে জমি অধিগ্রহণ করা হবে সেখানে কোনো স্থাপনা আছে কিনা। প্রকল্প একনেকে পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খবরটি সংশ্লিষ্ট এলাকায় চাউর হয়ে যায়। এর পরই জমি অধিগ্রহণ করা হবে এমন সব এলাকার ফাঁকা জায়গায় রাতারাতি স্থাপনা তৈরি হয়ে যায় বেশি টাকা পাওয়ার আশায়। অন্যদিকে ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে বহু মানুষকে তাদের সর্বস্ব বিক্রি করতে হয়। প্রয়োজনীয় ঘুষ দিয়েও ক্ষতিপূরণের টাকা পান না অনেকে। উল্লেখ্য, যাদের পৈতৃক সম্পত্তি তাদের অধিকাংশের জমি মিউটেশন বা নামজারি করা থাকে না। স্বল্পশিক্ষিত জমি মালিকদের অসচেতনতার কারণে তাদের নাম ডিসি অফিসের ভূমি রেকর্ডে থাকে না। আবার অনেক জমি বিক্রি হলেও তার নামজারি স্থানীয় ইউনিয়ন তহসিল অফিস হয়ে থানা ভূমি অফিস ঘুরে ডিসি অফিসের ভলিউমে নাম উঠাতে কয়েক বছর লেগে যায়। জমি অধিগ্রহণের পর ক্ষতিপূরণের টাকার নোটিস যায় ডিসি অফিসের রেকর্ড বই অনুযায়ী। তাতেই শুরু হয় জমজমাট ‘ঘুষ বাণিজ্য’। প্রকৃত মালিকরা অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে তাই ভয়াবহ জালিয়াতির শিকার হন। প্রয়োজনীয় নথিপত্র হালনাগাদ করে ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে তাদের জানের বারোটা বেজে যায়।

সূত্র জানান, জমির ভুয়া মালিক সেজে অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের প্রায় ৬০ কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগে ২৯৯টি মামলা ঝুলছে চট্টগ্রাম সার্টিফিকেট আদালতে। এর মধ্যে ২৯২টি মামলায় উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ আছে। এ ছাড়া মামলার কারণে বিভিন্ন প্রকল্পে আটকে আছে ক্ষতিপূরণের আরও প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। ফলে প্রকৃত ভূমি মালিকরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন। ভূমি অধিগ্রহণ করা হলেও প্রকৃত মালিকরা ক্ষতিপূরণের টাকা না পেয়ে পারিবারিকভাবে অভাব-অনটনে দিন কাটাচ্ছেন। রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত বন্দরনগরী চট্টগ্রামে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা  অনেক বেড়েছে। বর্তমানে শতাধিক প্রকল্পের অধীনে চলছে ভূমি অধিগ্রহণ। এর মধ্যে অন্যতম হলো কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল নির্মাণ, রাঙ্গুনিয়া সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প, এলএনজি গ্যাসলাইন স্থাপন, চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনাল, মিরসরাই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও দোহাজারী-ঘুমধুম রেললাইন স্থাপন প্রকল্প। এসব প্রকল্পের অধীনে শত শত কোটি টাকার ভূমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে। ফলে এলএ অফিসের চেইনম্যান থেকে শুরু করে কানুনগো-সার্ভেয়ার পর্যন্ত ছোট-বড় অসাধু কর্মকর্তাদের চোখ এই অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের টাকার প্রতি। ভূমি অধিগ্রহণের বিপরীতে ক্ষতিপূরণের টাকার জন্য ভূমি মালিকরা এলএ অফিসে এলেই হয়রানি শুরু হয়। ভূমি মালিকদের অভিযোগ, এলএ অফিসে টাকা ছাড়া কোনো ফাইল নড়ে না। অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণের অর্থ পেতে ফাইল জমা দেওয়া থেকে শুরু করে চেক পাওয়া পর্যন্ত চলে টাকার খেলা। কাক্সিক্ষত টাকা না পেলে ভুয়া লোককে মালিক সাজিয়ে মিথ্যা অভিযোগ দাখিল ও মামলা দিয়ে আটকে দেওয়া হয় ক্ষতিপূরণের টাকা। শুধু চট্টগ্রামেই নয়, ঢাকা, গাজীপুর, মুন্সীগঞ্জ, মাদারীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা প্রশাসনের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় দুর্নীতির অনেক চাঞ্চল্যকর ঘটনা জানা গেছে। লাল ফিতার দৌরাত্ম্য, হয়রানি আর ঘুষ-বাণিজ্যের ঘটনা সেখানে ঘটছে। নিরীহ ভূমি মালিকদের ক্ষতিপূরণের টাকা থেকে ৩০ থেকে ৫০ ভাগ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে তুলে দিতে হচ্ছে। ঘুষ না দিলে ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে তাদের কত দিন অপেক্ষা করতে হবে কেউ জানে না। এসব দুর্নীতির প্রতিবাদ করলে প্রতিবাদকারীর জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। অনেকের জীবন বিপন্নও হয়।

অনুসন্ধানে দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায়ই ভূমি মালিকদের হয়রানি করার একটি সাধারণ ‘ফর্মুলা’ দেখা গেছে। তা হচ্ছে, একটি জমির মালিকানা কয়েকবার পরিবর্তন হওয়া স্বাভাবিক। তবে সর্বশেষ দলিলগ্রহীতা, নামজারি ও দাখিলা প্রদানকারীই হলেন জমির প্রকৃত মালিক। তাকে নোটিস করলেই ক্ষতিপূরণের বিষয়টি সহজ হয়ে যায়। কিন্তু অধিগ্রহণ শাখা থেকে বিভিন্ন রেকর্ডীয় মালিকের কাছে নোটিস পাঠিয়ে বিষয়টি জটিল করে তোলা হয়। অনেকেই টাকার লোভে জমির প্রকৃত মালিক না হয়েও একে অন্যের বিরুদ্ধে আপত্তি দায়ের করেন। বর্তমান আইনে তখনই ক্ষতিপূরণের টাকা আটকে যায়। এর মাধ্যমে ঘুষের প্রথম অধ্যায় শুরু হয়। ঢাকা জেলা প্রশাসকের দফতরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, ভূমি অধিগ্রহণ শাখার কারণে তাদের মানসম্মান ধুলায় মিশে যাচ্ছে। এতটা নোংরাভাবে সেখানে ঘুষ আদায় করা হয়, যা সত্যি নজিরবিহীন। নির্দিষ্ট পরিমাণ ঘুষ না দিলে ক্ষতিগ্রস্ত ভূমি মালিকদের বছরের পর বছর হয়রানি করা হয়। এমনকি ভুয়া অভিযোগ দাঁড় করিয়ে ক্ষতিপূরণের টাকা আটকে রাখা হয়।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর