Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১১ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ মার্চ, ২০১৯ ২২:৪৮

ডাকসু ও ছাত্র রাজনীতির গুণগত বদল : কিছু সংশয়

রোবায়েত ফেরদৌস

ডাকসু ও ছাত্র রাজনীতির গুণগত বদল : কিছু সংশয়

ছাত্র রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতা হলো, যারা ক্ষমতাসীনদের তাঁবেদারির রাজনীতি করছে তারাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে, ক্যাম্পাসগুলোতে এবং ছাত্রছাত্রীদের আবাসিক হলগুলোতে আধিপত্য, দখলদারিত্ব বজায় রাখছে।  তারা দলীয় আনুগত্যের      রাজনীতি করছে এবং পেশিশক্তির চর্চা করছে। ছাত্র রাজনীতির নামে তারা ভয়ের সংস্কৃতি আর দখলদারিত্বের সংস্কৃতিকে মাঠ পর্যায়ে বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ছাত্র রাজনীতির এই ধারায় কিন্তু আমরা কোনোরকম আদর্শ কিংবা নৈতিকতার অনুশীলন কিংবা সেই  চেষ্টা কিছুই আমরা দেখছি না। সেই অর্থে চলমান ছাত্র রাজনীতির কোনো ন্যূনতম মানও কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালো-মন্দ এবং শিক্ষা-গবেষণার প্রশ্নে কিন্তু এদের কোনো কর্মসূচি নেই।  এমনকি সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের সুবিধা-অসুবিধার প্রশ্নেও তাদের কোনো নৈতিক অবস্থানও নেই। উল্টো আমরা বিভিন্ন সময়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়ার বিরুদ্ধে এমন ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীদের অবস্থান নিতে দেখেছি। সাধারণ শিক্ষার্থীরা যখন চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছিল, রাস্তায় দাঁড়িয়েছিল তখন এই ছাত্র রাজনীতির হোমড়া-চোমড়ারা তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনদের পেটোয়া বাহিনী, হেলমেট বাহিনী হয়ে কাজ করেছে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে যখন স্কুল-কলেজের বাচ্চা-বাচ্চা ছেলেমেয়েরা রাজপথে আন্দোলন করছিল তখনো এদের আন্দোলনে নামা কিশোর-কিশোরীদের বিরুদ্ধে মারমুখী হতে দেখা গেছে।  এরকম চর্চাটা কিন্তু অনেক দিন ধরেই চলছে, এখনকার ক্ষমতাসীনদের সময়ে যেমন এটা দেখা যাচ্ছে, তেমনি এর আগে ক্ষমতায় থাকা দলের পক্ষেও তাঁবেদারি ছাত্র রাজনীতির এই ন্যক্কারজনক ভূমিকা আমরা দেখেছি। এ অবস্থায় ২৮ বছর পর ডাকসু নির্বাচনকে যত বড় করে দেখা হচ্ছে, আমি কিন্তু ততটা আশাবাদী নই মোটেই। আমার বরং ডাকসু নিয়ে উল্টো আশঙ্কা আছে।  মাঝখানে কয়েকটা দশক গেল, আমরা কিন্তু তেমনভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হতে দেখিনি। একটা শব্দ ছিল ‘সাইনে ডাই’ (sine die) , এর মানে হলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা। এখন কিন্তু তেমন পরিস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ডাকসু নির্বাচন হলে, যে নতুন ছাত্রনেতৃত্ব আসবে সেটা কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সমান্তরাল একটা ক্ষমতা চর্চার জায়গায় চলে যাওয়ার, একটা দ্বৈত-প্রশাসনের অবস্থায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করতে পারে। যেহেতু এরা নির্বাচিত হয়ে আসবে ফলে এখনকার ছাত্ররাজনীতির মাস্তানির চেয়ে তারা বরং একটা ‘বৈধ মাস্তানির’ জায়গায় চলে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।  সেরকমটা হলে আবাসিক হলগুলো থেকে শুরু করে ক্যাম্পাসে এরকম ম্যান্ডেট পাওয়া বৈধ মাস্তানির চর্চা এখনকার চেয়ে আরও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এমনকি তখন তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা-সংস্কৃতি-পরিবেশের প্রশ্নে এটা আমার কাছে খুবই একটা ভয়ের জায়গা হিসেবে কাজ করে। গত দুই-আড়াই দশকে বড় বড় ছাত্রসংগঠনগুলোর কাউকেই আমরা শিক্ষাসংশ্লিষ্ট, শিক্ষার্থীদের অধিকার সংশ্লিষ্ট, আবাসন সমস্যা, বা গ্রন্থাগারের সমস্যা কিংবা ছাত্রছাত্রীদের কোনো সাধারণ সুবিধা-অসুবিধার প্রশ্নে কোনো কর্মসূচি নিতে দেখি নাই। কাজেই নির্বাচিত হয়ে আসলেই যে তারা ছাত্রঅধিকার নিয়ে কথা বলবে এমনটা ভাবার কোনো কারণ বা কোনো নমুনাও কিন্তু আমাদের সামনে নেই। প্রগতিশীল ধারার কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের মুষ্টিমেয় কিছু ছেলেমেয়ে হয়তো বিভিন্ন সময়ে এসব নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তখনো কিন্তু এরা হয় নীরব থেকেছে নয়তো উল্টো বিরোধিতা করেছে, উল্টো আন্দোলনকারীদের ওপর চড়াও হয়েছে। হলে হলে হিটলারের গেস্টাপো বাহিনীর মতো এদের নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী আছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের এরা সারা রাত গেস্টরুমে আটকে রাখে গণরুমে নির্যাতন চালায়। এই নেতা-কর্মীদের নিজস্ব স্টাইলের প্রটোকল আছে, সাধারণ কর্মীদের এদের স্যালুট দিতে হয়, এদের কথায় উঠবোস করতে হয়, দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, মিছিলে যেতে হয়। এ অবস্থায় আমার কিছু প্রশ্ন, আজ যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে :

এক : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে দেখলাম, ডাকসু নির্বাচনও কী সেইরকম হবে? দুই. এখানে যে প্রশাসন নির্বাচনের দায়িত্বে আছে তারাও একপক্ষীয়, তারাও ক্ষমতাসীনদের আনুগত্যের রাজনীতিই করেন। যেসব শিক্ষক বিশ্ববিদ্যায়ল প্রশাসন চালান তাদের ওপরও কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থী কিংবা শিক্ষকদের কোনো আস্থা নেই। জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যেমন প্রশ্নবিদ্ধ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনের কর্তৃপক্ষও কিন্তু একইরকম প্রশ্নবিদ্ধ। তারা কি আজ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ডেলিভারি দিতে পারবে? তিন. ছাত্ররাজনীতির কাঠামোগত এবং গুণগত পরিবর্তন ছাড়া কেবল ছাত্রসংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কোনো যুগান্তকারী পরিবর্তন কি সম্ভব? চার. বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, রাজনৈতিক দল এবং ছাত্রসংগঠনগুলোকে এটা বুঝতে কতটা সম্ভব যে, একটা পরাধীন দেশের ছাত্ররাজনীতি আর একটা স্বাধীন দেশের ছাত্ররাজনীতির ভূমিকা আর দায়িত্ব কি একরকম? আমি মনে করি, আজকের ছাত্ররাজনীতি হতে হবে পুরোপুরি শিক্ষাব্যবস্থাকেন্দ্রিক, শিক্ষার্থীদের অধিকার, শিক্ষা-গবেষণা সংক্রান্ত দাবি-দাওয়া, ক্যাম্পাসের পরিবেশ-সংস্কৃতি ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে।  ক্ষমতায় বা ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি ছাত্ররা করবে না। ছাত্রসংগঠনগুলোকে কাঠামোগতভাবে এবং অনুশীলনের জায়গা থেকে স্বাধীন থাকতে দিতে হবে। তাহলেই আজকের তরুণ প্রজন্ম নিজেদের মেধার বিকাশ ঘটাতে পারবে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও তখন ছাত্ররাজনীতি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে। ছাত্ররাজনীতির কাঠামোগত ও গুণগত এমন পরিবর্তন ছাড়া ‘ডাকসুর সোনার হরিণ’ আমাদের কিছুই দিতে পারবে না। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, দুধ বিষাক্ত হলে সেই দুধ থেকে যে মাখন ছেনে নেওয়া হবে তা আরও বিষাক্ত হবে।  এখন যে ছাত্র রাজনীতি আমরা দেখছি, সেখানে ছাত্র রাজনীতির নব্বই ভাগই যে প্রক্রিয়ায় চলছে, সেটা বিষাক্ত হয়ে গেছে। ফলে এই ছাত্র রাজনীতি  থেকে আসা ছাত্র নেতৃত্ব বা বেছে নেওয়া ডাকসু নেতৃত্বও ‘বিষাক্ত’ হয়ে উঠতে করি।  কাজেই ডাকসু নিয়ে উচ্চাশা দেখা যাচ্ছে তার মধ্যে আবেগতাড়িত বিষয় আছে, অতিশয়োক্তি আছে। ডাকসু সম্পর্কে আমাদের ধারণার মধ্যেই যতটা না সত্য আছে তারচেয়ে বেশি মিথ আছে, একটা বিশ্লেষণহীন ঢালাও ধারণায় আচ্ছন্ন হয়ে থাকার ব্যাপার আছে। ফলে ডাকসু নির্বাচন নিয়ে নির্মোহ হয়ে ভাবনা চিন্তা করা প্রয়োজন যে, আমরা আসলে এখান থেকে কী প্রত্যাশা করছি বা কী প্রত্যাশা করব।

রোবায়েত ফেরদৌস : অধ্যাপক, গণযোযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। [email protected]


আপনার মন্তব্য