Bangladesh Pratidin || Highest Circulated Newspaper
শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ জুন, ২০১৯ ২৩:০৪

সংসদে প্রধানমন্ত্রী

টাকা লুটেরাদের চিনি, কেউ কারাগারে কেউ দেশান্তরে

নিজস্ব প্রতিবেদক

টাকা লুটেরাদের চিনি, কেউ কারাগারে কেউ দেশান্তরে

সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘ব্যাংকের তারল্য সংকট, ঋণখেলাপি ও লুটপাট’ নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগের জবাবে বলেছেন, কথা এসেছে ব্যাংকে টাকা নেই। ব্যাংকে টাকা থাকবে না কেন? অবশ্যই টাকা আছে। তবে লুটে খাওয়ার টাকা নেই। আর যারা লুটে নিয়েছে তাদের আমরা চিনি। কেউ দেশান্তরে অথবা দুর্নীতির দায়ে কারাগারে। অনেকেই ব্যাংক থেকে প্রচুর টাকা নিয়ে আর কোনো দিন দেয়নি। এ রকম বহু ঘটনা আছে। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বাজেট অধিবেশনে গতকাল সম্পূরক বাজেটের ওপর সমাপনী বক্তব্যে বাজেট নিয়ে বিভিন্ন মহলের সমালোচনার জবাবে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনা শুরু হয়েছে গত রবিবার। গতকাল সাধারণ আলোচনার পর তা কণ্ঠ ভোটে পাস হয়। অর্থমন্ত্রীর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্পূরক বাজেট পাস ও মঞ্জুরি বরাদ্দ পাস করার প্রস্তাব করেন। এর আগে সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত বাজেট ও সংশোধিত বাজেট নিয়ে অনেক আলোচনা, অনেক কথা বাইরেও হচ্ছে, এখানেও হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, এ বাজেট কিছুই নয়। কেউ বলছেন, বাজেট দিয়েছেন বাস্তবায়ন করতে পারেননি। বাজেট বাস্তবায়ন একটা বিষয় আছে। বছরের মাঝামাঝি একটা হিসাব নিই। তখন পরিমার্জন, সংশোধন করি যাতে অর্থটা যথাযথভাবে কাজে লাগে। সেটাই সম্পূরক হিসেবে উপস্থাপন করি। বলা হচ্ছে, বাজেট বাস্তবায়ন করতে পারি না, সেটা যদি বলে, যদি আমাদের বাস্তবায়নের দক্ষতাই না থাকে, তাহলে ৬১ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেয়েছিলাম ২০০৮ সালে। আজকে আমরা ৫ লাখ টাকার ওপরে বাজেট দিলাম। এটা তাহলে আমরা করলাম কীভাবে? আমাদের উচ্চাভিলাষ না থাকলে এসব অর্জন সম্ভব হতো না। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিদ্যুৎ নিয়ে অনেকে কথা বলেছেন, যে বিদ্যুৎ এত উৎপাদন হলো তাহলে শতভাগ পায় না কেন? বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো সব সময় চালু থাকে না। প্রত্যেক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংস্কার করতে হয়, বন্ধ থাকে। আজ ৯৩ ভাগ মানুষ কিন্তু বিদ্যুৎ পাচ্ছে। গ্রামে-গঞ্জে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশও হয়ে গেছে।

আমি সাতবারের এমপি, একটি প্লটও নিইনি : বাজেটে গৃহায়ণ, স্বরাষ্ট্র, জনপ্রশাসন ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত বরাদ্দের বিরোধিতা করে বিরোধী দলের সদস্যদের দেওয়া বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে দুর্নীতিকেই নীতি হিসেবে গণ্য করা হতো। তারা দুর্নীতিতে বাংলাদেশকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বানিয়েছিল। তা চললে বোধহয় ভালো হতো। তখন অনেক সংসদ সদস্য প্রতিবার এমপি হলে একটি করে প্লট চেয়েছেন। আমি কিন্তু সাতবারের এমপি, একটিও প্লট নিইনি। নেওয়ার মধ্যে একটি বুলেটপ্রুফ গাড়ি পেয়েছিলাম। যার জন্য ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে যাই। তিনি আরও বলেন, আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বের করার জন্য দেশি-বিদেশি অনেক গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে তদন্ত করা হয়েছে। কিন্তু কেউ কিছু বের করতে পারেনি।

বুয়েট ছাত্রদলের ভিপি বালিশ মাসুদুল : পাবনার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পের আওতায় আসবাবপত্র, বালিশ কেনাসহ অন্যান্য কাজের অস্বাভাবিক ব্যয়ের অভিযোগের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদকে জানান, যে ভদ্রলোক এই বালিশকা- ঘটিয়েছেন, আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি তিনি একসময় বুয়েট ছাত্রদলের নির্বাচিত ভিপি ছিলেন। এসব মানুষ যত দিন দায়িত্বে থাকবেন তত দিন দুর্নীতি তো কিছু হবেই। যাই হোক, সেই ভদ্রলোককে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খানের অভিযোগের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের আরেকজন মাননীয় সংসদ সদস্য বললেন, সুশাসনের অভাব। উনি যে দল থেকে এসেছেন, নবগঠিত দল। আসলে আওয়ামী লীগ ভেঙেই ওই দলটি গড়া হয়েছিল। উনাদের নেতা আওয়ামী লীগই করতেন। তারপর চলে গিয়েছিলেন। কাজেই তার দলে কী ডিসিপ্লিনটা আছে? কী দলতন্ত্রটা আছে? যার নিজের দলেই সুশাসন নেই, গণতন্ত্র নেই, ডিসিপ্লিন নেই; যেখানে কেউ কথা বলতে গেলেই বলেন, খামোশ। তার কাছ থেকে কী আশা করা যায়?

স্ত্রীর প্লট বাতিলের বিষয়ে হারুনের ক্ষোভ : বিএনপি থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদের স্ত্রীর প্লট বাতিলের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উনি এমপি। উনাদের স্বামী-স্ত্রী দুজনের নামে দুটি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু রাজউক তার স্ত্রীর নামের প্লটটি বাতিল করেছে। তাতে তিনি ক্ষুব্ধ। এটি ভুল হয়েছে। তার স্ত্রীর (পাপিয়ার) প্লটটি বাতিল না করে তারটি বাতিল করলে ঘরে শান্তি থাকত। এ সময় সংসদে হাসির রোল পড়ে যায়।

ঢাকাকে তিলোত্তমা করা কারও পক্ষে সম্ভব নয় : কাজী ফিরোজ রশীদের গুলিস্তান ভবনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হ্যাঁ, এটি ঝুঁকিপূর্ণ, কিন্তু এখানে যারা বাস করেন, যারা ব্যবহার করছেন তাদেরও বুঝতে। তবে আমরা রাজধানীর ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত করছি। তিনি আরও বলেন, রাজধানী ঢাকাকে তিলোত্তমা করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়, কেননা এটা একটা পুরাতন ঘরানার শহর। কিন্তু যতটুকু পারি বাসযোগ্য করার চেষ্টা করছি। সম্পূরক বাজেটে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত বরাদ্দের বিষয়ে জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমামের অভিযোগের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি আমলে রাজউক নীতিমালা অমান্য করে এফ আর টাওয়ারের মতো বহু টাওয়ার তৈরি হয়েছে। আইন অমান্য করে তিনটি অতিরিক্ত তলা বানানো হয়। আর যারা এর সঙ্গে সম্পৃক্ত তারা তো বিএনপি ঘরানার। তিনি আরও বলেন, বিএনপি সরকারের আমলে লেক বন্ধ করে বহুতল বিল্ডিং তৈরি করা হয়েছে।

খেলার মাঠ নেতা-কর্মীদের নামে বরাদ্দ করা হয়। তারা আবার কি ন্যায়নীতির কথা বলেন? তিনি বলেন, আমি একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যিনি প্রতিটি একনেক বৈঠকে উপস্থিত থেকে প্রতিটি প্রকল্পের বিষয়ে যাচাই-বাছাই করি, ডিজাইন নিয়ে জানতে চাই। শেখ হাসিনা এ সময় সম্পূরক বাজেটে হ্রাস-বৃদ্ধির কারণ ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৮ শতাংশ অনুমান করেছিলাম। সংশোধিত বাজেটে তা আমরা ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ হবে বলে আজ অনুমান করছি। সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৬ শতাংশ নির্ধারিত হয়েছিল, এটি আমরা সাফল্যজনকভাবে অতিক্রম করতে সক্ষম হব বলে আশা করছি। মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬ শতাংশ অনুমান করা হলেও সংশোধিত মূল্যস্ফীতি ধারণা করা হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। বাজেট পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে অত্যন্ত সতর্ক থাকার জন্যই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ এখন যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে বলেই আমরা উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনে বিশ্বের অনেক দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি। এটা দেখে সারা বিশ্ব আজ অবাক হচ্ছে। বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে এখন উন্নয়নের বিস্ময়। যেখানে যাই সেখানেই সেই কদরটা পাই। দেশবাসী সেই সম্মানটা পায়। কাজেই অযথা কিছু কথা বলে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত না করাই ভালো। আমরা কাজ না করলে দারিদ্র্যের হার ৪০ থেকে ২১ ভাগে নেমে আসত না। এই ২১ ভাগ থেকে দারিদ্র্যের হার আরও নামিয়ে আনব।

এ সময় তিনি জানান, মন্ত্রণালয় বা বিভাগের বিপরীতে সম্পূরক মঞ্জুরি ও বরাদ্দের দাবি ১৫ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে দায়যুক্ত ব্যয় ১ হাজার ১১৯ কোটি এবং অন্যান্য ব্যয় ১৪ হাজার ৪৭ কোটি টাকা।


আপনার মন্তব্য