শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৮ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৭ আগস্ট, ২০১৯ ২৩:০৮

বস্তি পুড়ে ছাই

ধ্বংসস্তূপেই কিছু সম্বল পাওয়ার চেষ্টা

নিজস্ব প্রতিবেদক

ধ্বংসস্তূপেই কিছু সম্বল পাওয়ার চেষ্টা
রাজধানীর রূপনগরে বস্তিতে আগুনে পুড়ে গেছে ঘর সহায়-সম্বল। সেই ধ্বংসস্তূপের পাশে বসে গতকাল আহাজারি -রোহেত রাজীব

প্লাস্টিক পাইপে জোড়াতালির গ্যাস লাইনের ছড়াছড়ি থাকাতেই রূপনগর ঝিলপাড় চলন্তিকা বস্তির আগুন ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ফায়ার সার্ভিসের ২৪টি ইউনিট তিন দিক থেকে লাগাতার পানি ছুড়েও সে আগুন নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়।

মাত্র তিন ঘণ্টা সময়েই প্রায় তিন হাজার বস্তিঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। অগ্নিকান্ডের কারণ খতিয়ে দেখতে উপপরিচালক (অ্যাম্বুলেন্স) আবুল হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্যরা হলেন সহকারী পরিচালক (অপারেশন্স) আবদুল হালিম ও সদস্য উপ-সহকারী পরিচালক (ঢাকা জোন-২) নিয়াজ আহমেদ।

জানা গেছে, চলন্তিকা বস্তিসহ আশপাশের তিনটি বস্তিতেই ১১ হাজারের বেশি অবৈধ গ্যাস সংযোগ রয়েছে। একই পরিমাণ অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগও রয়েছে সেখানে। তবে পানির সংযোগ রয়েছে পাঁচ শতাধিক পয়েন্টে। অবৈধ গ্যাস সংযোগের বিপরীতে মাসে এক হাজার টাকা হারে কোটি টাকা আদায় করে বস্তির নিয়ন্ত্রকরা। বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগের বিপরীতেও প্রতি মাসে আদায় হয় আরও এক কোটি টাকা। প্লাস্টিক পাইপে জোড়াতালি দিয়ে, ড্রেন-নর্দমার ভিতর দিয়ে ছিদ্রযুক্ত পাইপে পলিথিন জড়িয়েই গ্যাসের সরবরাহের ব্যবস্থা করে বস্তির নিয়ন্ত্রকরা।

গতকাল সরেজমিন দেখা গেছে, আগুন লাগার খবর শুনে কাছাকাছি জেলার অনেকে ভোর থেকে বস্তিতে আসা শুরু করেন। চলন্তিকা বস্তিতে পোড়া ধ্বংসস্তূপ হাতড়ে বেড়ান সব হারানো এসব মানুষ। সেখানেই খুঁজে  ফেরেন কিছু অবশিষ্ট আছে কি না। বেশিরভাগ ঘর থেকে কিছুই বের করতে পারেননি বাসিন্দারা। হাজারও পুড়ে যাওয়া ঘরে শুধু টিন দেখা যায়। ঈদের কারণে বস্তিতে থাকা বেশিরভাগ বাসিন্দা গ্রামের বাড়িতে চলে গিয়েছিলেন। আগুনের খবর পেয়ে অনেকে ফিরে আসেন ঢাকায়। পোড়া বস্তিতে নিজেদের ঘর খুঁজেছেন দিশাহারা এসব মানুষ। কিন্তু সেখানে শুধু নষ্ট হয়ে যাওয়া টিন পড়ে আছে। তার মধ্যেই সেখানে তারা নিজেদের অবশিষ্ট জিনিসপত্র খুঁজেছেন। কিন্তু পাননি কিছুই। ভয়াবহ আগুনে সেখানে বেঁচে যাওয়ার মতো কিছু ছিল না। আগুন লাগার প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে তা নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিস। পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় চারজন আহত হয়েছেন। তারা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আগুনের খবর পেয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্যা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এনামুর রহমান ঘটনাস্থলে যান। তারা ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তার আশ্বাস দেন। গতকাল দুপুরে আবারও ঘটনাস্থল পরিদর্শনে এসে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলাম আগুনে পুড়ে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত পুনর্বাসনের আশ্বাস দেন। এরপর পরিদর্শনে আসেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ সময় তিনি বলেন, রাজধানীতে কেন বার বার বস্তিতে আগুন লাগছে, তা তদন্ত করে দেখা উচিত। কোনো ব্যক্তি বিশেষের দ্বারা হলে তার শাস্তি হওয়া প্রয়োজন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের নেতারা পোড়া বস্তি ঘুরে দেখেন এবং সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের পাশে থাকার আশ্বাসও দেন বিএনপি নেতারা। স্থানীয় অনেক লোক বলছেন, রূপনগরের বস্তিটি অবৈধ। এখানে বেশিরভাগ বাড়ি টিন ও কাঠের। একেকটি বাড়ি টিন দিয়েই তিন-চারতলা করা হয়েছে। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে তৈরি করা এসব ঘরের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়েছে। বস্তির আশপাশের বাড়িগুলোতেও আগুন নিয়ে আতঙ্ক ছড়ায়। আগুনের খবরে ভোরে আসেন আলেয়া বেগম। তিনি গৃহকর্মীর কাজ করেন, আর তার স্বামী ইয়াসিন হোটেল কর্মচারী। তারা বলেন, ‘যাব কোথায়? কোথাও ঘর বলে কিছু নেই। সব সমান হয়ে গেছে। ঈদের আগে কাপড়চোপড়সহ যেসব জিনিস সঙ্গে ছিল, সেগুলো ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই।’ মোতালেব নামে বস্তির আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। সকাল থেকে ঘর খোঁজার চেষ্টা করেছি। ঈদে বউ আর বাচ্চা জামালপুরে বাড়ি গেছে। আগুন লাগার কথা শুনে দৌড়ে বেরিয়ে এসেছি। কিছু সঙ্গে আনতে পারিনি।’


আপনার মন্তব্য