শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ১৯ আগস্ট, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৮ আগস্ট, ২০১৯ ২৩:১৮

ডেঙ্গু অধ্যায়ের শেষ কোথায়

চলছে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়, সেপ্টেম্বরের আগে অবস্থা বদলাবে না হাই কোর্টের অসন্তোষ

জয়শ্রী ভাদুড়ী

ডেঙ্গু অধ্যায়ের শেষ কোথায়

এডিস মশার বংশবিস্তারের অনুকূল আবহাওয়া এবং ‘পিক টাইমে’ ডেঙ্গু পরিস্থিতি ঝুঁকিপূর্ণ সময় পার করছে। আগস্ট মাসের মাঝামাঝিতে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত প্রতি বছরই বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে গত সাত দিনের বৃষ্টিতে মশার উৎসস্থল বাড়ায় ডেঙ্গু মোকাবিলায় তৈরি হয়েছে চ্যালেঞ্জ। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে কমতে থাকে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। তাই এ সময় বাড়তি সতর্কতা না থাকলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল ও এডিসবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রধান কীটতত্ত্ববিদ মো. খলিলুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসকে ডেঙ্গুর মৌসুম বলা হয়। এর মধ্যে টানা বৃষ্টিতে পরিস্থিতি জটিল করে তুলেছে। ২০-৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং ৭০-৮০ শতাংশ আর্দ্রতা এডিস মশার বংশবিস্তারের জন্য সবচেয়ে অনুকূল পরিস্থিতি। তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতা এর চেয়ে কম কিংবা বেশি বলে ভাইরাস কার্যকারিতা হারায়। বৃষ্টিতে নতুন করে মশার প্রজনন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। তাই কালক্ষেপণ না করে দ্রুত এডিস লার্ভা নিধনে জোর দিতে হবে। আবহাওয়া অধিদফতরের পূর্বাভাসে জানা যায়, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় ঢাকা, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, ময়মনসিংহ, সিলেট বিভাগের বেশ কিছু জায়গায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। বেশ কিছু জায়গায় বজ্রসহ বৃষ্টিও হতে পারে। আগামী ৭২ ঘণ্টার আবহাওয়ায় উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন হবে না বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর। গত সাত দিনের মতো আগামী তিন দিনেও বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। ডেঙ্গু পরিস্থিতি বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, প্রতি বছরই আমাদের দেশে আগস্টের শেষ থেকে সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর পিক টাইম দেখা গেছে। এবার আগেই আমরা সেই পিকে উঠে গেছি।  এক্ষেত্রে আবহাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। তাই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আগামী সাত দিন আমাদের জন্য খুবই চ্যালেঞ্জিং। এদিকে সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৭০৬ জন। এর মধ্যে ঢাকার হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭৩৪ জন এবং রাজধানী বাদে অন্য বিভাগের হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৭২ জন। গতকাল রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে নাজিম উদ্দিন নামে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তার বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের চৌমুহনী পৌর এলাকার গনিপুর গ্রামে। তিনি ঢাকা নোয়াখালী রুটের হিমাচল পরিবহনের সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। নোয়াখালীর বেসরকারি রাবেয়া হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার শরীরে ডেঙ্গুর ভাইরাস শনাক্ত হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় গতকাল ভোরে তার মৃত্যু হয়। এ ছাড়া ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ইউনুস শেখ নামে এক রোগী মারা গেছেন। মশক নিধনে দুই সিটি করপোরেশন গতকাল নিয়মিত কর্মসূচি চালিয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন মশক নিধনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে। ইস্কাটন রোডের একটি বাড়ির নিচতলায় এডিস মশার লার্ভা এবং মশা বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ পাওয়া গেছে। এজন্য বাড়ির কেয়ারটেকার আবদুল বারেককে ৭ দিনের বিনাশ্রম কারাদ  দেওয়া হয়। এ ছাড়া বনানী ৬ নম্বর সড়কের একটি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়ায় বাড়ির ম্যানেজারকে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) ও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছে। ধানমন্ডির ১১ নম্বর সড়কে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর নির্মাণাধীন ভবনে এডিস মশার লার্ভা পাওয়ায় ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। এ ছাড়া শুক্রাবাদ এলাকার মীম টাওয়ার নামে আরও একটি ভবনকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ডিএসসিসি এ পর্যন্ত ৫৮ হাজার বাড়িতে অভিযান চালিয়েছে।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে দুই সিটির দায়িত্বশীলরা যথাসময়ে ব্যবস্থা নেননি : ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম নিয়ে আবারও অসন্তোষ প্রকাশ করেছে হাই কোর্ট। আদালত বলেছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যথাসময়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেননি। এটা নিলে হয়তো এরকম পরিস্থিতি হতো না। যাদের সঠিকভাবে বিষয়টি তদারকি করার দায়িত্ব ছিল তারা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেননি। তাদের মানসিকতা ও দক্ষতার অভাব রয়েছে। গতকাল বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের হাই কোর্ট বেঞ্চ এ মন্তব্য করে। এর আগে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারের নেওয়া কার্যক্রম হাই কোর্টকে জানিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। তবে এ বিষয়ে আদালত নতুন করে কোনো আদেশ দেয়নি। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল (ডিএজি) ব্যারিস্টার এবিএম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল সাইফুল আলম। শুনানিকালে আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে উদ্দেশ করে বলে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কতজন মারা গেছেন তা নিয়ে পত্রপত্রিকায় দুই রকম তথ্য দেখছি। সরকারি হিসাবে বলা হচ্ছে ৪৮ জন। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে বলা হচ্ছে ৭২ জন। এটা নিয়ে দুই রকম তথ্য কেন? জবাবে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সরকারি হিসাবে ৪৮ জন। যারা ডেঙ্গুতে মারা গেছেন তাদের কারও কারও অন্য রোগ থাকতে পারে। কারও হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। তাই এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয়। এ সময় আদালত বলে, ধরে নিচ্ছি, ৪৮ জনই মারা গেছেন। যারা মারা গেছেন তাদের পরিবারের কী অবস্থা তা একবার ভেবে দেখুন। ডেঙ্গু এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। যথাসময়ে যদি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হতো তাহলে হয়তো এত লোককে মরতে হতো না। আদালত বলে, শরীয়তপুর থেকে একজন ঢাকায় সেবা দিতে এসে মারা গেছেন। তিনি যদি গ্রামে থাকতেন তাহলে হয়তো তাকে মরতে হতো না। আদালত বলে, নিজেরা সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করে জনগণের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে। জনগণকে তাদের ঘরবাড়ি পরিষ্কার করতে বলা হচ্ছে। সত্যিকারে যেখানে এডিস মশা থাকে সেখানে ওষুধ ছিটালেই তো হয়। জনগণকে সচেতন হতে হবে-এটা ঠিক। কিন্তু সব দায় জনগণের- এমনটা ভাবার কোনো সুযোগ নেই। ডেঙ্গু মশার লার্ভা ও ডিম থাকে পানিতে। উনারা সেটা পরিষ্কার না করে রাস্তায় ময়লা ফেলে পরিষ্কার করলেন। এটা নেহায়েতই হাস্যকর। আদালত বলে, কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বছরের পর বছর একই ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। অথচ ওই ওষুধে কাজ হচ্ছে না। একটি ওষুধ বার বার ব্যবহার করলে তা সহনীয় হয়ে যায়। এটা বুঝতে হবে।

জামালপুরে দুজনের মৃত্যুর দাবি : এদিকে জামালপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জামালপুরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে দুজনের মৃত্যুর দাবি করেছে পরিবার। গতকাল দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও দেওয়ানগঞ্জের চুনিয়াপাড়া গ্রামে তাদের মৃত্যু হয়। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে তাদের মৃত্যুর বিষয়ে নিশ্চিত করতে পারেনি।

এছাড়া ময়মনসিংহ প্রতিনিধি জানান, গতকাল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়ে রাসেল মিয়া (৩৫) নামে একজন যুবকের মৃত্যু হয়েছে।


আপনার মন্তব্য