শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ২৩:১০

সড়কে প্রতিদিন ঝরছে প্রাণ

বছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি ৩৮ শতাংশ ভারী যানবাহনে চালকের লাইসেন্স নেই

মাহবুব মমতাজী

সড়কে প্রতিদিন ঝরছে প্রাণ

দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রায় প্রতিদিন ঝরছে প্রাণ। এ সংখ্যা দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। সড়ক দুর্ঘটনায় একটি মৃত্যুর সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে গোটা পরিবারেরই যেন মৃত্যু হয়। দেশের প্রায় ৩৮ শতাংশের বেশি ভারী যানবাহনের চালকের কোনো লাইসেন্স নেই। সড়কে দুর্ঘটনা বাড়লেও প্রতিরোধের তেমন কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ে না। সড়ক, যানবাহন এবং দক্ষ চালক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলার তিন মূল নিয়ামক। কিন্তু দেশের এর কোনোটিই ত্রুটিমুক্ত নয়। ফলে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে  আসছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। বিশেষজ্ঞদের দাবি, অদক্ষ চালক আর অপরিকল্পিত যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিদিন মারা যাচ্ছে ২০ জন। আর এসব সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বছরে প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা। এর জন্য ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল, লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ চালকের ছড়াছড়ি, সড়কে অব্যবস্থাপনা ও অসচেতনতাই দায়ী। আর এ দুর্ঘটনা বাড়তে থাকলে ২০২৫ সালে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে বাধার সম্মুখীন হবে বাংলাদেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৬ সালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা ২৪ হাজার ৯৫৪ জন।  পুলিশ সদর দফতর থেকে পাওয়া তথ্যে, বাংলাদেশে ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৩৬৯টি। শুধু ঢাকাতেই ফিটনেসবিহীন গাড়ি আছে এক লাখ ৬৮ হাজার ৩০৮টি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ২২৬ জন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ১৯৪টি। গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায় ২ হাজার ৬৩৫ জন এবং আহত হয় এক হাজার ৯২০ জন।

সড়ক দুর্ঘটনা রোধে জাতীয় ঐক্যের প্রকাশিত সড়ক বার্তায় বলা হয়, দেশের সড়ক দুর্ঘটনার ধরন এবং মাত্রা ক্রমাগত বাড়ছে। আহত-নিহতের সঠিক চিত্রও পুলিশের রেকর্ডে উঠে আসে না। তবে দেশের শহরাঞ্চলে মোট নিহতের ৭০ শতাংশই পথচারী। সারা দেশে এই হার ৫৪ শতাংশ। তবে ঢাকা শহরে যতগুলো পঙ্গু ভিক্ষুক ও ভাসমান মানুষ পাওয়া যায় তার ৭০ ভাগই সড়ক দুর্ঘটনায় হাত-পা হারানো বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। এ সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরে দুর্ঘটনায় ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষের মৃত্যু এবং প্রায় ২৫ হাজার মানুষ পঙ্গু হচ্ছে। যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা।  সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের (সওজ) তথ্যানুযায়ী, দেশের জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কের ৬২ শতাংশে যথাযথ সাইন-সংকেতের ব্যবস্থা নেই। জাতীয় মহাসড়কের অন্তত ১৫৪ কিলোমিটার মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। আর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) হিসাব মতে, দেশে ৪০ লাখ ১৮ হাজার ৭৬৭টি নিবন্ধিত যানবাহন রয়েছে। এর মধ্যে ফিটনেসবিহীন যানবাহনের সংখ্যা ৫ লাখের মতো। ভারী যানবাহন আছে ২ লাখ ৫২ হাজার। এসব যানবাহনের বিপরীতে লাইসেন্স আছে ১ লাখ ৫৫ হাজার চালকের। অর্থাৎ ৩৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ যানবাহন চলছে ভুয়া চালক দিয়ে। আর দেশে হালকা যানবাহনের সংখ্যা ৭ লাখের কিছু বেশি। এই শ্রেণির যানবাহনের চালকের লাইসেন্স আছে ১৭ লাখের ওপরে।   ১৯৯৯ সাল থেকে সড়ক দুর্ঘটনার পুলিশের দেওয়া তথ্য সংরক্ষণ এবং তা বিশ্লেষণ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা ইনস্টিটিউট (এআরআই) জানায়, ৫৩ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে। আর চালকদের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনার পেছনে চালক কোনো না কোনোভাবে দায়ী। গত সাড়ে তিন বছরে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ২৫ হাজার ১২০ জন। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ২০ জন করে। এ সময়ে আহত হয়েছেন ৬২ হাজার ৪৮২ জন।  

যাত্রীকল্যাণ সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারা দেশে সংঘটিত ৩৪ শতাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট ছিল। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানে দুর্ঘটনা ঘটে ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাসের দুর্ঘটনা ২৫ শতাংশ। কার, মাইক্রোবাস ১৫ শতাংশ। তবে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা আরেক সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই বাংলাদেশের (নিসচা) হিসাবে, গত তিন বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ১৩ হাজার ৩৬৭ জন। আহত হয়েছে ১৯ হাজার ১৫৮ জন। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, দুর্ঘটনায় আহত-নিহতদের জন্য সরকারের আলাদা কোনো বাজেট নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার বাজেট এ খাতে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। ঢাকায় যানজটের কারণে গাড়ির গতি থাকে ৫ কিলোমিটার। এরপরও এখানে দুর্ঘটনার কারণ প্রতিযোগিতা। যখন ট্রাফিক সিগন্যাল ছেড়ে দেয়, কিংবা রাস্তা সামান্য ফাঁকা পায় তখনই চালক ধৈর্যহারা হয়ে বেপরোয়া গতিতে চালাতে চায়। আর তখনই মানুষের প্রাণহানি হয়। তবে ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি।


আপনার মন্তব্য

close