শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ টা
আপলোড : ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ ২৩:০৩

রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার আজ শুরু

জুলকার নাইন

রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার আজ শুরু

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে লড়াই শুরু হচ্ছে আজ। নেদারল্যান্ডসের হেগে ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস’ (আইসিজে)-এ শুরু হবে রাখাইনে গণহত্যা চালানো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলার শুনানি। হেগের স্থানীয় সময় ১০ ডিসেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে এই শুনানি। মামলায় লড়তে সু চির নেতৃত্বে মিয়ানমারের প্রতিনিধি দল ইতিমধ্যে সেখানে পৌঁছেছে। অন্যদিকে মামলার বাদী গাম্বিয়াকে কারিগরি সহায়তা করতে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলও গিয়েছে হেগে। বাংলাদেশ ছাড়াও গাম্বিয়াকে সহায়তা করবে  কানাডা ও নেদারল্যান্ডস। জানা যায়, পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া ১১ নভেম্বর আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে মামলাটি দায়ের করে। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের জাতিগতভাবে নির্মূল করতে রাখাইনে গণহত্যা, গণধর্ষণসহ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ করা হয়েছে ওই মামলায়। আইসিজের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডসের পিস প্যালেসে অবস্থিত আইসিজেতে মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) গাম্বিয়ার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলার শুনানি শুরু হবে। ১১ ডিসেম্বর বক্তব্য উপস্থাপন করবে মিয়ানমার। এরপর ১২ ডিসেম্বর সকালে গাম্বিয়া পাল্টা যুক্তি দেবে মিয়ানমারের বিপক্ষে। আর দুপুরে মিয়ানমার গাম্বিয়ার জবাব দেবে।

আন্তর্জাতিক আদালতে তিন দিনের শুনানিতে জাতিসংঘ নিযুক্ত ১৬ জন বিচারক প্যানেল মূলত উভয় পক্ষের আইনজীবীদের প্রশ্ন করবেন। এ জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ল ফার্ম ফলি হককে আইনজীবী নিযুক্ত করেছে গাম্বিয়া। এই ফার্মটি মিয়ানমার ও ভারতের বিপক্ষে সমুদ্রসীমা-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশের পক্ষে আইনজীবীর দায়িত্ব পালন করেছে। গাম্বিয়ার পক্ষে এই ফার্মের প্রধান আইনজীবী পায়াম আখাবানও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানবিক ও মানবাধিকার বিষয়ে বিশ্বব্যাপী পরিচিত আইনজীবী প্রফেসর স্যার উইলিয়াম এ শাহবাসকে মিয়ানমারের পক্ষে নিযুক্ত করা হয়েছে। কানাডীয় ও আইরিশ নাগরিক আইনজীবী প্রফেসর শাহবাস মানবিক ও মানবাধিকার প্রশ্নে এর আগে কসোভোতে গণহত্যা হয়েছে বলে মনে করেননি। রোহিঙ্গাদের বিপক্ষেও তার অবস্থান একই রকম। আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে দায়ের করা রোহিঙ্গা গণহত্যা মামলায় নিজ দেশের পক্ষে লড়াই করতে নেদারল্যান্ডসের হেগে পৌঁছেছেন নোবেলজয়ী মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চি। সু চি হেগের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে দেশটির মিত্র চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইর সঙ্গে বৈঠক করেন। আইসিজেতে মিয়ানমারের বিপক্ষে দায়ের করা মামলায় বাংলাদেশ সরাসরি কোনো পক্ষ নয়। তবে গাম্বিয়ার পক্ষে এ ব্যাপারে লজিস্টিক সহায়তা দেবে বাংলাদেশ। এ জন্য পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকের নেতৃত্বে ২০ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গতকাল হেগের উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। এ প্রতিনিধি দলে আছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিষয়ক সচিব মাসুদ বিন মোমেন, অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার সুফিউর রহমান, ইরানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গাউসুল আজম সরকারসহ কয়েকজন কূটনীতিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তিনজন প্রতিনিধি। অন্যদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুুডো এরই মধ্যে গাম্বিয়াকে আইসিজেতে সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। ফলে রাখাইনে গণহত্যার বিচার নিশ্চিত করতে গাম্বিয়াকে সব ধরনের সহযোগিতা দিতে তৈরি আছে কানাডা। ইতিমধ্যে মিয়ানমারবিষয়ক কানাডার বিশেষ দূত বব রায়ের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল শনিবার নেদারল্যান্ডসে পৌঁছেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজেতে গণহত্যার মামলার শুনানি চলাকালে নেদারল্যান্ডসে বেশ কিছু অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশসহ ওআইসির সদস্য কয়েকটি দেশ এবং একাধিক আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থা এসব আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন বলেন, জাতিসংঘের অধীন আইসিজেতে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে চলা মামলায় বাংলাদেশ সরাসরি কোনো পক্ষ নয়। গাম্বিয়া ও মিয়ানমারের মধ্যে এই মামলায় লড়াই চলবে। তবে মামলা পরিচালনায় বাংলাদেশ লজিস্টিক সহযোগিতা দেবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সব সময়ই মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে আগ্রহী। কিন্তু মিয়ানমার এ বিষয়ে আন্তরিক নয়।

যে কারণে আইসিজেতে মামলা : জাতিসংঘের অধীনে দুই ধরনের আন্তর্জাতিক আদালত আছে। একটা হলো ‘ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট’ (আইসিসি) এবং অপরটি ‘ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস’ (আইসিজে)। কোনো ব্যক্তি আন্তর্জাতিক ফৌজদারি অপরাধ করলে তার বিচার ও সাজা নির্ধারণ করে আইসিসি। রোম চুক্তিতে যেসব দেশ সই করেছে, সাধারণত ওই দেশগুলোর কেউ গণহত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ করলে অপরাধী ব্যক্তির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারিসহ সাজা দিতে পারে আইসিসি। বাংলাদেশ রোম চুক্তিতে সই করলেও মিয়ানমার এতে সই করেনি। আইসিসিতে এ কারণে বিচারে কিছুটা অসুবিধা থাকলেও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সুপারিশ করলে আইসিসি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘটিত অপরাধের বিচার করতে পারে। অন্যদিকে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার সময়ই ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আইসিজে। দুই দেশ কোনো বিরোধে জড়ালে আইসিজে শুনানি গ্রহণ করে রায় দিতে পারে। মিয়ানমার, গাম্বিয়া ও বাংলাদেশ আইসিজের সদস্য। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে মিয়ানমার ও গাম্বিয়া পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়বে।

কী হতে পারে রায়ে : আইসিজে রায়ে মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বলতে পারে। কিংবা আইসিজে বলতে পারে যে, রোহিঙ্গারা ঐতিহ্যগতভাবে মিয়ানমারের নাগরিক হওয়ার যোগ্য। তাই তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার আদেশ দিতে পারে আন্তর্জাতিক এই আদালত। তবে আইসিজে রায় কার্যকর করতে পারে না। মিয়ানমার, গাম্বিয়া, বাংলাদেশ আইসিজের সদস্য। ফলে রায় সদস্য-দেশগুলো নিজেরা কার্যকর করতে পারে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ রায় কার্যকরে পদক্ষেপ নিতে পারে। আবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী কোনো সদস্য দেশ রায় কার্যকরে বল প্রয়োগও করতে পারে। যদিও ফিলিস্তিনের পক্ষে আইসিজে রায় দিলেও যুক্তরাষ্ট্র তা কার্যকর করতে পদক্ষেপ নেয়নি। যুক্তরাষ্ট্র বরং উল্টো ইসরায়েলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তবে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর পক্ষে রয়েছে।


আপনার মন্তব্য

close