শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ জানুয়ারি, ২০২০ ২৩:৩২

ভোটের মাঠে তুমুল লড়াই

কেউ হার মানতে রাজি নয় । নেতা-কর্মী ও প্রার্থীরা দিনরাত ছুটছেন দুয়ারে দুয়ারে প্রচারণা তুঙ্গে । তাবিথের ইশতেহার । ইসিতে দুই দলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ

মাহমুদ আজহার ও রফিকুল ইসলাম রনি

ভোটের মাঠে তুমুল লড়াই
রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে গতকাল প্রচারণায় ব্যস্ত ছিলেন মেয়র প্রার্থীরা -বাংলাদেশ প্রতিদিন

ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনে ভোটের মাঠে তুমুল লড়াইয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এ লড়াইয়ে বিজয়ী হতে প্রধান দুই দলের মেয়র-কাউন্সিলর প্রার্থী ছাড়াও দলীয় নেতা-কর্মীরা দিনরাত ছুটছেন ভোটারের দুয়ারে দুয়ারে। শেষ মুহূর্তের প্রচারণা এখন তুঙ্গে।

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ভূমিকা নিয়ে দুই দলের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে বিক্ষিপ্ত উত্তাপ ছড়ালেও এখন পর্যন্ত ভোটের উৎসবমুখর পরিবেশই বিরাজ করছে। দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও পোস্টার, লিফলেট বা গণসংযোগে প্রতিযোগিতামূলক গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ নির্বাচনের চিত্রপট দৃশ্যমান রয়েছে। ভোটারদের মধ্যে নানা শঙ্কা কাজ করছে। তবে সুষ্ঠু ভোট হবে এমনটাই প্রত্যাশা সবার। মেয়র প্রার্থীদের পাশাপাশি কাউন্সিলর প্রার্থীরাও ঘাম ঝরাচ্ছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০১৪ সালের পর এবারই প্রথম প্রধান দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ-বিএনপি সমানতালে রাজধানীতে গণসংযোগ করছে। সবারই পোস্টার, লিফলেট বা ব্যানার দেখা যাচ্ছে। সব দলের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা পছন্দমতো গণসংযোগ করছেন। যদিও এরই মধ্যে দু-একটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বড় ধরনের কোনো অবনতি ঘটেনি। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে চলেছে সব দলই। তার পরও উৎসবমুখর ভোট করতে কিছুটা ছাড় দিয়েছে ইসিও। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশনের ওপর সব রাজনৈতিক দলের আস্থা নেই। বিশেষ করে ইভিএম নিয়ে এখনো কয়েকটি দল নির্বাচন কমিশনকে বলছে তা বাদ দিতে। এ ব্যাপারে ইসি অনড় কেন তা বুঝি না। এ ছাড়া সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো আশঙ্কা বিরাজ করছে। নিজের ভোট দিতে পারবেন কিনা এ নিয়ে সংশয়ে অনেকেই।’ আওয়ামী লীগসূত্রে জানা গেছে, সিটি নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে দলটি। এজন্য কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন ক্ষমতাসীন দলটির নেতারা। নৌকার ভোট চাইতে ঘরে ঘরে যাচ্ছেন তারা। দুই সিটিতে দুই প্রার্থীও ঘাম ঝরাচ্ছেন। দলের নেতাদের ভাবনা, সরকারের অভাবনীয় উন্নয়নের বিষয়টি টনিক হিসেবে নির্বাচনে কাজে লাগবে। আওয়ামী লীগ নেতারা এবং সরকারের মন্ত্রিবর্গ তফসিলের পর থেকেই বলে আসছেন, দুই সিটিতে সুষ্ঠু ভোট হবে। সে কারণেই ঢাকা দক্ষিণে সাঈদ খোকনের পরিবর্তে শেখ ফজলে নূর তাপসকে আওয়ামী লীগ মেয়র প্রার্থী করেছে। বিগত নির্বাচন বিএনপি মাঝপথে বর্জন করায় ঢাকার দুই সিটিতে ভোট হয় একচেটিয়া। এর বাইরে জাতীয় নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচনও বিএনপি বর্জন করায় একতরফা ভোট হয়। সে বদনাম ঘোচাতে চায় ক্ষমতাসীনরা। ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘আমরা ঢাকাবাসী থেকে স্বতঃস্ফূর্ত সাড়া পাচ্ছি। আমাদের উন্নয়নের রূপরেখা ঢাকাবাসী সাদরে গ্রহণ করেছেন। আমরা নির্বাচিত হলে ৯০ দিনের মধ্যে সব নাগরিক সুবিধা দোরগোড়ায় পৌঁছে দেব।’ ঢাকা উত্তর সিটিতে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলাম বলেন, ‘উন্নয়ন হবে। সে উন্নয়নের চাইতে আরও বেশি উন্নয়ন হবে যদি আমরা একটি সুস্থ মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে পারি।’ বিএনপিসূত্রে জানা গেছে, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ভোটের শেষ পর্যন্ত থাকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। দুই স্তরের পোলিং এজেন্টকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কেন্দ্রে পাঠানো, কেন্দ্র পাহারায় কেন্দ্রভিত্তিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে নির্ভয় প্রদান করতেও কাজ করছে বিএনপি। দলটি বলছে, ভোটারদের মধ্যে কোনো ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করা যাবে না। এতে ভোটাররা কেন্দ্রবিমুখ হবেন। আর যত বেশি ভোট পড়বে বিএনপির জন্য ততই লাভ হবে। ঢাকা দক্ষিণে বিএনপির মেয়র প্রার্থী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন বলেন, ‘আমার বাবা মুক্তিযোদ্ধা মরহুম সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন অবিভক্ত ঢাকার মেয়র। তার সময়ে ঢাকার এই করুণ অবস্থা ছিল না। এ রকম অবাসযোগ্য নগরী ছিল না। ভোটারদের বলব, আপনারা নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে আপনার অধিকার প্রয়োগ করুন। আমরা আপনাদের অভয় দিচ্ছি।’

তাবিথের ইশতেহারে ১৯ দফা : ঢাকাকে বিশ্বমানের আধুনিক সিটি করার ঘোষণা দিয়ে ১৯ দফা ইশতেহার দিলেন ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল। অপরিকল্পিত নগরীতে অগণিত চ্যালেঞ্জের মুখে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য-২০৩০-এর আলোকে তিনি এই ইশতেহার ঘোষণা করেন। গতকাল সকালে রাজধানীর গুলশানের ইমানুয়েলস কনভেনশন হলে তাবিথ জানান, মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হলে তিনি ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধে ১ ফেব্রুয়ারি থেকেই কার্যক্রম শুরু করবেন। ২৪ ঘণ্টাই খোলা থাকবে মেয়রের দরজা। ডেঙ্গুর ভাইরাস বহনকারী এডিস মশা ও লার্ভা নিধনে কার্যকর কীটনাশক প্রয়োগ, মশাপ্রতিরোধী বৃক্ষ রোপণ, নিয়মিত মশার প্রবলতা পরীক্ষা ও জলাশয় পরিষ্কার করতে উদ্যোগ নেবেন তিনি। ইশতেহার ঘোষণার আগে তাবিথ আউয়াল বলেন, ‘আমি আপনাদের কাছে আমার স্বপ্ন ও পরিকল্পনার কথাগুলো বলার আগে আবেদন জানাচ্ছি, দয়া করে আমাকে সহযোগিতা করুন, সমর্থন করুন, আমার পাশে দাঁড়ান। আমি আপনাদের সহানুভূতি চাই। কথা দিচ্ছি, আপনাদের অধিকার, সুযোগ-সুবিধা ও সেবার বিষয়ে আমি কখনো আপস করব না।’

তাবিথের প্রার্থিতা বাতিলের রিট পর্যবেক্ষণসহ খারিজ : ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়ালের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে করা রিট আবেদন পর্যবেক্ষণসহ সরাসরি খারিজ করে দিয়েছে হাই কোর্ট। ফলে সিটি নির্বাচনে তাবিথ আউয়ালের প্রার্থিতা ঠিক রয়েছে বলে জানান আইনজীবীরা। গতকাল দুপুর ২টার দিকে শুরু করে ১ ঘণ্টা ৫০ মিনিটের মতো শুনানির পর বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।

আতিকুলের গণসংযোগ : ঢাকা উত্তর সিটিতে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলাম গতকাল উত্তরার ৭ নম্বর সেক্টরের মাসকট প্লাজা থেকে গণসংযোগ শুরু করেন। পরে ১১ নম্বর সেক্টর, বাউনিয়া, নলভোগ, কালিয়ার টেক এলাকায় গণসংযোগ করে নৌকার পক্ষে ভোট চান এই মেয়র প্রার্থী।

আতিকের নির্বাচনী কার্যালয়ে রাদওয়ান : ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সব প্রার্থী ও নেতা-কর্মীদের ঘরে ঘরে গিয়ে ভোট চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক। গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা উত্তর আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আতিকুল ইসলামের বনানীর নির্বাচনী কার্যালয়ে উপস্থিত হন তিনি।

তাপসের গণসংযোগ : ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস গতকাল ডেমরায় পথসভা ও গণসংযোগ করেন। এ সময় বিভিন্ন ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী ও নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

ইশরাকের গণসংযোগ : ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে বিএনপির মেয়র প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এরপর ডিইউজে ও বিএফইউজের দুই অংশ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি ও ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সদস্যদের সঙ্গেও তিনি মতবিনিময় করেন। এরপর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তিনি। মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরী, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি যুগান্তরের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সাইফুল আলম, সাংবাদিক নেতা সৈয়দ আবদাল আহমদ, শাবান মাহমুদ, শ্যামল দত্ত, শাহেদ চৌধুরী, মাইনুল আলম, ইলিয়াস খান, কাদের গনি চৌধুরী, ওমর ফারুক, আবদুস শহীদ, নুরুদ্দিন আহমেদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

ইসলামী আন্দোলনের দুই মেয়র প্রার্থী : ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মেয়র প্রার্থী আবদুর রহমান ও মাওলানা শেখ ফজলে বারী মাসউদ গতকাল ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। বলছেন নির্বাচিত হতে পারলে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা।

মিলনের ১৭ দফা : রাজধানী ঢাকাকে যানজটমুক্ত রাখাসহ ১৭ দফা নির্বাচনী ইশতেহার পেশ করেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচিত হলে বেতন নেব না। ঢাকা সিটির উন্নয়নে ২০ বছরের মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে।’ গতকাল কাকরাইলে জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেন মিলন।

গোপীবাগের ঘটনা বিএনপির সাজানো : গতকাল আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচ টি ইমামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্য কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, গোপীবাগে বিএনপির মেয়র প্রার্থীর প্রচারে হামলার যে অভিযোগ তা পুরোপুরি সাজানো ও পূর্বপরিকল্পিত। আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলছেন উল্লেখ করে বিএনপির অভিযোগকে ‘চোরের মার বড় গলা’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তাপসের সমর্থনে মাঠে মুক্তিযোদ্ধা ও সন্তানরা : ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের সমর্থনে মাঠে নেমেছে মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সন্তানরা। গতকাল জাতীয়  প্রেস ক্লাবের সামনে এক সমাবেশে ফজলে নূর তাপসকে নির্বাচিত করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করার আহ্বান জানান মুক্তিযোদ্ধা সংসদ  কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক নির্বাচিত যুগ্ম মহাসচিব সফিকুল বাহার মজুমদার টিপু। আমরা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংগঠনের সভাপতি হুমায়ুন কবিরের সভাপতিত্বে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম নয়নের পরিচালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ  কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল নির্বাচন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক মো. আবদুল হাই, আনোয়ার হোসেন পাহাড়ি বীরপ্রতীক, কানাডা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি জসীম চৌধুরী, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান পারভীন রশীদ, নুরুজ্জামান ভুট্টো, অ্যাডভোকেট সাইফুল বাহার মজুমদার, লুবনা খান, রুবানা ইয়াসমিন অন্তরা প্রমুখ। এদিকে সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছে বাংলাদেশ (হিন্দু ত.স) তফসিল জাতি ফেডারেশন। গতকাল সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনের সভাপতি প্রকাশ দাস চৌধুরী ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মলয় সিনহা সমর্থন জানান।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর