শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:১৮

পুলিশের রোষানলে সর্বনাশ

জিম্মি করে টাকা আদায়, অসহায় মানুষের আর্তনাদ

সাখাওয়াত কাওসার

পুলিশের রোষানলে সর্বনাশ

২০১৯ সালের ২০ জানুয়ারি বিকাল আনুমানিক ৫টা। রাজধানীর খিলগাঁও ছোট বটতলা ব্রিজের ঢাল থেকে ব্যবসায়ী তাপস চন্দ্র দে ওরফে খোকনকে ডেকে পার্শ্ববর্তী একটি মার্কেটে নিয়ে যায় খিলগাঁও থানার তৎকালীন এএসআই হায়দার আলী। সঙ্গে ছিল সোর্স রহমান এবং সোর্স জলিল। তাপসকে মাদক বিক্রির জন্য দোষারোপ করতে থাকে এএসআই হায়দার আলী। একপর্যায়ে পিকআপ ভ্যানে উঠিয়ে তাপসকে বলা হয়, দুই লাখ টাকা না দিলে তাকে মাদক মামলার আসামি করা হবে। মানসম্মানের ভয়ে তাপস দুই লাখ টাকা ম্যানেজ করে দেওয়ার পরও মামলা থেকে রেহাই পাননি। ছয় বোতল ফেনসিডিল তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে এমন একটি মামলা দিয়ে তাপসকে কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। মামলার বাদী এসআই মনিরুজ্জামান। পরবর্তীতে পুলিশ সদর দফতরের তদন্তে উঠে আসে প্রকৃত চিত্র। দোষীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নিমিত্তে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে উল্লেখ করে ২০১৯ সালের ২২ জানুয়ারি দেওয়া হয় মামলার ফাইনাল রিপোর্ট। কিন্তু পুলিশের রোষানলে পড়ে তাপসের জীবন থেকে ততদিনে চলে গেছে বেশ কয়েকটি মাস। কারাগারে বন্দী থেকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হন।

শুধু ব্যবসায়ী এই তাপসই নন, তার মতো আরও অনেক সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীর জীবন আজ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে পুলিশের রোষানলে পড়ে। অনেকে পুলিশের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে জীবন পর্যন্ত দিয়েছেন।

পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) সোহেল রানা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বাংলাদেশ পুলিশের দুই লক্ষাধিক সদস্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত। তাদের মধ্যে কখনো কখনো দু-একজন সদস্যের বিরুদ্ধে বিচ্যুতি, অপেশাদারসুলভ বা অপরাধমূলক আচরণ বা কর্মকান্ডের অভিযোগ পাওয়া যায়। প্রতিটি অভিযোগ আমলে নিয়ে আমরা উপযুক্ত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করি। উপযুক্ত আইনি প্র?ক্রিয়া মে?নে এ ব্যবস্থা গ্রহণ কিছুটা সময়সা?পেক্ষ। ত?বে, উ?ত্থিত প্র?ত্যেক?টি অ?ভি?যো?গের বিষ?য়েই যথার্থ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।

গতকাল ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে সিএমপির বায়েজিদ থানার আলোচিত ওসি প্রিটন সরকারসহ সাত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন মোহাম্মদ ইয়াছিন নামে এক ব্যক্তি। অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মহিউদ্দিন মুরাদের আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়। বাদী পক্ষের আইনজীবী শহীদুল ইসলাম সুমন বলেন, বায়েজিদ থানা পুলিশ মো. ইয়াছিনকে দুই দফায় তুলে নিয়ে ২৩ লাখ টাকা আদায় করে। এ অভিযোগে বায়েজিদ থানার বর্তমান ওসি প্রিটন সরকার, সাবেক ওসি আতাউর রহমান, বায়েজিদ থানার এসআই আকতার, এএসআই ইব্রাহিম, মিঠুন দাশ, কনস্টেবল রহমান এবং সাইদুলকে আসামি করা হয়। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনারকে (প্রশাসন ও অর্থ) তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।

তবে অভিযুক্ত প্রিটন সরকার বলেন, ইয়াছিন নামে কাউকে তিনি চেনেন না। সাবেক ওসি আতাউর রহমানের বক্তব্যও অনেকটা একই। তিনি বলেন, ‘এ থানা থেকে তিন মাস আগে বদলি হয়ে গেছি। ইয়াছিন নামে কাউকে চিনি না। অভিযোগের বিষয়ে বলতে পারব না।

২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর থেকে শুরু। তিন লাখ টাকা না দেওয়ায় জাল মুদ্রার ব্যবসায়ী হিসেবে মামলা দেওয়া হয় রাজধানীর ফকিরেরপুল ‘বন্ধু হোটেল’-এর ম্যানেজার হাসান মজুমদার ও হোটেলের বাবুর্চি সোহেল রানার বিরুদ্ধে। সাজানো মামলায় ৫ মাস ১৭ দিন জেল খেটে তারা জামিনে মুক্তি পেলেও তার ওপর অব্যাহত রয়েছে পুলিশি হয়রানি। এ বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী সময়ে ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশের আইজিপি ও ডিএমপি কমিশনার বরাবর অভিযোগ করা হলে বিভিন্ন সময় তদন্ত এবং সমঝোতার আশ্বাসেও মুক্তি মেলেনি তাদের। গতকাল এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে দেন হাসান মজুমদার। তিনি বলেন, ডিবির (পূর্ব) তৎকালীন এসি (বর্তমানে, এডিসি) জুয়েল রানার টিমের এসআই তপন কুমার ঢালীর (বর্তমানে পিবিআই-তে কর্মরত) এসআই দেওয়ান উজ্জ্বল হোসেন, এএসআই জিয়াউর রহমান, সোহেল মাহমুদ, আবুল বাশার, মোমিনুল হক, নাজমুল হক প্রধান, কং নয়ন কুমার ও কং গোলাম সারোয়ার তার হোটেলে গিয়ে তাকে এবং সোহেলকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে আসেন।

তিনি আরও বলেন, ভাগ্যিস হোটেলের একটি সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ হয়নি। ওই ক্যামেরা থেকেই আমরা ফুটেজ পেয়েছি। তবে আমার পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ দেওয়ার পর তিনটি তদন্ত কমিটি হলেও অভিযুক্তরা এখনো বহাল তবিয়তে। উল্টো তাকে ও তার সহকর্মীর নামে ভুয়া মামলায় চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তাদের ফাঁসানোর জন্য ভুয়া সাক্ষী বানিয়ে আদালতে তা প্রমাণের চেষ্টা করে যাচ্ছে অভিযুক্ত ডিবির সদস্যরা। জানা গেছে, ডিবি পুলিশের ভুয়া মামলা থেকে রেহাই পেতে হাসান মজুমদার পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিএমপি), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দফতর থেকে ডিবির আট সদস্যের বিরুদ্ধে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটির প্রধান করা হয় পুলিশ সদর দফতরের এএসপি ওমর ফারুক, সিনিয়র এএসপি শরিফুল ইসলাম ও ডিবির এডিসি কাজী শফিকুল আলমকে। এ ছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়। এই কমিটির প্রধান হলেন তৎকালীন ক্যান্টনমেন্ট জোনের এডিসি মোহাম্মদ সাহেদ মিয়া ও ডিএমপির তৎকালীন অতিরিক্ত কমিশনার বর্তমানে রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য। সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয় শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং কুমিল্লা জেলার সাবেক জেলা প্রশাসক এ কে এম শামসুল হক খানের নামের দেওয়া অর্পিত সম্পত্তি দখলে পুলিশের সহায়তা। পুলিশি সহায়তা এবং আর্থিক সংশ্লেষের অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ওয়ারীর উপ-কমিশনার মোহাম্মদ ইব্রাহীম খানকে গত বছরের ২৫ আগস্ট সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে বর্তমান কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাবেক বংশাল থানার ওসি সাহিদুর রহমান এবং সাবেক নবাবপুর ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) জাহাঙ্গীর হোসেনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। সাড়ে ৫ লাখ টাকা ডাকাতির অভিযোগে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) এসআই রাশেদুল আলমকে গ্রেফতার করেছে ওয়ারী থানা পুলিশ। গত ১৮ ডিসেম্বর ওয়ারী থানায় ডাকাতির অভিযোগে বাদী শফিউল আলম আজাদের মামলায় গ্রেফতারকৃত ৫ জনের জবানবন্দিতে এসআই রাশেদুল আলমের নাম উঠে এলে গ্রেফতার হন রাশেদুল। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত বছরের ৫ ডিসেম্বর মামলার বাদী শফিউল আলম আজাদ, তার বন্ধু গিয়াস উদ্দিন ও ভাগিনা মাহমুদুল হাসান মুন্নাসহ সাড়ে ৫ লাখ টাকা নিয়ে মাদারীপুরের উদ্দেশে রওনা দেন। এরপর ওয়ারীর টিপু সুলতান রোডে পৌঁছালে একটি মাইক্রোবাসে এসে অজ্ঞাতনামা ৪/৫ ব্যক্তি নিজেদের র‌্যাব পরিচয়ে পেটে অস্ত্র ঠেকিয়ে তাদের সবাইকে গাড়িতে তুলে নেয়। পরে তাদের মুন্সীগঞ্জে নিয়ে হাত-চোখ বেঁধে সাড়ে ৫ লাখ টাকাসহ অন্যান্য মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নেয়। এসআই রাশেদুল আলম নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার ভুঁইঘর গ্রামের শহিদুল্লাহর ছেলে।

হেফাজতে মৃত্যু : হঠাৎ বেড়েছে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুধু ২০১৯ সালেই সারা দেশে পুলিশের হেফাজতে ১৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এদের মধ্যে গ্রেফতারের আগে নির্যাতনে চারজন এবং গ্রেফতারের পর শারীরিক নির্যাতনে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। থানার হাজতখানায় দুজন আত্মহত্যা করেন। দুজন অসুস্থ হয়ে মারা যান। বাকি দুজন নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। সর্বশেষ গত ১৯ জানুয়ারি রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার হাজতে আবু বক্কর সিদ্দিক বাবু (৩৫) নামে একজন আসামি মারা যান। পুলিশ বলছে, ওই আসামি হাজতের গ্রিলের সঙ্গে চাদর পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন। তবে গ্রিলের সঙ্গে চাদর পেঁচিয়ে আত্মহত্যার বিষয়টি মানতে রাজি নন নিহত বাবুর সহকর্মীরা। বাবু বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) ফ্লোর ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ১৬ জানুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশের নির্যাতনে গাড়িচালক আলমগীরের মৃত্যু হয়েছে এমন অভিযোগ এনে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি তপন চন্দ্র সাহা, এসআই মো. মিজানুর রহমান, এএসআই নামজুল ও মো. সোহাগকে আসামি করে মামলা করেছেন আলেয়া বেগম। তিনি মৃত আলমগীরের স্ত্রী। এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, সম্প্রতি উত্তরা পশ্চিম থানা ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা পুলিশের হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনা দুটি তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় মৃত্যুর অভিযোগটি হচ্ছে আত্মহত্যা। তবে তার আত্মহত্যায় কারও প্ররোচনা রয়েছে কিনা সে বিষয়টিও আমি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছি। তদন্ত রিপোর্ট পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর