শিরোনাম
প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ২৩:২১

এখনো খোঁজ মেলেনি দুজনের প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থ পুলিশ

চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির এক বছর, রিটের কথা ভুলেই গেছেন এক আইনজীবী

আরাফাত মুন্না ও মাহবুব মমতাজী

এখনো খোঁজ মেলেনি দুজনের প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থ পুলিশ

চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটনার এক বছর আজ। গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে এই অগ্নিকান্ডের ঘটনায় ৬৯ জন প্রাণ হারান। আজও খোঁজ মেলেনি ওই ঘটনায় নিখোঁজ দুজনের। অন্যদিকে ৯ দফা সময় নিয়েও বিচারিক আদালতে পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার বিচারও শুরু করা সম্ভব হয়নি। জানা গেছে, এ ঘটনায় অশনাক্ত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে রয়েছে তিনটি লাশ। ডিএনএ নমুনায় মিল খুঁজে না পাওয়ায় লাশগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে পুলিশ জানিয়েছে। ভয়াবহ ওই অগ্নিকান্ডের পর নিহতদের ক্ষতিপূরণ, কেমিক্যাল গুদাম সরিয়ে নেওয়াসহ বেশকিছু নির্দেশনা চেয়ে পৃথক পাঁচটি রিট করার পর হাই কোর্ট রুলও জারি করেছিল। তবে এই এক বছরেও সেই রুল শুনানির উদ্যোগ নেননি কোনো আইনজীবী। রিটকারী এক আইনজীবী ভুলেই গেছেন আদেশের কথা। ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের এক বছরেও বদলায়নি চুড়িহাট্টার কিছুই। সরু গলিতে এখনো সেই যানজট। আবাসিক বাসার নিচে দাহ্য বস্তু আর রাসায়নিকের গুদাম এখনো আছে। পুড়ে যাওয়া পাঁচটি ভবনের মধ্যে চারটিরই সংস্কার করা হয়েছে। কিছুটা সংস্কার হয়েছে সেই ওয়াহেদ ম্যানশনের নিচের অংশও। চুড়িহাট্টার বর্তমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও এখনো হতাহত মানুষের স্বজনদের বুকের ভিতর জ্বলছে সেই আগুন। স্বজন হারানো বাসিন্দারা এখনো ডুকরে ডুকরে কাঁদেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডি ৬৭টি লাশের ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। যে কোনো সময় পুলিশের কাছে তা হস্তান্তর করা হবে। তিনি বলেন, প্রথম পর্যায়ে বিভিন্নভাবে ৪৫ জনকে শনাক্ত করা হয়। ২২ জনের মধ্যে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে ১৯ জনকে শনাক্ত করা হয়। বাকি তিনজনকে এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষক ডা. নুসরাত ইয়াসমিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, যে তিনজনের লাশ নিখোঁজ ছিল, এর মধ্যে একজনের পরিবার তাদের জানিয়েছে যে- তাদের স্বজন জীবিত আছেন। আর দুজনের খোঁজ পাওয়া যায়নি। আর ঢামেক মর্গে থাকা লাশ দুটির সঙ্গে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা দেওয়া পরিবারের কারও সঙ্গে মিল ছিল না। মূলত আগেই হস্তান্তর হওয়া লাশগুলোর সঙ্গে তাদের স্বজনদের লাশ অদল-বদল হয়ে যায়। পরে কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে ডিএনএ প্রোফাইল করা হয়। এরপর তাদের স্বজনদেরও লাশ শনাক্ত হয়। তারা ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের চূড়ান্ত রিপোর্ট গত বছরের ২৭ আগস্ট জমা দিয়ে দিয়েছেন।

জানা গেছে, নিখোঁজ রাজুর জন্য ডিএনএ নমুনা দিয়েছিলেন তার মা ফাতেমা বেগম। হেলালের জন্য ডিএনএ নমুনা দিয়েছিলেন তার ভাই কামাল ও শফিকুল এবং মা আনোয়ারা বেগম। আর রফিকের জন্য ডিএনএ নমুনা দিয়েছিলেন তার বাবা আলতাফ মিয়া। পরে রফিকের সন্ধান পাওয়া যায় বলে জানায় সিআইডি সূত্র। নিখোঁজ হেলালের ভাই শফিকুল ইসলাম বলেন, তার ভাই হেলাল চকবাজারে থেকে রিকশা চালাতেন। তাদের বাড়ি মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায়। আগুনের ঘটনার পর থেকে তার আর কোনো খোঁজ পাননি। লাশের সন্ধানে তারা সিআইডিতে ডিএনএ নমুনাও জমা দেন। কিন্তু এখনো সিআইডি থেকে লাশের কোনো সন্ধান দিতে পারেনি। 

রুল শুনানির উদ্যোগ নেয়নি কেউ : চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে ৬৯ জন নিহত হওয়ার পর হাই কোর্টে পৃথক ৫টি রিট আবেদন করেছিলেন আইনজীবীরা। চুড়িহাট্টার অগ্নিকান্ডে নিহতদের ক্ষতিপূরণ, কেমিক্যাল গুদাম সরিয়ে নেওয়াসহ বেশকিছু নির্দেশনা চেয়ে জনস্বার্থে করা এসব রিটের পর হাই কোর্ট রুলও জারি করেছিল। তবে প্রায় এক বছর পার হলেও সেই রুল শুনানির উদ্যোগ নেয়নি কেউ। রিটকারী এক আইনজীবী তো ভুলেই গেছেন রিটের কথা। গত বছর ২৬ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চের জারি করা রুলে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন রাসায়নিক ও কেমিক্যালের মজুদ, বিক্রি, বিপণন ও বহনে আইন এবং নীতিমালা প্রণয়ন ও সেই আইন ও নীতিমালা কঠোরভাবে মেনে চলতে বিবাদীদের প্রতি কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিমতলীতে অগ্নিকান্ডের পর মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির ১৭ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের সংশ্লিষ্টদের ব্যর্থতা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না, ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ব্যারিস্টার নূর মোহাম্মদ আজমী, অ্যাডভোকেট ইউনুছ আলী আকন্দ, অ্যাডভোকেট খন্দকার মো. সায়েদুল কাউছার এবং অ্যাডভোকেট সাগুফতা তাবাসসুম পৃথক পাঁচটি রিট দায়ের করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট আদালতের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার এ বি এম আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বাশার বলেন, আদালত রুল জারি করেছিল। এখন রুল শুনানির উদ্যোগ নেওয়া রিটকারীদের দায়িত্ব। তাদের পক্ষ থেকে এমন কোনো উদ্যোগ আমার চোখে পড়েনি।

জানতে চাইলে একটি রিটের আবেদনকারী অ্যাডভোকেট ইউনুছ আলী আকন্দ রিট করার কথা মনে আছে জানালেও আদেশ কী হয়েছে তা ভুলে গেছেন বলে জানান। এই এক বছরে এই রুল শুনানির কোনো উদ্যোগ নিয়েছিলেন কি-না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আসলে কী আদেশ হয়ে গিয়েছিল মনে নেই। ফাইল খুঁজে দেখব এবং শুনানির জন্য চেষ্টা করব।

তদন্ত প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থ পুলিশ : পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড় অগ্নিকান্ডের এক বছরেও শুরু হয়নি মামলার বিচার। ৯ দফা সময় নিলেও বিচারিক আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থ হয়েছে পুলিশ। এ সুযোগে উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে বের হয়েছেন প্রধান দুই আসামি। আর তাই ন্যায়বিচার নিয়ে শঙ্কিত স্বজনহারা পরিবারগুলো।

ঝুঁকি জেনেও বেশি টাকার লোভে আবাসিক ভবন ভাড়া দেওয়া হয়েছিল রাসায়নিক কারখানার গোডাউন। আদালতে এমন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় মামলার প্রধান দুই আসামি ভবন মালিকের দুই ছেলে। কিন্তু এরপরও পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না হওয়ায় শুরু হচ্ছে না মামলার বিচারকাজ। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি আবু আবদুল্লাহ বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার একটা নির্ভুল প্রতিবেদন আমরা আশা করব। দ্রুতই মামলার চার্জশিট দাখিল করবে এটাও আশা করছি।

দিশাহারা নোয়াখালীর ১৭ পরিবার : নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে নিহতদের ১৭ জনেরই বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলায়। সেদিন কেউ হারিয়েছেন স্বামী, কেউ হারিয়েছেন একমাত্র সন্তান, কেউ হারিয়েছেন একই পরিবারের একাধিক সদস্যকে। যাদের মাঝে কেউ কেউ ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম। প্রিয়জন আর সহায় সম্বল হারিয়ে পরিবারগুলোতে এখন শুধুই হাহাকার। পরিবারের সদস্যদের চোখের পানি যেন শেষ হয়নি। কেউ খোঁজ নিতে গেলেই ডুকরে ডুকরে কাঁদছেন সন্তানহারা, বাবা-মা, স্বামীহারা স্ত্রী বা প্রিয়জনহারা এই মানুষগুলো। কবরের পাশে এখনো খুঁজে বেড়ান বুকের ধনকে, একমাত্র অবলম্বনকে।

ঘটনার এক বছর পেরিয়ে গেলেও ভুক্তভোগী পরিবারগুলো সরকারিভাবে তেমন কোনো সহায়তা পায়নি। চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে অসহায় পরিবারগুলোর। তবে সরকারি নির্দেশনা পেলে সর্বোচ্চ সহায়তার আশ্বাস জেলা প্রশাসনের।

আড়াই বছরের শান্তা যখন বাবার কথা জানতে চায়, তখন উত্তর খুঁজে দিশাহারা নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার নাটেশ্বর ইউনিয়নের মা নূর নাহার। চুড়িহাট্টায় আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যান নূর নাহারের স্বামী নাছির উদ্দিন। তখন লাশ দাফনের জন্য সরকারিভাবে তাদের ২০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল। আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল সরকারি চাকরি বা আর্থিক সহায়তার। এক বছর পেরিয়ে গেলেও সে আশ্বাসের তেমন কোনো ফল মেলেনি।

আজকের কর্মসূচি : ভয়াবহ এই অগ্নিকান্ডের বছরপূর্তি উপলক্ষে আজ নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। সকাল ৭টায় কালো ব্যাচ ধারণ, ৮টায় কোরআন খতম, দিনব্যাপী চুড়িহাট্টা মসজিদে দোয়া ও কোরআন খতম দেওয়া হবে।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর