শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ১ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০৫

বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ কীভাবে চলবে সেই ফয়সালা ’৭১-এ হয়ে গেছে

মাহবুব-উল আলম হানিফ

বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ কীভাবে চলবে সেই ফয়সালা ’৭১-এ হয়ে গেছে

এ দেশ কীভাবে পরিচালিত হবে সেই ফয়সালা ১৯৭১ সালে হয়ে গেছে। ১৯৭২ সালে যখন সংবিধান রচিত হয়, সেই সংবিধানের যে চারটি মৌলিক স্তম্ভ ছিল, তার একটি ছিল ধর্মনিরপেক্ষতা। বঙ্গবন্ধু যেখানেই যেতেন, তিনি এটির অর্থ যে ধর্মহীনতা নয়, তা বারবার উল্লেখ করতেন। তিনি বলতেন, ধর্মনিরপেক্ষতা মানে যার যার ধর্ম সে পালন করবে। ধর্ম থেকে রাষ্ট্র পৃথক থাকবে। তিনি একটি আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছেন চিরকাল। যে আওয়ামী লীগ শুরু হয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম দিয়ে, অচিরেই সে নাম থেকে মুসলিম শব্দটি উঠিয়ে দিয়েছিলেন তিনি; যাতে তার চরিত্র ধর্মনিরপেক্ষ হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল এক রক্তক্ষয়ী সর্বাত্মক জনযুদ্ধের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এ লড়াই, এ বিপুল আত্মত্যাগ নিছকই একটা ভূখ- বা মানচিত্রের জন্য ছিল না। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জাতি হিসেবে আমরা নিজেদের জন্য এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো পেতে চেয়েছিলাম, যা কতগুলো সুনির্দিষ্ট আদর্শ ও মূল্যবোধকে ধারণ করবে। নাগরিকদের মাঝে সেগুলো নির্বিঘ্ন চর্চার পরিসর তৈরি করবে।

অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমি মানুষকে মানুষ হিসেবেই দেখি। রাজনীতিতে আমার কাছে মুসলমান, হিন্দু ও খ্রিস্টান বলে কিছু নেই। সবাই মানুষ।’ এই সত্যকে ধারণ করেই আওয়ামী লীগ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে গেছে। পৃথিবীর বুকে অসাম্প্রদায়িক চেতনা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বহু ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, পেশা ও আদশের্র সম্ভাবনাময় এক বাংলাদেশ। যে বাংলাদেশে সব ধর্মের মানুষ একসঙ্গে একই চেতনা ধারণ করে। সে চেতনা হচ্ছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের চেতনা। যখন গোধূলি নামে তখন একই সঙ্গে আজানের ধ্বনি এবং শাঁখের ধ্বনি জানান দেয় যে আমরা মহান বাঙালি জাতি, আমাদের মধ্যে কোনো বৈষম্য নেই, নেই কোনো সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদ। সেই জন্মলগ্ন থেকেই আমরা অসাম্প্রদায়িক চেতনার সোনার বাংলাদেশ নামে পরিচিত বিশ্বের কাছে। আজান দিলে যখন মুসলিম পুরুষরা মসজিদের দিকে যায়, তখন হিন্দু নারীরা তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালেন। ঈদের সময় যেমন হিন্দু, মুসলিম নির্বিশেষে আনন্দ করে, তেমনি পূজা-পার্বণে সব বাঙালি মেতে উঠে মহাসুখের আনন্দভেলায়। বাঙালির পয়লা বৈশাখে নারী-পুরুষ, বিভিন্ন ধর্ম গোত্র নির্বিশেষে সবাই মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে সব অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলে। এখানে থাকে না কোনো বৈষম্য, কোনো ভেদাভেদ। সবাই মেতে উঠে বাঙালিয়ানায়।

মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নামে সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাঙালি জনগোষ্ঠী তার ইতিহাসে একটি অনন্য ও অভিনব বাস্তবতা তৈরি করে। মুক্তিযুদ্ধের সাফল্য একদিকে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীকে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে অভিষিক্ত করে, অন্যদিকে নতুন রাষ্ট্র কাঠামোর ভিতরে দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল হিসেবে পাওয়া সেসব আদর্শ ও মূল্যবোধ চর্চার এক কঠোর দায় আরোপ করে এবং অবারিত সম্ভাবনার সুযোগ করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধ তাই একাধারে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের সমাপ্তি এবং আরেকটি দীর্ঘ লড়াইয়ের সূচনা। আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যে আদর্শগুলো ধারণ করে আছে, তার শুরুর দিকেই আসে মুক্তি, বাঙালিত্ব, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য ও মানবাধিকার। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ দেশের ঐতিহ্যবাহী এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল। সৃষ্টিলগ্ন থেকে অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদের যে ঝান্ডা উড়িয়ে এসেছে এই দলটি, শত ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময় পেরিয়েও সেই ঝান্ডাকে সমুন্নত রাখতে সক্ষম হয়েছে। দলটি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে দেশকে সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তির দেশে পরিণত করার চেষ্টাকে কেবল রুখেই দেয়নি, অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংবিধানকেও সমুন্নত রাখতে সক্ষম হয়েছে। এবার আসি সাম্প্রতিক বহুল আলোচিত ইস্যুতে। আমার বক্তব্য পরিষ্কার। স্বাধীন দেশে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য হবেই। কোনো অপশক্তি নেই এটা প্রতিহত করার। যারা এই ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে কথা বলবে তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। জনগণ প্রতিহত করবে। ভাস্কর্য নিয়ে কিছু আলেম, ওলামা-মাশায়েখ উগ্র কথা বলছেন। তারা নাকি ইসলামের ধারক-বাহক। ইসলামে জঙ্গিবাদ, মৌলবাদের স্থান নেই। ইসলাম শান্তির ধর্ম। অথচ তারা শান্তির ভাষায় কথা বলছেন না। তাদের যে উগ্রতা সেটা ইসলামের কথা হতে পারে না। শান্তির ধর্মের কথা হতে পারে না। আপনারা কোন ইসলামের কথা বলছেন? আপনাদের এই ভাষা জনগণ বরদাস্ত করবে না। ওলামা-মাশায়েখরা ধর্মের নামে অপব্যাখ্যা দিয়ে উগ্র-জঙ্গিবাদী টাইপের কথা বলছেন। ইসলাম সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদের ভাষা নয়। এ দেশে সরকার আছে, জনগণ আছে। তাদের শক্তি সম্পর্কে আপনাদের অবহিত থাকতে হবে। উগ্রবাদী-সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী কথা বলে শ্রদ্ধা ধরে রাখতে পারবেন না। জনগণ বরদাস্ত করবে না। পাকিস্তানের প্রেতাত্মা রাজাকারদের হুমকি শোনার জন্য এ দেশ স্বাধীন হয়নি। এটা পরিষ্কার মনে রাখবেন। অযথা মাঠ গরম করার চেষ্টা করবেন না। যারা আবার শাপলা চত্বরের হুমকি দেয়, তাদের লজ্জা থাকা উচিত। লেজ গুটিয়ে পালিয়েছিল তারা। কোনো হুমকি কাজে আসবে না। সরকারের শক্তি সম্পর্কে তাদের ধারণা থাকা উচিত। যখন আস্থার সংকট দেখা দেয়; অনিশ্চয়তা, গুজব তখন আমাদের গ্রাস করে ফেলে। সাময়িক সমাধান নয় প্রয়োজন সমস্ত আস্ফালন আর ধৃষ্টতার কড়া জবাব। আস্থা ফেরাতে হবে এবং এক্ষেত্রে সবার দায়িত্বশীল আচরণ জরুরি। এ দেশের মাটি খুব নরম। এই ভূখন্ডের মানুষ চরম সংবেদনশীল। এ দেশের কোটি জনতা তাদের বঙ্গবন্ধুকে মনে মগজে ধারণ করে। কোনো দুষ্টচক্রের সাধ্য নেই তা টলানোর। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ কীভাবে পরিচালিত হবে সেটার ফয়সালা ’৭১ সালেই হয়ে আছে। -যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর