শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৪ ডিসেম্বর, ২০২০ ২৩:২৬

বিএনপি এখন নেতৃত্বের দুর্বলতায় প্রায় ন্যুব্জ

মাহমুদ আজহার

বিএনপি এখন নেতৃত্বের দুর্বলতায় প্রায় ন্যুব্জ
মাহমুদুর রহমান মান্না

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, বিএনপি এখন নেতৃত্বের দুর্বলতায় প্রায় ন্যুব্জ হয়ে পড়েছে। বিএনপির হাইকমান্ডের ভূমিকা এখন ঝাপসা। মনে হয়, তারা নিজেরাই বিপথে রয়েছেন। এ জন্য মাঠের নেতা-কর্মীরাও হতাশ হয়েছেন। দলের হাইকমান্ড যদি খালেদা জিয়ার মুক্তি বা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আন্দোলন কর্মসূচি না দেন, তাহলে কর্মীরা মাঠে থাকবে কীভাবে? স্বাভাবিকভাবে মাঠের কর্মীরা হতাশ হবেনই। তবে এটাও ঠিক, অত্যাচারের মাত্রা বেড়ে গেলে ঠিকই তারা সবাই মাঠে নামবেন। কারণ, তখন কোনো উপায় থাকবে না। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে যা হয় আর কি। আমি বিএনপির সমালোচনা করার জন্য বলছি না, এটাই নির্মোহ বাস্তবতা। গত বুধবার বাংলাদেশ প্রতিদিনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন। আলাপচারিতায় ডাকসুর সাবেক এই ভিপি বলেন, রাজপথের বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির এখন কোনো ভূমিকাই নেই। তারা হয়তো বলবেন, নির্যাতন-হামলা-মামলায় সুযোগ পাচ্ছেন না। এটাও ঠিক। কিন্তু আবার এটাও ঠিক যে, এ ধরনের জুলুম-নির্যাতন মোকাবিলা করেই বেগম খালেদা জিয়া ও গণতন্ত্রের মুক্তি আন্দোলন করতে হবে। সেই উদ্যোগ বা কর্মসূচি তাদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি না। আমি যেটা দেখছি, বিএনপির নেতৃত্বের দুর্বলতা রয়েছে। তারা ভয় পান, জেল খাটতে চান না। তারা বাধ্য হয়ে জুলুম-নির্যাতন সহ্য করছেন। জুলুম-নির্যাতন, ভয়ভীতি উপেক্ষা করে পথে নামার মানসিকতা তারা দেখাতে পারছেন না।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে সরকারবিরোধী জোট ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’-এর এখনকার ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা করে মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এই ফ্রন্টের এখন আর কোনো কার্যকারিতাই নেই। ফ্রন্ট ভাঙেনি, কিন্তু কার্যকর নয়। পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়। তথাকথিত ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের পর আমরা একটি বৈঠকও করিনি। এ জোট নিয়ে আমি কিছুটা বিব্রত। এটা এখন ‘নন ফাংশনাল’ ফ্রন্টে পরিণত হয়েছে। দলগতভাবে আমরা কিছু কাজ করার চেষ্টা করছি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক দল গণফোরাম প্রসঙ্গে মান্না বলেন, করোনাভাইরাসের এই ৮-১০ মাসে তারা কিছুই করেননি। তবে দলটা ভেঙেছে।   

সরকারের চলমান উন্নয়ন কর্মকা-ের সমালোচনা করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এই অন্যতম শীর্ষ নেতা বলেন, গণতন্ত্রের সমান্তরাল কখনই উন্নয়ন হতে পারে না। উন্নয়নটা গণতন্ত্রকে সামনে রেখেই হতে হয়। আমাদের উন্নয়ন সূচক শুধু কাগুজে জিডিপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সমাজে বৈষম্য অনেক বেড়েছে। ধনী দরিদ্র এখন ভারসাম্যহীন। দরিদ্ররা আরও দরিদ্র হচ্ছে। মানুষের আয় কমছে, বাড়ছে বেকারত্ব। দেশে কোনো ধরনের বিনিয়োগ হচ্ছে না। দেশে বিনিয়োগবান্ধব সরকার অনুপস্থিত। ভালো প্রশাসন নেই, বিনিয়োগের নেই সুষ্ঠু পরিবেশ। শুধু বিদেশিই নয়, দেশি বিনিয়োগকারীরাও আগ্রহ দেখাচ্ছে না। দেশের অর্থ সব পাচার হয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, এখন শোনা যায়, আমলারাই বেশি টাকা পাচার করছেন। বেগমপাড়ায় তারা টাকা রাখছেন। ব্যবসায়ীরাও টাকা পাচার করছেন। উন্নয়নের অর্থনীতি একটি সর্বনাশা অর্থনীতি। পাচার হওয়া টাকা সরকার চাইলে ফেরত আনতে পারে। কিন্তু সরকারের সেই সদিচ্ছা নেই। কারণ, তাদের লোকজনই এর সঙ্গে জড়িত। সরকার যদি বঙ্গবন্ধুর খুনিকে আইনি প্রক্রিয়ায় ফেরত আনতে পারে, সন্ত্রাসীদের ফেরত আনতে পারে তাহলে পাচার হওয়া টাকাও ফেরত আনা অসম্ভব হবে না। এখন সরকারের মন্ত্রী-এমপি, আমলা নেতারা পাচার ও দখল উৎসবে মেতেছেন।

মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, দেশের অবস্থা এখন ভালো নয়। সেটা রাজনীতি হোক অর্থনীতি বা অন্য যাই হোক। সরকার গণতন্ত্র হত্যা করেছে এই বলে যে, তারা অর্থনীতিতে মানুষকে সুখ দেবে। তারা গণতন্ত্রের বিকল্প হিসেবে উন্নয়নের অর্থনীতিকে বেছে নিয়েছে। করোনাভাইরাস আসার আগে আমাদের অর্থনীতির সব সূচকই নিম্নগামী ছিল। কভিড-১৯ আসাতে সেটা ঢেকে গেছে। কভিডের শুরুতে সরকার এমন একটা ভাব নেয়, সবাইকে প্রণোদনা দিয়ে অর্থনীতি তারা চাঙ্গা করে ফেলবে। কিন্তু এখন রিপোর্ট আসছে, হতদরিদ্রদের বড় অংশই প্রণোদনা পায়নি। দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে দেড় কোটি লোক। প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ লোক দারিদ্রসীমার নিচে অবস্থান করছে। সরকার উন্নয়ন মানেই জিডিপিকে বোঝায়। জনগণের সামগ্রিক কল্যাণটাকে সামনে আনা হয় না।

তিনি বলেন, বিশ্বে এখন কভিডের দ্বিতীয় ওয়েভ চলছে। সরকার এ নিয়ে হৈচৈ করছে। টিআইবি ও সিপিডির মতো প্রতিষ্ঠান বলছে, কভিড সম্পর্কে যেসব তথ্য সরকার দিয়েছে তার মধ্যে মিথ্যা তথ্য আছে। এখন সারা বিশ্বই ভ্যাকসিনের জন্য অপেক্ষা করছে। সরকার বলছে, ফেব্রুয়ারি-মার্চের মধ্যে ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে। ভ্যাকসিন বণ্টন নিয়ে সরকারের পলিসি জানা যায়নি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, যারা হেলথ সেক্টরে কাজ করছে, তাদের প্রাধান্য দিতে হবে। আমি শঙ্কিত, যেভাবে সরকার ভোট ডাকাতি ও জবরদখল করে ক্ষমতায় আছে তাতে তারা ভ্যাকসিন নিয়ে মিথ্যাচার করবে, লুটপাট করবে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এই শীর্ষস্থানীয় নেতা বলেন, করোনার ত্রাণও তারা চুরি করেছে। ভ্যাকসিন বিতরণেও এ ধরনের দুর্নীতির আশঙ্কা করছি। সরকারের কাছে বিশেষভাবে আবেদন করতে চাই, ভ্যাকসিন নিয়ে যেন কোনো দুর্নীতির ঘটনা না ঘটে। এটা জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত। ৩ কোটি ভ্যাকসিন বিনামূল্যে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দেড় কোটি মানুষ দুই ডোজ করে এটা ব্যবহার করবে। এটা ভালো উদ্যোগ। দেড় কোটি মানুষ যদি সরকারি দলের নিজের লোকজনই হয়ে যায়, তাহলে দেশের সর্বনাশ হয়ে যাবে। আমি মনে করি, যারা করোনার সম্মুখযুদ্ধে কাজ করছে, তাদেরই আগে ভ্যাকসিন দিতে হবে। এই জায়গায় সরকার দলনিরপেক্ষ থাকবে-এটা আমি প্রত্যাশা করি। ডাকসুর সাবেক এই ভিপি বলেন, সরকারের গণতন্ত্রে ফিরে যাওয়ার কোনো প্রবণতা লক্ষ্য করছি না। দেশের বেশির ভাগ মানুষই মনে করে, দেশে গণতন্ত্র নেই, কথা বলার অধিকার নেই, বাক-স্বাধীনতা নেই। সবাই চায়, একটি নিরপেক্ষ ভোট। সরকারের পদত্যাগ চায়, নতুন নির্বাচন চায়। কিন্তু সরকার কোনো তোয়াক্কা করছে না। দেশের স্বাস্থ্য খাত ভঙ্গুর। সরকারের কূটনৈতিক পলিসি বলতে কিছু নেই। রোহিঙ্গা ইস্যুতেও সরকার কিছু করতে পারছে না। ভোট নিয়ে তাদের কোনো সদিচ্ছা নেই। এভাবেই তারা টিকে থাকতে চায়। আমার মনে হয়, অদূর ভবিষ্যতে সরকার চাইলেও আর গায়ের জোরে ভোট ডাকাতি করতে পারবে না। কারণ, মানুষের মধ্যে এখন ক্রমেই নির্যাতনবিরোধী প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। সরকারের বিরুদ্ধে মানুষ প্রতিবাদ করছে, মিছিল করছে। কিন্তু সরকার যদি গণতন্ত্রের পথে না হাঁটে, তাহলে দেশ নৈরাজ্যের দিকে চলে যাবে। এটা একটা ভয়ের কারণ।


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর