শিরোনাম
প্রকাশ : রবিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১০ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:৫২

তোয়াক্কা নেই স্বাস্থ্যবিধিতে

মার্কেট শপিং মলে উপচে পড়া ভিড় । আইইডিসিআর বলছে, বাজার ও গণপরিবহন থেকে ৬০ শতাংশ সংক্রমণ । উৎকণ্ঠা বিশেষজ্ঞদের

মাহমুদ আজহার

তোয়াক্কা নেই স্বাস্থ্যবিধিতে
রাজধানীর গাবতলীতে গতকাল মানুষের ভিড় -বাংলাদেশ প্রতিদিন

আগামী বুধবার থেকে কঠোর লকডাউনে যাওয়ার আগ মুহূর্তে সর্বত্রই স্বাস্থ্যবিধি না মানার হিড়িক পড়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশের সর্বত্রই এখন মানুষ আর মানুষ। দেশে যে সাত দিনের কঠোর বিধিনিষেধ চলছে তা বোঝার উপায় নেই। স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই কোথাও। দেদার চলছে গণপরিবহন, বাড়ছে মানুষের চাপ। শপিং মলসহ বিপণিবিতানগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। পয়লা বৈশাখ ও রোজা সামনে রেখে কেনাকাটার ধুম পড়েছে। কাঁচাবাজারেও মানুষের চাপে উপেক্ষিত স্বাস্থ্যবিধি। অনেকেই  মজুদ করছেন নিত্যপণ্য। রাজধানীর সড়কগুলোতে চিরচেনা যানজটও লক্ষ্য করা গেছে। এ অবস্থায় করোনা সংক্রমণ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। এদিকে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানোর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান এখন দুটি। একটি বাজার এবং আরেকটি গণপরিবহন। দেশে এখন পর্যন্ত যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের বড় অংশই হয় বাজারে গেছেন, নয় তো গণপরিবহন ব্যবহার করেছেন। এই দুটি স্থান থেকেই করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬০ শতাংশ। জনস্বাস্থ্যবিধি ও পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ড. তৌফিক জোয়ার্দার গতকাল সন্ধ্যায় বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘লকডাউন একটি বড় ধরনের প্রস্তুতির বিষয়। এখানে বড় ধরনের অর্থনীতি, বিশেষ করে মানুষের জীবন-জীবিকার বিষয়টি সামনে আসে। তাই অপ্রস্তুত অবস্থায় লকডাউন দিলে মানুষ তো তা মানবে না। এক সপ্তাহের লকডাউনের বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি নেই। যুক্তিসংগতভাবে মানুষকে না বোঝাতে পারলে তারা প্রয়োজনে রাস্তায় বেরোতেই থাকবে। মানুষকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। এখানে চরম অব্যবস্থাপনা আছে। আমি মনে করি, সরকারের যারা এ নিয়ে কাজ করছেন, তাদের উচিত বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে লকডাউনকে এক থেকে দেড় মাস করতে হবে। এতেই সুফল মিলতে পারে।’ জানা যায়, গতকাল সকাল থেকেই লোকে লোকারণ্য ছিল নিউমার্কেট এলাকা। শুধু ফুটপাথ নয়, মানুষের ভিড় ছিল মার্কেটের ভিতরও। নিউমার্কেট, গাউছিয়া, চাঁদনী চকসহ আশপাশের সব বিপণিবিতানেই ছিল একই দৃশ্য। বড় শপিং মলগুলোতেও কেনাকাটার ধুম পড়ে। রাজধানীর বাইরে বিভাগীয় ও জেলা-উপজেলা শহরগুলোতেও একই চিত্র লক্ষ্য করা যায়। ঢিলেঢালা বিধিনিষেধের সুযোগে ঠেলাঠেলি করেই কেনাকাটায় নেমেছেন সাধারণ মানুষ। অনেকের মুখেই ছিল মাস্ক। কারও কারও ছিল থুতনিতে। আবার একটি অংশের মাস্ক ছিল পকেটে। মাস্ক পরার প্রবণতা বাড়লেও মানতে দেখা যায়নি সামাজিক দূরত্ব। নিউমার্কেটে কেনাকাটা করতে আসা সস্ত্রীক আহসান হাবীব নামে এক ক্রেতা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই শপিং করতে এসেছি। সামনে রোজা ও পয়লা বৈশাখ। কঠোর লকডাউন আসছে। এটা আসলে কত দিন থাকে তা বোঝা যাচ্ছে না। এমনকি ঈদ পর্যন্ত গড়াতে পারে। তাই কেনাকাটার কাজটা সেরে ফেলছি।’ সুমন মিয়া নামে আরেক ক্রেতা বললেন, ‘ঈদের হালকা কেনাকাটা করলাম। ঈদ অনেক অনেক দেরি। কিন্তু লকডাউন বাড়তেও পারে। এ জন্য অনেকটা আগেই বাচ্চাদের জামাকাপড় কিনে নিলাম।’ রাজধানীর পাইকারি কাপড়ের দোকান ইসলামপুর, বঙ্গবাজার, গাউছিয়া থেকে শুরু করে গুলশান-বনানী, বাড্ডা, শাহজাদপুরসহ সর্বত্রই বিপণিবিতানগুলোতে কেনাকাটার হিড়িক পড়েছে।

জানা যায়, করোনা নিয়ন্ত্রণে সরকার-ঘোষিত বিধিনিষেধের ষষ্ঠ দিন গতকাল রাজধানীতে যানজটের তীব্রতা ছিল বেশি। দোকানপাট খোলার কারণে সকাল থেকেই রাজধানীজুড়ে ছিল গণপরিবহন। যানজট দেখা গেছে রাজধানীর পল্টন, শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাব, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, রামপুরা, মৌচাক, মালিবাগ, প্রগতি সরণি, ধানমন্ডিসহ প্রধান সড়কগুলোয়। এতে ওই সব সড়কে চলাচলকারী মানুষকে পোহাতে হয় ভোগান্তি। একদিকে যাত্রীবাহী পরিবহন, অন্যদিকে ব্যক্তিগত প্রাইভেট কার, সিএনজি, অটোরিকশা, রিকশাসহ যানবাহনে ঠাসা ছিল রাস্তা। যাত্রীরা বলেন, বিধিনিষেধের মধ্যেও জীবিকার তাগিদে তারা রাস্তায় বেরিয়েছেন। তবে যানবাহনে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না তা পর্যবেক্ষণে বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতও চোখে পড়ে। মাস্ক না পরার কারণে অনেককে জরিমানাও করা হয়। তবু স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতা ছিল রাজধানীজুড়েই। গতকাল দুপুরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শফিকুল ইসলাম পুরানা পল্টন মোড়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানালেন, ‘বাড্ডায় যাব, বাসের অভাব নেই। আমার মতো বহু মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। অর্ধেক সিট নিয়ে চলাচলে বাধ্যবাধকতা থাকায় অধিকাংশই গুলিস্তান থেকে বুক হয়ে আসছে। দরজাও বন্ধ করে রাখা। এ কারণে কয়েকটি বাসে চেষ্টা করেও উঠতে পারিনি। মানুষ যেভাবে হুড়োহুড়ি করছে, তাতে করোনার সংক্রমণ আরও বাড়তে পারে।’

বাজার-গণপরিবহন থেকে সবচেয়ে বেশি করোনায় আক্রান্ত : ৫ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত কারা বেশি আক্রান্ত হয়েছে এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানোর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান এখন দুটি- একটি বাজার এবং অন্যটি গণপরিবহন। দেশে এখন পর্যন্ত যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের বড় অংশই হয় বাজারে গেছেন, নয় তো গণপরিবহন ব্যবহার করেছেন। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, যেসব জায়গা থেকে মানুষ বেশি সংক্রমিত হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে আরও রয়েছে উপাসনালয়, সভা-সেমিনারের মতো জনসমাগমস্থল, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, এক বিভাগ থেকে আরেক বিভাগে ভ্রমণ, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এবং পর্যটন কেন্দ্র। করোনায় আক্রান্ত রোগীদের হিস্ট্রি (ইতিহাস) পর্যালোচনা করে সংক্রমণ ছড়ানোর ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ এসব উৎসস্থল চিহ্নিত করা হয়েছে।

আইইডিসিআর বলছে, প্রায় সাড়ে ৮ হাজার আক্রান্ত ব্যক্তির তথ্য তারা ৫ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত পর্যালোচনা করেছেন। এর ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি করা হয়েছে। ওই রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে ৬১ শতাংশ রোগীর বাজারে যাওয়া এবং গণপরিবহন ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে। সংক্রমিত হওয়া ব্যক্তিদের অন্তত ৩০ শতাংশ জনসমাগমস্থল (সভা-সেমিনার) এবং উপাসনালয়ে গিয়েছিলেন। ওই সাড়ে ৮ হাজার রোগীর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে গিয়েছিলেন ২৬ শতাংশ, করোনায় আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে এসেছিলেন ২২ শতাংশ। এ ছাড়া আন্তবিভাগ ভ্রমণ করেছিলেন ১৩ শতাংশ, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন ১২ শতাংশ। আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ড. মোশতাক হোসেন বলেন, ‘করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার লকডাউন ঘোষণা করেছে। তবে এর আদর্শ ব্যবস্থাটা হতো সবাইকে ঘরে রাখতে পারলেই। কিন্তু জীবন-জীবিকার তাগিদে মানুষ বাইরে বের হচ্ছে। এ অবস্থায় সংক্রমণ কমাতে হলে তাদের সমস্যাগুলোও তো চিহ্নিত করে সমাধান করতে হবে। আমাদের উদ্দেশ্য হলো সংক্রমণ যেন না বাড়ে। সেটিকে নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু সংক্রমণ যেভাবে দাবানলের মতো বাড়ছে, সে ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিটা পদক্ষেপই ঝুঁকি বিবেচনায় সুনির্দিষ্ট করে নিতে হবে।’

১২ ও ১৩ এপ্রিল নিয়ে সিদ্ধান্ত রবিবার : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে চলমান এক সপ্তাহের বিধিনিষেধের মেয়াদ শেষ হচ্ছে আজ মধ্যরাতে। নতুন করে কঠোর লকডাউন আসছে আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে। তাই এর মধ্যে দুই দিন ১২ ও ১৩ এপ্রিল কোন প্রক্রিয়ায় চলবে, কোনো বিধিনিষেধ থাকবে কি না তা নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। এ ব্যাপারে কোনো দিকনির্দেশনাও নেই। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রবিবার বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে এখন যেভাবে চলছে, ১২ ও ১৩ এপ্রিলও (সোম ও মঙ্গলবার) সার্বিক কার্যক্রমে মোটামুটি এভাবেই বিধিনিষেধ থাকতে পারে।

এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘রবিবারের মধ্যে এ বিষয়ে একটা বার্তা আসছে। যেহেতু ১৪ তারিখ ঘরে থাকার যে ব্যবস্থাটা আসছে, সেটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন। এখন যে অবস্থাটা আছে, এর চেয়ে তো বেশি কিছু হওয়ার কথা নয়। এ অবস্থায় বিধিনিষেধ চলমান থাকারই কথা। তবে কী সিদ্ধান্ত হয় তা কাল রবিবার দেখা যাবে।’

এই বিভাগের আরও খবর