শিরোনাম
প্রকাশ : বুধবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৩ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:২৭

রমনায় হামলার ২০ বছরেও নিষ্পত্তি হয়নি দুই মামলা

আরাফাত মুন্না

Google News

২০ বছর আগে ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা পার্কের বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ভয়াবহ বোমা হামলা চালিয়েছিল জঙ্গিরা। ঘটনাস্থলেই মারা যান নয়জন। হাসপাতালে আরও একজন মারা যান। নির্মম এ ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা মামলা দুটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। হত্যা মামলাটি বিচারিক আদালতের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে হাই কোর্টে। আর বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে করা মামলাটি থমকে আছে সাক্ষীর অভাবে। দীর্ঘ ২০ বছরেও মামলা দুটির বিচার শেষ না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অনেকে।

সুপ্রিম কোর্ট সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে হত্যা মামলাটি বিচারিক আদালতের রায়ের পর ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাই কোর্টে আসে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ মামলার পেপারবুক (রায়সহ যাবতীয় নথি সংবলিত বই) তৈরি করা হয়। কয়েক দফা আদালতও পরিবর্তন হয়েছে। এর পর থেকে এ মামলার কার্যক্রম আর এগোয়নি। তবে আদালতের কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে শুরু হলে চলতি বছরই ডেথ রেফারেন্স নিষ্পত্তির আশার কথা জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। আগামী ৩০ মে বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ ও বিচারপতি এ এস এম আবদুল মোবিনের সমন্বয়ে গঠিত হাই কোর্ট বেঞ্চে শুনানির জন্য মামলাটি নির্ধারিত রয়েছে। জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শাহীন আহমেদ খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কয়েক দফা আদালত পরিবর্তন হয়েছে। এরপর আবার নতুন করে আদালত নির্ধারণ, আইনজীবীদের প্রস্তুতির জন্য সময় লাগছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এখন শুনানির জন্য প্রস্তুত রয়েছি। করোনা সংক্রমণ কমে এলে এবং নিয়মিত আদালত চালু হলে আশা করি চলতি বছরের মধ্যে মামলাটি শেষ হবে।’ রায়ে সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের দন্ড বহাল থাকবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি। আদালত সূত্রে জানা গেছে, বিস্ফোরকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের মামলাটির বিচার চলছে ঢাকার ১ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে। মামলার মোট ৮৪ সাক্ষীর মধ্যে ৫৫ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। এখনো ২৯ সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ বাকি। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এ মামলায় একজন সাক্ষীরও সাক্ষ্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে। সর্বশেষ ৫ এপ্রিল এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ঠিক থাকলেও চলমান করোনাভাইরাসজনিত কারণে চলমান লকডাউনের কারণে আর শুনানি হয়নি। জানতে চাইলে এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবু আবদুল্লাহ ভূঁইয়া বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, করোনাভাইরাসজনিত কারণসহ নানা কারণে গত এক বছরে একজন সাক্ষীরও সাক্ষ্য গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। ৫ এপ্রিল এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ঠিক ছিল। লকডাউনের কারণে সেদিনও শুনানি হয়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার নতুন করে দিন ঠিক করা হবে। কবে নাগাদ এ মামলার বিচার শেষ হবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারেননি তিনি।

দীর্ঘদিনেও বিচার শেষ না হওয়ায় ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও সাবেক ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু আক্ষেপ করে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘চোখের সামনে মানুষ মারা গেল, রক্তে ভিজে গেল আমার গায়ের পোশাক, সেই ঘটনার বিচার আজও দেখতে পারলাম না, এটাই আফসোস।’ তিনি বলেন, বিস্ফোরক মামলাটি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর, সংশ্লিষ্ট আইন কর্মকর্তা এবং বিচারককে আরও বেশি তৎপর হতে হবে। প্রয়োজনে সপ্তাহে দু-তিন দিন করে তারিখ নির্ধারণ করে বিচার শেষ করতে হবে। হাই কোর্টেও দ্রুত ডেথ রেফারেন্স শুনানির উদ্যোগ গ্রহণের দাবি তার। মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠান ‘ইসলামবিরোধী’ বিবেচনা করে ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালানো হয়।

হামলায় ঘটনাস্থলেই নয়জনের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে মারা যান একজন। এ ঘটনায় নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির সার্জেন্ট অমল চন্দ্র ওই দিনই রমনা থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। ঘটনার প্রায় আট বছর পর ১৪ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। আলোচিত এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তা বার বার পরিবর্তন, সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল, বার বার তাগিদ দেওয়া সত্ত্বেও তদন্ত কর্মকর্তাদের আদালতে সাক্ষ্য দিতে না আসার কারণে বিচার শুরু হতে দেরি হয়। পর্যায়ক্রমে থানা, ডিবি ও সিআইডি পুলিশে মামলার তদন্ত যায়। মামলার অষ্টম তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আবু হেনা মো. ইউসুফ ২০০৮ সালের ৩০ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। দুটি মামলারই অভিযোগপত্র একসঙ্গে দাখিল করা হয়। পরে বিচারের জন্য মামলা দুটি ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে যায়। ওই আদালতে একই বছরের ১৬ এপ্রিল পৃথক মামলা দুটিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং সেলের সিদ্ধান্তে হত্যা মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-৩ ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ পাঠানো হয়। বিচার শেষে ২০১৪ সালের ২৩ জুন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত হত্যা মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মুফতি আবদুল হান্নানসহ আটজনকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয় ছয় আসামিকে। মৃত্যুদন্ড ও যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদন্ডও দিয়েছে আদালত। এ মামলায় ১৪ আসামির মধ্যে চারজন শুরু থেকেই পলাতক। এরপর ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের জেল আপিল ও ফৌজদারি আপিলের শুনানির জন্য মামলাটি হাই কোর্টে আসে।

এই বিভাগের আরও খবর