শিরোনাম
প্রকাশ : শনিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ১৬ এপ্রিল, ২০২১ ২৩:২৩

কেমন হবে লকডাউনের অর্থনীতি

জুলকার নাইন ও মানিক মুনতাসির

বান্দরবানের পাহাড়ে ইকো রিসোর্ট চালান রায়হান রাব্বি। ইকো ট্যুরিজমের সব ধরনের মান রক্ষায় রিসোর্টের পেছনে তার বেশ বড়সংখ্যক ব্যয় হয়। গত বছরের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক পয়সা আয়ের বিপরীতে একটানা ব্যয় করেছেন রাব্বি। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রিসোর্ট বন্ধ করে দেওয়ার। কিন্তু জানুয়ারিতে পর্যটক আসা শুরু করে রিসোর্টে। ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চলতে থাকে তার। চলতি এপ্রিলে এসে কঠোর বিধিনিষেধ ও লকডাউন সব চেষ্টা শেষ করে দিয়েছে। এখন রাব্বির একটাই চিন্তা- ‘কত দিন চলবে এ লকডাউন’। একই চিন্তা সারা দেশের পর্যটন ব্যবসায়ী, পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল সবার।

পর্যটন ব্যবসায়ীদের মতোই মাথায় হাত পড়েছে মুন্সীগঞ্জের পরিবহন ব্যবসায়ী মুন্নারও। ঢাকা-মুন্সীগঞ্জ রুটে তার তিনটি বাস চলে। কিন্তু ১০ দিন ধরে বন্ধ রয়েছে গাড়ির চাকা। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে আয়ের চাকাও। শুধু বাসের মালিক হওয়ায় তার আয়ই বন্ধ হয়নি, সংসার চালানোর উপার্জন বন্ধ হয়ে গেছে মুন্নার তিন বাসের পাঁচ ড্রাইভার ও পাঁচ হেলপারের পরিবারের। সারা দেশের সড়ক পরিবহন বন্ধ থাকায় কমপক্ষে ১০ লাখ পরিবারের দৈনিক আয় একেবারেই বন্ধ।

সরকার বিধিনিষেধ আরোপ করায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাইরের সব ধরনের খুচরা বিক্রেতা। দোকানপাট সব বন্ধ করে দেওয়ায় আসবাবপত্র থেকে শুরু করে রড-সিমেন্ট সব দোকানদার পড়েছেন সংকটে। সরকার কারখানা চালু রাখার সুযোগ দিলেও তা কাজে আসবে কি না সন্দেহ আছে স্থানীয় বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদনকারী ব্যবসায়ীদের। কারণ যারা পণ্য বিক্রি করবেন তাদের দোকানপাট বন্ধ। তাই কারখানায় উৎপাদন করলেও তা বাজারে পৌঁছানো যাবে না, বিক্রিও হবে না। সেজন্য অনেকেই সর্বোচ্চ এক সপ্তাহ চালিয়ে কারখানা বন্ধ করার কোনো বিকল্প দেখছেন না। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, এবার কঠোর লকডাউন এসেছে ব্যবসার ভরা মৌসুমে। প্রতি বছর এই সময় সারা দেশে কেনাবেচার ধুম পড়ে। রমজান ও তার পরে ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে এ সময় সবচেয়ে বেশি পণ্য বিক্রি হয়। গত বছরও প্রায় একই সময় করোনার আগমনে মারাত্মক মন্দা নেমেছিল। একদিকে দোকানপাট ঠিকভাবে খোলা রাখা যায়নি। আবার আয় না থাকায় মানুষ কেনাকাটা করতে পারেনি। এবারও ঠিক একই সময়ে কঠোর লকডাউন এসেছে। হাটবাজার দোকানপাট শপিং মল সব বন্ধ হয়ে গেছে। আবার সাধারণ মানুষের আয়ের পথও একেবারেই সীমিত হয়ে গেছে। এ অবস্থায় যারা ভেবেছিলেন গতবারের ক্ষতি এবার কিছুটা কাটিয়ে উঠবেন তাদের মাথায় আবারও হাত পড়ল। শুধু দোকানপাটকেন্দ্রিক কেনাবেচা নয়; সামগ্রিক অর্থনীতিতে লকডাউন বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে যাচ্ছে। এর ফলে সৃষ্ট মন্দা শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির কতটা অবনতি ঘটায় কেউ জানে না। অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদের মতে, ‘এক মাস ধরেই টিসিবির তেল, চিনি, চাল, ডাল, পিঁয়াজ বিক্রির ট্রাকের পেছনে লম্বা লাইন দেখছি। খেয়াল করলে দেখা যাবে শুধু নিম্নবিত্ত নয়, অনেক সম্পন্ন মধ্যবিত্তও লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। অথচ একসময় তারা ট্রাকের পেছনে দাঁড়িয়ে এসব পণ্য কেনার জন্য অপেক্ষা করতেন না। এর অর্থটা কী? অর্থটা হলো তাদের আয় কমে গেছে। বাজারে গিয়ে পণ্যগুলো কেনার মতো ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। অর্থাৎ তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। কেন এমনটা হবে? বিশ্বব্যাংক বলছে, আমাদের অর্থনীতি এখনো সাড়ে ৫ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি করছে। তাহলে একটা শ্রেণি এ দুরবস্থায় পতিত হলো কেন? কারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের একটা অংশের আয়প্রবাহ কমে গেছে। আর এটা ঘটেছে গত বছরের লকডাউন থেকে। এমন অবস্থায় আমাদের মতো দেশ দ্বিতীয়বার লকডাউনের ধকল কতটা সইতে পারবে, তা খুবই চিন্তার বিষয়। সেটা পূর্ণ লকডাউন হোক বা লকডাউনের আদলে বিধিনিষেধই হোক।’ আবু আহমেদের মতে, ‘শুধু জনগণ কেন, লকডাউনের কারণে সরকারও তো সমস্যায় পড়বে। সরকারের রাজস্ব আহরণের দিকটাও দেখতে হবে। সরকার যে উন্নয়নকাজগুলো করছে এর অর্থায়নের জন্য সরকারকে ঋণ করতে হবে। সোশ্যাল সেইফটি নেটের জন্য ঋণ করতে হবে। আর সরকারের ঋণ বাড়লে মূল্যস্ফীতিও বাড়বে একপর্যায়ে। তখন তো সবার অবস্থাই খারাপ হয়ে যাবে। তাই বাংলাদেশের যা করা উচিত তা হলো অর্থনীতি ও মানুষ দুটিকেই একসঙ্গে বাঁচানো।’

এই বিভাগের আরও খবর