শিরোনাম
প্রকাশ : মঙ্গলবার, ৪ মে, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ৩ মে, ২০২১ ২৩:৩৮

নৌযানের সংঘর্ষে গেল ২৬ প্রাণ

বেঁচে যাওয়া যাত্রী বললেন স্পিডবোট এলোমেলো চালাচ্ছিলেন চালক, তদন্ত কমিটি গঠন

বেলাল রিজভী, মাদারীপুর

নৌযানের সংঘর্ষে গেল ২৬ প্রাণ
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বাংলাবাজার ফেরিঘাটে দুর্ঘটনার শিকার স্পিডবোট। স্বজন হারিয়ে আহাজারি -বাংলাদেশ প্রতিদিন

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় বাংলাবাজার ফেরিঘাটে বালুবাহী বাল্কহেডের সঙ্গে স্পিডবোট দুর্ঘটনায় ২৬ জনের প্রাণহানি হয়েছে। বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত এদের ১৭ জনের মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে স্বজনদের কাছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনায় আহত পাঁচজনকে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। ভর্তি পাঁচজনের মধ্যে একজন ওই স্পিডবোটের চালক শাহ আলম। তাকে আটক করেছে পুলিশ।

শিবচরের উপজেলার কাঁঠালবাড়ীর বাংলাবাজার পুরনো ঘাটে বালুবোঝাই একটি বাল্কহেডের সঙ্গে ধাক্কা লেগে স্পিডবোট ডুবে গেলে তিন শিশু ও দুই নারীসহ ২৬ জনের মৃত্যু হয়। এই মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় শিবচর কাঁঠালবাড়ী হাজী ইয়াসিন মোল্লাকান্দি দোতার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ এলাকায় শোকের মাতম বিরাজ করছে। স্বজনদের আহাজারিতে ওই এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।

প্রাণহানির শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ২৫ জনের নাম-পরিচয় জানা গেছে। এরা হলেন খুলনা জেলার তেরখাদা উপজেলার বারখালীর মনির মিয়া (৩৮), হেনা বেগম (৩৬), সুমী আক্তার (৫) ও রুমি আক্তার (৩), ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা উপজেলার চরডাঙা গ্রামের আরজু শেখ (৫০), ইয়ামিন সরদার (২), মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার সাগর ব্যাপারী (৪০), কুমিল্লা দাউদকান্দির কাউসার আহম্মেদ (৪০), রুহুল আমিন (৩৫), মাদারীপুর জেলার রাজৈরের তাহের মীর (৪২), কুমিল্লার তিতাসের জিয়াউর রহমান (৩৫), মাদারীপুরের শিবচরের হালান মোল্লা (৩৮), শাহাদাত হোসেন মোল্লা (২৯), বরিশালের তেদুরিয়ার আনোয়ার চৌকিদার (৫০), মাদারীপুরের রায়েরকান্দি মাওলানা আবদুল আহাদ (৩০), চাঁদপুর জেলার উত্তর মতলবের মো. দেলোয়ার হোসেন (৪৫), নড়াইলের লোহাগড়ার রাজাপুরের জুবায়ের মোল্লা (৩৫), মুন্সীগঞ্জ সদরের সাগর শেখ (৪১), বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের সায়দুল হোসেন (২৭) ও রিয়াজ হোসেন (৩৩), ঢাকা পীরেরবাগের খোরশেদ আলম (৪৫), ঝালকাঠির নলছিটির এস এম নাসির উদ্দীন (৪৫), বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জের মো. সাইফুল ইসলাম (৩৫), পিরোজপুরের চরখামার মো. বাপ্পি (২৮), পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ার জনি অধিকারী (২৬)।

ঘাট কর্তৃপক্ষ, উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ সূত্র জানায়, গতকাল সকাল ৭টার দিকে মুন্সীগঞ্জের শিমুলিয়া ঘাট থেকে ৩১ জন যাত্রী বহন করে মাদরীপুরের শিবচরের বাংলাবাজারের দিকে যাচ্ছিল একটি স্পিডবোট। স্পিডবোটটি বাংলাবাজার ফেরিঘাটের কাছাকাছি এলে ঘাটের কাছে নোঙর করা বালুবোঝাই একটি বাল্কহেডের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এতে স্পিডবোটটি সজোরে ধাক্কা খেয়ে উল্টে যায়। খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে ফায়ার সার্ভিস ও নৌপুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে ২৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সাঁতরে তীরে উঠতে পারেন পাঁচজন। তাদের উদ্ধার করে শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে সেখানে এক নারীর মৃত্যু হয়। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী আদুরি বেগম। প্রাণে বেঁচে গেলেও স্বামী-সন্তানকে হারিয়ে অনেকটা নির্বাক। তিনি বলেন, ‘শিমুলিয়া ঘাট থেকে গাদাগাদি কইরা স্পিডবোট ছাড়েন চালক। যাত্রার শুরু থিকাই এলোমেলোভাবে স্পিডবোট চালাচ্ছিলেন তিনি। শুরুতে একবার বোটটি উল্টা দিকে যাচ্ছিল। ওই চালক নেশা করে বোট চালাচ্ছিলেন। চালকের কারণেই আইজ আমার স্বামী-সন্তান হারাইলাম।’

এদিকে এ ঘটনায় মাদারীপুর স্থানীয় সরকার অধিদফতরের উপপরিচালক আজাহারুল ইসলামকে প্রধান করে ছয় সদস্যদের তদন্ত কমিটি করেছেন জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আশাদুজ্জামান, শিবচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিরাজ হোসেন, শিমুলিয়া বিআইডবিøউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী পরিচালক মো. শাহাদাত হোসেন, মাদারীপুরের শিবচর চরজানাজাত নৌপুলিশ ইনচার্জ শেখ মো. আবদুর রাজ্জাক ও নারায়ণগঞ্জের পাগলার কোস্টগার্ড স্টেশন কমান্ডার লে. আসমাদুল।

এ ছাড়া নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এ সম্পর্কে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক রহিমা খাতুন বলেন, ‘তদন্ত কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।’ লকডাউনে স্পিডবোট বন্ধ থাকার পরও কেন এমন দুর্ঘটনা- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘স্পিডবোটটি মুন্সীগঞ্জ থেকে ছেড়ে বাংলাবাজার আসে। তারা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে স্পিডবোট ছাড়ে। এসব বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

স্পিডবোট দুর্ঘটনায় আহত পাঁচজন শিবচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি রয়েছেন। তাদের মধ্যে ঘাতক স্পিডবোটের চালক শাহ আলমকে (৩০) আটক করেছে পুলিশ। মাদারীপুরের পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল বলেন, এই লকডাউনের সময় এমনিতেই এ ধরনের যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ। এর পরও কেন স্পিডবোটটি বের হয়েছিল বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, ‘স্পিডবোটের চালক গুরুতর আহত। তাকে পুলিশের নজরদারিতে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে রেফার করা হয়েছে।’ মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন বলেন, ‘দুর্ঘটনা এলাকা পরিদর্শন করেছি। যারা দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছি। মর্মান্তিক নৌ-দুর্ঘটনায় যাদের মৃত্যু হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে সহায়তা দেওয়া হবে।’ স্থানীয় ও ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা উদ্ধারকাজ পরিচালনা করেন।

এই বিভাগের আরও খবর