শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ২৮ জুন, ২০২১ ০০:০০ টা
আপলোড : ২৭ জুন, ২০২১ ২৩:২৬

উৎকণ্ঠায় ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবীরা

সমন্বয়হীনতা সবখানে, ঈদের আগে সবকিছু বন্ধ থাকলে তৈরি হবে নানামুখী অস্থিরতা, বেতন-বোনাস নিয়ে আতঙ্ক, রপ্তানি খাত নিয়ে চিন্তা, রাজস্ব আদায়ের খাতগুলো খুলে রাখার দাবি, ব্যাংক ও সেবা খাত বন্ধ হলে বাড়বে জটিলতা

জুলকার নাইন ও রুহুল আমিন রাসেল

Google News

ঈদের আগে আকস্মিক ঘোষিত লকডাউনে উৎকণ্ঠায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে শ্রমজীবী ও পেশাজীবীদের মাঝে। বেতন ও বোনাস নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন চাকরিজীবীরা। দুশ্চিন্তায় পড়েছে রপ্তানি খাত। একদিকে অর্ডার বাতিলের শঙ্কা, অন্যদিকে সময়মতো শ্রমিকের বেতন-ভাতা পরিশোধের চাপ। ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও শ্রমজীবীরা বলছেন, সমন্বয়হীন এই লকডাউন পরিস্থিতি জটিল করে ফেলবে। বাড়ি ফেরার হুড়োহুড়িতে যেমন সংক্রমণ বাড়বে তেমনি ঈদের আগে সবকিছু বন্ধ থাকলে তৈরি হবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা। ব্যাংক ও সেবা খাত বন্ধ হলে বাড়বে জটিলতা। পাশাপাশি সরকারি প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে যে কোনো মূল্যেই রাজস্ব আদায়ের খাতগুলো খুলে রাখতে হবে।  সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লকডাউন না দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মানতে আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। সর্বক্ষেত্রে মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। মাস্ক না পরলে বাধ্যতামূলকভাবে জরিমানা আদায় করতে হবে। জরিমানা আদায় করা সম্ভব না হলে কয়েক দিনের জন্য জেলে পাঠানোর মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রয়োজনে যেসব গণপরিবহনে মাস্কবিহীন যাত্রী পাওয়া যাবে তার রুটপারমিট বাতিল করতে হবে। বাজার বা শপিং মলে মাস্ক না পরলে সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট অঙ্কের জরিমানা আদায় করতে হবে। সামাজিক দূরত্ব বা স্বাস্থ্যবিধি ছাড়া দোকান পরিচালনা করলে জেল-জরিমানার পাশাপাশি ট্রেড লাইসেন্স বাতিলের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে। ব্যবসায়ী শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন গতকাল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, লকডাউন কোনো সমাধান না। সমাধান আছে দুটো- একটি হলো টিকা, আরেকটি জনসচেতনতা। দুটোর কোনোটাই আমরা সঠিকভাবে করতে পারিনি। উন্নত বিশ্ব টিকা প্রদান নিশ্চিত করেই সফল হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের দেশে সবার জন্য টিকার নিশ্চয়তা জরুরি হয়ে পড়েছে। তবে টিকা সংগ্রহের পাশাপাশি জনসচেতনতা নিশ্চিত করতে প্রয়োজন রাজনীতিবিদ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজ, গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। এই শীর্ষ ব্যবসায়ী নেতা বলেন, প্রশাসন দিয়ে করোনা মোকাবিলা কতটা সম্ভব, সেই প্রশ্নও উঠেছে। দেশ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ৭২ বছরের পুরনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষ রাজনীতিবিদদের জনসচেতনতায় যুক্ত করতে হবে। কারণ গ্রামে গ্রামে প্রশাসন ও পুলিশ দিয়ে মানুষকে মাস্ক পরা ও স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করানো কঠিন হবে। কিন্তু জনসচেতনতায় রাজনীতিবিদরা যুক্ত হলে করোনা মোকাবিলা অনেক সহজ হবে।  বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, লকডাউন কোনো সমাধান নয়। বিশ্ব করোনা মোকাবিলা করছে জনসচেতনতা ও টিকার মাধ্যমে। আমাদেরও সর্বজনীনভাবে চিন্তা করা প্রয়োজন। আমলাভিত্তিক সমাধান কার্যকর হবে না। প্রয়োজন স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা। এ জন্য রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী ও নাগরিকদের সমন্বয়ে গ্রামে গ্রামে কমিটি গঠন করে জনসচেতনতা বাড়ানো যেতে পারে। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, দীর্ঘমেয়াদে লকডাউনে অর্থনীতিতে বিপর্যয় আসবে। তখন আরও বড় ধরনের ক্ষতি হবে। তাঁর মতে- লকডাউনের প্রভাবে ক্রয়াদেশও চলে যেতে পারে। তাই লকডাউনে না গিয়ে সরকারকে টিকার ব্যবস্থা করতে হবে। মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলাসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন করতে হবে। এক্ষেত্রে আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন-বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকনের মতে, সত্যিকার অর্থে লকডাউন কোনো সমাধান না। বিশ্বের কোনো দেশ সফল লকডাউন করতে পারেনি। সবাই টিকার ওপর ভরসা করেছেন। উন্নত বিশ্বে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বাড়ছে। ক্রেতারা এখন অর্ডার নিয়ে ব্যস্ত আছেন। ফলে এ মহূর্তে লকডাউনে আমরা ব্যবসা হারাব। আর লকডাউনে প্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের আটকে রাখা গেলেও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের কেউ আটকাতে পারছে না। সেবা খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই এখন প্রয়োজন সবার মুখে মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে আইনি অ্যাকশন। কারণ গুলশানের মতো সচেতন এলাকার মানুষও মাস্ক পরে না। নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি-বিকেএমইএ প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মানতে সবাইকে বাধ্য করতে হবে। প্রয়োজনে মানুষকে জেল-জরিমানাসহ তাদের অন্যান্য শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। কারণ, এই লকডাউন রাজস্ব আদায়ে প্রভাব ফেলবে। যদিও আমাদের টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যর্থতা রয়েছে। সরকারের উচিত হবে, যত দ্রুত সম্ভব সারা দেশের মানুষকে টিকার আওতায় আনা। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, লকডাউনে ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরম সংকটে পড়েছেন। সরকারের উচিত ছিল, লকডাউন না দিয়ে সাধারণ মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করা।

এটা খুব দরকার ছিল। আবার সরকার টিকার ব্যবস্থাপনাও সঠিকভাবে করতে পারেনি। তাই এখন জনসচেতনতা খুব জরুরি। ঢাকার বাইরে কারও মুখে মাস্ক নেই। এখন ভরসা কেবল টিকা ও আইনের কঠোর প্রয়োগ।

এই বিভাগের আরও খবর