সোমবার, ২ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ টা

মানুষের ঢল থামছেই না

স্বল্পসংখ্যক গণপরিবহন, বিধিনিষেধ নেই বললেই চলে ♦ লঞ্চ চলেছে ভোর ৬টা পর্যন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

মানুষের ঢল থামছেই না

গণপরিবহন চালু ঘোষণায় লঞ্চঘাট ও বাস টার্মিনালে ছিল গতকাল মানুষের ঢল। গার্মেন্টে চাকরিজীবী ছাড়াও অনেকে ঈদ শেষে রাজধানী ফিরছেন। তবে স্বল্পসংখ্যক গণপরিবহনের কারণে কোথাও বিধিনিষেধ নেই বললেই চলে। মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় কর্মস্থলে ফেরা মানুষের ভিড় দেখা গেছে। পর্যাপ্ত গণপরিবহন না থাকায় কর্মজীবী মানুষজন খোলা ট্রাক, পিকআপ, প্রাইভেটকার, সিএনজি ও মোটরসাইকেলে গাদাগাদি করে ঢাকায় ফিরতে দেখা গেছে। এ ছাড়া লকডাউনের মধ্যে কয়েক ঘণ্টার জন্য গণপরিবহন চালু হওয়ায় শনিবার রাত থেকে বঙ্গবন্ধু সেতুর উভয় সংযোগ সড়কে প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে ভোগান্তিতে পড়েন কর্মস্থলে ফেরা শ্রমজীবী মানুষ এবং পরিবহন শ্রমিকরা।

এদিকে শিমুলিয়া ঘাটে ঢাকামুখো যাত্রী ও গাড়ির চাপ বেশি ছিল গতকাল। বাসে অর্ধেক আসনের জায়গায় পূর্ণ সংখ্যক আসনেই যাত্রী নেওয়া হচ্ছে। ফলে সামাজিক দূরত্ব না মেনেই যাত্রীরা চলাচল করছেন। এ ছাড়া কলকারখানার শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরার সুবিধার্থে শিমুলিয়া ঘাট দিয়ে গতকাল লঞ্চ চলাচল করেছে। আজ সকাল ৬টা পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল করবে। এ ঘাটে ঢাকামুখী যাত্রীদের  চাপ ছিল বেশি। লোকজন গাদাগাদি করে পদ্মা পার হয়েছেন। এর আগে লকডাউনের মধ্যে কারখানা খোলায় দুর্ভোগে পড়া শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফিরতে রবিবার সারা দেশে বাস ও লঞ্চ চালুর ঘোষণা দেয় সরকার। অন্যদিকে কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেই পোশাক কারখানাসহ শিল্প কল-কারখানা খুলে দেওয়ায় কর্মীদের কর্মস্থলে ফেরার সুবিধার্থে লঞ্চ চলাচলের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। যাত্রীর চাপ থাকায় আজ সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত লঞ্চ চলাচল চালু রাখার সিদ্ধান্ত দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। প্রথমে গতকাল বেলা ১২টা পর্যন্ত লঞ্চ চলার ঘোষণা দেওয়া হলেও পরে তা বাড়িয়ে আজ ভোর ৬টা পর্যন্ত করা হয়েছে। গতকাল রবিবার বিআইডব্লিউটিএ থেকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ জানিয়েছে, রাস্তায় অনেক মানুষ আছে। সবাই তাদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। এ জন্য আজ সকাল ৬টা পর্যন্ত লঞ্চ চালু রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

সকালে উন্মুক্ত ঢাকা, দুপুরের পর কমেছে চলাচল

কারখানার শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরার জন্য সীমিত সুযোগে কঠোর লকডাউনের দশম দিন গতকাল সকালের ভাগে ঢাকার সড়ক ছিল উন্মুক্ত, তবে দুপুরের পর যানবাহন চলাচল আবার কমে এসেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পোশাক কারখানাগুলো রবিবার সকালে খুলে গেছে। সেই সুযোগে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে সর্বত্র, অলিগলিতে অধিকাংশ দোকাপাট খোলা দেখা গেছে। দুর্ভোগে পড়া শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরার সুযোগ দিতে শনিবার রাত থেকেই সারা দেশে বাস ও লঞ্চ চালানোর সুযোগ দেওয়া হয়। তাতে রবিবার সকাল থেকে রাজধানীর সড়কের চিত্র পাল্টে যায়। বাস-মিনিবাসের পাশাপাশি অটোরিকশা ও মোটরবাইক দেখা যায় প্রচুর। প্রাইভেট কার, পণ্যবাহী যানবাহন আর রিকশা তো আছেই। বেলা ১২টার পর বৃষ্টিস্নাত রাজধানীতে গণপরিবহন ও অন্যান্য যানবাহন চলাচল কমে আসে। করোনাভাইরাসের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে সারা দেশে চলমান কঠোর লকডাউনের মধ্যেই রবিবার থেকে সব ধরনের রপ্তানিমুখী কল-কারখানা খোলার অনুমতি দেওয়া হয় শুক্রবার। সেই ঘোষণার পর চাকরি বাঁচাতে লকডাউনের মধ্যেই শনিবার ঢাকার পথে রওনা হন হাজারো শ্রমিক। বাস-ট্রেন-লঞ্চ বন্ধ থাকায় শত শত মাইল পাড়ি দিয়ে ঢাকায় আসতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় তাদের। কখনো পায়ে হেঁটে, কিছুপথ রিকশা-অটোরিকশায়, সুযোগ পেলে পিকআপ ভ্যানের পেছনে দাঁড়িয়ে গাদাগাদি করেই তারা ঢাকা ও আশপাশের জেলাগুলোতে কারখানায় ফেরার চেষ্টা করেছেন। শনিবার দিনভর ঢাকামুখী শ্রমিকদের এই বিড়ম্বনা দেখার পর রাতে সরকার গতকাল রবিবার বেলা ১২টা পর্যন্ত বাস ও লঞ্চ চালু রাখার ঘোষণা দেয়। তবে চলাচলের সময় আজ সকাল ৬টা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যানুযায়ী-

কলকারখানার শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরার সুবিধার্থে শিমুলিয়া ঘাট দিয়ে গতকাল লঞ্চ চলাচল করেছে। গতকাল এ ঘাটে ঢাকামুখী যাত্রীদের চাপ বেশি ছিল; লোকজন গাদাগাদি করে পদ্মা পার হন। শনিবার রাতে এ ঘাট দিয়ে আটটি লঞ্চে যাত্রী পারাপার করা হয় বলে কর্তৃপক্ষ জানায়। এদিকে গতকাল রবিবারও শিমুলিয়া ঘাটে ঢাকামুখো যাত্রী ও গাড়ির চাপ দেখা গেছে। বাসে অর্ধেক আসনের জায়গায় পূর্ণ সংখ্যক আসনেই যাত্রী নেওয়া হচ্ছে। ফলে সামাজিক দূরত্ব না মেনেই যাত্রীরা চলাচল করছেন। জনপ্রতি ৭০ টাকার ভাড়া আদায় করা হচ্ছে ১২০ টাকা। অন্যদিকে শিমুলিয়া লঞ্চ টার্মিনালে গিয়ে দেখা গেছে, লঞ্চে ওঠার অপেক্ষায় লোকজন গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে আছে; স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না কেউ। শতভাগ আসন শুধু নয় দ্বিগুণেরও বেশি যাত্রী নিয়ে লঞ্চগুলো পদ্মা পাড়ি দিচ্ছে। লঞ্চ মালিক সমিতির একজন কর্মকর্তা বলেন, ৮৭ লঞ্চের মধ্যে চলছে ১৫টি। স্টাফ ছুটিতে থাকায় বাকি লঞ্চ চালু করা যাচ্ছে না। বিআইডব্লিউটিসির সহকারী ম্যানেজার মাহবুবুর রহমান জানান, বহরে ১৮ ফেরির মধ্যে চলছে ৮টি ফেরি। তবে পদ্মায় প্রবল স্রোত থাকায় পারাপারে সময় লাগছে বেশি। মাওয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ সিরাজুল কবির জানান, শনিবার রাতেও ৮টি লঞ্চ যাত্রী পারাপার করে। আমরা চেষ্টা করছি যাত্রীরা স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাতে পারাপার হয়। কিন্তু যাত্রীরা মানতে নারাজ।

চাঁদপুর লঞ্চঘাটে ঢাকামুখো মানুষের ঢল

শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরার সুবিধার্থে লঞ্চ চলাচলের ঘোষণার পর চাঁদপুর লঞ্চঘাটে ঢাকামুখী যাত্রীদের ঢল নেমেছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে ঘাট থেকে প্রত্যেকটি লঞ্চ ছাড়া হচ্ছে বলে লঞ্চ মালিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। রবিবার ভোর সাড়ে ৫টায় রফ রফ-৭ লঞ্চটি প্রথম যাত্রা শুরু করে বলে চাঁদপুর বিআইডব্লিউটির উপ-পরিচালক কায়সারুল ইসলাম জানান। এদিকে চাঁদপুর লঞ্চঘাটে যাত্রীর চাপ থাকলে লঞ্চের সংখ্যা কম। যার কারণে অনেক যাত্রীকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লঞ্চঘাটে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। চাঁদপুরের লঞ্চ-মালিক প্রতিনিধি বিপ্লব সরকার বলেন, ঘাটে যে পরিমাণ যাত্রী রয়েছে, সেই অনুযায়ী লঞ্চ নেই। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যাত্রী ধারণ ক্ষমতার অর্ধেক যাত্রী নিয়ে ঢাকা যাচ্ছে লঞ্চগুলো। চাঁদপুর বিআইডব্লিউটিএর উপ-পরিচালক কায়সারুল ইসলাম বলেন, শিল্প-কারখানার শ্রমিকদের কর্মস্থলে ফেরার সুবিধার্থে স্বাস্থ্যবিধি মেনে লঞ্চ চলছে। যদিও রাত ১২টার পর থেকে লঞ্চ চলাচল করার কথা ছিল, কিন্তু যাত্রী না থাকায় ভোরে প্রথম লঞ্চ ছাড়া হয়েছে। এরপর একে একে সকাল ৯টার মধ্যে সাতটি লঞ্চ ছেড়ে যায়। গণপরিবহনে পোশাক শ্রমিকদের চেয়ে সাধারণ যাত্রীই বেশি তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন শিল্প-কারখানা খুলে দেওয়ার ঘোষণায় বিপাকে পড়েছেন শ্রমিক ও কর্মীরা।

 লকডাউনের মধ্যে শনিবার থেকে বিভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করে এবং পায়ে হেঁটে কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেন তারা। এ অবস্থায় শ্রমিকদের ভোগান্তি কমাতে গতকাল রবিবার এক দিনের জন্য গণপরিবহন চলাচলের অনুমতি দেয় সরকার। তবে ঢাকা-ময়মনসিংহের বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখা যায় বাসসহ অন্যান্য গণপরিবহনে শ্রমিক-কর্মীদের চেয়ে সাধারণ যাত্রীই বেশি ছিল। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কারখানা খুলে দেওয়ার কথা শুরু হলে শুক্রবার রাত, শনিবার দিন ও রাতে বেশিরভাগ পোশাক শ্রমিক কর্মস্থলের আশপাশে চলে আসেন। পরে রবিবার সকালে বাস চালু হওয়ায় সড়কের কোনো কোনো স্থানে গণপরিবহন থেকে পোশাক শ্রমিকদের ওঠানামা করতে দেখা গেছে। অনেকে এদিনও পিকআপভ্যান ও ইঞ্জিনচালিত ভ্যান, ব্যাটারি এবং সিএনজিচালিত অটোরিকশা দিয়েও গন্তব্যে পৌঁছেছেন। তবে গণপরিবহনে শ্রমিক-কর্মীদের চেয়ে সাধারণ যাত্রীই বেশি ছিল বলে বিভিন্ন পরিবহনের কর্মীরা জানিয়েছেন।

লকডাউনের মধ্যে কয়েক ঘণ্টার জন্য গণপরিবহন চালু হওয়ায় ঢাকা রংপুর মহাসড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ বেড়েছে। শনিবার  রাত থেকে বঙ্গবন্ধু সেতুর উভয় সংযোগ সড়কে প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে থেমে থেমে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছে কর্মস্থলে ফেরা শ্রমজীবী মানুষ এবং পরিবহন শ্রমিকরা।

গতকাল বেলা ১১টায় এলেঙ্গা হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ইয়াসির আরাফাত জানান সরকারের নতুন প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ায় মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মহাসড়কের বিভিন্ন এলাকায় হাইওয়ে পুলিশ জেলা পুলিশ ও ট্রাফিক পুলিশ নিয়োজিত আছে। তবে বঙ্গবন্ধু সেতুর ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম সূত্র জানায়, সেতুর উভয় প্রান্তে যানবাহনের প্রচ- চাপ থাকায় সেতু দিয়ে যান পারাপার ব্যাহত হচ্ছে। যাত্রী এবং পরিবহন শ্রমিকরা জানিয়েছেন, সকাল থেকে মহাসড়কের বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব প্রান্ত, এলেঙ্গা, পুংলি, রাবনা বাইপাস এলাকা এবং সেতুর পশ্চিম প্রান্ত থেকে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল মোড় পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে থেমে থেমে চলছে যানবাহন। ঢাকায় ফেরা যাত্রীরা জানান, স্বল্প সময়ের জন্য গণপরিবহন চালু করায় স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে  যে যেমন পরিবহন পাচ্ছে তাতে চেপেই যাচ্ছেন। বাড়তি ভাড়া গুনতে হচ্ছে তাদের। তবে চাকরি বাঁচাতে তাদের কাছে বিকল্প কিছু নেই।

এই রকম আরও টপিক

এই বিভাগের আরও খবর