শনিবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ টা

ঝরে পড়ছে শিক্ষার্থীরা

শিক্ষা বন্ধের দেড় বছরে ছাত্রছাত্রী কমেছে নজিরবিহীন । উৎকণ্ঠা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে

মাহমুদ আজহার ও আকতারুজ্জামান

দেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার রণচ-ী দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণিতে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে নিবন্ধিত হয় ৩৬ জন ছাত্রী। এর মধ্যে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করে মাত্র ১৯ জন ছাত্রী। ওই স্কুলের সহকারী শিক্ষক (লাইব্রেরিয়ান) আবদুল্লাহ আল ফারুক জানালেন, করোনাকালের প্রায় দেড় বছরে ড্রপআউট হয়ে গেছে ১৭ জন ছাত্রী। এই ড্রপআউট হওয়া মানে ঝরে পড়ার কারণ, ছাত্রীদের বড় একটা অংশের বিয়ে হওয়া এবং গরিব বাবা-মার অভাব অনটন। একই অবস্থা তেঁতুলিয়ার কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হক জানালেন, ২০১৯-২০ বর্ষে তার কলেজ শাখায় ২২৩ জন ছাত্রী ভর্তি হয়েছিল। এর মধ্যে পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করে ১৬০ জন। বাকি ৬৩ জন শিক্ষার্থী বিয়েশাদি, দরিদ্রতাসহ নানা কারণে ঝরে পড়েছে।  শিক্ষার্থীদের এভাবে ঝরে পড়ায় তিনি উদ্বিগ্ন। শুধু এই দুটি প্রতিষ্ঠানই নয়, ঢাকাসহ সারা দেশেরই প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক  বিদ্যালয়ের প্রায় একই চিত্র। টানা দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ড্রপআউট হওয়ার প্রবণতা। অভাব অনটন, অসচেতনতা ইত্যাদির কারণে অনেক বাবা মা-ই তার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। এতে আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে বাল্যবিয়ে। আর ছেলেদের বড় একটি অংশ দরিদ্রতার কারণে উপার্জনমূলক নানা কাজে জড়িয়ে পড়ছে। কেউবা তাদের পিতামাতাকে পারিবারিক নানা কাজে সহায়তা করছে।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুললেও তারা আর মূলধারার শিক্ষায় ফিরবে না। এভাবে বড় একটি অংশের ছাত্রও ঝরে পড়ছে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেও টিউশন ফি নেওয়া অব্যাহত থাকায় শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ইচ্ছে করেই বিদ্যালয় ছেড়েছে। বিভিন্ন জরিপসহ শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা থেকে ঝরে পড়েছে। রাজধানীর বাইরের বিভিন্ন জেলা, মফস্বল এলাকা, চরাঞ্চল এলাকায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার আরও উদ্বেগজনক। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চরাঞ্চল ও হাওর-বাঁওড় এলাকায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার শতকরা ৫০ শতাংশেরও বেশি।

পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক যৌথ গবেষণায় গত বছর বলা হয়, প্রাথমিকের ১৯ শতাংশ ও মাধ্যমিকের ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী করোনার এই সময়ে নিয়মিত পড়াশোনার একদম বাইরে রয়েছে। এ গবেষণায় এমন প্রেক্ষাপটে মা-বাবাদের চিন্তাভাবনার চারটি মৌলিক দিক উঠে এসেছে। এগুলো হলো- শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাওয়া, শিক্ষার খরচ তুলনামূলকভাবে বেড়ে যাওয়া, স্কুল খোলার সময় নিয়ে চিন্তা এবং পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মসংস্থানজনিত উদ্বেগ। এদিকে প্রায় ৬৫ হাজারেরও বেশি কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কেউ কেউ ভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছেন। নীলফামারীর ডিমলায় পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের দশম শ্রেণির ছাত্রী সুরভী আকতার (ছদ্মনাম)। দেড় বছর ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে মিশে উচ্ছন্নে গেছে অনেকটা। তার বাবা-মা এখন ১৬ বছর বয়সী মেয়েকে বিয়ে দিতে পাত্র খুঁজছেন। গতকাল সুরভীর মায়ের সঙ্গে কথা হয় প্রতিবেদকের। তিনি জানালেন, স্কুল বন্ধ থাকলেও সন্তানকে তো আর বাসায় আটকে রাখতে পারি না। বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে মিশে দিনে দিনে ‘খারাপ’ হয়ে যাচ্ছে। তাই বিয়ের জন্য এত তোড়জোড়।

লালমনিরহাটের আদর্শ ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মাহবুবুল আলম মিঠু জানান, গত দেড় বছরে তার কলেজের একাদশ শ্রেণির ১৭ জন ছাত্রী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। জেলার শিয়াল খোওয়া এসসি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফজলুল হক জানান, গত চার মাসে তার স্কুলের সাতজন ছাত্রী বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে। করোনার কারণে গ্রামে-গঞ্জে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বাল্যবিয়ে।

চলতি বছরে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১ লাখ ৪২ হাজার শিক্ষার্থী নিবন্ধিত হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষায় অংশ নিতে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তাদের মধ্যে ফরম পূরণ করেছে ১ লাখ ১১ হাজার শিক্ষার্থী। তবে আগামী এক-দুই দিনে এ সংখ্যা আরও কিছু বাড়তে পারে বলে শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানিয়েছে। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আবদুস ছালাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানালেন, করোনা মহামারী উদ্ভূত নানা দৈন্যতার কারণেও শিক্ষার্থী কমছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় পাঠবিমুখ হয়েছে ছেলেরা। পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের নানা কাজে জড়ানো হচ্ছে। স্কুল-কলেজের অনেকের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিল ৩ লাখ ৩৭ হাজার। এরাই চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী হিসেবে ফরম পূরণ করার কথা। এদের মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করেছে মাত্র ২ লাখ ৯০ হাজার। আবার এই সংখ্যার মধ্যে রয়েছে অনিয়মিত শিক্ষার্থীও। সবমিলে শুধু এইচএসসিতেই ঢাকা বোর্ডে ফরম পূরণ করেনি প্রায় অর্ধ লাখ ছাত্রছাত্রী। এ শিক্ষা বোর্ডে নবম শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিল ৬ লাখ ৩০ হাজার ১৪৪ জন। এদের মধ্যে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করে মাত্র ৪ লাখ ৭০ হাজার। সে হিসেবে এসএসসি পরীক্ষার আগে শুধু ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেই ড্রপআউট হয়ে গেছে দেড় লাখের বেশি শিক্ষার্থী।

শিক্ষাবিদরা বলছেন, করোনার প্রভাবে দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়াতে অনেক শিক্ষার্থীকে তার পরিবার কাজে লাগিয়ে দিচ্ছে। এ কারণে বেড়ে গেছে বাল্যবিয়ে। বিশেষ করে চর, হাওর ও শহরের বস্তি অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বেশি সমস্যায় পড়ছে। করোনা শেষে শিক্ষাঙ্গন খুললেও এদের অনেকে আর বিদ্যালয়ে ফিরবে না। করোনায় দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষতিও ভয়াবহ। গত বছর কোনো বার্ষিক পরীক্ষা ছাড়াই উপরের শ্রেণিতে উঠেছে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা। ফলে গত বছরের ক্লাসের দক্ষতা ঘাটতি তাদের রয়েই গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন বছরে নতুন ক্লাসের পড়াশোনা। অথচ স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ নেই। সামর্থ্যবান অভিভাবকরা গৃহশিক্ষক দিয়ে পড়াচ্ছেন। অন্যদিকে করোনায় নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র অসংখ্য অভিভাবকের আয়ে ধস নেমেছে। তাই তারা সন্তানের জন্য গৃহশিক্ষক রাখতে পারছেন না।

সম্প্রতি ব্র্যাকের এক ডিজিটাল সংলাপে শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলেন, বাল্যবিয়ের দিক দিয়ে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। করোনার কারণে এই হার বেড়েছে ২২০ শতাংশ। ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিশুরা যা শিখেছে তা-ও ভুলতে বসেছে।

করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কত শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে- এর কোনো হিসাব নেই জাতীয় শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) কাছে। সংস্থাটির মহাপরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, আগামী অক্টোবরে এ নিয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হবে। এখন পর্যন্ত এর কোনো উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়নি বলেও জানান তিনি। সরেজমিনে দেখা গেছে, করোনার প্রভাবে রাজধানীর অনেক স্কুলেও শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক বেশি লক্ষ্য করা গেছে। সেগুনবাগিচা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক এ কে এম ওবাইদুল্লাহ জানান, গত বছর ষষ্ঠ শ্রেণিতে ছিল ৫০ জন ছাত্র। এ বছরে তাদের মধ্যে ৩৫ জন সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। একইভাবে গত বছর স্কুলটিতে সপ্তম শ্রেণিতে শিক্ষার্থী ছিল ৪৬ জন। তাদের মধ্যে চলতি বছরে এসে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে ৩৫ জনে। তিনি জানান, প্রায় প্রতিটি শ্রেণিতেই উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। রাজধানীর মগবাজার মধুবাগ শেরেবাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. আবদুস সাত্তার বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, করোনার কারণে প্রাথমিকের প্রতিটি শ্রেণিতে ৩০ শতাংশ ছাত্রছাত্রী ঝরে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেকে শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া মাধ্যমিকের ২০ শতাংশ ছাত্রছাত্রী ঝরে পড়ছে। তার স্কুলের কোনো কোনো ছাত্র রিকশাও চালাচ্ছে বলে জানান। আমাদের লালমনিরহাট প্রতিনিধি রেজাউল করিম মানিক জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় জেলায় বাল্যবিয়ের হার বাড়ছে। স্কুলের পাঠ শেষ করার আগে ছাত্রীদের বাল্যবিয়ে দেওয়া হলেও সেসব সংসারও টিকছে না। একের পর এক দাম্পত্য কলহে ভাঙছে সংসার। দিনমজুরের মেয়ে আয়েশা বেগম মাত্র সাড়ে ১৩ বছর বয়সে বসতে হয় বিয়ের পিঁড়িতে। বয়স কম হওয়ায় বিয়ে হয় আদিতমারী শহরে। অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী আয়েশার বিয়ের ৪ মাস পর দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। এখন আর আয়েশা স্বামীর কাছে যায় না। আয়েশার পিতা জানান, দীর্ঘ সময় ধরে স্কুল বন্ধ। পাড়ার উঠতি বয়সের ছেলেরা ঝামেলা করে। মেয়েও ঠিকমতো পড়তে চায় না। তাই বাধ্য হয়ে বিয়ে দিতে হয়। এখন সে আর স্বামীর কাছে যেতে চায় না। একইভাবে শিয়াল খোওয়া গ্রামের হাজেরা খাতুনের (ছদ্ম নাম) বিয়ের আয়োজন করেছিল পরিবার। বিয়ের দিন কালিগঞ্জ থানা পুলিশ বর পক্ষকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। বিয়ে না করার শর্তে থানায় উভয় পক্ষ মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পায়। গোপনে তারা সেই মেয়েকেই আবার বিয়ে দেয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় আয়েশা ও হাজেরার মতো কিশোরীরা বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে।

এই রকম আরও টপিক