রবিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ টা

আওয়ামী লীগ কেন পারেনি হামলা ঠেকাতে

রফিকুল ইসলাম রনি

আওয়ামী লীগ কেন পারেনি হামলা ঠেকাতে

সাম্প্রদায়িক হামলার প্রতিবাদে গতকাল বিক্ষোভ -বাংলাদেশ প্রতিদিন

হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরে হামলা-ভাঙচুর, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় কেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ ঠেকাতে পারেনি তা নিয়ে দলের ভিতরে-বাইরে চুলচেরা বিশ্লেষণ হচ্ছে। কুমিল্লার ঘটনার পর অন্যত্র যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো প্রতিরোধ করতে না পারা রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাসীন দলটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যর্থতার বিষয়টিও সামনে আনছেন রাজনৈতিক  বিশ্লেষকরা। আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র দাবি করছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা করছে বিএনপি, জামায়াত ও হেফাজত গোষ্ঠী। ইতিমধ্যে একেবারে পরিকল্পনা ও ছক করে এসব হামলা করা হয়েছে। এতে কিছু গোয়েন্দা ব্যর্থতাও থাকতে পারে। আবার স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক গ্রুপ থাকায় প্রতিরোধ করতে না পারার তথ্যও সামনে এসেছে। এমনকি হামলার দিন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও ঘটনাস্থলে যাননি এমন অভিযোগও রয়েছে। আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে। কিন্তু সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়, এমন ঘটনার স্থানীয়ভাবে কোনো প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না দলটি। অনেকেই বিএনপি-জামায়াতের উসকানিতে পা দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করছে। আর জনপ্রতিনিধিরা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নয়, নির্বাচিত হয়ে তারা এলাকায় থাকেন না। জনগণের পাশে দাঁড়ান না। ঘটনা ঘটলেও তাদের ‘কুম্ভকর্ণের’ ঘুম ভাঙে না। এ প্রসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপচার্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মীজানুর রহমান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, কুমিল্লাসহ সারা দেশে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা সরকার দায় এড়াতে পারে না। রাজনৈতিক দল হিসেবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বড় দায় রয়েছে। কুমিল্লার পর এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে পারে এমন ধারণা নিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের উচিত ছিল সংখ্যালঘুদের পাশে দাঁড়ানো। জনপ্রতিনিধিদেরও একই দায়িত্ব ছিল। কিন্তু জনপ্রতিনিধিরাও সেখানে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শুধু আওয়ামী লীগ, নয় প্রত্যেক রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনগুলোকেও দায় নিতে হবে। কুমিল্লার পর তারা যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে বড় ধরনের শোডাউন করত, তাহলে হয়তো এমন ঘটনা ঘটত না। এখন সব পক্ষই সতর্ক হয়েছে, কিন্তু সংখ্যালঘুদের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে তা শুকাবে কেমনে?’ দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে দুটি কাজকে খুব জরুরি বলে মনে করছেন তারা। সেজন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পাশে থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হামলাকারীদের শাস্তির আওতায় এনে সরকারের সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে। কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, রংপুরের ঘটনার পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি দল সেখানে পরিদর্শন করেছেন। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সহায়তাও দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কৃষিবিদ আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার পর প্রথমে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। সরকারের উন্নয়ন-অর্জন বাধাগ্রস্ত করতে চায় বিএনপি-জামায়াতসহ সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। সে কারণেই তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মন্দির, বাড়িঘরে হামলা করেছে।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীররা দোষারোপের রাজনীতির আড়ালে এই ঘটনার ইন্ধন দিচ্ছেন। যারা ঘটিয়েছে তাদেরকে রক্ষা করতে চাইছেন। কিন্তু তাদের মুখোশ জাতির সামনে উন্মোচন হবে। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলব। আমরা সংখ্যালঘুদের পাশে ছিলাম, আছি, থাকব।’ আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার ফলে স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক গ্রুপ, উপগ্রুপে বিভক্ত হয়েছে। সেই বিভক্তির কারণেই আওয়ামী লীগ ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। আবার ক্ষমতাসীন দলের জনপ্রতিনিধিরাও ঠিকমতো এলাকায় না থাকায় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনাও পাননি স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। যেসব এলাকায় বড় বড় ঘটনা ঘটেছে সেখানকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কেউ কেউ দেশের বাইরেও অবস্থান করেছেন, কেউ ঘুমিয়ে ছিলেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের এক প্রেসিডিয়াম সদস্য বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘হামলার পর আওয়ামী লীগ প্রতিরোধ করতে পারেনি, এটা পুরোপুরি সত্য নয়। তবে যেভাবে তাৎক্ষণিক ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা দরকার ছিল, তার কিছু সমন্বয়হীনতা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় জনপ্রতিনিধি, দলীয় নেতার ব্যর্থতা আছে কিনা, কেন প্রতিরোধ গড়ে তোলা যায়নি তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক ঘটনায় সংখ্যালঘুরা ক্ষমতাসীন দলটির নেতা-কর্মীদের কথায় আশ্বস্ত হতে পারছে না। আওয়ামী লীগ এখন আদর্শভিত্তিক রাজনীতি করছেন না বলেও অভিযোগ করছেন। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশ গুপ্ত বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার জন্য যা বলা হচ্ছে, সেগুলো কথার ফুলঝুরি ছাড়া কিছুই না। এই আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ নেই। আদর্শ বাদ দিয়ে ক্ষমতার রাজনীতি করছে বর্তমান আওয়ামী লীগ। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কথাই বলতে হয়, ক্ষমতার একযুগে অনেক আগাছা, পরগাছা, কাউয়া ঢুকে গেছে। যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বিশ্বাস করে না। যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বিশ্বাস করে না, তারা কীভাবে আওয়ামী লীগের মঙ্গল চাইবে?’ তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকার পরও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দেওয়া যাচ্ছে না। একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলছে। আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে এখন খুব নড়বড়ে। এটা যদি তারা উপলব্ধি করতে পারে তবেই তাদের মঙ্গল।

সর্বশেষ খবর