শিরোনাম
বুধবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০২২ ০০:০০ টা

ভাঙেনি অনশন চলবে আন্দোলন

♦ শাবিপ্রবি থেকে মেডিকেল টিম প্রত্যাহার, আর্থিক লেনদেনের অ্যাকাউন্ট বন্ধ ♦ উপাচার্যের কাছে খাবার পৌঁছে দিল আন্দোলনকারীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, সিলেট ও শাবি প্রতিনিধি

ভাঙেনি অনশন চলবে আন্দোলন

শাবিপ্রবি উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে গতকালও অনশন করেন শিক্ষার্থীরা -বাংলাদেশ প্রতিদিন

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ দাবিতে ২৮ শিক্ষার্থীর অনশন চলছেই। গতকাল সন্ধ্যায় নিজেদের মধ্যে ২ ঘণ্টার বৈঠক শেষে অনশন চালিয়ে যাওয়ারই ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। রাত সাড়ে ৯টায় অনশন পালনকারী শিক্ষার্থীদের মুখপাত্র পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র শাহরিয়ার আবেদিন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘উপাচার্য পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা অনশন চালিয়ে যাব।’ এর আগে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা শপথবাক্য পাঠ করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এ ছাড়া করোনা সংক্রমণের ঝুঁকির কারণে অনশনস্থল থেকে মেডিকেল টিম প্রত্যাহার করা হয়েছে। যেসব ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বিকাশ নম্বরে আন্দোলনকারীদের কাছে টাকা আসত তা-ও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

অনশনের ১৫০ ঘণ্টা : শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদের পদত্যাগ দাবিতে অনশনরত শিক্ষার্থীদের ১৫০ ঘণ্টা পার হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় গোলচত্বরে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা সমবেত হয়ে অনশনকারীদের অনশন ভাঙার অনুরোধ করেন। এ সময় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা আমাদের অনশনরত সহযোদ্ধাদের বলতে চাই যে অনশনরত কেউ মারা গেলেও এই মনুষ্যত্বহীন উপাচার্যের কিছু যায় আসে না। কিন্তু আমরা আমাদের অনশনরত সাহসী সহযোদ্ধাদের হারাতে চাই না। তারা আত্মাহুতি না দিয়ে যেন অনশন ভাঙে।’ অনশন ভাঙলেও উপাচার্যের পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার শপথ করেন কয়েক শ শিক্ষার্থী। শপথবাক্যে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমরা শপথ করছি যে স্বৈরাচারী ফরিদ উদ্দিনের পদত্যাগের আগ পর্যন্ত আমরা আমাদের দাবি আদায়ের লড়াই অব্যাহত রাখব। অনশনরত ভাইবোনদের এত দিনের অকুতোভয় সংগ্রামের অনুপ্রেরণা বুকে ধারণ করে আরও দ্বিগুণ শক্তি ও তেজে আমরা আমাদের সংগ্রাম চালিয়ে যাব। তাদের এ দুর্বিষহ যন্ত্রণা আমরা বৃথা যেতে দেব না। দিন হোক রাত হোক আমরা এ আন্দোলনের মাঠ ছেড়ে যাব না। আমরা আমাদের এক দফা দাবি আদায় করে তবে ঘরে ফিরব।’

অনশনরতদেরমেডিকেল টিম সাপোর্ট বন্ধ : অনশনরত শিক্ষার্থীদের অনশনের প্রথম দিন থেকেই সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাত্রলীগের উদ্যোগে একটি মেডিকেল টিম স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল। তবে গতকাল থেকে তারা এ সাপোর্ট দেওয়া বন্ধ করে দেয়। মেডিকেল টিমের নেতৃত্ব দেওয়া নাজমুল হাসান বলেন, অনশনরত শিক্ষার্থীদের মধ্যে করোনার উপসর্গ পরিলক্ষিত হচ্ছে। কিন্তু তারা নমুনা পরীক্ষা করাতে চাচ্ছেন না। এ অবস্থায় তাদের চিকিৎসা দিয়ে আবার মেডিকেল টিমের সদস্যদের হাসপাতালে গিয়েও অন্য রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। ফলে সাধারণ রোগীরাও করোনায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাই তারা মেডিকেল টিমের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়েছেন। এ ছাড়া ইতোমধ্যে মেডিকেল টিমের কয়েক সদস্যের মধ্যেও করোনার উপসর্গ দেখা দিয়েছে। আন্দোলনকারীদের মুখপাত্র আরিফুল ইসলাম চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে বলেন, ‘অনশনরত শিক্ষার্থীদের সবার অবস্থার অবনতি হচ্ছে এবং তাদের জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। তারা সবাই খিঁচুনি, ব্লাডে অক্সিজেন ও সুগার লেভেল কমে যাওয়া, ব্লাড প্রেসারসহ নানা শারীরিক জটিলতায় পড়ছেন। তারা অর্গান ড্যামেজের ঝুঁকিতে আছেন।’

শিক্ষার্থীদের আর্থিক লেনদেনের অ্যাকাউন্ট বন্ধ : আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের আর্থিক লেনদেনের মোট ছয়টি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনকারীদের মধ্যে সাদিয়া আফরিন বলেন, ‘আন্দোলনের আর্থিক জোগান নিশ্চিতে রকেট, নগদ, বিকাশ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টসহ মোট ছয়টি অ্যাকাউন্ট থেকে তারা কোনো লেনদেন করতে পারছেন না। শাবিপ্রবির যে কোনো কর্মসূচিতে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা যৌথ উদ্যোগে ফান্ড তৈরি করে থাকেন। এ আন্দোলনেও সেভাবেই অর্থ সংগ্রহ চলছিল। তবে সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে এসব নম্বরে আর কোনো লেনদেন করা যাচ্ছে না।’

অর্থের জোগান দেওয়ার অভিযোগে সাবেক পাঁচ শিক্ষার্থী আটক  : আন্দোলনে অর্থের জোগান ও উসকানি দেওয়ার অভিযোগে শাবির পাঁচ সাবেক শিক্ষার্থীকে আটক করে সিলেট পুলিশে হস্তান্তর করেছে ঢাকা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল দুপুরে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. নিশারুল আরিফ। তিনি বলেন, আটকদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এরপর মামলা দেওয়া হবে।

উপাচার্যের বাসভবনে বিদ্যুৎ পুনঃসংযোগ : বিশ্ববিদ্যালয় উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদের বাসভবনে বিদ্যুতের পুনঃসংযোগ দিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। সোমবার মধ্যরাতে এ বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা এ ব্যাপারে বলেন, রাত ১২টার দিকে শিক্ষার্থীরাই উপাচার্যের বাসভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ চালু করেন। উপাচার্য ভবনের পাশের কর্মচারীদের আবাসিক এলাকার বিদ্যুতের লাইন একই। এ লাইন কেটে দেওয়ায় কর্মচারীদের অনেক পরিবার নানাবিধ সমস্যায় পড়েছেন। তাই কর্মচারীদের পরিবারের কথা বিবেচনা করে বিদ্যুৎ পুনঃসংযোগ দেওয়া হয়েছে। এর আগে রবিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় আন্দোলনকারীরা উপাচার্য ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে দিয়েছিলেন।

আন্দোলনকারীদের প্রতি . কামালের সংহতি : গতকাল দুপুরে সিলেট-২ আসনের (ওসমানীনগর-বিশ্বনাথ) সংসদ সদস্য ও গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোকাব্বির খান অনশনরতদের দেখতে এসে তাদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। এ সময় গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে আন্দোলনরতরা কথা বলেন। ড. কামালও তাদের যৌক্তিক দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। মোকাব্বির খান এমপি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী তাদের দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক। এখানে কোনো ধরনের রাজনীতি নেই। প্রধানমন্ত্রী চাইলেই এ সমস্যা সমাধান করতে পারেন।’

উপাচার্যের কাছে খাবার পৌঁছে দিলেন আন্দোলনকারীরা : আন্দোলনকারীরা গতকাল দুপুরে উপাচার্যের জন্য নিয়ে আসা শিক্ষকদের খাবার বাসভবনের প্রহরীদের মাধ্যমে উপাচার্য ভবনে পৌঁছে দিয়েছেন। জানা যায়, শিক্ষক সমিতির নেতারা খাবার নিয়ে উপাচার্য ভবনে যেতে চাইলে শিক্ষার্থীরা বাধা দেন। শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক তুলসী কুমার দাস বলেন, ‘ভিসি স্যার কয়েকদিন ধরে অসুস্থ। তাই আমরা খাবার নিয়ে দেখতে যেতে চাচ্ছি।’ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘আমাদের উপাচার্য অসুস্থ হলে তিনি মেডিকেলে যেতে পারেন। আমরা সহযোগিতা করব, তবে খাবার নিয়ে ভিতরে যেতে দিতে পারছি না। আমরা কোনো সহিংসতার দিকে যেতে চাই না। তাই নিরাপত্তা প্রহরীদের মাধ্যমে আমরা খাবার পাঠানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছি। আর উপাচার্য পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা কোনো আলোচনায় যেতে চাই না।’

শাবি শিক্ষককে ফেনসিডিল দিতে গিয়ে গার্ডসহ আটক : বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের জন্য ফেনসিডিল আনতে গিয়ে জাহিদুর রহমান নামে এক গার্ডসহ দুজনকে সোমবার রাত ১১টার দিকে আটক করেছেন শিক্ষার্থীরা। জানা যায়, রাত ১১টার দিকে ফেনসিডিল নিয়ে উপাচার্য বাসভবনের দিকে যাওয়ার সময় তাকে আটক করা হয়। এ সময় আটক জাহিদ জানান, ‘একজন স্যার আমাকে বলেন এক লোক একটি ওষুধ দেবে তা এনে দিতে। ওই শিক্ষকের কথামতো আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকের কাছ থেকে অন্য লোকের দেওয়া ওষুধ নিয়ে আসি। এটি ফেনসিডিল কি না জানতাম না।’ পরে শিক্ষার্থীদের জেরার মুখে জাহিদ ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মাজহারুল হাসান মজুমদারের জন্য এটি নিয়ে এসেছেন বলে স্বীকার করেন। এ ব্যাপারে অভিযুক্ত শিক্ষককে একাধিকবার ফোন দিলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে তাদের জালালাবাদ থানায় হস্তান্তর করা হয় এবং গতকাল দুপুরে মামলা হয়। বিষয়টি নিশ্চিত করে জালালাবাদ থানার ওসি নাজমুল হুদা খান বলেন, ‘মাদক আইনে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। মামলায় আপাতত দুজনকে আসামি করা হয়েছে। সেই সঙ্গে পুরো বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্তে যার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে তাকেই মামলার আসামি করা হবে।’

প্রসঙ্গত, ১৩ জানুয়ারি রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বেগম সিরাজুন্নেসা চৌধুরী হলের প্রাধ্যক্ষ জাফরিন আহমেদ লিজার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ তুলে তাঁর পদত্যাগসহ তিন দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন হলের ছাত্রীরা। এর জেরে ১৬ জানুয়ারি বিকালে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি ভবনে উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করেন। তখন শিক্ষার্থীদের লাঠিপেটা, গুলি ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে উপাচার্যকে মুক্ত করে পুলিশ। সেদিন রাতে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দেন কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীরা তা উপেক্ষা করে উপাচার্য বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়ে তাঁর পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনে নামেন। ফলে ১৭ জানুয়ারি থেকে বাসভবনে অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন উপাচার্য ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। ১৯ জানুয়ারি বেলা আড়াইটা থেকে উপাচার্যের পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরণ অনশনে বসেন ২৪ শিক্ষার্থী। তার মধ্যে একজনের বাবা হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় তিনি অনশন শুরুর পরদিনই বাড়ি চলে যান। এর মাঝে উপাচার্য ইস্যুতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ২২ জানুয়ারি গভীর রাতে ভার্চুয়ালি বৈঠক করেন শিক্ষামন্ত্রী। বৈঠকে উপাচার্যের পদত্যাগ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না এলেও দাবিগুলো লিখিতভাবে জমা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তবে বৈঠকের পর শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের মূল দাবি উপাচার্যের পদত্যাগ। এ দাবি না মানা পর্যন্ত তারা আন্দোলন থেকে সরবেন না। ২৩ জানুয়ারি দুপুরের পর শিক্ষার্থীদের আবার শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও তা আর হয়নি। রবিবার রাতে শিক্ষার্থীরা উপাচার্য বাসভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

এই বিভাগের আরও খবর

সর্বশেষ খবর