শিরোনাম
সোমবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২২ ০০:০০ টা

নাহিদ-মুরসালিনের হত্যাকারী শনাক্ত

নিউমার্কেটে সংঘর্ষ

নিজস্ব প্রতিবেদক

রাজধানীর নিউমার্কেটে ছাত্র-ব্যবসায়ী সংঘর্ষের সময় নাহিদ ও মুরসালিনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় অন্তত ২০ জনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। এদের মধ্যে ১২ জনই ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী। শনাক্তের মধ্যে নাহিদকে কুপিয়েছেন রাব্বী নামে একজন। তিনি ঢাকা কলেজের আবাসিক হলের শিক্ষার্থী। সংঘর্ষের সময় নাহিদকে দুজন ও মুরসালিনকে একজন রামদা দিয়ে কুপিয়েছেন। এই তিনজনসহ শনাক্তদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। গতকাল মামলার তদন্তকারী সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও র‌্যাব সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফেসবুক ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, নিথর পড়ে থাকা একটি দেহের ওপর নির্মমভাবে কোপাচ্ছে এক যুবক। হেলমেট পরা যুবকের নাম রাব্বী। তিনি ঢাকা  কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, থাকেন কলেজের নর্থ হলে। বিভিন্ন স্থানে হেলমেট পরা অস্ত্র হাতে তাদের হামলা চালাতে দেখা গেছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত করা হচ্ছে। ডিবি ও র‌্যাব নিউমার্কেটে সংঘর্ষের ঘটনায় গতকাল পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া ২০ জনের মধ্যে অন্তত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে, গতকাল বিকালে ঢাকা কলেজে অভিযান চালিয়েছে ডিবি ও র?্যাব। কলেজের আন্তর্জাতিক ছাত্রাবাসের ১০১ নম্বর কক্ষে অভিযান চালায় তারা। অভিযানে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য একজনকে আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া গতকাল বিকালে নাহিদকে কুপিয়ে হত্যাকারী রাব্বীকে পঞ্চগড় থেকে গ্রেফতার করেছে ডিবি। গ্রেফতারের পর তাকে ঢাকায় আনা হচ্ছে।

১৯ এপ্রিল বেলা ১১টা থেকে দুপুর পর্যন্ত নিহত নাহিদ ব্যবসায়ী-কর্মচারীদের পক্ষ হয়ে সংঘর্ষে জড়ান। অন্তত দুই ঘণ্টা ধরে একটি বড় ছাতা হাতে তাকে সংঘর্ষের একদম সামনে দেখা যায়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে ইটের আঘাতে আহত হয়ে সড়কে পড়েন নাহিদ। এরপর তার ওপর নির্মম হামলা চালায় হেলমেটধারী কিছু যুবক।

নাহিদকে সেদিন দুজন পরপর কোপায়। এর মধ্যে সবচেয়ে হিংস্র দেখা গেছে শনাক্ত হওয়া রাব্বীকে। রাব্বীর আগের হামলাকারীকেও শনাক্ত করা হয়েছে। নাহিদ হত্যার পরদিন হাসপাতালে মারা যান দোকানকর্মী মুরসালিন। মুরসালিনকেও কুপিয়েছে ঢাকা কলেজের এক শিক্ষার্থী। মুরসালিনের হত্যাকারীকেও শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

সংঘর্ষের সময় বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্র নিয়ে হেলমেট পরা কিছু যুবককে দেখা গেছে। এ বিষয়ে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলছেন, দুজন নিহতের ঘটনায় নিউমার্কেট থানায় দুটি মামলা হয়েছে। এ নিয়ে আমরা কাজ করছি। সব ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। সেগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে শনাক্ত এবং অন্তত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে।

১৮ এপ্রিল রাত ১২টার দিকে ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী ও কর্মচারীদের সংঘর্ষ হয়। প্রায় আড়াই ঘণ্টা চলে এ সংঘর্ষ। এরপর রাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও পরদিন ১৯ এপ্রিল সকাল ১০টার পর থেকে ফের দফায় দফায় সংঘর্ষ শুরু হয়, যা সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে। এ ঘটনায় নিউমার্কেটের সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। ২০ এপ্রিলও নিউমার্কেটে থমথমে অবস্থা বিরাজ করে। ওই দিন বিকালে একডজন ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।

পরে ছাত্র-শিক্ষক-ব্যবসায়ীরা বৈঠকে বসে ২১ এপ্রিল দোকান খোলার সিদ্ধান্ত নেয়। সংঘর্ষের ঘটনায় ১৫ জন সাংবাদিকসহ অর্ধশতাধিক আহত হন। এদের মধ্যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বেশ কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। এ ছাড়া সংঘর্ষের এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত দুজন চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তাদের একজন নাহিদ হোসেন ছিলেন ডেলিভারিম্যান, অন্যজন মুরসালিন ছিলেন দোকান কর্মচারী। এ ঘটনায় উভয় পরিবারের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি মামলা করা হয়।

সংঘর্ষের সূত্রপাত নিউমার্কেটের ভিতরে থাকা ওয়েলকাম ও ক্যাপিটাল ফাস্টফুড নামের দুই দোকান কর্মচারীর দ্বন্দ্ব থেকে। সেই দোকান দুটি সিটি করপোরেশন থেকে বিএনপি নেতা অ্যাডভোকেট মকবুলের নামে বরাদ্দ রয়েছে। তবে কোনো দোকানই নিজে চালাতেন না মকবুল। রফিকুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম নামে দুজনকে ভাড়া দিয়েছেন দোকান দুটি।

সংঘর্ষের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে দুটি মামলা করে। একটি মামলা বিস্ফোরক আইনে এবং অন্যটি পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে করা হয়। দুই মামলায় নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীসহ ২৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ১২০০ জনকে আসামি করা হয়। পরে এ মামলার ১ নম্বর আসামি অ্যাডভোকেট মকবুল হোসেনকে গ্রেফতার করে ডিবি।

এ ছাড়া সংঘর্ষে নিহত নাহিদের স্বজন মো. সাঈদ ও মুরসালিনের ভাই নুর মোহাম্মদ বাদী হয়ে নিউমার্কেট থানায় দুটি হত্যা মামলা করেন। নাহিদের মামলায় অজ্ঞাত ২০০ এবং মুরসালিনের মামলায় অজ্ঞাত ১৫০ জনকে আসামি করা হয়। নিউমার্কেট থানায় হওয়া চার মামলায় ২৪ জনের নাম উল্লেখসহ মোট আসামি করা হয়েছে ১ হাজার ৫৭৬ জনকে। তবে চারটি মামলার মধ্যে শুধু পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় বিএনপি নেতা মকবুলসহ ২৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ মামলার বাদী নিউমার্কেট থানার পুলিশ পরিদর্শক ইয়ামিন কবীর।

অ্যাডভোকেট মকবুল ছাড়াও এ মামলায় আমির হোসেন আলমগীর, মিজান, টিপু, হাজি জাহাঙ্গীর হোসেন পাটোয়ারী, হাসান জাহাঙ্গীর মিঠু, হারুন হাওলাদার, শাহ আলম শন্টু, শহিদুল ইসলাম শহিদ, জাপানি ফারুক, মিজান বেপারী, আসিফ, রহমত, সুমন, জসিম, বিল্লাল, হারুন, তোহা, মনির, বাচ্চু, জুলহাস, মিঠু, মিন্টু ও বাবুলের নাম রয়েছে।

সর্বশেষ খবর