শিরোনাম
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট, ২০২০ ১৩:৫২
আপডেট : ১৩ আগস্ট, ২০২০ ১৪:২৮

নিয়ম না মানাই যেখানে নিয়ম

ডা: নওশিন শারমিন পূরবী

নিয়ম না মানাই যেখানে নিয়ম
প্রতীকী ছবি

আমরা এক অদ্ভুত জাতি। মহামারীও পারেনি আমাদের বিবেককে জাগ্রত করতে। এ সময়ও আমরা মানহীন মাস্ক, সুরক্ষা সামগ্রী বিক্রয় করি। ন্যায্য মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি হয় জীবানুনাশক। ডেঙ্গু মহামারীর সময় মশক নিবারক সামগ্রীর দাম বাড়িয়ে দেই, মশা মারতে মশার ঔষধের পরিবর্তে পানি ছিটানোর নজিরও রয়েছে এই শহরে। আমরা ভাবি না প্রতিটি ক্রিয়ারই একটি সমান এবং বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া আছে।

বেশ কিছু স্বাস্থ্যবিষয়ক টক শোতে আমন্ত্রিত ডাক্তার ও উপস্থাপক দর্শকদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেন, চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্রও প্রদান করেন। আমার বিজ্ঞ সহকর্মী (যারা এই কাজ করেন) তাদের কাছে প্রশ্ন; রোগীর রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসা প্রদানের কয়েকটি ধাপ আছে। এক্ষেত্রে প্রথমে রোগীর সাথে কথা বলে তার বিশদ ইতিহাস জানতে হয়। অতঃপর তাকে শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে কিছু ল্যাবরেটরি পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করে পরবর্তীতে চিকিৎসা প্রদান করা হয়। এমন অনেক ঔষধ আছে যা কোন ব্যক্তি বিশেষের জন্য ব্যবহার করা ক্ষতিকর। রোগী বর্তমান এ আর কী কী ঔষধ সেবন করছেন, আপনার দেয়া ঔষধ ওই ঔষধের সাথে যুগপৎ কাজ করতে পারবে কিনা তাও জানার প্রয়োজন। রোগ নির্ণয়ের এতগুলো ধাপকে উপেক্ষা করে ক্যামেরার সামনে টেলিফোনে ২/৩ টি বাক্য আদান প্রদানে আপনারা যে ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন, এটা কি বিধিসম্মত হচ্ছে? কোথায় আপনার পেশাগত দায়িত্ববোধ? 

অসাধু ব্যবসার ফলে সৃষ্ট জনস্বাস্থ্য সমস্যার কারণে পরবর্তীতে জাতিকে অনেক বড় মাশুল দিতে হয়। প্রকৃতির নিয়মে অসাধু ব্যবসায়ী, মধ্যস্বত্বভোগী, মুনাফাভোগী নিজেও কিন্তু ঐ ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায় না। অসেচতন জনগোষ্ঠীর মাঝে স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরীর ক্ষেত্রে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আজকাল স্বাস্থ্য বিষয়ক বিভিন্ন টক শোয়ের কার্যকলাপ সত্যই প্রশ্নবিদ্ধ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরূপ।

এন্টিবায়োটিক রেজিসটেন্স মানবজাতির জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এন্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইবের আগে আমাদের কালচার সেনসিটিভি পরীক্ষা করার কথা। এইসবের ধার না ধরে আপনারা যে এন্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করছেন এর ফলে কি আপনাদের মাধ্যমে এন্টিবায়োটিক রেজিসটেন্স তৈরী হচ্ছে না? এই দায়ভার কাকে দিবেন?

আমাদের দেশের বেশিরভাগ লোক অসচেতন, হুজুগে। নির্দিষ্ট ২/১টা সমস্যার কথা শুনে আপনার যে ঔষধ গণমাধ্যম মারফত দিচ্ছেন তা কিন্তু আরও লক্ষাধিক মানুষ শুনছে। তাদের মাঝে উৎসুক আরো কিছু লোক স্বপ্রণোদিত হবে, নিজের  সমস্যার সাথে মিল আছে ভেবে এই ঔষধ গুলো ফার্মেসি থেকে কিনবেন এবং সেবন করবেন। একবার কি ভেবেছেন এই কথা?

অনেকে হয়তো বলবেন, এই মহামারীর সময়ে, ডাক্তার সংকটে যা পাই তাই ভালো। স্বাধীনতার প্রায় ৫০ বছর পরেও আমরা খড়কুটোকে আঁকড়ে ধরে টিকতে চাই। ফলশ্রুতিতে আমরাও ডুবি, খড়কুটোও ডোবে । গত ৩/৪ মাসে এমন অনেক উদাহরণ আমাদের সামনে এসেছে।

আমাদের অতি উৎসাহী, আবেগপ্রবণ গুটি কয়েক ডাক্তার সস্তা কিছু বাহবা নেবার জন্য কিংবা ঔষধ কোম্পানির কাছ থেকে পাওয়া কিঞ্চিত সুবিধার বিনিময়ে যে কাজ করছেন বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে তা যে শাস্তিযোগ্য অপরাধ তা কি আপনি জানেন? বাংলাদেশের দ্য ড্রাগস (কন্ট্রোল) অর্ডিন্যান্স ১৯৮২ এর ১৪, ২১, ২২ ধারা এবং ন্যাশনাল ড্রাগ পলিসি ২০১৬ এর ৪.৯ এর b,c তা সমর্থন করে ।

এবার  আশা  যাক, গণমাধ্যম এবং তার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার ভূমিকায়। ডাক্তার সাহেব হয়তো এ সকল নিয়মনীতির বিষয়ে ততটা নাও জানতে পারেন, কিন্তু জাতীয় ঔষধ নীতি অনুযায়ী কোনো কোম্পানির ঔষধের বিজ্ঞাপন যে নিষিদ্ধ তা নিশ্চয়ই আপনারা জানেন। তবে ডাক্তার সাহেবদের সহযোগিতায় কোন অসুখের চিকিৎসায় নির্দিষ্ট কোম্পানির ঔষধের নাম গণমাধ্যমে প্রচার করে আপনারা কি দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের পাশাপাশি ঔষধ কোম্পানির স্বার্থ সংরক্ষণ এবং আপনাদের ব্যবসায়িক মুনাফা অর্জন করছেন না?

ঔষধ প্রশাসনের ওয়েবসাইটে দ্য ড্রাগস (কন্ট্রোল) অর্ডিন্যান্স ১৯৮২ এবং ন্যাশনাল ড্রাগ পলিসি ২০১৬ আপলোড করা আছে। এ আইন/ নিয়মনীতি আপলোড করার পাশাপাশি ঐ বিষয়ে মনিটরিং এর দায়িত্ব কি তারা অস্বীকার করতে পারেন? সর্বোপরি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জনস্বার্থে জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই সকল অনুষ্ঠান বন্ধে বা অনুষ্ঠান পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট দিক নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে ধরে নেয়া যায়।

নির্দিষ্ট কোম্পানির ঔষধের ট্রেড নাম উল্লেখ করে ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয় এমন অনেক টিভি অনুষ্ঠানের ভিডিও ইউটিউবে আপলোড হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে কেউ ই-মেইলে যোগাযোগ করলে কিছু অনুষ্ঠানের লিংক দেয়া সম্ভব।

সীমিত সম্পদ এবং লোকবল নিয়ে কাজ করে আমাদের ডাক্তার সমাজের একটি বড় অংশ যেভাবে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছে তা সত্যিই বিস্ময়কর। গুটিকয় অবিবেচক, সুবিধাভোগী, অনৈতিক কার্যকলাপে লিপ্ত ডাক্তারের কাজ দিয়ে গোটা ডাক্তার সমাজের ভূমিকা বিষয়ে দেশববাসী যেন সন্ধিহান না হয় সেই দিকে সকলেরদৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।

আর উল্লেখিত অনিয়ম তদারকি, দোষীদের শাস্তি প্রদান বিষয়ে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার শক্ত, পক্ষপাতশূন্য ভূমিকা আমরা আশা করি।

লেখক: চিকিৎসক, মানবাধিকার কর্মী
চেয়ারপার্সন, লিভ হেলদী ফাউন্ডেশন
ই-মেইলঃ dr. purabi @ yahoo.com

বিডি প্রতিদিন/ফারজানা


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর