শিরোনাম
প্রকাশ : সোমবার, ৬ এপ্রিল, ২০২০ ০০:০০ টা
আপলোড : ৬ এপ্রিল, ২০২০ ০০:১৯

করোনা বিপর্যয় : সমাধানের বাতিঘর

মেজর ডা. খাশরোজ সামাদ

করোনা বিপর্যয় : সমাধানের বাতিঘর
করোনাভাইরাস তার অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রতিনিয়তই তার ‘জিন’ তথা বংশগতি বদলাচ্ছে। অদ্যাবধি এ ভাইরাস অন্তত ৩৮০ বার এ কাজটি সাড়ম্বরে করেছে। ফলে বিজ্ঞানীদের জন্য ‘ক্ষণে ক্ষণে’ পরিবর্তিত ভাইরাসের প্রতিষেধক বা ওষুধ তৈরি করা জটিল হয়ে পড়েছে

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ এবং ধ্বংসযজ্ঞের পর পৃথিবীর মানুষকে খোদ মৃত্যুর ভয়ে সরুদ্ধকরভাবে ‘প্যানিক’ করতে পেরেছে অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক অণুজীব, সাধারণ্যে যা করোনাভাইরাস নামে পরিচিত।

আমাদের সাধারণ ধারণা অনুযায়ী যে কোনো ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাব তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে বেশি। অথচ, সম্প্র্রতি আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে দেখলাম, চিকিৎসাবিজ্ঞানের উৎকর্ষে শীর্ষস্থানে থাকা ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যেমন ইতালি, ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানসহ বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে তাসের দেশের মতো পুরোটাই তছনছ করে দিয়েছে এ অণুজীব। গ্রেট ব্রিটেনে স্বেচ্ছায় রাজত্ব ছেড়ে দেওয়া রাজপুত্র চার্লস, প্রধানমন্ত্রীও সংক্রমিত হয়েছেন। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিধর দেশ হিসেবে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার এতই বেশি যে সেখানকার প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে খোদ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও করোনার ভীতি গ্রাস করেছে। মিডিয়াকে দেওয়া নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সেটি বারবার প্রস্ফুট হয়েছে।

যে কোনো দেশে মহামারী দেখা দিলে তার মূল সমস্যা খুঁজে বের করা হয়। দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে, অর্থনৈতিক অবস্থান ইত্যাদি পরিমন্ডলে একই অসুখের মূল সমস্যা ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। তবে খোলা চোখে সব জনপদেই কতগুলো বিষয় দৃশ্যমান। যেমন জাতীয় বাজেটের কত শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ, মাথাপিছু জিডিপি কেমন, রোগী চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীর অনুপাত কেমন, শিশু-মাতৃমৃত্যুর হার কেমন ইত্যাদি। করোনা বিপর্যয়ের মূল কারণ খুঁজতে গেলে কী সেই মানদন্ডগুলোই প্রথমে উচ্চারিত হয়? আগে উল্লেখিত দেশগুলোতে এ মানদন্ডগুলো সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও এ রোগের ব্যাপক বিস্তার প্রমাণ করে মূল কারণ এর বুলস আইতে তীরটি ঠিকমতো লাগেনি। তবে মূল সমস্যাটি কী? সঠিক উত্তর হলো করোনা  সংক্রমিত হয়েছে আজ অবধি অজেয় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এক ‘অণুজীব’, ভাইরাস দ্বারা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির চরম উৎকর্ষের যুগে প্রকৃতির নানাবিধ খেয়ালকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সক্ষম হলেও করোনাভাইরাসকে নিরাময় করার জন্য পুরোপুরি কার্র্যকরী প্রতিষেধক বা ওষুধ চিকিৎসাবিজ্ঞান আমাদের আজও উপহার দিতে সক্ষম হয়নি। বিগত দিনে ভাইরাসঘটিত কিছু রোগের ব্যাপক প্রাণহানি আমাদের চৈতন্যের দ্বারে বিপুলভাবে নাড়া দিয়ে গেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় SARS, MERS, AIDS ইত্যাদির নাম। এছাড়া এবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিশেষত আফ্রিকাতে যখন ব্যাপক লোকক্ষয় হয়েছিল তখনো ভাইরাস নামের অণুজীবের কাছে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অসহায়ত্ব আরেকবার প্রস্ফুট হয়েছিল। উল্লিখিত ভাইরাসগুলোর ধরন পৃথক। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক হিপক্রিটাসের যুগ  থেকে অদ্যাবধি এ ভাইরাসগুলোর প্রাদুর্ভাব এই প্রথম। ফলে চিকিৎসকদের কাছে বিষয়টি নতুন এবং সংশ্লিষ্টদের পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই এই ‘মহাযুদ্ধে’ নামতে হয়েছে। করোনাভাইরাস তার অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রতিনিয়তই তার ‘জিন’ তথা বংশগতি বদলাচ্ছে। অদ্যাবধি এ ভাইরাস অন্তত ৩৮০ বার এ কাজটি সাড়ম্বরে করেছে। ফলে বিজ্ঞানীদের জন্য ‘ক্ষণে ক্ষণে’ পরিবর্তিত ভাইরাসের প্রতিষেধক বা ওষুধ তৈরি করা জটিল হয়ে পড়েছে।

একটু লক্ষ করলে দেখা যায়, কুষ্ঠের মতো ভয়াল ব্যাধিকে চিকিৎসা দিয়ে আরোগ্য লাভ করা সম্ভব। প্রচলিত প্রবচন ‘যার হয় যক্ষ্মা, তার নেই রক্ষা’ - কে অসার প্রমাণিত করে তাকেও পরাভূত করা সম্ভব হয়েছে। কেন যক্ষ্মা, কুষ্ঠসহ অনেক দুর্মদ-দুর্বিনীত রোগকে পরাজিত করা সম্ভব হয়েছে? উত্তর খুবই সহজ। এগুলো কোনোটিই ভাইরাসজনিত রোগ নয়। আবার ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করার জন্য অব্যর্থ অ্যান্টিবায়োটিক যেমন আছে তেমনই উল্লিখিত অণুজীবের বিরুদ্ধে কার্যকরী প্রতিষেধক এবং ওষুধও তেমন আছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লাগসই প্রতিষেধক বা ওষুধ আজও অধরা। এটিই করোনা সমস্যার মূল। তাত্ত্বিকভাবে যদি ধরি, আগামীকালই করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক বা ওষুধ আবিষ্কার করা সম্ভব হয় তবে COVID-19 এর যত রোগী আছে তাদের সেই ওষুধ দিয়ে রোগ উপশম করা সম্ভব। আবার বাকি জনগোষ্ঠীকে প্রতিষেধক প্রয়োগের মাধ্যমে সংক্রমণের হাত  থেকে বাঁচান সম্ভব। সময়ের আবর্তনে পশ্চিমা দেশগুলো শল্য চিকিৎসায় বিশেষ সাফল্য লাভ করেছে। হৃদরোগ, স্নায়ুরোগ বা মানসিক রোগ চিকিৎসায় অগ্রগতির সূচক অনেকটাই অগ্রগামী কিন্তু তাদের আবহাওয়া, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সর্বসাধারণের স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মেনে চলাসহ নানাবিধ কারণে ‘ইনফেকশন’ জাতীয় রোগ অল্পই হয়। ফলে অণুজীব দ্বারা সৃষ্ট রোগবালাইয়ে উন্নততর গবেষণায় তাদের আগ্রহ যেমন কম তেমনই প্রায়োগিক জ্ঞান এবং সরাসরি চিকিৎসাসেবা দিয়ে রোগীকে সুস্থ করার অভিজ্ঞতাও সীমিত।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের FDA, ফেডারেল ড্রাগ এজেন্সি নতুন ওষুধ আবিষ্কারের অন্যতম অগ্রদূত। তবে শুধু ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা নয়, প্রাণীর ওপর ট্রায়াল, ‘স্বেচ্ছা প্রণোদিত’ রোগীর ওপর প্রয়োগ সবশেষে পোস্ট মার্কেটিং সার্ভিল্যান্সের স্তর পেরিয়ে এ সংস্থা নতুন ওষুধ বাজারজাত করার অনুমতি দেয়। এ প্রক্রিয়ায় নতুন ওষুধ বাজারজাত করতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। সেই ধারাবাহিকতায় করোনার ওষুধ আবিষ্কার এবং বাজারে আসতে যে দীর্ঘ সময় লেগে যাবে এটি দিব্যি বোঝা যাচ্ছে। তবে কি করোনা বিপর্যয়কে আমরা বিনাযুদ্ধে ওয়াক ওভার দিয়ে দেব। বিবেকবান মানুষ হিসেবে আমরা সেটি কখনই মানতে পারি না। তাহলে এ অবস্থায় আমাদের কি করণীয়।

উত্তর হলো, করোনা রোগী এবং তাদের ছোঁয়া থেকে মুক্ত থাকাই একমাত্র ‘বাতিঘর’। করোনা জীবাণু ঘরে আসে না, আমরাই তা জতুগৃহে নিয়ে আসি। 

লেখক : ক্লাসিফাইড স্পেশালিস্ট, ফার্মাকোলজি, আর্মড ফোর্সেস

মেডিকেল কলেজ।                                


আপনার মন্তব্য