শিরোনাম
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর, ২০২০ ২২:২২
আপডেট : ১৯ অক্টোবর, ২০২০ ২৩:৫৭

আমেরিকার নির্বাচন ২০২০

জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেন চীন ও ইউক্রেনে কি করছিলেন?

অনলাইন ডেস্ক

জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেন চীন ও ইউক্রেনে কি করছিলেন?
নাতনি এবং ছেলেকে (হান্টার বাইডেন) নিয়ে এয়ার ফোর্স টু থেকে নামছেন জো বাইডেন

বেশ কিছুদিন ধরেই ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নির্বাচনী প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে টার্গেট করেছেন জো বাইডেনের ছেলে হান্টার বাইডেনকে।

ট্রাম্পের অভিযোগ - ওবামা প্রশাসনে ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকার সময় ইউক্রেন এবং চীনে ছেলের ব্যবসায়িক স্বার্থে অবৈধভাবে প্রভাব খাটিয়েছিলেন জো. বাইডেন। মি বাইডেন সবসময় জোরালো ভাষায় এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

মার্কিন পত্রিকা নিউ ইয়র্ক পোস্টে সম্প্রতি একটি ইমেল নিয়ে এক প্রতিবেদন ছাপার পর বিষয়টি আবারো নতুন করে সামনে এসেছে।

কথিত ঐ ইমেলটি ইউক্রেনের একটি জ্বালানি কোম্পানির তৎকালীন একজন কর্মকর্তা হান্টার বাইডেনকে পাঠিয়েছিলেন, যেখানে তার বাবার সাথে সাক্ষাতের আমন্ত্রণ জানানোর জন্য ঐ কর্মকর্তা মি. বাইডেনের ছেলেকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

এই খবর সম্পর্কে একজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করলে, জো বাইডেন উত্তর দেন, এটি “চরিত্র হরণে মিথ্যা প্রচারণা'' ছাড়া আর কিছুই নয়।

ব্যবসায়িক স্বার্থে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ ওয়াশিংটনে নতুন কিছু নয়। মি. ট্রাম্পের ছেলে-মেয়েদের নানা ব্যবসায়িক চুক্তির সাথেও স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন উঠেছে। তারাও সবসময় তা জোর গলায় অস্বীকার করেন।

নিউইয়র্ক পোস্ট কী বলেছে?

নিউ ইয়র্ক পোস্টের ঐ রিপোর্টটি প্রধানত ২০১৫ সালের এপ্রিলের একটি ইমেল নিয়ে যেখানে ইউক্রেনের বেসরকারি জ্বালানি কোম্পানি বুরিজমা'র একজন উপদেষ্টা তাকে তার বাবার সাথে সাক্ষাতের জন্য ওয়াশিংটনে আমন্ত্রণ জানানোয় হান্টার বাইডেনকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

জো বাইডেন তখন বারাক ওবামা সরকারের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং তার দ্বিতীয় সন্তান হান্টার সেসময় বুরিজমা'র পরিচালনা বোর্ডের একজন সদস্য। তিনি ছাড়াও আরও কয়েকজন বিদেশী সেসময় বুরিজমার পরিচালনা বোর্ডে ছিলেন।

তবে বুরিজমার ঐ উপদেষ্টার সাথে জো বাইডেনের আদৌ কোনো সাক্ষাৎ হয়েছিল কিনা, সে ব্যাপারে নিউ ইয়র্ক পোস্ট কোনো প্রমাণ হাজির করেনি।

জো বাইডেনের নির্বাচনী প্রচারণা দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, সে সময় ভাইস প্রেসিডেন্টের ‘সরকারি কর্মসূচিতে' তেমন কোনো বৈঠকের কোনো উল্লেখ বা প্রমাণ নেই।

তবে পলিটিকো সাময়িকীতে এক লিখিত বিবৃতিতে মি. বাইডেনের প্রচারণা টিম থেকে বলা হয়েছে, বুরিজমার একজন উপদেষ্টার সাথে হয়ত অনানুষ্ঠানিক কোনো সাক্ষাৎ হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু তা হয়ে থাকলে তা ছিল খুব কম সময়ের সৌজন্য ধরণের হঠাৎ কোনো সাক্ষাৎ, যা সরকারি শিডিউলে উল্লেখ নেই।

বিবৃতিতে বলা হয়: “মিডিয়ার বিভিন্ন তদন্তে, ইমপিচমেন্টের (মি ট্রাম্পের)সময় তদন্তে, এবং এমনকী রিপাবলিকান নেতৃত্বের সেনেট কমিটির তদন্তে - যে তদন্তকে রিপাবলিকান একজন সেনেটর নিজেই ‘অবৈধ এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত' বলে আখ্যা দিয়েছিলেন - এগুলোর সবগুলোরই উপসংহার ছিল : জো বাইডেন ইউক্রেনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের নীতির বাইরে কিছুই করেননি, এবং কোনো অবৈধ বা অনৈতিক কাজে লিপ্ত ছিলেন না।“

মি বাইডেনের প্রচারণা টিম নিই ইয়র্ক পোস্ট-এর এই রিপোর্টকে “রাশিয়ার মিথ্যা প্রচারণা ছড়ানোর'' অংশ বলে বর্ণনা করেছে। তবে তারা বলেনি যে ঐ ই-মেল একেবারে ডাহা মিথ্যা।

নিউ ইয়র্ক পোস্টের ঐ রিপোর্টটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার মিত্ররা সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছেন। তার সাবেক দুই উপদেষ্টা - স্টিভ ব্যানন এবং রুডি জুলিয়ানি, কথিত ঐ ইমেলটি ফাঁস করার সাথে জড়িত ছিলেন। যে ল্যাপটপে ঐ ই-মেলটি ছিল বলে জানা গেছে সেটি এই দুজন নিউ ইয়র্ক পোস্টকে দিয়েছেন।

তবে অনেক মার্কিন মিডিয়া বলছেন, ঐ ইমেলটি ভুয়া না সত্যিই সেটি পাঠানো হয়েছিল, তা তারা যাচাই করতে পারেননি।

হান্টার বাইডেন বুরিজমা বোর্ডে যোগ দেন ২০১৪ সালে, এবং ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত তিনি ঐ কোম্পানিতে ছিলেন।

চীন নিয়ে বাইডেন ও তার ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী?

নিউ ইয়র্ক পোস্ট আরো একটি ইমেলের কথা বলেছে যে ইমেলেটি হান্টার বাইডেন পাঠিয়েছিলেন।

কথিত ঐ ইমেলে মি. বাইডেনের ছেলে নাকি লিখেছিলেন যে “শুধুমাত্র যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার জন্য'' তিনি চীনা একজন বিলিওনেয়ার ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বছরে এক কোটি ডলার পাচ্ছিলেন। তবে কার কার সাথে চীনা ঐ ব্যবসায়ীর যোগাযোগ তিনি করিয়ে দেন তা পরিষ্কার নয়।

তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ২০১৩ সালে মি. বাইডেন যখন চীন সফরে যান, তখন এয়ার ফোর্স টু বিমানে হান্টার বাইডেনও তার বাবার সহযাত্রী হয়েছিলেন।

ঐ সফরে বাইডেন জুনিয়র চীনা ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার জনাথন লি'র সাথে দেখা করেছিলেন। হান্টার নিই ইয়র্কার পত্রিকাকে বলেন, তিনি মি লি-র সাথে “এক কাপ কফি'' খেয়েছিলেন।

তবে ঐ সফরের ১২ দিন পর চীনা সরকারি কর্তৃপক্ষ বিএইচআর পার্টনার নামে একটি বেসরকারি ইকুইটি ফান্ডকে অনুমোদন দিয়েছিল। ঐ ফান্ডের প্রধান নির্বাহী ছিলেন জনাথন লি, এবং মি. হান্টার কোম্পানির পরিচালনা বোর্ডের সদস্য ছিলেন। কোম্পানিতে তার ১০ শতাংশ মালিকানাও ছিল।

মার্কিন মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, বিএইচআরের পেছনে চীনের বড় বড় কয়েকটি ব্যাংক এবং বেশ কটি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল।

তবে হান্টার বাইডেনের আইনজীবী বলেছেন ঐ কোম্পানির বোর্ডে তিনি অবৈতনিক সদস্য ছিলেন। “তার (হান্টারের) উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক অর্থ বাজারে চীনা পুঁজি নিয়ে আসা।'' ঐ আইনজীবী আরো বলেন, ২০১৭ সালে তার বাবা ক্ষমতা ছাড়ার আগ পর্যন্ত ঐ বিনিয়োগ কোম্পানিতে হান্টার বাইডেনের কোনো অংশিদারিত্ব ছিলনা।

বিএইচআর-এর বোর্ড থেকে ২০০০ সালের এপ্রিলে হান্টার পদত্যাগ করেন। কিন্তু কোম্পানির রিপোর্ট অনুযায়ী জুলাই পর্যন্ত ঐ কোম্পানিতে তার ১০ শতাংশ মালিকানা ছিল।

ইউক্রেন নিয়ে বাবা ও ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ কী

ট্রাম্পের অভিযোগ - বুরিজমা নামে যে জ্বালানি কোম্পানিতে হান্টার বাইডেন কাজ করতেন সেটির বিরুদ্ধে অনিয়মের তদন্ত করছিলেন যে সরকারি কৌঁসুলি তাকে চাকরিচ্যুত করার জন্য ইউক্রেন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন জো বাইডেন।

২০১৭ সালে মি. বাইডেন আইনজীবী ভিক্টর শোকিনকে বরখাস্ত করার চাপ দিয়েছিলেন। তবে ইউক্রেনকে সাহায্য করছিল এমন আরো কটি পশ্চিমা সরকার এবং প্রতিষ্ঠানও সেসময় ঐ আইনজীবীকে বরখাস্ত করার দাবি করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, মি শোকিন ইউক্রেনে দুর্নীতি মোকাবেলায় ভূমিকা নিচ্ছিলেন না।

ইমপিচমেন্টের সাথে ইউক্রেনের কী সম্পর্ক ছিল?

২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে ইউক্রেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্টের এক ফোনালাপের খবর ফাঁস হয়ে যায়, যেখানে মি. ট্রাম্প, জো বাইডেন এবং তার ছেলের ভূমিকা তদন্তে ইউক্রেনের নেতাকে অনুরোধ করেন।

সাথে সাথে ক্ষিপ্ত ডেমোক্র্যাটরা বলতে শুরু করে যে তার নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীর ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য মি ট্রাম্প ইউক্রেনের ওপর অবৈধ চাপ দিচ্ছেন। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়া শুরু হয়।

মি. ট্রাম্প বলেন, তিনি কোনো অন্যায় করেননি, এবং রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সেনেট তাকে অব্যাহতি দিয়ে দেয়।

জো বাইডেন ও তার ছেলের বিরুদ্ধে কিছু কি প্রমাণিত হয়েছে?

কোনো অপরাধী তৎপরতা প্রমাণিত হয়নি, এবং এমন কোনো প্রমাণ এখনও নেই যে জো বাইডেন ইচ্ছাকৃতভাবে এমন কিছু করেছিলেন, যা তার ছেলেকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে পারে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে যে স্বার্থের সংঘাত হয়তোবা হয়ে থাকতে পারে। এমনকী ২০১৫ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন কর্মকর্তাও এমন সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

জো বাইডেনের ছেলে বলেছেন বিদেশে তার ব্যবসায়িক ভূমিকায় অবৈধ বা অনৈতিক কিছু ছিল না।

মার্কিন রিপাবলিকান সেনেটররা তাদের এক তদন্তে বলেছেন ইউক্রেনের একটি প্রতিষ্ঠানে হান্টারের চাকরি করা ছিল ‘একটি সমস্যা'। তবে হান্টারের ঐ চাকরি যে মার্কিন বিদেশ নীতিকে প্রভাবিত করেছে, তা প্রমাণিত হয়নি।

ইউক্রেনের কোম্পানি বুরিজমার বিরুদ্ধেও কোনো অপরাধী তৎপরতা প্রমাণিত হয়নি। ২০১৭ সালে ঐ কোম্পানি এক বিবৃতিতে বলে, তাদের বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ এবং আইনি প্রক্রিয়া সরকার প্রত্যাহার করেছে।

ভিক্টর শোকিনের জায়গায় যে কৌঁসুলি নিয়োগ পেয়েছেন সেই ইউরি লুতসেনকো গত বছর বিবিসিকে বলেন, ইউক্রেনে জো বাইডেন এবং তার ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের কোনো কারণ নেই।

পরিবারের কেউ সরকারে থাকলে কোনো কোম্পানির বোর্ডে বসা বেআইনি কিছু নয়, যদিও হান্টার বাইডেন বলেছেন, বুরিজমার পরিচালনা বোর্ডে যোগ দেওয়া হয়ত তার ‘দুর্বল একটি সিদ্ধান্ত' ছিল।

২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে হান্টার বাইডেনের আইনজীবী বলেন “তিনি স্বাধীনভাবে ঐসব ব্যবসায়ী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। তিনি মনে করেননি যে এসব নিয়ে বাবার সাথে পরামর্শ করা যথাযথ হতো, এবং তিনি তেমন পরামর্শ কখনো করেনওনি।''

নিউ ইয়র্কার পত্রিকাকে হান্টার বলেন, মাত্র একবার তিনি বাবার কাছে বুরিজমার প্রসঙ্গ তুলছিলেন: “বাবা বলেছিলেন আমি আশা করি তুমি যা করছো তা বুঝেশুঝেই করছো।''

আর এসব বিতর্ক আর প্রশ্নের মাঝে, জো বাইডেন গত বছর বলেছিলেন তিনি নির্বাচিত হলে, তার পরিবারের কেউ সরকারে কোনো চাকরিতে থাকবে না, অথবা বিদেশী কোনো কোম্পানি বা বিদেশী কোনো সরকারের সাথে কোনো ধরনের ব্যবসায়িক সম্পর্কে জড়াবে না। সূত্র: বিবিসি বাংলা

বিডি প্রতিদিন/আরাফাত


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর