শিরোনাম
প্রকাশ : ২০ জানুয়ারি, ২০২১ ০৮:৫৫
আপডেট : ২০ জানুয়ারি, ২০২১ ০৯:৪৩
প্রিন্ট করুন printer

ইরানে হামলা চালালে কতটা সফল হবেন বাইডেন?

অনলাইন ডেস্ক

ইরানে হামলা চালালে কতটা সফল হবেন বাইডেন?
জো বাইডেন

যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প শাসনামলের সমাপ্তির ফলে ইরান সতর্কতার সঙ্গে হলেও এক ধরনের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে।

কারণ, নব-নির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে তিনি ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পক্ষের যে পরমাণু চুক্তি হয়েছিল তাতে আমেরিকাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন।

সেরকম হলে ইরানের ওপর আরোপিত সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নিতে হবে এবং চুক্তি মেনে চলার শর্তে ইরানকে তখন অর্থও দিতে হবে।

তাহলে কি বলা যায় যে ইরান এখন হামলার হাত থেকে বেঁচে গেছে?

এক কথায় বললে, না। ইরান নিয়ে ইসরায়েল এখনও প্রচণ্ড উদ্বিগ্ন। ইরানের বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচিই শুধু নয়, তেহরানের পরমাণু অস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির চেষ্টাও তাদের উদ্বেগের কারণ।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বেনি গান্টজ ইরানের পরমাণু কর্মসূচি প্রসঙ্গে বলেছেন, “এটা পরিষ্কার যে ইসরায়েলকে সামরিক বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে। এজন্য সম্পদ ও বিনিয়োগের প্রয়োজন এবং তার জন্য আমি কাজ করছি।”

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের ঘোষিত শত্রু ইসরায়েল।

ইসরায়েল মনে করে ইরানের হাতে যদি পরমাণু অস্ত্র চলে আসে সেটা তাদের অস্তিত্বের জন্যই বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। একারণে তারা বিশ্বের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দেরি না করে ইরানকে এখনই থামাতে।

ইরান সবসময়ই বলে আসছে যে তাদের পরমাণু কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ কাজে জ্বালানি ব্যবহারের উদ্দেশ্যে। তবে সম্প্রতি দেশটি যে হারে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে সেটি ২০১৫ সালের চুক্তিকে লঙ্ঘন করছে এবং তা নিয়েই নতুন করে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

এর আগে ১৯৮১ সালে ইসরায়েল সন্দেহ করেছিল যে ইরাকি প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন পরমাণু অস্ত্র অর্জনের চেষ্টা করছেন।

পরে ‘অপারেশন ব্যাবিলন’ নামের অভিযানে এফ ফিফটিন ও এফ সিক্সটিন যুদ্ধবিমান দিয়ে হামলা চালিয়ে ইরাকের অসিরাক পরমাণু কেন্দ্র ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।

এর ২৬ বছর পর ২০০৭ সালে তারা সিরিয়াতেও অভিযান চালিয়েছে যার নাম ছিল অপারেশন আউটসাইড দ্য বক্স। ওই অভিযানে তারা দেইর আল-জুরের কাছে মরুভূমিতে স্থাপিত গোপন একটি প্লুটোনিয়াম চুল্লি ধ্বংস করে দিয়েছিল সেটি চালু করার আগেই।

কিন্তু ইরান আক্রমণের জন্য খুব একটা সহজ টার্গেট নয়। প্রথমত দূরত্ব, সেখানে পৌঁছানো এবং তার পর দেশটির শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চাড়া ইসরায়েল সেখানে কতোটা সফলভাবে আক্রমণ করতে পারবে সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এছাড়াও বাইডেন প্রশাসন এধরনের হামলায় অংশগ্রহণ করতে অনিচ্ছুক।

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং কোন উপসাগরীয় আরব দেশ থেকে ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালানো হতে পারে এই আশঙ্কায় তেহরান তাদের কিছু কিছু কেন্দ্র পাহাড়ের তলায় মাটির নিচে লুকিয়ে ফেলার জন্য অর্থ বিনিয়োগ করেছে এবং এবিষয়ে তারা অনেক কাজও করেছে।

ইরানের পরমাণু শিল্প, যদিও তারা এর প্রকৃত উদ্দেশ্য গোপন রেখে বলে যে এই কর্মসূচি বেসামরিক, তারপরেও তাদের এই কর্মসূচি ইরানের সামরিক ও নিরাপত্তা কাঠামোর সাথে জড়িত।

সত্যি কথা বলতে, এধরনের হামলার ব্যাপারে ইরানি লোকজন এতো দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি নিয়েছে যে এখন মাটির নিচে তৈরি করা এসব স্থাপনা টার্গেট করাও বেশ কঠিন হবে।

তা সত্ত্বেও ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা তিনটি দিক থেকে হামলার শিকার হতে পারে।

 “ইরানের স্থাপনাগুলো অজেয় নয়,” বলেন মার্ক ফিৎসপ্যাট্রিক, ইন্টারন্যাশনাল ইন্সটিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বা আইআইএসএসের একজন গবেষক, একই সাথে তিনি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ।

“নাতাঞ্জে যে স্থাপনাটি আছে সেখানে বাঙ্কার ধংস করে দেওয়ার বোমা দিয়ে নিখুঁতভাবে হামলা চালানো যেতে পারে। এজন্য হয়তো দুটো নিখুঁত আঘাতের দরকার: প্রথম আঘাতে একটা বড় গর্ত তৈরি হবে এবং পরের হামলায় এর ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে স্পর্শকাতর সব যন্ত্রপাতি এমনভাবে নাড়িয়ে দেওয়া হবে যে সেগুলো আর কাজ করতে পারবে না।”

তবে ইরান অনেক বড় একটি দেশ এবং তার পারমাণবিক স্থাপনা বিভিন্ন জায়গায় ভূগর্ভে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

বছর আটেক আগে ২০১২ সালে বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন যে ফর্দোতে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের স্থাপনাটি একটি পর্বতের অন্তত ২৬০ ফুট গভীরে। যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত শক্তিশালী বাঙ্কার-বাস্টিং বোমা দিয়ে নিখুঁতভাবে হামলা চালিয়েও এটি হয়তো ধ্বংস করা অসম্ভব।

“ফর্দো স্থাপনাটি মাটির এতো গভীরে যে সেটি বাঙ্কার-বাস্টার প্রতিরোধ করতে পারবে। কিন্তু কোন নাশকতা তো তারা ঠেকাতে পারবে না,” বলেন মার্ক ফিৎসপ্যাট্রিক।

“এর প্রবেশ মুখ এবং ভেতরে ঢোকার পথে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে স্থাপনাটি কয়েক মাসের জন্য অকেজো করে দেওয়া যায়।”

তবে এধরনের স্থাপনায় পৌঁছাতে হলে সম্ভবত দুই দফায় হামলা চালাতে হবে। প্রথমে ইরানের আকাশ সীমায় ঢুকে পড়তে হবে। সেটা করতে হবে ইরানকে লুকিয়ে অথবা তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিয়ে।

ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করার ব্যাপারে ইরান প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। তার মধ্যে রয়েছে বাভার-৩৭৩। এটি রাশিয়ার এস-৩০০ প্রতিরোধী ব্যবস্থার মতো। এই ব্যবস্থা ৩০০ কিলোমিটার দূরের কোন বিমান চিহ্নিত করে সেটিকে মাটিতে নামিয়ে দিতে পারে।

ইরানের ওপর আংশিক সফল হামলার পরিণতি হতে পারে এরকম- ভূপাতিত বিমানের পাইলটকে আটক করে তাকে ইরানি টেলিভিশনে হাজির হওয়া, হামলাকারীরা যা কখনোই চাইবে না।

অন্যদিকে, মানুষ দিয়ে আক্রমণের ইতোমধ্যেই চালানো হয়েছে ইরানে।

ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ইরানের ভেতরে গুপ্তচরদের ব্যতিক্রমী ও অত্যন্ত শক্তিশালী একটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে।

তাদের কাছে এতোটাই তথ্য আছে যে ইরানের শীর্ষস্থানীয় একজন বিজ্ঞানী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহসেন ফখরিজাদে ২৭ নভেম্বর যখন প্রহরায় থাকা একটি গাড়ির বহর নিয়ে রাজধানী তেহরানের একটি নির্জন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন তখন তার ওপর হামলা চালানো হয়েছিল এবং হামলাকারীরা নিখুঁতভাবে জানতো তিনি কোন সময়ে কোন পথ ধরে যাচ্ছেন।

সেদিন তার ওপর কিভাবে হামলা চালানো হয়েছিল সেবিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন খবর পাওয়া গেছে।

ইরান দাবি করছে যে একটি রিমোট স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রিত মেশিনগান দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে যা একটি পিক-আপ ট্রাকের ওপর বসানো ছিল। অন্যান্য সূত্রের বিশ্বাস যে মোসাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গুপ্তচর তার ওপর হামলা চালিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে গেছে।

তবে যেভাবেই হোক, ইরানের পরমাণু কর্মসূচির জনক হিসেবে পরিচিত এবং গোপনে পরমাণু কর্মসূচি চালানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা যাকে দায়ী করে সেই ফখরিজাদেকে হত্যা করা হয়েছে।

এই হামলার নেপথ্যে কারা আছে সেবিষয়ে ইসরায়েল কোনও মন্তব্য করেনি।

এই হত্যাকাণ্ডের আগে ২০১০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে ইরানে চারজন শীর্ষস্থানীয় পরমাণু বিজ্ঞানীকে ইরানের ভেতরে হত্যা করা হয়েছে। তাদের কাউকে কাউকে হত্যা করা হয়েছে গাড়ি-বোমা ফাটিয়ে।

এসব ঘটনায় ইসরায়েল জড়িত কিনা সেবিষয়ে ইসরায়েল কখনও মন্তব্য করেনি, আবার কখনও অস্বীকারও করেনি।

তবে এসব হত্যাকাণ্ড প্রমাণ করে ইরানের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা সত্ত্বেও হত্যাকারীরা তাদের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে।

এদিকে, সাইবার জগতেও অঘোষিত এক যুদ্ধ চলছে, যার একদিকে ইরান আর অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং সৌদি আরব।

ইরানের যে নাতাঞ্জ পরমাণু কেন্দ্রে সেন্ট্রিফিউজ সমৃদ্ধ করা হয় সেখানকার কম্পিউটারে ২০১০ সালে অত্যন্ত স্পর্শকাতর এক ভাইরাস বা ম্যালাওয়্যার দিয়ে আক্রমণ চালানো হয়েছিল। ওই ভাইরাসের কোডনেম ছিল স্টাক্সনেট।

এর ফলাফল ছিল বিশৃঙ্খলা, সেন্ট্রিফিউজগুলো নিয়ন্ত্রণের বাইরে গিয়ে ঘুরতে থাকে এবং তার ফলে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কাজ কয়েক বছর পিছিয়ে যায়।

ইসরায়েল এই হামলা চালিয়েছে বলে খবরে ফলাও করে বলা হলেও ধারণা করা হয় যে স্টাক্সনেট তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বিশেষজ্ঞরা ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন।

সাথে সাথেই পাল্টা হামলা চালায় ইরান। তাদের তৈরি ম্যালাওয়্যার দিয়ে তারা সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরমকোর নেটওয়ার্কের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করে। এর ফলে ৩০,০০০ কম্পিউটার অচল হয়ে পড়ে এবং সৌদি আরবের তেল উৎপাদনও হুমকির মুখে পড়ে যায়।

ইরানের তৈরি ওই ভাইরাসটির নাম ছিল শামুন। এরপরেও এধরনের হামলা অব্যাহত থেকেছে।

ঝুঁকি রয়েই গেছে
ইরান ও বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে ২০১৫ সালে যে আন্তর্জাতিক চুক্তি সই হয়েছিল তাতে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচির ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা বলা হয়েছিল।

ধারণা করা হয়েছিল যে এর ফলে তার প্রতিপক্ষ দেশগুলোর আর সামরিক হামলার কথা বিবেচনা করতে হবে না।

কিন্তু এই চুক্তির ব্যাপারে ইসরায়েল এবং সৌদি আরব সবসময় সন্দিহান ছিল। তারা মনে করতো এই চুক্তি অনেক বেশি নমনীয় ও সাময়িক। কারণ এই চুক্তিতে ইরানের

ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়নি।

এখনও তারা চায় না জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর এনিয়ে তাদের উদ্বেগ দূর না করেই এই চুক্তি পুনরুজ্জীবিত করা হোক।

উপসাগরীয় এলাকার কোন দেশও আরো একটি যুদ্ধ দেখতে চায় না।

এমনকি ২০১৯ সালে সৌদি আরবে তেলের অবকাঠামোর ওপর যে ক্ষেপণাস্ত্র চালানো হয়েছিল এবং যার জন্যে ইরানকে দায়ী করা হয়, তার বিরুদ্ধেও কোন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কিন্তু ইরান গোপনে পরমাণু অস্ত্র তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে এই সন্দেহ যতদিন থাকবে ততদিন তাদের স্থাপনার ওপর সামরিক আক্রমণের ঝুঁকি থেকেই যাবে। সূত্র: বিবিসি বাংলা

বিডি প্রতিদিন/কালাম


আপনার মন্তব্য

এই বিভাগের আরও খবর